ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: হাসপাতালের ওয়ার্ডের মেঝে-বারান্দায় চাদর ও পাটি বিছিয়ে বসে ও শুয়ে আছেন অর্ধশতাধিক রোগী। পাশেই গাদাগাদি করে বসে আছে স্বজনেরা। প্রচণ্ড গরমে রোগী ও স্বজনদের হাঁসফাঁস অবস্থা। তাঁদের বিছানার পাশ দিয়ে মানুষজন হেঁটে যাচ্ছেন। পায়ের ধুলাবালু উড়ে বিছানায় ও নাকেমুখে যাচ্ছে। এ অবস্থায় রোগীদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা।
এটি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিত্র। ১৫০ জনের অধিক রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছে। অথচ পুরো হাসপাতালে শয্যা রয়েছে ৫০টি। বাকি রোগী ওয়ার্ডের মেঝে ও বারান্দায় বিছানা করে সেবা নিচ্ছেন।
আনোয়ারা বেগম নামের এক মধ্যবয়সী নারী তাঁর স্বামীকে নিয়ে গতকাল শুক্রবার সকালে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বেড না পেয়ে বারান্দার একটি ছোট্ট স্থানে পাটি বিছিয়ে স্বামীকে নিয়ে আছেন। তিনি বলেন,‘স্বামীকে ডাক্তার দেখাতে এসে আমি নিজেই এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছি। হাইরে গরম,ফ্যানের বাতাস ঠিকমতো লাগে না গায়ে। পচা দুর্গন্ধ আর মশার কামড়ে অবস্থা খারাপ। কোথাও সিট (শয্যা) খালি নাই।’
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়,গত ৪ মাস ধরে জ্বর ডায়রিয়া,নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও এ্যাজমা রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে জ্বরে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত বয়স্ক ও শিশুরা। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারে হাসপাতালে ভর্তি শিশু ও বয়স্ক রোগীর সংখ্যা বেশী। ধারণ ক্ষমতার চেয়ে তিনগুন রোগী ভর্তি হওয়ায় দূর্ভোগে পড়েছে রোগীরা, সেইসাথে সেবা দিতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে চিকিৎসকরা।
সরেজমিন দেখা যায়,আউটডোরে ডাক্তারদের চেম্বারে সেবা নিতে আসা রোগীদের উপচে পড়া ভীড়,প্রতিদিন আউটডোরেই ৪ শতাধিক রোগীকে সেবা দেওয়া হয়। এছাড়াও জরুরি বিভাগ,পুরুষ ওয়ার্ড ও শিশু ওয়ার্ডে রোগীদের প্রচন্ড ভীড় লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি রোগীরা মেঝে,বারান্দা ও করিডোরে শুয়ে আছে। যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। কোন ওয়ার্ডে শয্যা ফাকা নেই, মেঝে ও বারান্দায় গাদাগাদি করে চিকিৎসা সেবা নিচ্ছে রোগীরা। জ্বর ও ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন ৩০-৪০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছে। বিভিন্ন বয়সের বেশীরভাগ রোগী কাশি,নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর অনেকে সুস্থ হয়ে উঠলেও অনেক বয়স্ক ও নবজাতকের গুরুতর অবস্থাও দেখা গেছে। এছাড়াও ১৪ জন ডেঙ্গু রোগীও ভর্তি আছে হাসপাতালটিতে।
হাসপাতালে সেবা নিতে আসা পৌর এলাকার মাঠপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল খালেক বলেন,’ ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে ৩দিন হাসপাতালের বারান্দায় শুয়ে সেবা নিচ্ছি। কোন শয্যা ফাঁকা নেই। ‘
উপজেলার সিদ্দি গ্রামের দীপা খাতুন বলেন,’শিশুর ঠান্ডা,জ্বর ও কাশি হয়েছে তাই হাসপাতালে এনেছি। অনেক শিশুই হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। রোগীর সংখ্যা বেশী হওয়ায় এভাবে গাদাগাদি করে মেঝেতে সেবা নিতে হচ্ছে।’
বারান্দায় বিছানা করে শ্বশুরকে রেখেছেন আমেনা খাতুন। তিনি বলেন,’সব সময় মানুষের ভিড়। বিছানা ঘেঁষে মানুষজন চলাফেরা করছেন। হাঁটার সময় চাদরের ওপর জুতা পরে উঠে যাচ্ছেন কেউ কেউ।’
হাসপাতালটির মেডিকেল অফিসার ডা: সোনিয়া আক্তার মুক্তা বলেন,’বর্তমানে ২০ জন ডেঙ্গু ও ১৬ জন ডায়রিয়া রোগী ছাড়াও দেড়’শ জনের উপর রোগী ভর্তি রয়েছে। তবে বেশীরভাগ জ্বরে আক্তান্ত রোগী ভর্তি আছে। বেশকিছুদিন হাসপাতালটিতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ দেখা যাচ্ছে। তাই শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে।’
শৈলকুপা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: রাশেদ আল মামুন বলেন,’হাসপাতালে বর্তমানে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে রোগী অনেক বেশী ভর্তি। শয্যা সংকুলান না হওয়ায় মেঝেতে সেবা দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও আমাদের লোকবল সংকট রয়েছে। এরপরও যথাসাধ্য চেষ্টা করা হচ্ছে ভাল সেবা দেওয়ার জন্য।’
শেখ ইমন/ইবিটাইমস