সহিংস এ বিক্ষোভ সামলাতে দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁকেও হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স
ইউরোপ ডেস্কঃ শনিবার (১ জুলাই) বিবিসি জানিয়েছে, গতকাল শুক্রবার রাত পর্যন্ত রাজধানী প্যারিসসহ অন্যান্য শহর থেকে পুলিশের ওপর হামলা ও নাশকতার অভিযোগে ১৩ শত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত মঙ্গলবার। ওইদিন সকালে প্যারিসের উপশহর নানতেরে ট্রাফিক বিধি অমান্য করে জোরে গাড়ি চালানোর অভিযোগে নাহেল এম. নামের ১৭ বছর বয়সী এক তরুণকে গাড়ি থামানোর নির্দেশ দিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু নাহেল তাতে কর্ণপাত না করে গাড়ি নিয়ে সরে পড়ার চেষ্টা করলে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন পুলিশ সদস্যরা। এতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় নাহেলের।
ফ্রান্সে পুলিশের গুলিতে কিশোর নিহত হওয়ার ঘটনায় শুরু হওয়া বিক্ষোভ তীব্র থেকে আরও তীব্র হচ্ছে। গত রাতে সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভ হয়েছে লিঁও শহরে। ফরাসি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এ শহরে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর অন্তত ৩৫ জন সদস্য আহত হয়েছেন। যার মধ্যে দুইজনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।
শহরটির সাধারণ মানুষ আশঙ্কা করেছেন, যদি আরও পুলিশ মোতায়েন না করা হয় তাহলে পরিস্থিতি সামনে আরও খারাপ হবে।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে পোস্ট করা বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, পুলিশের উপস্থিতিতেই দোকানে, ভবনে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করছেন বিক্ষোভকারীরা, গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন জ্বালিয়ে দিচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার রাতে বিক্ষোভকারীরা ফ্রান্সের পূর্বাঞ্চলীয় শহর লিওনে একটি ট্রামে অগ্নিসংযোগের পর দেশটির অভ্যন্তরীণ সড়ক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষ শুক্রবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত বাস ও ট্রাম চলাচল বন্ধ থাকবে ফ্রান্সে।
শুক্রবার ব্রাসেলসে জরুরি সফর বাতিল করে মন্ত্রিসভার সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।বৈঠক শেষে দেশটির প্রধানমন্ত্রী এলিজাবেথ বোর্ন জানিয়েছেন, পরিস্থিতি যদি আরও খারাপের দিকে যায়, সেক্ষেত্রে জরুরি অবস্থা জারি করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে বৈঠকে।’ প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ দেশটির কিশোর-কিশোরীদের এই ধরনের সহিংসতার জন্য সমালোচনা করে বলেন, এটা ভিডিও গেমস না।
সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে,সমগ্র ফ্রান্স জুড়ে তৃতীয় রাতের অস্থিরতার পর সরকার এখন নাগরিক জীবনে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৯ টার পর থেকে বাস এবং ট্রাম সহ স্থানীয় পরিবহন দেশব্যাপী চলাচল বন্ধ ঘোষণা করেছে। কনসার্টের মতো প্রধান অনুষ্ঠানগুলি বাতিল করা হয়েছে। আতশবাজি,দাহ্য পদার্থ বিক্রি এবং বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও অভিভাবকদের দায়িত্ববোধের প্রতি আবেদন জানিয়েছেন।
তাদের কিশোর-কিশোরীদের দাঙ্গায় অংশগ্রহণ থেকে নিরুৎসাহিত করতে হবে। প্রেসিডেন্ট সাম্প্রতিক দিনগুলিতে সহিংসতা বৃদ্ধির জন্য সামাজিক নেটওয়ার্ক গুলিকেও দায়ী করেছেন। সেখানে সহিংস সমাবেশের আয়োজন করা হয়। কিছু তরুণ-তরুণী রাস্তায় ভিডিও গেম নকল করে এমন অনুভূতিও রয়েছে তার। ম্যাক্রোঁ ঘোষণা করেছেন যে কর্তৃপক্ষ দাঙ্গা উসকে দেওয়ার জন্য সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় “অতিরিক্ত তহবিল” পায় প্রধানমন্ত্রী এলিসাবেথ বোর্ন পূর্বে ঘোষণা করেছিলেন যে, তিনি দ্রুত “প্রজাতন্ত্রী আদেশে” ফিরে আসার জন্য “সমস্ত অনুমান” পরীক্ষা করবেন – তিনি দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা ঘোষণাকে অস্বীকার করেননি। যাইহোক, ফরাসি সরকার প্রাথমিকভাবে জরুরী পরিষেবাগুলির সমর্থনকে শক্তিশালী করার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে “অতিরিক্ত সংস্থান” প্রদান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কংক্রিট পদে এর অর্থ কী তা এখনও অস্পষ্ট।
উল্লেখ্য যে,কিশোরের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। মঙ্গলবার সকালে প্যারিসের কাছে নান্তেরেতে একটি পুলিশ মোটরসাইকেল টহল ১৭
বছর বয়সী নাহেলকে গাড়ি থামানোর নির্দেশ দিলে,যুবকটি হঠাৎ গাড়ি চালালে পুলিশ অফিসারের সার্ভিস অস্ত্র থেকে গুলি ছোড়ে। কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্ত শুরু হয়েছে এবং তাকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসের মতে, নিয়ন্ত্রণের সময় অস্ত্রের ব্যবহার ন্যায়সঙ্গত ছিল না।
এরপর থেকে সহিংস অস্থিরতায় কাঁপছে ফ্রান্স। বৃহত্তর প্যারিস এলাকা এবং অন্যান্য শহরে, বৃহস্পতিবার থেকে শুক্রবার পরপর তৃতীয় রাত পর্যন্ত দাঙ্গা হয়েছে। প্রায় ২,০০০ গাড়ি আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে যায় । প্রায় ৫০০টি পাবলিক বিল্ডিং যেমন পুলিশ স্টেশন এবং সিটি হলগুলিতে আগুন দেওয়া হয় এবং পুলিশ অফিসারদের আতশবাজি দিয়ে আক্রমণ করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, কয়েক শতাধিক লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ২০$ জনেরও বেশি পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। দেশব্যাপী, দাঙ্গা মোকাবেলায় ৪০,০০০ হাজার পুলিশ নিয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী প্যারিসে ৫,০০০ হাজার পুলিশ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সহিংস এ বিক্ষোভ সামলাতে দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁকেও হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস