আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে দক্ষিণ তুরস্ক এবং উত্তর সিরিয়ায় ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পে ৫ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এখনও অনেক মানুষ নিখোঁজ আছে। তাই মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
গত সোমবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ভোর ৪ টার দিকে তুরস্ক ও সিরিয়ার সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় সংঘটিত এই ৭,৮ মাত্রার ভূমিকম্পের কম্পন সুদূর লেবানন, সাইপ্রাস এবং মিশর পর্যন্ত অনুভূত হয়েছিল বলে উক্ত দেশ সমূহের সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে
জাতিসংঘের দুর্যোগ ও ত্রাণ তহবিল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন,অস্ট্রিয়া,যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, চীন, বাংলাদেশসহ আরও বহু দেশ।
সোমবারের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর তুরস্ক এবং সিরিয়ার উদ্ধারকারীরা হিমশীতল আবহাওয়ায় ধসে পড়া ভবনগুলিতে চাপা পড়ে থাকা অনেককে উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উদ্ধার সংস্থাগুলি বলেছে, একটি বিস্তীর্ণ সীমান্ত অঞ্চলের বিভিন্ন শহরে কয়েক হাজার ভবন ধসে পড়েছে। ইতিমধ্যে যুদ্ধ, বিদ্রোহ, শরণার্থী সংকট এবং সাম্প্রতিক কলেরা প্রাদুর্ভাবে জর্জরিত এই অঞ্চলটিতে নতুন করে দুর্দশার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে ভূমিকম্প।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়িপ এর্দোয়ান টুইটারে লিখেছেন, “ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত আমাদের সকল নাগরিকের প্রতি সমবেদনা জানাই। আমরা আশা করছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এবং কম ক্ষতির সাথে একসাথে এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠবো।” তুরস্কের দুর্যোগ ও জরুরী ব্যবস্থাপনা প্রেসিডেন্সি (এএফএডি) অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম সমন্বয় করছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিকেও সাহায্যের জন্য মোতায়েন করা হয়েছে।
তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুলুসি আকরকে উদ্ধৃত করে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আমরা ভূমিকম্প অঞ্চলে মেডিকেল টিম, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল এবং তাদের যানবাহন পাঠানোর জন্য আমাদের বিমানগুলিকে সচল করেছি।” কাহরামানমারাস এবং গাজিয়েন্টেপের কেন্দ্রস্থলের কাছে ভূমিকম্পের সবচেয়ে বড় ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। যা ২০ লাখ বাসিন্দার একটি শহরকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।
ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিতদের বের করতে তুরস্ক ও সিরিয়ায় উদ্ধারকর্মীদের মোতায়েন করা হয়েছে। স্তূপের মধ্যে বেঁচে থাকা লোকদের সন্ধানে স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধার দলগুলোকে সাহায্য করছেন।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, শুধুমাত্র তুরস্কেই মঙ্গলবার দুপুর অবধি মৃতের সংখ্যা ৩,৪১৯ জন। তুরস্ক এবং সিরিয়া উভয় দেশ মিলিয়ে এই সংখ্যা ৫,০২১ এ দাঁড়িয়েছে। আশঙ্কা রয়েছে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারা ২০ হাজার মানুষ মারা যেতে পারে বলে অনুমান করেছেন।
তুরস্কের সানলিউরফা শহরের ২০ বছর বয়সি ছাত্র ওমর এল কুনেদ এএফপিকে বলেন, “ধ্বংসস্তূপের নিচে আমার পরিচিত একটি পরিবার এখনও আটকে আছে। সকাল ১১টা বা দুপুর পর্যন্ত আমার বন্ধু ফোনের উত্তর দিচ্ছিল। কিন্তু এখন আর সে উত্তর দিচ্ছে না। সে ভবনের নিচে আছে।”এই ঘটনায় পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থা এক মানবিক সংকট পার করছে। দায়িত্বরত চিকিৎসকরা আনুমানিক ২০ হাজার আহতকে সেবা দিতে লড়াই করছেন।
বিশ্বের অন্যতম সক্রিয় ভূমিকম্প অঞ্চল তুরস্ক পৃথিবীর অন্যতম প্রধান সক্রিয় ভূমিকম্প অঞ্চলে অবস্থিত। তুর্কি অঞ্চল ডুজসে ১৯৯৯ সালে ৭.৪-মাত্রার ভূমিকম্পে ১৭ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন।সোমবারের প্রথম ভূমিকম্পটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এটি গ্রিনল্যান্ডের মতো বহুদূরে অবস্থিত অঞ্চলে অনুভূত হয়েছিল। সেদিনই অনুসন্ধান ও উদ্ধার কাজ চলা অবস্থায় ৭.৫-মাত্রার আরও একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল।
শীতকালীন তুষারঝড় এবং তুষারপাত আক্রান্ত এলাকার প্রধান রাস্তাগুলিকে ঢেকে রেখেছে। তুর্কি সরকারি কর্মকর্তারা বলেছেন, এই অঞ্চলের তিনটি প্রধান বিমানবন্দর অকার্যকর হয়ে পড়েছে, যা অত্যাবশ্যকীয় সাহায্যের সরবরাহকে জটিল করে তুলেছে। উত্তর সিরিয়ার বেশিরভাগ ভূমিকম্পবিধ্বস্ত এলাকা কয়েক বছর ধরে যুদ্ধ এবং সিরিয়া ও রাশিয়ার বাহিনীর বিমান বোমাবর্ষণে ধ্বংস হয়ে গেছে। যার ফলে সেখানকার ঘরবাড়ি, হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলো অকার্যকর।
জাতিসংঘে সিরিয়ার দূত বাসাম সাব্বাগ সীমান্ত পুনরায় খোলার বিষয়টি অস্বীকার করে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলিতে সাহায্য পৌঁছানোর অনুমতি দেবে বলে জানিয়েছে।
সিরিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আলেপ্পো, লাতাকিয়া, হামা এবং টারতুস প্রদেশ জুড়ে ক্ষতির কথা জানিয়েছে। সতর্কতা হিসাবে অঞ্চল জুড়ে প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে সিরিয়া কর্তৃপক্ষ। দুই সপ্তাহের জন্য স্কুলগুলিও বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
ইউনেস্কোর ঐতিহ্যের তালিকায় থাকা দুই শহর সিরিয়ার আলেপ্পো এবং তুরস্কের দিয়ারবাকির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
উদ্ধারকারী দল পাঠাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রাইসিস কমিশনার জেনেজ লেনারসিক নিশ্চিত করেছেন, উদ্ধারকারী দলগুলি স্থানীয় সংস্থাগুলিকে সাহায্য করার জন্য তুরস্কে যাত্রা করেছে।
ইইউ কমিশনার জোসেপ বোরেল এবং লেনারসিক এক বিবৃতিতে বলেছেন, “দূর্যোগে সমর্থন করার জন্য বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, চের প্রজাতন্ত্র, ফ্রান্স, গ্রিস, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড এবং রোমানিয়া থেকে দশটি আরবান সার্চ এবং রেসকিউ টিম দ্রুত জড়ো করা হয়েছে।”
রোমানিয়ার দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া ইউনিট ভূমিকম্পে সহায়তার জন্য তুরস্কের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে। রোমানিয়ার দুর্যোগ প্রতিক্রিয়া ইউনিট ভূমিকম্পে সহায়তার জন্য তুরস্কের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে। তুরস্কের সামরিক বাহিনী একটি বিমান করিডোর স্থাপন করেছে যাতে অনুসন্ধান এবং উদ্ধারকারী দলগুলিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দুর্যোগ অঞ্চলে পৌঁছাতে সহায়তা করা যায়।
এই দূর্যোগের প্রভাব এতটাই ধ্বংসাত্মক ছিল যে এটি মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ইউক্রেন থেকে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত কয়েক অসংখ্য দেশ তুরস্ক ও সিরিয়ায় সাহায্য পাঠানোর অঙ্গীকার করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়াসহ সকল দেশই সমবেদনা ও সাহায্যের প্রস্তাব পাঠিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তুর্কি রাষ্ট্রপতি রেচেপ তাইয়িপ এর্দোয়ানকে এই বিধ্বংসী ভূমিকম্প থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় যেকোনো সহায়তা পাঠাবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি তুরস্ককে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। উল্লেখ্য, তুরস্কের দেয়া ড্রোন কিয়েভকে রাশিয়ার আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করছে।
মঙ্গলবার চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে বেইজিং উদ্ধারকারী, চিকিৎসা দল এবং অন্যান্য সরবরাহ পাঠাচ্ছে।.ঘানার ফুটবল তারকাকে জীবিত পাওয়া গেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, তুরস্কে আঘাত হানা ভূমিকম্পে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে ঘানার আন্তর্জাতিক উইঙ্গার ক্রিশ্চিয়ান আতসুকে জীবিত পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার ক্রিশ্চিয়ান আতসুর ক্লাব হাতায়স্পোরের ভাইস প্রেসিডেন্ট মুস্তাফা ওজাকও রেডিও গোলকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সোমবার ভূমিকম্পের পর তুরস্কের হাতায় প্রদেশে আতসু নিখোঁজ হওয়ার খবর ফুটবেল ভক্তদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। মুস্তাফা ওজাক রেডিও গোলকে বলেন, “ক্রিশ্চিয়ান আতসুকে আহত অবস্থায় বের করে আনা হয়েছে। আমাদের ক্লাবের ক্রীড়া পরিচালক তানের সাভুত, দুর্ভাগ্যবশত এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে রয়েছেন।”
তথ্যসূত্র: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস