
নূরী নামকে পাথর বলেই ভাবতে দোষ কী? এই পাথর যখন যার হাতে থাকে, সে নানান রুপে মূল্যবান করে গড়ে তুলতে পারে। যদি সে পাথর টি সঠিক রূপদানকারী কোন উপযুক্ত ব্যক্তির হাতে পড়ে। কোন হস্ত কারিগর কিংবা ভাস্কর শিল্পীর হাতে নতুন রূপ নিয়ে সৌন্দর্যের রূপদান করতে করতে আরও নিপুন ও সুনিপুন হয়ে ওঠে।
সেদিন খা খা দুপুর। নূরী নিজের খেয়ালে একটা ব্যাগ নিয়ে কোথায় যেন রওনা দিল। সে এরকম প্রতিদিনই যায়। কি তার বাবা, মায়ের নাম জিজ্ঞাসা করলে বলতে পারে ঠিকই।তবে অনেক ভেবে চিন্তে সময় অতিবাহিত করতে হয়। নূরীর উপার্জন চেয়ে চিন্তে খাওয়া। যাকে বলে ভিক্ষাবৃত্তি। কোন কাজে যে পরিচ্ছন্ন তাও কিন্তু নয়। কেউই তাকে কাজে ডাকে না। যদিওবা কারো কাজের দরকার হয়, ডাকলে ঠিক করে করতেও পারে না নূরী।
কাক ডাকা ভোরে কুড়েঘর থেকে ঘুম থেকে উঠে পরে নূরী। কিন্তু কি কাজ করে যে সে বেড় হবে তাও সে বুঝতে পারে না। শুধু জানে একটা ব্যাগ হাতে মানুষের দরজার সামনে তাকে দাঁড়াতে হবে। কোন রান্না ও সে করে না। সব চেয়ে ছোট বাচ্চাকে কোলে করে বেড়িয়ে যায় গ্রামে।
টুকিটাকি কিছু করতে দেখে নূরীকে আশপাশের লোকজন। অথচ কি কাজ যে সে করে স্বাভাবিক দৃষ্টিতে কেউই দেখতে পায় না।
স্বামীর নাম রেজেক আলী। আলীটা আমার দেওয়া। শুধু রেজেক বলেই ডাকে সবাই তাকে। সে হাটে, বাজারে দোকানে দোকানে কাজ করে। মূল কাজ হল জল দেওয়া।প্রত্যেক কলসি জলের জন্য দুই টাকা পায়। রেজেক নূরীর হাতে কখনো টাকা-পয়সা দেয় না।
রেজেককে প্রশ্ন করে জানতে চাইলাম। ভাই রেজেক, তুমি নূরীর হাতে টাকা পয়সা দাও না? উত্তরে রেজেক বলে- আমারে পাগলে পাইছে, বিডিগো হাতে টাহা দিমু! হে যেমনে পারে চলুক দেহি ! বিডিগো হাতে টাহা থাকলে মাতায় ওডে।
আমি তো শুনে অবাক! এই রেজেক নাকি বোকা ! ও যাদের মধ্যে চলে তাদের এমন ভাবনা বোধ রেজেকের কানকে মুখস্ত করে দিয়েছিল,কিছু গদবাঁধা কথা।
যাক সে কথা- রেজেক খেয়ে আসে দোকানে দোকানে। এই রেজেকের সাথে নূরীর বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছে গ্রামের কিছু লোক। রেজেককে বোকা আর বুদ্ধিহীন ভাবে ছোট বাচ্চারাও। সে টাকা চেনে না। দুই টাকার নোট সে ভালো করেই চেনে। পনেরো বছর যাবত রেজেক দোকানে জল দেয়, এখন তার রেট দুই টাকা। এই দুই টাকাই তার পরিচিত টাকা। দুই টাকার কম বেশি দিলে সে চিনতে পারে না। এই হল নূরীর স্বামী!
নূরী যে ঘরটিতে থাকে, উপরে খড় কুটো কিছু আর বাকিটা পলিথিনের কিছুটা অংশ। পলিথিনে ছিদ্র আছে বেশ কয়েকটি। শীতের শিশির গড়িয়ে ওর নিজের এবং সন্তানের গায়ে পরতে থাকে নির্দিধায়। বৃষ্টি সে তো ওর পরিবারের জন্য খুবই আপন হয়ে আসে।
তিন সন্তানের মা নূরী। প্রথম সন্তান মেয়ে ১২ বছর বয়স তার। মেজোটা ছেলে ১০ হবে। ছোট জন মেয়ে ৩ কি ৪ বছর। নিজে বলতে পারল না। আমাকে হিসাব করে লিখতে হল।
বড় মেয়েটা প্রতিবন্ধী ! মুখথেকে লালা ঝরে। তিনটি সন্তানের নাম জিজ্ঞাসা করলে নূরী ও রেজেককে, নূরী পারলেও বলতে রেজেক পারে না! আর নূরীর কাছে জানতে চাইলে নূরীও জানে না আদৌ রেজেকেরই সন্তান কি না ওরা! ওদের সন্তানরা ল্যাংটা সময় কাটায় বেশির ভাগই। বড় মেয়েটির জন্য কেউ কেউ পুরাতন বস্র দেয় তাই পড়ে। কিনে তো কাপড় পড়া ওদের ভাগ্যে নাই।
ভিক্ষা করে যে চাল পায় নূরী -বিকেলে বা সন্ধ্যায়- ছোট্ট কুড়ে ঘরে এসে মাটির উনোনে অন্যের বাগান থেকে কুড়িয়ে আনা কাঠ দিয়ে আগুন ধরায়। কি রান্না হয় কেউ সখ করে দেখতেও যায়!
নূরীকে তার বয়সের কথা জিজ্ঞাসা করলে বলে- তা চব্বিশ, পঁচিশ হইছে। তয় আমি একাত্তরের রাজাকার দেখছি! ওই সময়ে কতা মোর স্পষ্ট মনে আছে। সবই কইতে পারমু।
নূরীর শরীরে যে রাজাকারের আচড় বর্তমান সময়ের রাজাকারের হাত থেকে পরে, সেটা পরোক্ষভাবে বুঝাতে সে তবে কি একাত্তরের কথা কল্পনা করে?
এটা কি তবে তার নিজস্ব কল্পনার জগত। পথে চলতে অযাচিত হাতের স্পর্শ ওর নিজের শরীরকে কেটে খুটে খুবলে খায়, সেটা বুঝাতে সে তবে কি একাত্তর শব্দটা ব্যবহার করে!
সঠিক যা নূরী একাত্তর দেখে নি!
গরমে নূরী ব্লাউজ গায়ে জড়ায় না। প্রচন্ড জ্বরে নূরী যখন গোঙাতে থাকে তার সন্তানেরা পাশে বসে চেয়ে চেয়ে দেখে। রেজেক? কোথায় থাকে নূরী জানে না। হয়ত বাজারে আছে। প্রচন্ড যন্ত্রণায়ও সরকারি ঔষধ দয়া করেও নূরীর পেটে পড়ে না। কেননা নূরী ক্লিনিক বা স্বাস্থ্য কম্প্লেক্সে যেতে ভয় পায়। আর কার দায় পরেছে যে যেচে নূরীকে ঘরে গিয়ে ঔষধ দিয়ে আসবে।
এই যে নূরীরা, রেজেকরা সমাজের গন্যমান্যদের আবর্জনা। নূরী পৃথিবীতে একটা প্রাণ বটে যে প্রাণ সমাজের জন্য অস্পৃশ্য ঘৃণিত। নূরী,রেজেক পৃথিবীর কারো উপকারে আসবে না। ওরা জঞ্জাল।তাই ওদের দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা, অপ্রোয়জনীয় হাসির কোন মূল্য নাই সমাজের। যে মানুষটির সংসারে ব্রাশ নাই, পরিচ্ছন্ন হতে সাবান নাই, শিক্ষার জন্য বই নাই।
আছে? একটা বাতি, একটি হাড়ি, একটা মাত্র জলের মগ, একটা গ্লাস। নূরী নাকি গ্লাসটা চুরি করে এনেছে সন্তানদের জন্য। ঘুমাতে বালিশ লাগে না নূরীর ও তার সন্তান -দের।
অচেনা অজানা সময়ের দাবি নিয়ে, কোটি কোটি টাকার পৃথিবীতে আসার কি খুব প্রয়োজন ছিল, নূরীর? অন্ন অন্যের ঘরে, বস্র অন্যের দোকানে, চিকিৎসা ভয়ের নূরীর কাছে। বিনোদন মূলত কি নূরী এই জীবনটায় জানতেই পারল না!
কে দাঁড়াবে ওদের সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবন গড়ে দিতে পাশে। কেউ কি?
বি রিপোর্ট/ইবিটাইমস