ফলো আপ
তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা ১৯ হাজার ছাড়িয়েছে বলে উভয় দেশের উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম খবর প্রকাশ করছে
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ বৃহস্পতিবার (৯ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে গত সোমবার তুরস্ক ও সিরিয়ার সীমান্ত সংলগ্ন বিস্তৃত অঞ্চলে স্মরণকলের ভয়াবহ ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় বাড়ছে। বৃহস্পতিবার দুই দেশের কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে
মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১৯,০০০ হাজার ছাড়িয়েছে। আর আহত হয়েছেন প্রায় ৪০,০০০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
তুরস্ক ও সিরিয়ার ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধার হওয়া হাজার হাজার মানুষ বৃহস্পতিবারও শীত, ক্ষুধা ও হতাশার মধ্যে দিন পার করেছে। সময় যতো পেরুচ্ছে ততই ধ্বংসস্তুপ থেকে জীবিত উদ্ধারের আশা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তুরস্কে ১৬ হাজার ১০০ জনের এবং সিরিয়ায় তিন হাজার ১৬২ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। অর্থাৎ সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ১৯ হাজার ২৬২ জন মারা গেছে।
শীতের মাঝামাঝি সময়ে ভূমিকম্পে দুই দেশের লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছে। অনেকে সুপারমার্কেটের গাড়ি পার্কিং, মসজিদ, রাস্তার পাশে বা ধ্বংসাবশেষের মধ্যে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। এরা সবাই খাদ্য, পানি ও উষ্ণতার জন্য মরিয়ে হয়ে উঠেছেন।
তুর্কি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তুরস্কে প্রায় ছয় হাজার ৫০০ ভবন ধসে পড়েছে এবং যেখানে ভূমিকম্প হয়েছে সেখানে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ মানুষের বাস ছিল।
এখানে উল্লেখ্য যে,তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং সিরিয়ার উত্তরে সোমবার ভোরে আঘাত হানে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্প একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প। তারপর দিনের বেলায় পর পর প্রায় একই আকারের আরও দুইটি ভূমিকম্প আঘাত হানে। তাছাড়াও আরও কয়েক ডজন আফটারশক ভূমিকম্প সংগঠিত হয়। ফলে তুরস্ক ও সিরিয়ার বিস্তৃত অঞ্চল এক বিধ্বস্ত ভূমিতে পরিণত হয়। গত এক দশকের মধ্যে এটিকে সবচেয়ে ভয়াবহ ভূমিকম্প হিসেবে উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভূকম্পনবিদরা বলছেন, দশকের অন্যতম শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের ফলে তুরস্কের আনাতোলিয়া থেকে আরব ভূখণ্ড পর্যন্ত মাটির গভীরে ১০০ কি মি (৬২ মাইল) এর মতো দীর্ঘ ফাটল তৈরি হয়েছে। মাটির নীচে আসলে কি ঘটেছে এবং এর প্রভাটা কি তা-ও ব্যাখ্যা করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই ভূমিকম্পের উৎপত্তি কোথায় ?
সোমবার ভোরের ভূমিকম্পের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলে গাজিয়ান্তেপ প্রদেশের নুরগাদি শহর থেকে প্রায় ২৬ কিলোমিটার পূর্বে এবং ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১৮ কিলোমিটার গভীরে ইস্ট আনাতোলিয়া ফল্টে। ফল্ট বলতে মাটির নীচে পাথর ও অন্যান্য খনিজের বিশালাকৃতির (শত বা হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ) খণ্ডগুলোকে বোঝায়। অনমনীয় এই প্লেটগুলো চলমান অবস্থায় থাকে। ইস্ট আনাতোলিয়া ফল্টে ফাটলের কারণে সৃষ্ট কম্পনগুলো উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবল ছিল। এর ফলে তুরস্কের মধ্যাঞ্চল ও সিরিয়া পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি ছড়িয়ে গেছে।
ব্রিটিশ জিওলোজিক্যাল সার্ভের অনারারি রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট রজার মুসন বলেন, গত শতাব্দিতে ইস্ট আনাতোলিয়া ফল্টের তেমন কোনো গতিবিধি ছিল না। ১৯৭০ সাল থেকে এই ৫২ বছরে এই এলাকায় তিন বার রিখটার স্কেলে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছে। কিন্তু এখন থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে ১৮২২ সালে এই এলাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে অন্তত ২০ হাজার লোকের মৃত্যু হয়।
কত ভয়ঙ্কর ছিল এই ভূমিকম্প ?
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এক বছরে মোটামুটি ২০টির কম ভূমিকম্প ৭ মাত্রার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়। তবে কি পরিমাণ শক্তি এই ভূমিকম্পের ফলে বিচ্ছুরিত হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ। ইউনভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইনস্টিটিউট ফর রিস্ক অ্যান্ড ডিজাস্টার রিডাকশনের প্রধান জোয়ান্না ফাউর ওয়াকার জানান, ২০১৬ সালে ইতালিতে ৬ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ৩০০ জেনের প্রাণহানি ঘটে। সেই তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল তুরস্কের এই ভূমিকম্প। গত ১০ বছরে এত শক্তিশালী মাত্র দুটি ভূমিকম্প হয়েছে পৃথিবীতে।
কেন এত প্রবল কম্পন ?
ভূপৃষ্ঠের নীচে ইস্ট আনাতোলিয়া ফল্ট দুই অংশে ভাগ হয়ে দুটি খণ্ড আগু-পিছু অবস্থায় সরে গেছে, বলছেন ভূকিম্পনবিদরা। পাথুরে এই খণ্ডগুলো পরস্পরকে ধাক্কা দিতে দিতে একটি ওপরের দিকে ও একটি নীচের দিকে সরতে থাকে। এসময় প্রবল মাত্রার শক্তি নির্গত হয়। দুটি খণ্ডের মাঝখানে দূরত্ব তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই অবস্থা চলতেই থাকে। এ কারণেই এত শক্তিশালী ভূকম্পন অনুভূত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার নীচে দ্য সান অ্যান্ড্রিয়াস ফল্ট একই ধরনের, তবে সবচেয়ে শক্তিশালী স্ট্রাইক স্লিপ ফল্ট বলেও জানান বিজ্ঞানীরা। সেখানে যে কোনো সময় ভয়ঙ্কর ভূমিকম্প আঘাতের পূর্বাভাস দীর্ঘদিন ধরেই দিয়ে রেখেছেন তারা।
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস