পূর্ব ইউরোপের দেশ রোমানিয়া সম্প্রতি বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে
ইউরোপ ডেস্কঃ ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত অনলাইন পোর্টাল ইনফোমাইগ্র্যান্টস এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, অবৈধ পথে ইউরোপ আসা অভিবাসীদের ঢল ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে ইইউ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে কয়েক বছর ধরেই রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এই অভিবাসন সমস্যা।
অন্যদিকে, বৈধ পথে ইউরোপে এসেও শ্রমিকেরা বাধ্য হচ্ছেন অবৈধ পন্থা বেছে নিতে৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশ রোমানিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে ঘটছে এমনই ঘটনা৷ পূর্ব ইউরোপের দেশ রোমানিয়া সম্প্রতি বাংলাদেশি শ্রমিকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে৷ ইউরোপের বাইরে থেকে শ্রমিক নেয়ার জন্য ২০২২ সালে ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ৷ শেঙ্গেনভুক্ত না হলেও ইউরোপের দেশ হওয়ায় অনেকেই আগ্রহী হচ্ছেন বৈধ পথে রোমানিয়ায় কাজ করতে আসার জন্য৷
ইনফোমাইগ্র্যান্টস জানায়,নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ম মেনে হলেও বাংলাদেশে রিক্রুটিং এজেন্সির কথা এবং রোমানিয়ায় বাস্তবতায় কোনো মিল নেই৷ দেশটির বিভিন্ন শহরে কাজ করতে আসা বাংলাদেশি শ্রমিকেরা এমন নানা তথ্য তুলে ধরেছেন ইনফোমাইগ্রেন্টসের কাছে৷
নিয়োগের সময় কি বলা হয় ? প্লাম্বার, ইলেকট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার, কার্পেন্টারসহ নানা কাজের জন্য রোমানিয়ান কোম্পানির পক্ষে আবেদনপত্র সংগ্রহ করে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সি৷ সরকারের অনুমোদন থাকা এই প্রতিষ্ঠানগুলো জাতীয় গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে কর্মী সংগ্রহ করে, ফলে এর বৈধতা নিয়ে আগ্রহী শ্রমিকদের তেমন কোনো সন্দেহও থাকে না ৷
এমনই এক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ইলেকট্রিশিয়ান হিসাবে কাজ করার পারমিট ও ভিসা সংগ্রহ করে রোমানিয়া এসেছেন একজন বাংলাদেশী।
ইনফোমাইগ্রেন্টসকে তিনি জানান, সত্যমিথ্যা যাচাই করার জন্য জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) এর ওয়েবসাইটে গিয়েও রিক্রুটিং এজেন্ট এশিয়া কন্টিনেন্টাল গ্রুপ-এর বৈধতা নিশ্চিত হন তিনি ৷
এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করে পাসপোর্ট ও পুলিশ ক্লিয়ারেন্স জমা দেয়ার কিছুদিন পরই তাদের জানানো হয়, রোমানিয়ার নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তাদের সাক্ষাৎকার নিবেন৷ প্রথম ইন্টারভিউয়ে ৩৯ জনের মধ্য থেকে তিন জনকে বাছাই করা হয়৷ তিনি আরও বলেন, ‘‘ইউরোপের একটা দেশ রোমানিয়া৷ আমরা দেখলাম ভালো বেতন, ৬৫০ ডলার বেতন, থাকা খাওয়া ফ্রি, প্রতি তিন-চার জনের জন্য একটা করে ফ্ল্যাট৷ কাজ হবে আট ঘণ্টা, অতিরিক্ত কাজের জন্য ওভারটাইমও দেয়ার কথা বলা হয়৷ তখন আমরা ভাবলাম, ইউরোপের একটা দেশ, সেখানে মানবাধিকারের নিশ্চয়তা রয়েছে৷ ফলে আমরা কাজের জন্য রাজি হয়ে যাই ৷’’
বাংলাদেশি শ্রমিকদেরর অভিযোগ, ছোট্ট রুমে গাদাগাদি করে থাকতে হয় তাদের। এরপর তাদের কাছ থেকে প্রাথমিকভাবে এক লাখ টাকা করে নেয়া হয়, যার বিনিময়ে দেয়া হয় রশিদ৷ মোট কত টাকা লাগবে জিজ্ঞেস করার পর রিক্রুটিং এজেন্সি তাদের জানায়, সরকার নির্ধারিত খরচই তাদের দিতে হবে, এর বেশি না ৷
এশিয়া কন্টিনেন্টাল গ্রুপের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ১৮ এপ্রিল সাতটি পদে ২০০ জন শ্রমিকের নিয়োগের অনুমতি দিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তিও জারি করে৷ সেখানে শর্তাবলীর মধ্যে শ্রমিকদের কাছ থেকে ভিসা এবং ফ্লাইট নিশ্চিত হওয়া সাপেক্ষে অভিবাসন ব্যয় হিসাবে সর্বোচ্চ চার লাখ ৪০ হাজার টাকা গ্রহণ করা যাবে ৷
তিনি আরও বলেন, ভিসা ও বিমান টিকিট হওয়ার পর তাদের কাছে মোট সাত লাখ টাকা দাবি করা হয়৷ এ নিয়ে প্রতিবাদ জানালে প্রয়োজনে তাদের প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে লোন নেয়ার কথাও বলা হয় এজেন্সির পক্ষ থেকে৷ তিনি বলেন, ‘‘আমি আমার আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিলাম৷ তারা বললো, ঠিক আছে নাও, গিয়ে আস্তে আস্তে শোধ করে দিও৷ আমিও ভাবলাম, প্রথম মাসে গিয়েই তো বেতন পাবো, শোধ করে দিবো৷’’
‘শ্রমিক বিক্রি’ করে রোমানিয়ার কোম্পানি: আহমেদ সহ ৮০ জন বাংলাদেশিকে নিয়ে যাওয়া হয় রোমানিয়ার রাজধানী থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি শহর সিবিউতে৷ এরপর তাদের কাজ না দিয়ে ’বিক্রি’ করে দেয়া হয় অন্য কোম্পানির কাছে।
অন্যদের মতো তিনিও কয়েকদিন পর আরেকটি কোম্পানিতে ’বিক্রি’ করা হয়৷ এবার যে ইতালিয়ান কোম্পানিতে তিনি কাজ পান, সেখানে তাকে ইলেকট্রিশিয়ান হিসাবে নিয়োগ দেয়া হলেও প্রথম দিনই দেয়া হয় গাড়ি ধোয়ার কাজ ৷
এরপর বাগান পরিষ্কার করা থেকে নানা কাজই তাদের দিয়ে করানো হয় ৷ আহমেদ বলেন, ‘‘একদিন আমাদের ওরা বললো টয়লেট পরিষ্কার করতে৷ আমরা তখন বললাম, এটা তো ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ না ৷ এটার জন্য আলাদা লোক আছে ৷ আসলে আমরা যাওয়ার পর ওরা ওদের ক্লিনার ডিপার্টমেন্টের শ্রমিকদের কাজে আসতে না করে দিয়েছে ৷ তখন থেকে মাল ওঠানো নামানো থেকে শুরু করে সবই আমাদের দিয়ে করানো হয় ৷’’
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস