ইসরাইল ও প্যালেস্টাইনের মধ্যে নতুন যুদ্ধাবস্থা

প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, দেশটি গাজা উপত্যকার শাসক ফিলিস্তিনি (প্যালেস্টাইন) স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে “যুদ্ধ করছে”

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ শুক্রবার (৬ অক্টোবর) অধিকৃত পশ্চিম তীরের হুয়ারা শহরে ইসরাইলের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত এক ফিলিস্তিনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকে নতুন করে এই উত্তেজনা শুরু হয়েছে। ইসরাইলিদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বেশ কয়েকটি ভয়াবহ গোলাগুলি ছোঁড়ার ঘটনা এ বছর প্রত্যক্ষ করেছে হুয়ারা। স্থানীয় বাসিন্দা ও তাঁদের বিষয়-আশয় লক্ষ্য করে শত শত ইহুদি বসতিস্থাপনকারীও পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

শনিবার দিনের শুরুতে গাজা উপত্যকার শাসক হামাস ইসরাইলের বিরুদ্ধে একটি বড় আকারের, নানামুখী আক্রমণ শুরুর পর প্রথমবারের মতো টেলিভিশনে বক্তব্য রাখতে যেয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু হামাসের সাথে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করার কথা জানিয়েছেন।

তিনি রিজার্ভ সেনাদলকে ডেকে পাঠিয়েছেন এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, হামাস “এতোটাই চরম মূল্য দেবে যা তারা এখন পর্যন্ত দেখেনি।” “আমরা যুদ্ধ করছি”, নেতানিয়াহু বলেন। “এটা কোনো ‘অভিযান” নয়, নয় কোনো ‘টহল’, এটা যুদ্ধ।”একইসঙ্গে, যেসব শহরে হামাসের যোদ্ধারা অনুপ্রবেশ করে ইসরাইলি সেনাদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধ করছে, সেগুলো থেকে তাদের নির্মূল করার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

শনিবার হামাস ইসরাইলের উদ্দেশে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ে এবং দেশটির অত্যন্ত সুরক্ষিত সীমান্ত এলাকায় বেশ কয়েক ডজন সেনা পাঠিয়ে বড় আকারে পেশীশক্তি প্রদর্শন করে, যা একটি বড় ছুটির সময় ইসরাইলকে অপ্রস্তুত করে তোলে।

ইসরাইলের জরুরী সেবা সংস্থা জানায়, চিকিৎসাকর্মীরা ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলে ১৬ জন হতাহতকে উদ্ধার করেছে, যার মধ্যে একজন ষাটোর্ধ বৃদ্ধা আছেন। তিনি গাজা থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি আঘাতে নিহত হন। এই হামলায় আহত অপর ২ ব্যক্তি আশংকাজনক অবস্থায় আছেন।

উভয় পক্ষে হতাহতের আরও খবর এসেছে। তবে কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষনিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। ইসরাইলি গণমাধ্যম জানায়, দক্ষিণ ইসরাইলে কয়েক ডজন মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গাজায় অবস্থিত ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রক জানায়, “অসংখ্য নাগরিক” আহত হয়েছেন। তবে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানানো হয়নি। মসজিদগুলোতে লাউডস্পিকারে নিহত যোদ্ধাদের জন্য প্রার্থনা করা হয়।

হামাস, ইসরাইলের উদ্দেশে ২ হাজারেরও বেশ ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ে। যার ফলে এমন কী দেশটির একেবারে উত্তরে অবস্থিত তেল আবিব ও জেরুজালেমেও সার্বক্ষণিকভাবে আকাশ হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বাজতে থাকে। এই হামলার কারণে গাজার সুনির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ইসরাইলি সামরিক বাহিনী। তারা জানায়, ইসরাইলের অন্তত ৭টি অবস্থানে হামাসের যোদ্ধারা অনুপ্রবেশ করতে পেরেছে এবং সেখানে এখন ২ পক্ষের মধ্যে বন্দুক যুদ্ধ চলছে। (হামাসের) যোদ্ধারা বেড়া ডিঙিয়ে এবং এমন কী, আকাশপথেও প্যারাগ্লাইডারের সহায়তায় ইসরাইলি ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করে বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী।

অনুপ্রবেশের ঘটনা ঠেকাতে গাজা সীমান্তজুড়ে ইসরাইল একটি বড় আকারের বেড়া নির্মাণ করেছে। এটি মাটির অনেকদূর গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত এবং এতে রয়েছে ক্যামেরা, উন্নত প্রযুক্তির সেন্সর ও সংবেদনশীল শ্রবণ প্রযুক্তি।

এমন সময় এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হলো যখন পশ্চিম তীরে বড় আকারে যুদ্ধ চলছে। এ বছর ইসরাইলি সামরিক অভিযানে প্রায় ২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনার পর পশ্চিম তীরে অসংখ্য ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী যোদ্ধা ও বাসিন্দারা উল্লাস প্রকাশ করতে সড়কে নেমে আসেন।

এদিকে কাতার ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আল জাজিরা জানিয়েছে,আটক ইসরাইলিদের বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি চায় হামাস।
উল্লেখ্য যে,ইসরাইলের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে শনিবার আচমকা রকেট হামলা চালায় হামাস। এ সময় তারা বেশ কয়েকজন ইসরাইলি সেনাকে আটক করে। হামাসের এক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, তাঁদের জিম্মায় থাকা এসব ইসরাইলিকে দিয়ে ইসরাইলে কারাবন্দী ফিলিস্তিনিদের ছাড়িয়ে আনা হবে।

হামাসের পলিটিক্যাল ব্যুরোর উপপ্রধান সালেহ আল-আরোওরি শনিবার বলেন, ‘আমাদের হাতে অনেক ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছেন। আটকও হয়েছেন অনেকে। লড়াই এখনো চলছে।’হামাস শনিবার যেসব ইসরাইলি সেনাকে আটক করেছে, তাঁদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও রয়েছেন বলে জানিয়েছেন সালেহ আল-আরোওরি। তবে তাঁদের সংখ্যাটা কত, এ নিয়ে কিছু জানাননি তিনি।

ফিলিস্তিনের মুক্তি আন্দোলনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস এবং ইসরাইল আবারও বড় সংঘাতে জড়িয়েছে। শনিবার সকালে হামাস-নিয়ন্ত্রিত গাজা উপত্যকা থেকে মুহুর্মুহু রকেট হামলা চালানো হয়েছে। নির্বিচার পাল্টা বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলও। পাল্টাপাল্টি হামলায় অন্তত ১০০ ইসরাইলি এবং গাজায় ১৯৮ ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। দুই পক্ষেই দুই হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

স্থানীয় সময় ভোর সাড়ে ছয়টা থেকে তেল আবিব শহরের উত্তরে মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে ৫ হাজার রকেট ছোড়ে হামাস। এ ছাড়া গাজা উপত্যকা থেকে বহু সশস্ত্র হামাস যোদ্ধা ইসরাইলের দক্ষিণ অঞ্চলে প্রবেশ করেন। ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, দেশটির ২২ অঞ্চলে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে ইসরাইলি সেনাদের লড়াই চলছে।

হামাসের রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণে যুক্ত সালেহ আল-আরোওরি বলেন, ‘আমাদের অনেকে (ইসরাইলের) কারাগারে। তাঁরা শিগগিরই মুক্ত হবেন। আমরা যাঁদের আটক করেছি, তাঁদের বিনিময়ে আমাদের সব বন্দীকে ছাড়িয়ে আনব। লড়াই যত দীর্ঘ হবে, যুদ্ধবন্দী তত বাড়তে থাকবে।’

কবির আহমেদ/ইবিটাইমস 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »