রাত পোহালেই আরাফাহ দিবস

ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল স্তম্ভের অন্যতম হজের আজ প্রধান আনুষ্ঠানিকতা। আরাফাতের দিন ইসলামে বছরের শ্রেষ্ঠ দিন

 কবির আহমেদঃ আরাফার দিন (বা আরাফাত) হল ইসলামিক চান্দ্র মাসের জিলহজ মাসের নবম দিন — এই বছরের ২৭ জুন মঙ্গলবার। মুসলমানরা এই দিনকে বছরের শ্রেষ্ঠ দিন হিসেবে দেখেন। দিনটি সৌদি আরবের মক্কায় হজ যাত্রায় মুসলমানদের জন্য চূড়ান্ত ঘটনা, যারা আরাফাহ পাহাড়ের সমভূমিতে প্রার্থনা করার জন্য এবং ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য জড়ো হয়।

হজ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ, তাই আরাফাহ দিবস মুসলমানদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আরাফার দিনটি এমন একটি দিন হিসাবে পরিচিত যেখানে যদি তালাশ করা হয় তবে লক্ষ লক্ষ মুসলমানের গুনাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। যেদিন আল্লাহ ইসলাম ধর্মকে পরিপূর্ণ করেছিলেন সেই দিনটিকে আরাফাহ বলা হয়।

এটিও গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই দিনটিই কুরআনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত, সূরা আল মায়িদাহ ৫:৩, অবতীর্ণ হয়েছিল। সংযুক্ত আরব আমিরাত সহ অনেক আরব দেশে আরাফাহ দিবসটি সরকারী ছুটি হিসাবে পালিত হয়।

আরাফাহ দিবস, সেই সময়টিকে নির্দেশ করে যখন ইসলাম ধর্মটি সমস্ত মুসলমানদের জন্য জীবন বিধান হিসাবে পরিপূর্ণ এবং অনুমোদিত হয়েছিল, ইসলামিক ক্যালেন্ডারে জিলহজ মাসের নবম দিনে – যা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে এই বছরের ২৭ জুন মঙ্গলবার।

আরাফাহ দিবসের ইতিহাস: আরাফার দিনটি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও পুণ্যময় দিন হিসেবে পরিচিত। এই দিনে নবী মুহাম্মদ আরাফাহ পর্বতে তাঁর বিদায়ী ভাষণ দিয়েছিলেন অনেক মুসলমান যাদের সাথে তিনি তাঁর জীবনের শেষের দিকে হজ সম্পন্ন করেছিলেন। নবী মুহাম্মদ যখন আরাফার ময়দানে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তাঁর কাছে কুরআনের ৫:৩ আয়াত নাজিল হয়েছিল।

আরাফাহ দিবসের আরেকটি নাম হল ‘আগুন থেকে মুক্তি।’ আরাফাহ শব্দের অর্থ “জানা”। যদিও যারা হজযাত্রা করেন না তাদের জন্য রোজা রাখা বাঞ্ছনীয়, বেশিরভাগ মুসলমান এই দিনে রোজা পালন করেন কারণ এটি পাপ পরিত্যাগ করার জন্য পরিচিত একটি দিন। দিনটি ইসলাম ধর্মের চূড়ান্ততা এবং ঐশ্বরিক ওহীর স্মৃতিচারণ করে।

ইসলাম মুসলমানদের আরাফাহ দিবসকে কৃতজ্ঞতার দিন হিসেবে দেখতে শেখায়, তাই পরের দিন ঈদ উদযাপন করা হয়। এটি মহান পুরস্কারের সুযোগ সহ অপরিমেয় ক্ষমার দিন। হজযাত্রীদের এই দিনে রোজা রাখতে হবে না। এটি নবীর সুন্নাহ অনুসরণ করে, কারণ তিনি নিজে এই দিনে রোজা রাখেননি কারণ তিনি হজ পালন করা অবস্থায় ছিলেন।

আজ মহান আল্লাহতায়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার জন্য মক্কার মরুভূমির উত্তপ্ত গরমে আরাফার ময়দানে প্রায় ২৫ লক্ষাধিক মুসলমান একত্রিত হবেন। তারা পাহাড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আল্লাহতায়ালার ইবাদতে কাটিয়ে দিবেন। হাজী গণ আল্লাহর নিকট নিজের কৃত গুনাহ থেকে অনুতপ্ত হয়ে প্রার্থনা করবেন ঠিক যেমনটি নবী মুহাম্মদ সা: করেছিলেন। আরাফার পুরো দিনটি সাধারণত নামাজ,কুরআন তেলাওয়াত ও নফল ইবাদতে ব্যয় হয়ে থাকবে।

আরাফাতের দিন যারা হজ করছেন না, তাদের জন্য এই দিনে রোজা রাখার গুরুত্ব: প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমি আশা করি আরাফাতের দিনের রোজার বদলায় আল্লাহতাআলা বিগত ১ বছরের ও পরবর্তী ১ বছরের গুনাহ মাফ করে দিবেন। (সহীহ মুসলিম ও তিরমিযী, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৫৮)।

আরাফার দিন হল ইয়াওমুল আরাফা বা ৯ জিলহজ, যেদিন হাজীরা হজের প্রধান ফরজ অকুফে আরাফা বা আরাফা প্রান্তরে অবস্থান করে থাকেন।

সারা পৃথিবীতে চান্দ্র তারিখের হিসাব চারভাবে হয়ে থাকে। এক. স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখে, দুই. মক্কা-মদিনা বা সৌদি আরবের সাথে, তিন. পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে প্রথম চাঁদ দেখার সংবাদের ভিত্তিতে, চার. জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবের মাধ্যমে। এ কারণে সারা পৃথিবীতে একটি চান্দ্র মাসের দুটি বা তিনটি তারিখ দেখতে পাওয়া যায়। ফলে এক দেশের সাথে অন্য দেশের চান্দ্র তারিখ একদিন বা দুই দিন ব্যবধান হয়ে থাকে।

মুজতাহিদ ফকীহগণের সিদ্ধান্তে এর যে কোনো একটি মতে আমল করলে উক্ত সওয়াব পাওয়া যাবে, ইনশাআল্লাহ! বাংলাদেশে কার্যত চান্দ্র তারিখের ২টি ধারা চালু আছে। প্রথমটি হলো- স্থানীয়ভাবে চাঁদ দেখে তারিখ নির্ধারণ করা; দ্বিতীয়টি হলো- সৌদি আরবের তারিখের অনুসরণ করা।

প্রথম মতের ফকীহগণের বক্তব্য হলো: ইয়াওমুল আরাফা বা আরাফার দিন হলো জিলহজ মাসের ৯ তারিখ। সুতরাং পৃথিবীর যেখানে যখন জিলহজ মাসের ৯ তারিখ হবে সেখানকার অধিবাসীদের জন্য সেদিনই আরাফার দিন অর্থাৎ ইয়াওমুল আরাফা।

জিলহজ মাসের ৯ তারিখই হলো আরাফার দিন বা ইয়াওমুল আরাফা। যেমন- জিলহজ মাসের ৮ তারিখকে ইয়াওমুত তারবিয়াহ এবং ১০ তারিখকে ইয়াওমুন নাহার বা কোরবানির দিন বলা হয়। অনুরূপভাবে ৯ তারিখ হলো ইয়াওমুল আরাফা বা আরাফার দিন।

দ্বিতীয় মতের আলেমগণের ব্যাখ্যা হলো: আরাফার রোজার ফজিলত সংক্রান্ত হাদিসে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো তারিখ উল্লেখ করেননি, বরং নির্দিষ্ট একটি বিশেষ দিনের উল্লেখ করেছেন; আর সেদিনটি হলো আরাফার দিন অর্থাৎ হজের দিন, যে দিন হাজীগণ আরাফা ময়দানে অবস্থান করেন।

সুতরাং ৮ বা ৯ তারিখ নয় বরং হজের দিনই রোজা রাখতে হবে। হজ যেহেতু পৃথিবীতে শুধুমাত্র এক জায়গায় মক্কা শরীফেই অনুষ্ঠিত হয়, তাই সারা পৃথিবীতে সেই হজের দিনই আরাফার রোজা প্রতিপালিত হবে।

কারণ এই রোজাটি তারিখের সাথে সম্পর্কিত নয়, স্থান ও কর্মের সাথে সম্পর্কযুক্ত। আর তা হলো মক্কা ও হজ। এক থেকে নয় তারিখ রোজা পালন করলে এর মধ্যেই আরাফার রোজা পালন হয়ে যাবে, এটাই সর্বোত্তম। নয়টি রোজা না রাখলেও আট ও নয় তারিখ দুটি রোজা করলেও আরাফার রোজা আদায় হয়ে যাবে।

যদি কেউ একটিমাত্র আরাফার রোজা রাখতে চান, তিনি উপর্যুক্ত বিশ্বব্যাপী অনুসৃত চারটি মতের বা বাংলাদেশে প্রচলিত দুটি মতের যে কোনো একটি অনুযায়ী ইখলাস ও তাকওয়ার সাথে আমল করলে পূর্ণ সওয়াব প্রাপ্ত হবেন।

হাদিস শরীফে বর্ণিত রয়েছে- ‘কাজের ফলাফল নিয়াতের ওপর নির্ভরশীল’। (বুখারি ও মুসলিম)। যারা যেই মতকে অধিক প্রামাণ্য ও যুক্তিসঙ্গত মনে করবেন ও তা অনুসরণ করে আন্তরিক অনুরাগের সাথে আমল করবেন, তারাই এই সওয়াবের অধিকারী হবেন। তবে মুজতাহিদ ফকীহগণ গবেষণার ক্ষেত্রে দলিল প্রমাণ ও যুক্তি-তর্কে অন্য মতের বিরোধিতা বা খণ্ডন করতে পারবেন। কিন্তু কোনো সাধারণ মানুষ ভিন্নমতের বিরোধিতা করা অশোভন ও অনুচিত এবং পক্ষাবলম্বন ও সমালোচনা অন্যায়, যা অনধিকার চর্চার শামিল।

নির্বাহী সম্পাদক(আন্তর্জাতিক)/ইবিটাইমস 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »