চিকেনস নেক নিয়ে নতুন আতঙ্কে ভারত

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি কড়িডোরে ভারী যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করেছে ভারত

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ শনিবার (৫ এপ্রিল) ভারতের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম এখবর জানায়। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড.মুহাম্মদ ইউনূস তার চীনে সফরের সময় চীনা বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সময় ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য তথা সেভেন সিস্টার্স রাজ্য নিয়ে আলোচনার পর ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়ায় ভারত সরকার সেখানে ভারী যুদ্ধাস্ত্র মোতায়েন করেছে।

প্রসঙ্গত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিমসটেক সম্মেলনে অংশ নিতে দু’দিনের থাইল্যান্ড সফর শেষ করেছেন। শুক্রবার ব্যাংকক থেকে দ্বিপাক্ষিক সফরে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে পৌঁছেছেন তিনি। নরেন্দ্র মোদির আঞ্চলিক এই সফরের মাঝে ভারতের বহুল আলোচিত ‘চিকেনস নেক’ খ্যাত শিলিগুড়ি করিডোরে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে নয়াদিল্লি। এমনকি সেখানে অত্যানুধিক যুদ্ধাস্ত্রের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাও।

এর আগে,গতকাল শুক্রবার (৪ এপ্রিল) আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন নরেন্দ্র মোদি। গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে মোদির এটাই প্রথম মুখোমুখি বৈঠক।

দুই দেশের কূটনৈতিক তৎপরতায় ব্যাংককে উভয় নেতা প্রথমবারের মতো বৈঠক করেন। কয়েক দিন আগে চীন সফরে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভারতে সেভেন সিস্টার্স নিয়ে মন্তব্য করেন। সেখানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশে চীনের সম্ভাব্য বিনিয়োগের বিষয়ে কথা বলেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টার ওই মন্তব্যের পর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোরের সুরক্ষা সম্পর্কে ভারতে উদ্বেগ দেখা গেছে। ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় এই করিডোর সাধারণত ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত।

পশ্চিমবঙ্গের এই সংকীর্ণ ভূমি ভারতের উত্তর- পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে দেশটির অন্যান্য অংশের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। যেখানে নেপাল, বাংলাদেশ, ভুটান এবং চীনের সীমান্ত রয়েছে। শুক্রবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ভারত এই গুরুত্বপূর্ণ করিডোরের নিরাপত্তায় ব্যাপক সুরক্ষা ব্যবস্থা বৃদ্ধি করেছে।

ভারতের জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে বলেছে, ভারতীয় সেনাবাহিনী শিলিগুড়ি করিডোরকে নিজেদের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা লাইন হিসাবে মনে করে। এই পথ ব্যবহার করে সামরিক প্রস্তুতির মাধ্যমে যে কোনও ধরনের সম্ভাব্য হুমকির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রস্তুতি রয়েছে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর।

করিডোরের পার্শ্ববর্তী সুকনায় দেশটির সামরিক বাহিনীর ত্রিশক্তি কর্পসের সদরদপ্তর রয়েছে। এই বাহিনী অঞ্চলটির নিরাপত্তায় মূখ্য ভূমিকা পালন করে। ত্রিশক্তি কর্পস রাফাল যুদ্ধবিমান, ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত প্রযুক্তির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাসহ অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত।

দেশটির এই সংবাদমাধ্যম বলেছে, ভারতীয় সেনাপ্রধানের সাম্প্রতিক বক্তব্য করিডোরের সুরক্ষার বিষয়ে ভারতের অবস্থানকে আরও জোরদার করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠার পরিবর্তে চিকেনস নেককে ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা হবে; যেখান থেকে পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাহিনী যে কোনও ধরনের সম্ভাব্য হুমকির ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রসর হতে পারবে।

ভারত বাংলাদেশ সংলগ্ন উক্ত এলাকায় যে সমস্ত পদক্ষেপ নিচ্ছে তা নিম্নরূপ:

* কয়েক স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে

* উন্নত সামরিক অস্ত্র মোতায়েন : ভারতীয় বিমান বাহিনী মিগ বিমানের পাশাপাশি হাশিমারা বিমানঘাঁটিতে রাফাল যুদ্ধবিমানের একটি স্কোয়াড্রন মোতায়েন করেছে।

* ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র রেজিমেন্ট : সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় শিলিগুড়ি করিডোরে ব্রহ্মস সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের একটি রেজিমেন্ট মোতায়েন করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।

* সারফেস-টু-এয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা : আকাশপথ ব্যবহার করে যে কোনও ধরনের হামলা ঠেকাতে ওই অঞ্চলে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে ভারত।

* এমআরএসএএম ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা : যে কোনও ধরনের অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে আকাশসীমার সুরক্ষা নিশ্চিতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে এমআরএসএএম ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন রেখেছে ভারতীয় সামরিক বাহিনী।

* নিয়মিত সামরিক টহল : ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ত্রিশক্তি কর্পস টি-৯০ ট্যাংক-সহ তাজা গুলি বর্ষণের মহড়া পরিচালনা করছে। যে কোনও পরিস্থিতি নিজেদের অভিযানের প্রস্তুতি জোরদারের লক্ষ্যে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কৌশলগত সতর্কতা: ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আঞ্চলিক হুমকির বিরুদ্ধে ভারত সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) মাধ্যমে বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক মন্তব্য নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করছে দিল্লি।

বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক ভারতের জন্য কৌশলগত, বিশেষ করে সিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তার বিষয়ে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন ভারতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

এমন পরিস্থিতিতে ভারত ওই অঞ্চলে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ (সিডিএস) জেনারেল অনিল চৌহান সম্প্রতি সামরিক বাহিনী অপারেশনাল প্রস্তুতি পর্যালোচনা করতে উত্তরবঙ্গ পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় ভারতের প্রতিশ্রুতির ওপর জোর দেন। সফরে সম্মুখ সারির ঘাঁটিগুলো পরিদর্শন ও নিরাপত্তা কৌশল সম্পর্কে সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনাও করেন।

* ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যতের প্রস্তুতি ২০১৭ সালে ভুটানের ভূখণ্ডের ডোকলামে চীনা সামরিক বাহিনীর একটি সড়ক নির্মাণ কাজে ভারতীয় বাহিনীর বাধা দেওয়ার ঘটনায় ব্যাপক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। সেই সময় চিকেনস নেকের নিরাপত্তার বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কারণ ডোকলামের ওই সড়ক ধরে শিলিগুরি করিডোরে পৌঁছানোর পথ অনেক সহজ হয়ে যেতো।

কিন্তু ভারতীয় সামরিক বাহিনীর বাধার মুখে শেষ পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ থেকে পিছু হটে চীনের সেনাবাহিনী। অতীতের এসব ঘটনা থেকে ভারত নিজেদের প্রতিরক্ষা অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রস্তুতি বাড়িয়ে চলেছে বলে ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

কবির আহমেদ/ইবিটাইমস/এম আর 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »