বর্ষায় কাঁদা-পানিতে একাকার,শুষ্ক মৌসুমে ধুলোর যন্ত্রণা
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: ‘ছোটবেলায় কাদাপানির মদি বেড়াইচি,এখন বুড়ি হয়ে গেলাম তা-ও সে কাদাপানির মদি-ই আছি। কত চাচা আলো,কত চাচি আলো,কিন্তু কেউ রাস্তাডা পাকা করে দিলো না।’ শৈশব,কৈশর পেরিয়ে জীবন সায়াহ্নে উপনিত হলেও এলাকার সড়কগুলোর উন্নয়ন না দেখে নিজের হতাশার কথা এভাবেই বলছিলেন ঝিনাইদহ সদর উপজেলার খাজুরা এলাকার রাহেলা বেগম।
মহাসড়কে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও এ জেলার অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক রয়ে গেছে এখনও কাঁচা। বর্ষায় কাঁদা-পানিতে একাকার আর শুষ্ক মৌসুমে ধুলোর ধূসর যন্ত্রণা যেন প্রতিমুহূর্তে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে।
ঝিনাইদহ সদর,হরিনাকুন্ডু,শৈলকুপা,মহেশপুরের কয়েকটি এলাকায় ঢুকলেই চোখে পড়বে এমন বাস্তবতা। যেখানে মানুষের যাত্রাপথ এখনও নির্ভর করে কাদাধুলোর উপর। রোদ,বৃষ্টি,ধুলোবালি হিসেব করে চলতে হয় এ পথের যাত্রীদের। বর্ষা মৌসুমে ভোগান্তি বাড়ে কয়েকগুন। বৃষ্টির পানিতে একাকার হয়ে যায় পথ। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা পড়েন চরম বিপাকে। এছাড়া এলাকার কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নিয়ে দুর্ভোগে পড়েন স্বজনরা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের(এলজিইডি) দেওয়া তথ্যমতে,জেলার ৬ উপজেলায় মোট গ্রামীন সড়কের পরিমাণ ৫ হাজার ৬ শ’ ৪৬ দশমিক ১০ কিলোমিটার। এর মধ্যে কাঁচা সড়ক রয়েছে ২ হাজার ৬ শ’ ৬৮ দশমিক ১০ কিলোমিটার। অন্যদিকে পাকা সড়ক রয়েছে ২ হাজার ৯ শত ৭৮ দশমিক ০৯ কিলোমিটার।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলায় মোট গ্রামীন সড়কের পরিমাণ ১ হাজার ৫ শ’ ১৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার। এর মধ্যে কাঁচা রয়েছে ৭ শ’ ৫৭ কিলোমিটার। পাকা রয়েছে ৭ শ’ ৫৯ দশমিক ৫০ কিলোমিটার।
হরিণাকুন্ডু উপজেলায় মোট গ্রামীন সড়কের পরিমাণ ৫ শ’ ১৩ দশমিক ৬০ কিলোমিটার। এরমধ্যে পাকা হয়েছে ৩ শ’ ৫৫ কিলোমিটার। আর কাঁচা রয়েছে ১ শ’ ৬৮ দশমিক ৬০ কিলোমিটার।
শৈলকুপা উপজেলায় মোট গ্রামীন সড়কের পরিমাণ ১ হাজার ১ শ’ ১৮ দশমিক ৮০ কিলোমিটার। এর মধ্যে কাঁচা সড়ক রয়েছে ৪ শ’ ৭৪ দশমিক ৩০ কিলোমিটার ও পাকা সড়ক রয়েছে ৬ শ’ ৪৪ দশমিক ৫০ কিলোমিটার।
কালীগঞ্জ উপজেলায় মোট গ্রামীন সড়কের পরিমাণ ৮ শ’ ৯০ দশমিক ৯০ কিলোমিটার। এর মধ্যে কাঁচা সড়ক রয়েছে ৩ শ’ ৮১ দশমিক ২০ কিলোমিটার ও পাকা সড়ক রয়েছে ৫ শ’ ০১ দশমিক ৭০ কিলোমিটার।
কোটচাঁদপুর উপজেলায় মোট গ্রামীন সড়ক ৪ শ’ ৪২ দশমিক ৯০ কিলোমিটার। এর মধ্যে কাঁচা সড়ক রয়েছে ১ শ’ ৯৪ কিলোমিটার ও পাক সড়ক রয়েছে ২ শ’ ৪৮ দশমিক ৯০ কিলোমিটার।
এছাড়াও মহেশপুর উপজেলায় মোট গ্রামীন সড়কের পরিমাণ ১ হাজার ১ শ’ ৫৩ দশমিক ৩০ কিলোমিটার। এর মধ্যে কাঁচা সড়ক রয়েছে ৬ শ’ ৬২ কিলোমিটার। আর পাকা সড়ক রয়েছে ৪ শ’ ৯১ দশমিক ৩০ কিলোমিটার।
উন্নয়নের হিসাব-নিকাশে পিছিয়ে পড়া লাখো মানুষের ভোগান্তি দূর করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এসব গ্রামীণসড়কগুলের উন্নয়নসহ পাকা করার দাবী স্থানীয়দের।
শৈলকুপার মাধবপুর এলাকার ইকরামুল ইসলাম বলেন,‘এমন অবহেলিত কাঁচা সড়কের কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষক,শিক্ষার্থী এবং এলাকাবাসীকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সরকার যায় আসে কিন্তু এই রাস্তাটির কোন উন্নতি হয় না। এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি রাস্তাটি সংস্কার করা হোক।’
কোটচাঁদপুর উপজেলার লক্ষিপুর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা জামিরুল ইসলাম বলেন,‘লক্ষিপুর মোড় থেকে ভোমরাডাঙ্গা গ্রাম পর্যন্ত মাত্র দেড় কিলোমিটার রাস্তা। সামান্য বৃষ্টি হলেই ওই দেড় কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে আমাদের ঘুরতে হয় দশ কিলোমিটার। আমার দাদা,বাবারাও এমন দেখে গেছে। আমাদের জীবনও প্রায় শেষ। জানিনা আমরা জীবিত থাকতে রাস্তাটি হবে কিনা।’
মহেশপুরের ইজিবাইক চালক শফিক হাওলাদার বলেন,‘বৃষ্টি হলেই কাঁচা সড়কগুলোতে চলাচল করা যায় না। পথচারীদের দুর্ভোগের পাশাপাশি আমাদের ভোগান্তি হচ্ছে। এসব সড়কে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি হয় অন্ত:সত্ত¡া রোগীদের। সময়মত তাদেও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না।’
মকবুল হোসেন নামে আরেক বাসিন্দা বলেন,‘বর্ষা মৌসুমে কাঁচা সড়কগুলোতে কোনো অ্যাম্বুলেন্স,মাইক্রোবাস,ভ্যান-রিকশা আসে না। এমনকি মোটরসাইকেল, সাইকেলে তো দূরে থাক,খালি পায়ে হেঁটে চলাচল করাও কষ্টসাধ্য। বৃষ্টির দিনে গ্রামের কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো যানবাহন ও অ্যাম্বুলেন্সও সড়কে ঢুকতে চায় না।’
এদিকে কাঁচা সড়কগুলো পাকাকরণের বিষয়ে ঝিনাইদহ এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মনোয়ার উদ্দিন বলেন,জেলার কাঁচা সড়কগুলো পাকাকরণে প্রায় ৫শ’ কোটি টাকার প্রজেক্ট হাতে নেওয়া হয়েছে। এই প্রোজেক্টের আওতায় প্রায় ৫শ’ কিলোমিটার রাস্তা পাকা করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে ২শ’ কিলোমিটার রাস্তা টেন্ডার হয়ে গেছে। আরও ৩০০ কিলোমিটার কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান আছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাঁচা সড়কগুলো পাকা করা হবে।’
শেখ ইমন/ইবিটাইমস