বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে বলেছেন, এখনো সময় আছে সিদ্ধান্ত নেন, স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়বেন, না জনগণের আন্দোলনে বিতাড়িত হবেন ?
ইবিটাইমস ডেস্কঃ বুধবার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সরকার পতনের একদফা দাবিতে, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, আজকের সমাবেশে লাখো জনতার উপস্থিতি আপনাকে বার্তা দিয়েছে, আপনি আর দেশের প্রধানমন্ত্রী নেই।
বিএনপির নতুন কর্মসূচি ঘোষণা: সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আবদুস সালাম। সমাবেশ শেষে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব আগামী ২৮ অক্টোবর রাজধানীতে মহাসমাবেশের ঘোষণা দিয়ে বলেন, এ মহাসমাবেশের মধ্য দিয়ে আমাদের মহাযাত্রা শুরু হবে।
সরকারের পদত্যাগ ও সংসদ বিলুপ্ত, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে এ জনসমাবেশের আয়োজন করে বিএনপি। দুপুর ২ টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বেলা ১১টার আগেই হাজার হাজার নেতাকর্মীদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। নেতাকর্মীদের স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠতে থাকে নয়াপল্টন। বিভিন্ন ইউনিট থেকে ব্যানার, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে স্লোগান দেন নেতাকর্মীরা। ৫টি ট্রাক দিয়ে অস্থায়ী মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়।
সমাবেশকে কেন্দ্র করে নয়াপল্টনে ভিআইপি সড়কের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আশপাশের সড়কে তীব্র যানজট দেখা দেয়। এদিকে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার বক্তব্যে বলেন, আজকে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। আজকেও দেখলাম প্রথম আলোর ভূয়া পেইজ খুলে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। সরকারের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, তত বেশি করে প্রপাগাণ্ডা ছড়াচ্ছে। আজকের এই লাখো জনতার উপস্থিতি প্রমাণ করে এসব প্রপাগাণ্ডা জনগণ এখন আর বিশ্বাস করে না।
তিনি বলেন, যখনই আমাদের সমাবেশ হয় তখনই নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। আজকের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ২৫০ জনেরও বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ থেকে প্রমাণ হয় সরকার ভীতু হয়ে উঠেছে। এদের পায়ের নিচে মাটি নেই। ভয় থেকেই সরকার এগুলো করছে।
ফখরুল বলেন, আমি আবারও বলছি এই সরকার সম্পূর্ণ অবৈধ সরকার। এরা বলছে সংবিধানের বাইরে যাবে না। এরা সংবিধান কাটাছেঁড়া করে জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে। এরা কথায় কথায় সংবিধানের দোহাই দেয়। আসলে এই সংবিধান এক পরিবারের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে। সংবিধানের কথা বলে সারাদেশকে সংহিস রাজনীতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে সরকার।
তিনি বলেন, আজকের এই সমাবেশে অনেক জেলা থেকে সাধারণ মানুষ ও দলীয় কর্মীরা ছুটে এসেছে। কারণ, তারা নতুন কর্মসূচি চায়। দেশব্যাপী উদগ্রীব হয়ে আছে কখন এ সরকার বিদায় নিবে। এখন আর হামলা-মামলা জনগণ ভয় পায় না। কোনো কিছু করে দেশের মানুষকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, খালেদা জিয়াকে গতকালও দেখতে গিয়েছিলাম। ডাক্তাররা বলেছেন, তাকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে বিদেশে সুচিকিৎসার কোনো বিকল্প নাই। যে মানুষটি আজীবন দেশের জন্য গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন, তাকেই বিনা চিকিৎসায় ধুকে ধুকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে এ সরকার।
তিনি বলেন, ইতোমধ্যে মিথ্যা মামলা দিয়ে ৯৬ জন নেতাকে সাজা দিয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে তাদের সাজা দিতে পারলে মাঠ পরিষ্কার। কত ভীতু হলে ও কাপুরুষ হলে তারা তা করতে পারে। এরা ক্ষমতায় থাকলে শুধু রাজনীতি নয়, দেশ রসাতলে যাবে।
তিনি বলেন, দেশের মানুষ আপনাদের ক্ষমতায় দেখতে চায় না। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য পাঁচ বছরে একদিনই জনগণ ভোটের অধিকার পায়, কিন্তু ২০১৪ ও ১৮ সালে সে অধিকারগুলো কেড়ে নিয়েছে। এ সরকারের কোনো ভিত্তি নেই। এখনো বলছি, ক্ষমতা ছাড়ুন। আজকে মানুষ জেগে উঠেছে। এই জাগ্রত জনতা ফুঁসে ওঠার আগে জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করুন।
সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস সরকারের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, এত গ্রেফতারে কি আন্দোলন থেমে গেছে? গতকাল একটি বিশেষ শ্রেণির সভা হয়েছে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে বিরোধী নেতাকর্মীদের দমন করার জন্য। এসব কোনো প্রক্রিয়ায় কাজ হবে না। জনগণ রাস্তায় নেমে গেছে। আপনার যত অপকর্ম করেছেন, চুরি করছেন জনগণ তা জেনে গেছে। আপনারা বলছেন- বাড়াবাড়ি করবেন না। বাড়াবাড়িতো আপনারা করছেন। পুলিশ নিয়ে অহঙ্কার করছেন। এত অহঙ্কার ভালো না। ওবায়দুল কাদের বলেছেন, শাপলা চত্বরের মতো অবস্থা হবে। তার মানে আপনি স্বীকার করছেন, সেদিন আপনারাই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন। মনে রাখবেন হেফাজত আর বিএনপি এক না। আমরা তিনবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলাম।
সমাবেশে সাবেক মন্ত্রী বিএনপির সিনিয়র নেতা ড. আবদুল মঈন খান বলেন, আজকে বাংলাদেশ থেকে বাকশালকে বিদায় করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য আমরা আন্দোলন করে যাচ্ছি। এই আওয়ামী লীগ তিন মিনিটে গণতন্ত্র ধ্বংস করে বাকশাল কায়েম করেছিল। এই আওয়ামী লীগ কখনই গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে নাই। এরা জনগণের ইচ্ছাকে পদদলিত করে বারবার ক্ষমতায় এসেছে। আওয়ামী লীগ আগে বলতো, আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব। আজকে তারা একথা বলে না। তারা এখন বলে, দিনের ভোট রাতে দেব। কারণ তারা দিনে ভোট দিলে ১০ শতাংশ ভোটও পাবে না। এবার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এদের বিদায় করে দেশে জনগণের শাসন কায়েম করবো ইনশাআল্লাহ।
আমীর খসরু বলেন, আজকে সব জায়গায় মানুষের একটি প্রশ্ন- আর কয়দিন? মানুষ আর অপেক্ষা করতে পারছে না। দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন তারা। এখনই পদত্যাগ করুন। আলোচনা সমঝোতার কথা আসছে। বিএনপি অবশ্যই আলোচনা সমঝোতায় বিশ্বাস করে। এর আগে শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে। তারপরেই বিএনপি আলোচনায় বসতে রাজি। মিথ্যে সংবিধানের দোহাই দিয়ে লাভ হবে না। জনগণ রাস্তায় নেমেছে। সরকারের পতন না ঘটিয়ে ঘরে ফিরবে না তারা।
আবদুস সালাম তার বক্তব্যে বলেন, ওবায়দুল কাদের নিজেই বিএনপির প্রচার করছে। বলছেন রাজধানীর সকল হোটেল, বাসাবাড়ি পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতাদের মাথায় নাকি ইউরেনিয়াম ঢেলে দিবে। আসলে আওয়ামী লীগে পাগলে ভরা। সরকারের কিছু উচ্ছিষ্টভোগী যারা ইউরেনিয়াম দিয়ে হত্যার হুমকি দেয় তাদের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য দালালী করছেন।
ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব আমিনুল হক এবং দক্ষিণের ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব লিটন মাহমুদের সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর, বরকত উল্লাহ বুলু, শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, হাবিবুর রহমান হাবিব, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, চেয়ারপার্সনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী, মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল প্রমুখ।
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস