ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারী,নতুন মিউটেশন ভাইরাস ৩০ শতাংশ বেশী মরণঘাতী !

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ব্রিটিশ  প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন শুক্রবার ২২ জানুয়ারী বিকালে এক সাংবাদিক সম্মেলন বলেন,বর্তমানে বৃটেনে বিকশিত করোনার  মিউটেশন অর্থাৎ ভাইরাসের পরিবর্তিত রূপটি মারাত্মক আকার ধারণ করছে। তিনি বলেন,এই ভাইরাসে সংক্রমিত হলে মৃত্যুর হার পূর্বের করোনা ভাইরাসের চেয়ে ৩০% শতাংশ বেশী। বরিস জনসন বলেন, সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে সনাক্ত নতুন মিউটেশন ভাইরাসটি ক্রমশ ভয়ানক আকার ধারণ করছে বলে আমাদের সংক্রমণ রোগ বিশেষজ্ঞরা সতর্কতা দিয়েছেন।

এই নতুন মিউটেশন শুরুর পর থেকে আমরা এই পরিবর্তিত ভাইরাস সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য বা বিশ্লেষণ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনাদেরকে আপডেট করার চেষ্টা করেছি। সুতরাং আমি আজ বিকেলে আপনাদেরকে অবশ্যই বলতে হবে যে, আমাদের দেশের সর্বোচ্চ বিশেষজ্ঞরা আজ আমাদেরকে অবহিত করেছেন,এই মিউটেশন ভাইরাস B.1.1.7 শুধুমাত্র দ্রুতই ছড়াচ্ছে না অধিকিন্ত পূর্বের ভাইরাসের চেয়ে প্রায় ৩০ গুন বেশী মরণঘাতী। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে লন্ডন এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ড এখন এক মৃত্যুপুরীতে রূপ নিয়েছে।

তিনি আরও জানান,বর্তমানে এই মিউটেশন ভাইরাসের দ্রুত বিস্তার লাভের ফলে আমাদের হাসপাতালগুলির উপর প্রচন্ড চাপ বাড়ছে। গত ২৪ ঘন্টায় নতুন করে পুনরায় সংক্রমিত সনাক্ত হয়েছেন ৪০,২৬১ জন। আজকের হিসাবে বর্তমানে আমাদের হাসপাতাল গুলিতে ভর্তি কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩৮,৫৬২ জন যা গত এপ্রিলের প্রথম তরঙ্গের সর্বোচ্চের তুলনায় শতকরা ৭৮% শতাংশ বেশী। তিনি আরও জানান, গত কয়েক দিনে করোনায় মৃত্যুবরণের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সকলকে অতি জরুরী প্রয়োজন ব্যতীত ঘর থেকে বের হতে বারণ করেন। তিনি সবশেষে বলেন, “সুতরাং এটি আগের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা সবাই ঘরে বসে থাকা নিয়মগুলি মেনে যথাযথভাবে মেনে চলি, ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (NHS) সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে নিজেদের স্বাস্থ্য ও জীবনকে নিরাপদ রাখি।

এদিকে লন্ডন থেকে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকা সমূহ জানিয়েছেন,লন্ডনে বাংলাদেশীদের ঘরে ঘরে স্বজন হারানোর আর্তনাদে ফেটে পড়ছে। লন্ডন শহ‌রে বাংলা‌দেশী প্রায় প্রতি‌টি প‌রিবার এখন স্বজন হারা‌নোর শো‌ক নিয়ে বেঁচে আছেন। এসব পরিবারের কোনও না কোনও সদস্য, নয়তো খুব কাছের কেউ বিগত দুই মাসের মধ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং এই সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। লন্ডন শহ‌রের মুস‌লিম কবরাস্থান গুলিতে লাশ কবর দিতে এখন সিরিয়াল পেতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। মর্গে পড়ে আছে লাশের পর লাশের সারি। করোনার এই মিউটেশন ভাইরাস আমাদের বাংলাদেশী কমিউনিটির উপর প্রচন্ডভাবে বিস্তার লাভ করেছে। তাই বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কমিউনিটির মানুষের মধ্যে এক বিশেষ আতঙ্ক বিরাজ করছে।

স্থানীয় একটি বাংলা পত্রিকার সাথে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ব‌বিদ‌্যাল‌য়ের সা‌বেক ভি‌পি বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী প্রফেসর পার‌ভেজ ম‌ল্লিক ব‌লেন, ইংল্যান্ডে প্রতি ৩০ সেকেন্ডে একজন কোভিড-১৯ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘দুই দফা করোনার সংক্রমণে ব্রিটে‌নে বসবাসরত বাংলা‌দেশী কমিউনিটির চার ভাগের এক ভাগ ষাটোর্ধ্ব মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে আমার মনে হচ্ছে।’ তিনি জানান বসবাসের কাগজপত্র ছাড়াই ব্রিটেনে বসবাস করা ৫০ হাজার বাংলাদেশীর সঙ্গে ব্রেক্সিটের আগ মুহূর্তে যুক্ত হয়েছেন ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে আরও কয়েক হাজারবাংলাদেশী বংশোদ্ভূত । বর্তমানে করোনার এই ভয়াবহতার ফলে ইউরোপের কাগজপত্র নিয়ে ব্রিটেনে প্রবেশ করা এসব বাংলাদেশীরা চরম বিপাকে পড়েছেন বলে জানান তিনি।

লন্ডনের স্থানীয় একটি সিলেট ভিত্তিক বাংলা অনলাইন পোর্টাল জানান, মৌ‌লভীবাজার জেলা ছাত্রলী‌গের সা‌বেক সভাপ‌তি এবং লন্ডনের কাউন্সিলর মুজিবুর রহমান জসিম বলেন, ব্রিটেনে যেসব বাংলাদেশী ব্যবসা করেন তাদের ৮০ শতাংশই রেস্টুরেন্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। করোনা মহামারির কারনে এই ব্যবসায় ধস নেমেছে। পূর্ব লন্ডনে করোনার সংক্রমণ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ায় মানুষ বাহিরের রেস্টুরেন্টের খাবার কেনা বাদ দিয়ে দিয়েছেন। নাইট ক্লাব, পাব সবকিছু বন্ধ থাকায় যারা ট্যাক্সিক্যাব চালাতেন তাদের আয় কমে গেছে।

অনলাইন পোর্টালটি আরও জানান, লন্ড‌নের ক‌্যাম‌ডে‌নে বসবাসরত সাংবাদিক ও যুক্তরাজ‌্য জাসদ নেতা ফখরুল ইসলাম খছরু এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ব্রিটেনে এখনও  ওয়েলফেয়ার সুবিধা রয়েছে। বৈধ কেউ না খেয়ে মারা যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনও হয়নি। তবে রোজগার হারাবার যন্ত্রণা আমাদের কমিউনিটির লোকজন সহ্য করতে পারছে কিন্ত স্বজন হারাবার বেদনা প্রবাসী বাংলাদেশীরা সহজে মেনে নিতে পারছেন না।

ইউ‌কে বাংলা প্রেসক্লা‌বের সভাপ‌তি কে এম  আবু তা‌হের চৌধুরী জানান, ব্রিটেনে এখন করোনায় প্রতিদিনের গড় মৃত্যুবরণ প্রায় দেড় হাজারের মত । তিনি বলেন, “বর্তমানে বৃটেনে এক ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছে। আমরা কেহই ভালো নেই। বাংলাদেশী কমিউনিটির প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ করোনায় আক্রান্ত। হাসপাতালে ঠাঁই নেই। করোনায় প্রতিদিন মৃত্যুর সর্বোচ্চ রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। ব্যবসা বানিজ্য বন্ধ। রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য।’ তিনি আরও জানান,এই নতুন মিউটেশন ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পূর্ব লন্ডনে এই পর্যন্ত প্রায় শতাধিক বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মৃত্যুবরণ করেছেন।

তাছাড়াও বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ইস্ট লণ্ডন মসজিদের ইমাম শায়েখ আব্দুল কাইউম । বর্তমানে তিনি নিজ বাসায়  আইসোলেশনে আছেন এবং শারীরিক অবস্থা অনেক উন্নতির দিকে। তাছাড়াও আরও আক্রান্ত হয়েছেন মারকাজি মসজিদের ইমাম মাওলানা হাফেজ রফিক, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা আব্দুস সালামসহ শত শত প্রবাসী বাংলাদেশী।

উল্লেখ্য, ‌ব্রিটে‌নের প‌রিসংখ‌্যান বিভা‌গের তথ‌্য অনুযায়ী ক‌রোনায় ২০২০ সা‌লে প্রায় ১৬ লাখ ৯০ হাজার মানুষ কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। স‌রকার এখন পর্যন্ত ফা‌র্লো স্কি‌মের (বিশেষ কর্মসূচি) মাধ‌্যমে দেশ‌টির কর্মজীব‌ীদের বেত‌নের বড় অংশ‌ প‌রি‌শোধ ক‌রে যাচ্ছে।‌ এ স্কিম চালু থাকায় বেকারত্বজ‌নিত বিপর্যয়ের প্রকৃত চিত্রটি সাম‌নে আসছে না। ক‌রোনায় ঠিক কত লাখ মানুষ ব্রিটে‌নে চাকুরী হারা‌বেন, সেটা বোঝা যা‌বে সরকারের প্রনোদনায় বেত‌নের চলমান ফা‌র্লো স্কিম বন্ধ হবার প‌রে।

ক‌রোনাভাইরাস মহামা‌রি‌তে স্মরণকা‌লের সব‌চে‌য়ে বড় সংক‌টের মু‌খোমু‌খি হয়েছেন ব্রিটেনে বসবাসকারী প্রায় আট লক্ষাধিক বাংলা‌দেশী। বৃটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের এক পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে স্থানীয় একটি বাংলা নিউজ পোর্টাল জানিয়েছেন,ব্রিটে‌নের ব্ল‌্যাক অ্যান্ড মাইনোরিটি এথ‌নিক (বিএমই) কমিউনিটির  ম‌ধ্যে ক‌রোনায় বাংলা‌দেশীদের মৃত‌্যুর হার শীর্ষ তা‌লিকায় রয়েছে।

কবির আহমেদ /ইবি টাইমস

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »