৮ম পর্ব
ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ ৭৬। একথা সর্বজনবিদিত যে, ১৯৭১ -এর ২৫শে মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে তাঁর বাসভবন থেকে অন্যত্র সরে যাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ সহ দেশবরেণ্য অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ সনির্বন্ধভাবে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর ৩২ নং ধানমন্ডির বাসায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর বাড়িতে অবস্থানকালে তাঁকে গ্রেফতার করা হতে পারে জেনেও তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। কেননা গ্রেফতার আতঙ্কে বঙ্গবন্ধু আদৌ ভীত ছিলেন না। তদুপরি তাঁকে হতোদ্যম করার জন্য ইতিপূর্বে বহুবার পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রেফতার করেছে এবং কারান্তরীণ করে রেখেছে। তাই গ্রেফতার হওয়া বঙ্গবন্ধুর জীবনে কোন নতুন বিষয় ছিল না কিংবা ভয়ের কারণ ও ছিল না। উপরন্তু দেশের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে এবং দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে গ্রেফতারের ভয়ে কোথাও পালিয়ে যেতে তিনি রাজি হননি। এমনকি আত্মগোপনে চলে যাওয়াকেও তিনি সমীচীন মনে করেননি। তাছাড়া তিনি খুব ভালভাবেই জানতেন তাঁর পক্ষে যা যা করণীয় তার সবই তিনি করে রেখেছেন। তাই ২৫শে মার্চের কালরাতে একটি দেশের জন্মের প্রসব বেদনার সময়ে দেশবাসীকে আতুর ঘরে ফেলে রেখে জনক হিসেবে তিনি কোথাও চলে যাননি। একজন দায়িত্বশীল জনকের দায়িত্ব এবং কর্তব্যবোধের পাশাপাশি আপামর দেশবাসীর প্রতি তাঁর পরম নিষ্ঠা ও আনুগত্য এবং গভীরতম মমত্ববোধের কারণেই বঙ্গবন্ধু তা করেননি। পরবর্তীকালের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, আজীবন সংগ্রামী এবং অকুতোভয় মুজিব ঐদিন সঠিক কাজটিই করেছেন।
৭৭। শোষণ, বঞ্চনা এবং ক্ষুধা দারিদ্র্য মুক্ত একটি গণতান্ত্রিক এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁর সারা জীবন ধরে সংগ্রাম করেছেন। আর এই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি যুগ যুগ ধরে অবহেলিত একটি পরাধীন জাতির
সামগ্রিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য তিনি তাঁর আন্দোলন-সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন। এমতাবস্থায় সম্পূর্ণভাবে বিবেকের দায়বদ্ধতা থেকে এবং বিচক্ষণতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে একটি জ্বালাময়ী এবং আবেগঘন বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে উজ্জীবিত করেন। তাঁর এহেন তেজোদীপ্ত বক্তৃতার মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালি জাতি সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত হয়। এরই ফলশ্রুতিতে পুরো জাতি জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নয় মাস ব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়কাল বঙ্গবন্ধুর উপরোক্ত দিকনির্দেশনামূলক ভাষণই ছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের নিরন্তর অনুপ্রেরণা। তাঁর উপরোক্ত ৭ই মার্চের ভাষণের গুরুত্ব এবং তাৎপর্য এতই বিশাল ও ব্যাপক ছিল যে, যুদ্ধের ময়দানে তিনি সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও তাঁর নামে এবং তাঁর দিকনির্দেশনার আলোকেই পরিচালিত হয়েছে
মহান মুক্তিযুদ্ধ। এমনকি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি সত্ত্বেও নিতান্ত অবধারিতভাবে তাঁকেই প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি ও করা হয়েছে।
৭৮। দেশের আপামর জনসাধারণ নিশ্চয়ই জানেন বঙ্গবন্ধুকে একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে প্রতিপন্ন করার জন্য পাকিস্তানী শাসকবর্গ দীর্ঘদিন ধরে সচেষ্ট, সক্রিয় এবং উদ্গ্রীব ছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতা ঘোষণা করার নিমিত্তে সুবর্ণ সুযোগ হাতে পেয়েও বঙ্গবন্ধুর উপরোক্ত শর্তযুক্ত, কৌশলী এবং বিচক্ষণ বক্তব্য শুনে তাদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। ফলে আশাভঙ্গের বেদনায় তারা ক্ষুব্ধ এবং ব্যথিত হন। পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধুর এহেন প্রজ্ঞাপূর্ণ, কৌশলী এবং বহুমাত্রিক বক্তব্যের কারণে পৃথিবীর বহু সমাজবিজ্ঞানী, কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং গবেষকগণ তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। এই ভাষণের গুরুত্ব এবং অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন করে লন্ডনের বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন উক্ত ভাষণের পর পরই মন্তব্য করে- “শেখ মুজিব ৭ই মার্চের ভাষণের মাধ্যমে আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।” এই ভাষণে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল ছিল বলেও উপরোক্ত মন্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। লন্ডনের Observer পত্রিকার তখনকার বিখ্যাত কলামিস্ট এবং রাজনৈতিক
বিশ্লেষক শিরিল ডান বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেন- “বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এই প্রথম একজন নেতা এলেন যিনি চারিত্রিক, নৃতাত্ত্বিক, ভাষা, পোশাক-আশাক, গায়ের রং এবং আচার-আচরণে নিখুঁত বাঙালি। তাঁর বজ্রকণ্ঠের ঘোষণা দেশের মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে এবং মান্য করে।”
৭৯। ৭ই মার্চের উপরোক্ত অনন্য সাধারণ ভাষণ নিয়ে বিশ্বের অনেক স্বনামধন্য নেতা এবং অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ঐ সময়ে বিভিন্ন ধরনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। ১৯৭১ -এ বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা AFP -এর ভাষ্য ছিল- “৭ই মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিব আসলে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি বাঙালিদের যুদ্ধের দিক নির্দেশনাও দিয়ে যান। ঐদিনই আসলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।” বিশ্ব বিখ্যাত সংবাদ সংস্থা রয়টার্স উপরোক্ত ভাষণের ব্যাপারে তাদের
প্রতিবেদনে উল্লেখ করে- “বিশ্বের ইতিহাসে এরকম আর একটি ও পরিকল্পিত এবং সুবিন্যস্ত ভাষণ খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে একই সঙ্গে বিপ্লবের রূপরেখা দেয়া হয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে দেশ পরিচালনার দিকনির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।” এই ভাষণের প্রতিটি শব্দ এবং বাক্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভীষণভাবে অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ। সবচেয়ে বড় কথা যে, এই ভাষণের মাধ্যমে পুরো দেশ এবং জাতিকে বঙ্গবন্ধু অসাধারণ এবং অবিশ্বাস্য রকমের এক ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করেন। উপরন্তু এই ভাষণের অন্তর্নিহিত মাধুর্য, তাৎপর্য এবং কমেন্ট এতটাই ব্যাপক, গভীর এবং প্রাণবন্ত ছিল যে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পুরো সময় পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর শারীরিক অনুপস্থিতি বাঙালি জাতি আদৌ টেরই পায়নি।
৮০। বঙ্গবন্ধুর উপরোক্ত সম্মোহনী ভাষণের কাব্যিক মান, শব্দশৈলী এবং বাক্য বিন্যাস সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং প্রভাবশালী সাময়িকী “Newsweek” ১৯৭১ -এর ৫ই এপ্রিল প্রকাশিত তাদের প্রচ্ছদ নিবন্ধে বঙ্গবন্ধুকে “Poet of Politics” বা “রাজনীতির কবি” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৭৪ সনে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী শন ম্যাকব্রাইড বলেছেন- “শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন কেবল ভৌগলিক স্বাধীনতাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানুষের মুক্তি এবং বেঁচে থাকার স্বাধীনতা। সাম্য ও সম্পদের বৈষম্য দূর করাই স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য। আর এ সত্যের প্রকাশ ঘটে ৭ই মার্চের ভাষণে।” ভারতের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেন- “বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালি জাতির পথ প্রদর্শক। তাঁর সাবলীল চিন্তাধারার সঠিক মূল্য শুধু বাংলাদেশ নয়, সমগ্র পৃথিবী স্বীকার করবে।” পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেন- “৭ই মার্চের ভাষণ একটি অনন্য দলিল। এতে একদিকে আছে মুক্তির প্রেরণা। অন্যদিকে আছে স্বাধীনতার পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা।”
৮১। কিউবার আজীবন সংগ্রামী এবং অবিসংবাদিত বিপ্লবী নেতা এবং প্রেসিডেন্ট ফিডেল ক্যাস্ট্রো বলেন- “৭ই মার্চের শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুধু ভাষণ নয়। এটি একটি অনন্য রণকৌশলের দলিল।” গ্রেট ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ ৭ই মার্চের ভাষণ মূল্যায়ন করে বলেছেন- “পৃথিবীর ইতিহাসে যতদিন পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম থাকবে, ততদিন শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণটি মুক্তিকামী মানুষের মনে সজীব থাকবে। এ ভাষণ শুধুমাত্র বাংলাদেশের মানুষের জন্য নয়, সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা।” সর্বগ্রাসী বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সফল সংগ্রামের সার্থক রূপকার তথা দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ সম্পর্কে বলেছেন- “৭ই মার্চের ভাষণ আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল দলিল।”
৮২। ইতিহাস সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন, পাকিস্তান আমলে পারতপক্ষে বাঙালিদেরকে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করা হতো না। বিভিন্নভাবে এবং বিভিন্ন অজুহাতে তাদেরকে বঞ্চিত করা হতো এবং সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে পদে পদে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হতো। বাঙালিদের বিরুদ্ধে অপবাদ ছিল বাঙালি শুধু ভেতো বাঙালিই নয়, সাহস ও শক্তি এবং ক্ষমতার দিক দিয়েও তারা ভীতু বাঙালি। কিন্তু বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবের ৭ই মার্চের জ্বালাময়ী, তেজোদীপ্ত এবং প্রেরণাদায়ক ভাষণে এই ভেতো বাঙালিই উদ্দীপ্ত এবং অনুপ্রাণিত হয়ে পাকিস্তানের সুসজ্জিত এবং সুসংগঠিত সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ট্রেনিং বিহীন, সম্পূর্ণভাবে অপ্রশিক্ষিত ভেতো এবং ভীতু বাঙালির সাথে সুদীর্ঘ নয় মাস ধরে সর্বশক্তি দিয়ে প্রাণপণে যুদ্ধ করে পাকিস্তানের সুপ্রশিক্ষিত এবং বিশ্বসেরা বলে দাবিদার হানাদার সেনাবাহিনী সম্মুখযুদ্ধে অত্যন্ত নাস্তানাবুদ হয়ে চরম লজ্জাজনকভাবে এবং ন্যক্কারজনভাবে পরাজয় বরণ করে। এরই ফলশ্রুতিতে ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান সামরিক কর্মকর্তা লেঃ জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান (এ এ খান) নিয়াজীর নেতৃত্বে ৯৩ হাজার সেনা সদস্যের বিশাল বাহিনী হাঁটু গেড়ে, মলিন মুখে এবং মাথা নত করে অত্যন্ত লজ্জাজনকভাবে আত্মসমর্পণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এটি ছিল পৃথিবীতে বৃহত্তম আত্মসমপর্ণের ঘটনা। বাঙালির এই বীরত্বপূর্ণ এবং গৌরবজনক ইতিহাসের স্রষ্টা ও মহান মুজিব।
৮৩। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকাবস্থায় জিয়াউর রহমান (পরবর্তীকালে বিএনপি-র প্রতিষ্ঠাতা) বিগত ১৯৭২ সালের ২৬শে মার্চ তৎকালীন “দৈনিক বাংলা” এবং “সাপ্তাহিক বিচিত্রা” (বর্তমানে দু’টি পত্রিকাই বিলুপ্ত) পত্রিকায়
এবং স্বাধীনতা দিবস সংখ্যায় তার নিজের নামে “একটি জাতির জন্ম” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছেন। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ আমাদের স্বাধীনতার জন্য “Green signal” ছিল বলে উক্ত প্রবন্ধে তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন এবং পরিচ্ছন্ন (Conspicuously and unequivocally) ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। এরই পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সুস্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট (Clearly, categorically and specifically) ভাবে মোট ৪ (চার) বার উপরোক্ত একই আর্টিকেলে তিনি উল্লেখ করেছেন। বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের ব্যাপারে অকাল প্রয়াত জিয়াউর রহমানের উপরোক্ত অন্তর্নিহিত উপলব্ধি, অভিমত এবং অভিব্যক্তির প্রতি যথোপযুক্ত সম্মান ও শ্রদ্ধা পোষণ করা উচিত কি না বিএনপি-র নেতা কর্মী, সমর্থক এবং বিএনপিপন্থী বুদ্ধিজীবীগণ তা একান্ত চিত্তে ভেবে দেখতে পারেন।
৮৪। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সর্বজন শ্রদ্ধেয় ও কিংবদন্তিতুল্য সাংবাদিক এবং অমর একুশের গানের রচয়িতা আবদুল গাফফার চৌধুরীর ভাষায়- “বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বিশ্বের রাজনৈতিক সাহিত্যে একটি বিরল ভাষণ। এই ভাষণ ১৬ কোটি বাঙালির হৃদয়ে মুদ্রিত বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির মহাকাব্য।” দেশের জনপ্রিয় এবং স্বনামধন্য কবি নির্মলেন্দু গুণ ও এই ভাষণকে মহাকাব্য এবং ভাষণদাতা বঙ্গবন্ধুকে মহাকবির বিশেষণে ভূষিত করেছেন। তার রচিত “স্বাধীনতা এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো” -কবিতায় অনবদ্য চরণে তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন- “শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন। তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল, হৃদয়ে লাগিল দোলা,
জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা- ; কে রোধে তাঁহার বজ্র কণ্ঠ বাণী? গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর
অমর কবিতাখানি: ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ সেই থেকে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি আমাদের।”
৮৫। অত্যন্ত দুঃখজনক এবং দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, বিগত ১৯৭৫ সনের ১৫ই আগস্ট অত্যন্ত নির্মম এবং নৃশংসভাবে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তাঁকে হত্যার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে যায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশকে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে স্বাধীনতার পূর্ববর্তী পাকিস্তানী ভাবধারায় ফিরিয়ে নেয়া হয়। লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তস্নাত সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্র অপসারণ করা হয়। শত শত বছর ধরে চলে আসা
আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্থলে ধর্মাশ্রয়ী এবং সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রচলন করা হয়। “জয় বাংলা” স্লোগানের পরিবর্তে পাকিস্তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” স্লোগান প্রবর্তন করা হয়। এমনকি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচার বন্ধ রাখার জন্য খুনী মোশতাক আহমেদ কর্তৃক জারিকৃত কুখ্যাত Indemnity Ordinance -টিকে তার উচ্চাভিলাসী সহচর জিয়াউর রহমান সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনে পরিণত করেন। যা চরম নৈতিকতা বিবর্জিত এবং জঘন্য মনমানসিকতার পরিচায়ক বলে যে কোন প্রকার সন্দেহ (Beyond all reasonable doubt and controversy) ব্যতিরেকেই প্রমাণিত হয়।
৮৬। স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর আহবানে সাড়া দিয়ে এবং দেশমাতৃকার টানে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে যারা স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তারা সবাই জানেন মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ছিল “জয় বাংলা”। এই জয় বাংলা স্লোগান কোন দলীয়
স্লোগান নয়, এটি জাতীয় স্লোগান। এই স্লোগান দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু পুরো বাঙালি জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং সংগঠিত করেছেন। এই স্লোগান ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয় স্লোগান। এই স্লোগান দিয়েই তিনি তাঁর ৭ই মার্চের কালজয়ী ভাষণ শেষ করেছেন। তাই এই ভাষণ এবং স্লোগান এখন আমাদের পবিত্র সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত [গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চম তফসিল ]। জয় বাংলা স্লোগান সম্পূর্ণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ স্লোগান। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল মুক্তিযোদ্ধা রণভূমিতে এই স্লোগান অসংখ্যবার উচ্চারণ করেছেন। এই স্লোগান জাতিকে উজ্জীবিত করার স্লোগান এবং জাতীয় ঐতিহ্যের স্লোগান। এই স্লোগানটি বাঙালি জাতির একটি আবেগঘন অভিব্যক্তির বহিঃপ্রকাশ। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতির অভ্যুদয়ের ব্যাপারে এই স্লোগানের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ব্যাপক এবং অপরিসীম।তদুপরি এই স্লোগান ছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর এবং আল শামস্ দের জন্য ত্রাস এবং আতঙ্ক।
৮৭। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ১৯৭৫ – এর ১৫ই আগস্ট পর্যন্ত অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করার দিনটি পর্যন্ত দেশের কোন একজন নাগরিকই জয় বাংলা স্লোগানের ব্যাপারে কখনো একটি শব্দ ও উচ্চারণ করেননি। এই স্লোগানের ব্যাপারে ঐ সময়ে কেউই কোন আপত্তি করেননি কিংবা কোন মন্তব্য ও করেননি। অন্যভাবে বলা যায় যে, কোন আপত্তি কিংবা মন্তব্য করার মতো কোন সাহস কিংবা ধৃষ্ঠতাও কেউ দেখাননি। কিন্তু ১৯৭৫ -এর ১৫ই আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর দেশের রাজনীতিতে আদর্শগত মতপার্থক্য ও মতভেদ কিংবা বিচ্যুতি ও বিভ্রান্তি অথবা অন্য কোন অজ্ঞাত এবং অব্যক্ত কারণে আজ যে সমস্ত মুক্তিযোদ্ধারা আওয়ামী লীগ বিরোধী শিবিরে অবস্থান নিয়েছেন কিংবা কোনভাবে কোন সুযোগ পেলেই যারা আওয়ামী লীগকে তুলোধুনো করতে সদা সর্বদা সচেষ্ট এবং সক্রিয় রয়েছেন তারা সবাই জাতি-ধর্ম-বর্ণ এবং গোত্র নির্বিশেষে রণভূমিতে জয় বাংলা স্লোগান দিয়েই রণক্ষেত্র প্রকম্পিত করেছেন এবং রণক্লান্তি দূর করেছেন। আজ তাদের মধ্যে এমন কি ঘটনা ঘটেছে যে তারা এই জয় বাংলা স্লোগান মুখে উচ্চারণ করতে দ্বিধা এবং সংকোচ বোধ করেন? এই দ্বিধা এবং সংকোচ কি আওয়ামী লীগের বিরোধিতার কারণে না কি পাকিস্তান প্রীতির কারণে? জয় বাংলা বিরোধীদের বিরোধিতার প্রকৃত কারণ স্পষ্ট করলে তাদের এহেন হীনমন্যতা এবং মতিভ্রম সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যেত।
৮৮। দেশের শিক্ষিত এবং সজ্জন ব্যক্তিবর্গ নিশ্চয়ই জানেন নামাজ-রোজা, চাচা-চাচী, নানা- নানী এবং পানি প্রভৃতি সহ আরও বহু শব্দ রয়েছে যেগুলি কোন বাংলা শব্দ নয়। ঠিক তেমনই হিন্দী, হিন্দ এবং হিন্দু এই সমস্ত শব্দগুলিও কোন বাংলা শব্দ নহে। এই শব্দগুলি ফারসি শব্দ বটে। আমাদের কারও মধ্যেই মক্কা বিজয় বলতে কোন প্রকার আপত্তি নেই। বিজয় দিবস বলতেও কোন দ্বিধা কিংবা সংকোচ নেই। যে কোন খেলাধুলায় জয় কিংবা বিজয় বলতে কারও মধ্যেই কোন অনিচ্ছা কিংবা অনাগ্রহ নেই। শুধুমাত্র জয় বাংলা বলতেই যত আপত্তি। এটা কি অর্বাচীন মনের সজ্ঞান এবং সচেতন পলায়নপর মনোবৃত্তি নাকি আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতার নামে সংকীর্ণ মনের দুরপনেয় হীনমন্যতা? এই সমস্ত জ্ঞানপাপীরা কি জানেন না যে জয় বাংলা ধ্বনি দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম না হলে আজ কিন্তু তারা “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” ও বলতে পারতেন না। তাই নয় কী?
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এটা খুবই আশাব্যঞ্জক যে অতি সম্প্রতি মহামান্য হাইকোর্ট একটি ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে জয় বাংলা স্লোগানকে আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক এবং জাতীয় স্লোগান বলে অভিহিত করেছেন। আইন আদালতের সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ নিশ্চয়ই জানেন মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত যে কোন রায় এবং আদেশ আমাদের সংবিধানের ১১১ নং আর্টিকেলের ভাষ্য মোতাবেক দেশের সমস্ত অধস্তন আদালত এবং সকল নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক।
৮৯। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলাম এবং মুসলিম লীগ সহ ধর্মভিত্তিক প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলোকে স্বাধীনতার পর নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও পর্দার অন্তরালে তথা নেপথ্যে থেকে এবং পাকিস্তানের মদদপুষ্ট হয়ে ঐ সমস্ত পরাজিত দলগুলো লোকচক্ষুর অন্তরালে পুরোদস্তুর সক্রিয় ছিল। উপরন্তু তাদের সঙ্গে তৎপর ছিল তাদের সমমনা আরও অনেকেই। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, মাওবাদী কম্যুনিস্ট নেতা কমরেড আবদুল হক স্বাধীন বাংলাদেশে “পূর্ব পাকিস্তান কম্যুনিস্ট পার্টি” নামে তার সংগঠন পরিচালনা করতেন। এমনকি ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে অস্ত্র এবং অর্থ সাহায্য চেয়ে তিনি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর নিকট বার্তাও
পাঠিয়েছিলেন। বাংলাদেশের খণ্ড-বিখণ্ড কম্যুনিস্ট পার্টিগুলির বর্তমান অবস্থা দেখে স্বাধীনতার পূর্ববর্তী তথা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের এবং স্বাধীনতার অব্যবহিত পরবর্তী সময়কালের উগ্র বামপন্থী হক-তোয়াহা-আলাউদ্দিন-মতিন এবং সিরাজ
শিকদার গং-দের অতি বিপ্লবী অবস্থান এবং তৎপ্রেক্ষিতে তাদের অন্তর্ঘাতমূলক কার্যক্রম এবং অপতৎপরতাসমূহ ভুলে যাওয়া সমীচীন হবে কিনা তা দেশবাসীর ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে।
৯০। অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং সঙ্গত কারণেই বলা আবশ্যক যে, রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকে ১৯৭৫ -এর সময়কালীন হঠকারী জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এবং বর্তমানে মহাজোটের অন্যতম শরিক শান্ত-সুবোধ জাসদ একই জাসদ নয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং নেতৃত্বদানকারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী। বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় বিগত ১৯৭৪ সনে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। এহেন অবস্থায় ঢাকার মিন্টো রোডে তার সরকারী বাসভবন ঘেরাও করার হঠকারী কর্মসূচী দিয়েছিল তৎকালীন অবিভক্ত জাসদ। তারও পরে ভারতের হাই কমিশনার সমর সেনকে জিম্মি করার প্রচেষ্টাও চালিয়েছিল জাসদ। উপরন্তু বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ধুয়া তুলে এবং “সশস্ত্র গণবাহিনী” গঠন করে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের নাশকতামূলক এবং অন্তর্ঘাতমূলক কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে জনবান্ধব বঙ্গবন্ধু সরকারকে সদাসর্বদা ব্যতিব্যস্ত এবং বেসামাল করে রেখেছিল ঐ সময়ের একীভূত জাসদ। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিভিন্ন ধরনের উস্কানি, প্ররোচনা এবং বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচারের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সরকারকে অপ্রিয় করে তোলার মাধ্যমে তাঁকে হত্যা করার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দিয়েছিল জলিল- রব-শাজাহান সিরাজের নেতৃত্বাধীন ঐক্যবদ্ধ জাসদ।
ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ),লেখক ও কলামিস্ট
(চলবে)
বি/ইবিটাইমস/এম আর