অস্ট্রিয়ায় করোনার সংক্রমণ অব্যাহত বৃদ্ধি, অবশেষে মুখ খুললেন প্রধানমন্ত্রী

ইউরোপ ডেস্কঃ সরকার প্রধান চ্যান্সেলর সেবাস্তিয়ান কুর্জ অক্টোবর থেকে রাতের গ্যাস্ট্রোনমি সহ সকল রাতের ইভেন্টে ১-জি নিয়ম বাধ্যতামূলক করার কথা জানিয়েছেন।

অস্ট্রিয়ার জনপ্রিয় অনলাইন পত্রিকা Oe24.at এর সাথে এক সাক্ষাৎকারের অস্ট্রিয়ার সরকার প্রধান চ্যান্সেলর (প্রধানমন্ত্রী) সেবাস্তিয়ান কুর্জ এই নতুন বিধিনিষেধের কথা জানান। আজ শনিবার অস্ট্রিয়ায় করোনার নতুন সংক্রমণ ১৩ শোর উপরে উঠে যাওয়ার পর সরকার প্রধান এই নতুন কঠোরতার কথা জানান।

এদিকে অস্ট্রিয়ার করোনা কমিশন সমগ্র অস্ট্রিয়ারকে করোনার হলুদ জোন ঘোষণা করেছে। কমিশন অস্ট্রিয়ায় করোনার নতুন সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকির কথা জানালেও দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর এখনও তেমন কোন চাপ পড়ে নাই বলেও জানিয়েছেন।

Oe24 এর সাথে সাক্ষাৎকারের চ্যান্সেলর কুর্জ বলেন, “অস্ট্রিয়া তুলনামূলকভাবে এখন পর্যন্ত করোনা মহামারী আয়ত্ত করেছে। তবে আমাদের শরতের জন্য ভালভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে কারণ করোনার নতুন সংক্রমণ আবার বাড়ছে। তিনি জানান, করোনার এই নতুন সংক্রমণ যদি এভাবেই বাড়তে থাকে, তাহলে ডিস্কো এবং নাইটক্লাবগুলির জন্য ১- জি নিয়ম বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। অর্থাৎ শুধুমাত্র রাতের ইভেন্টে কেবলমাত্র তারাই প্রবেশ করতে পারবেন যাদের করোনার প্রতিষেধক টিকার সম্পূর্ণ ডোজ গ্রহণ করা আছে।

চ্যান্সেলর আরও যোগ করে বলেন,”টিকা দেওয়ার মাধ্যমে, আমাদের কাছে মহামারী মোকাবেলা করার এবং আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা রক্ষা করার সর্বোত্তম উপায় রয়েছে। তাই নিজেকে এবং অন্যদের সুরক্ষার জন্য যতটা সম্ভব টিকা দেওয়া চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।” তিনি এই ব্যাপারে সরকারের তিনটি বিশেষ পরিকল্পনার কথা বলেন,

১. করোনার ১-জি নিয়ম বাধ্যতামূলক,

২. করোনার প্রতিষেধক টিকাদান কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং

৩. করোনার প্রতিষেধক টিকার তৃতীয় বা বুস্টার ডোজ দেয়া তরান্মিত করা।

করোনার ১-জি নিয়ম বাধ্যতামূলক:

১।করোনার ১-জি নিয়ম রেগুলেশন শরতের পর থেকে বিশেষ করে সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন এলাকায় যেমন নাইট কেটারিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে উঠতে পারে: ফেডারেল সরকার সবসময় জোর দিয়েছিল যে আমরা যে পদ্ধতিটি অনুসরণ করছি তা একটি ঝুঁকি ভিত্তিক পদ্ধতি।  নাইট ক্যাটারিং -এ আমাদের অবস্থা এমন যে অনেক টিকা ছাড়ানো মানুষ টিকা দেওয়া মানুষের সাথে দেখা করে। অতএব, তথাকথিত করোনার সংক্রমণের সুপারস্প্রেডার ইভেন্টগুলির জন্য একটি বিশেষ ঝুঁকি রয়েছে। তাই এটি যতটা সম্ভব প্রতিরোধ করা গুরুত্বপূর্ণ।  শরৎকাল থেকে, যখন সামাজিক জীবন আবার ভেতরের দিকে বদলে যায়, সংক্রমণের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং তরুণদের মধ্যে টিকা দেওয়ার হার কম থাকে, উদাহরণস্বরূপ, রাতের রেস্তোরাঁগুলিতে ১-জি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হতে পারে।

২. করোনার প্রতিষেধক টিকাদান কার্যক্রম বৃদ্ধি:

বর্তমানে সরকারের লক্ষ্য টিকাদান কার্যক্রম আরও বৃদ্ধি করা। ফেডারেল চ্যান্সেলরি নির্দিষ্ট লক্ষ্য গোষ্ঠীর জন্য দেশব্যাপী অস্ট্রিয়া ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইনের কার্যক্রম বৃদ্ধি করছে যাতে আবার প্রাথমিক টিকা দেওয়ার হার বৃদ্ধি পায় এবং ক্রমাগত ভ্যাকসিনেশন কভারেজ বৃদ্ধি পায়।  স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ফেডারেল রাজ্যগুলির সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। টিকা প্রদানের অফারগুলিতে যা যথাসম্ভব কম-সীমা, জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতার বিনিময়কে উৎসাহিত করে এবং নির্দিষ্ট স্টেকহোল্ডার যোগাযোগের দিকে মনোনিবেশ করছে। আরও অধিক সংখ্যক মানুষকে টিকাদানে উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

৩.করোনার প্রতিষেধক টিকার তৃতীয় বা বুস্টার ডোজ দেয়া তরান্মিত করা:

সরকার প্রধান চ্যান্সেলর সেবাস্তিয়ান কুর্জ বলেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের তৃতীয় কৌশল করোনার প্রতিষেধক টিকার তৃতীয় ডোজ বা বুস্টার ডোজ প্রদান শুরু করা। তিনি জানান উপরন্তু, আমাদের লক্ষ্য টিকাদান কার্যক্রমের গতি অব্যাহত রাখা। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন,প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে যে মাত্র কয়েক টিকাদান কার্যক্রম অত্যন্ত সুন্দর ও উৎসাহ এবং উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে চললেও এখন টিকা গ্রহণে মানুষের মধ্যে উৎসাহ কমে গেছে। ফলে যারা এখনও টিকা গ্রহণ করেন নি,তারাই অধিক মাত্রায় খুব সহজেই নতুন করে সংক্রমিত হচ্ছেন। এই কারণেই জাতীয় টিকা বোর্ড গত সপ্তাহে সুপারিশ করেছিল যে দেশের বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্রুপের যারা করোনার প্রতিষেধক টিকা গ্রহণ সম্পন্ন করেছেন,তাদেরকে ৯ মাসের পরিবর্তে ৬ মাসেই করোনার তৃতীয় ডোজ বা বুস্টার ডোজ দেয়া শুরু করা যেতে পারে। সেবাস্তিয়ান জানান, ফেডারেল রাজ্যগুলিতে এর জন্য প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে বয়স্ক , ঝুঁকিপূর্ণ  নার্সিংহোমের বাসিন্দাদের করোনার প্রতিষেধক টিকার তৃতীয় বা বুস্টার ডোজ প্রদান শুরু করা হচ্ছে।

এদিকে অস্ট্রিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভল্ফগাং মুকস্টাইন অস্ট্রিয়ায় নতুন করে করোনার সংক্রমণের উর্ধ্বগতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি করোনার এই নতুন সংক্রমণ বিস্তারের বৃদ্ধিতে সতর্ক করে বলেন,“বিজ্ঞানীদের বর্তমান পূর্বাভাস দেখায় যে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ওভারলোডিং এড়াতে আমাদের টিকা দেওয়ার হার আরও বাড়াতে হবে।  অতএব আমি প্রত্যেকের কাছে আবেদন করছি যারা এখনও করোনার প্রতিষেধক টিকা নেননি,তারা টিকা সম্পর্কে আরও জানুন এবং অসংখ্য টিকা প্রদানের অফারগুলির মধ্যে একটি ব্যবহার করুন।  আপনি নিজেকে এবং আপনার প্রিয়জনকে একটি গুরুতর অসুস্থতা থেকে রক্ষা করুন!”

অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধীদল সোস্যালিস্ট পার্টি অস্ট্রিয়ার (SPÖ) চেয়ারপার্সন ডা.পামেলা রেন্ডি-ভাগনার আজ এক প্রেস বিবৃতিতে জানিয়েছেন সরকারের উচিৎ দেশের অতি ঝুঁকিসম্পন্ন এলাকা ইভেন্টগুলিতে শুধুমাত্র করোনার প্রতিষেধক টিকাকারীরাই (১-জি) প্রবেশ করতে পারবে এই রকম নিয়ম বাধ্যতামূলক করা।

আজ অস্ট্রিয়ায় নতুন করে করোনায় সংক্রমিত শনাক্ত হয়েছেন ১,৩২৮ জন। তবে আজ কেহ করোনায় মৃত্যুবরণ করেন নি। রাজধানী ভিয়েনায় আজ নতুন করে করোনায় সংক্রমিত শনাক্ত হয়েছেন ৩৬৪ জন।অন্যান্য রাজ্যের মধ্যে OÖ রাজ্যে ৩২৪ জন, NÖ রাজ্যে ১৮১ জন, Steiermark রাজ্যে ১৫৬ জন, Salzburg রাজ্যে ১০০ জন, Tirol রাজ্যে ৮২ জন, Vorarlberg রাজ্যে ৬২ জন, Kärnten রাজ্যে ৩৭ জন এবং Burgenland রাজ্যে ২২ জন নতুন করে করোনায় সংক্রমিত শনাক্ত হয়েছেন।

অস্ট্রিয়ার স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী আজ করোনার প্রতিষেধক টিকা দেয়া হয়েছে ২৩,৯৬০ ডোজ এবং এই পর্যন্ত দেয়া হয়েছে ১,০৩,০২,৩৩৭ ডোজ। অস্ট্রিয়ায় এই পর্যন্ত ৫১,০৪,৮৪৩ জন করোনার প্রতিষেধক টিকার সম্পূর্ণ ডোজ গ্রহণ করেছেন, যা দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৭,২৫ শতাংশ।

অস্ট্রিয়ায় এই পর্যন্ত করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬,৭৫,৪০৫ জন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ১০,৭৬১ জন। করোনার থেকে আরোগ্য লাভ করেছেন মোট ৬,৫২,৮৯৬ জন। বর্তমানে করোনার সক্রিয় রোগীর সংখ্যা ১১,৭৪৮ জন। এর মধ্যে আইসিইউতে আছেন ৭০ জন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ৩২৬ জন। বাকীরা নিজ নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে আছেন।

কবির আহমেদ /ইবিটাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »