আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ওয়াশিংটনে যুদ্ধকালীন প্রতিবাদী বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের রাশিয়ার বিরুদ্ধে তার দেশের লড়াইকে সমর্থন দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন।
ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথমবারের মতো বিদেশ সফরে যুক্তরাষ্ট্র পৌঁছেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। বর্তমানে তিনি হোয়াইট হাউসে অবস্থান করছেন। গতকাল বুধবার (২১ ডিসেম্বর) কোন এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেন্সকি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ফার্স্টলেডি জিল বাইডেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে হোয়াইট হাউজে অভ্যর্থনা জানান বলে জানিয়েছেন ভয়েস অফ আমেরিকা ও বিবিসি।
প্রথম সাক্ষাৎকারের সময় তারা করমর্দন করেন এবং কিছু ছবি তুলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ওভাল অফিসে দুই ঘণ্টাব্যাপী তারা বৈঠক করেন। এর আগে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি এক টুইটে জানিয়েছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসেও বক্তব্য দেবেন। তিনি আশা করছেন, এই সফরের মাধ্যমে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
এ ছাড়াও ইতিপূর্বেই হোয়াইট হাউস জানিয়েছিল, এই সফরের সময় ইউক্রেনকে নিরাপত্তা সহযোগিতা দেওয়ার জন্য একটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করবেন দুই দেশের নেতৃবৃন্দ। একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, এর মধ্যে ইউক্রেনকে অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার কথাও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি কখন এবং কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করছেন, সেটি প্রকাশ করা হচ্ছে না তার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে। সফর শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে এর কথা ঘোষণা করা হয়।
সামরিক সহায়তা কোনো ‘দাতব্য’ কাজ নয় বরং গণতান্ত্রিক বিশ্বের জন্য ‘বিনিয়োগ’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়ের স্মৃতি উল্লেখ করে জেলেনস্কি বলেন, তার দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে কোনো ধরনের আপসে যাবেন না তিনি। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম বিদেশ সফরে যুক্তরাষ্ট্রে এসে গত বুধবার মার্কিন সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের যৌথসভায় জেলেনস্কি বলেন, তিনি আশা করছেন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপাক্ষিকভাবে তার দেশকে যুদ্ধে সহায়তা অব্যাহত রাখবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ সংস্থা ভয়েস অফ আমেরিকার খবরে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেন্সকিকে হোয়াইট হাউজে স্বাগত জানিয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারী মাসে রাশিয়া দেশটিতে আক্রমণ শুরু করার পর ইউক্রেনের বাইরে জেলেন্সকির এটাই প্রথম বিদেশ সফর।
বাইডেন বলেন, “ইউক্রেনীয় জনগণ বিশ্বকে অনুপ্রাণিত করে চলেছে। শুধু আমাদের অনুপ্রাণিত করছে না, যেভাবে তাদের সাহস এবং কীভাবে তারা তাদের পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে এবং ভবিষ্যতের জন্য সংকল্প বেছে নিয়েছে, তা পুরো বিশ্বকেই অনুপ্রাণিত করবে।” তিনি বলেন, আমেরিকান জনগণ ইউক্রেনীয়দের সাথে “গর্বের সঙ্গে দাঁড়িয়েছে”।
প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, “জাতি হিসাবে ইউক্রেনের অস্তিত্বের অধিকারের উপর” রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নৃশংস হামলার ৩০০ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “ ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকানরা একসাথে ইউরোপ এবং জাপান এবং অন্যান্য জায়গায় আমাদের মিত্রদের সাথে, প্রয়োজনীয় আর্থিক, মানবিক এবং নিরাপত্তা সহায়তা নিশ্চিত করেছে।”
জেলেন্সকি ইংরেজিতে বক্তৃতা করেন। তিনি বাইডেনের কাছে দ্বিদলীয় সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “আমার হৃদয় থেকে, সমস্ত ইউক্রেনীয়দের হৃদয় থেকে” অশেষ কৃতজ্ঞতা। তিনি বলেন, “ধন্যবাদ, আমাদের সাধারণ মানুষের, আপনাদের সাধারণ মানুষের প্রতি, সকল আমেরিকানের প্রতি।”
পরে, একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জেলেন্সকি ধন্যবাদ জানান, “আমেরিকার জনগণকে, যারা ইউক্রেনের জন্য অনেক কিছু করেছেন। আমি এর জন্য কৃতজ্ঞ।”.তিনি প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি সিস্টেমসহ সাহায্যের নতুন প্যাকেজের জন্য বাইডেনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এটি “আমাদের বিমান প্রতিরক্ষাকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করবে। এটি ইউক্রেনের জন্য নিরাপদ আকাশসীমা তৈরি করার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ,” রাশিয়াকে আক্রমণ করা থেকে বিরত রেখে “আমাদের জ্বালানী সেক্টর, আমাদের মানুষ এবং আমাদের অবকাঠামোকে সুরক্ষিত করবে।”
ফেব্রুয়ারীতে আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে জেলেন্সকি ইউক্রেন ছেড়েছেন বলে জানা যায়নি, তিনি রাজধানী কিয়েভের বাইরে সফর করেছেন, যার মধ্যে মঙ্গলবার পূর্বাঞ্চলীয় শহর বাখমুতে গিয়েছেন, যেখানে তার বাহিনী প্রচন্ড লড়াইয়ে নিয়োজিত রয়েছে। তিনি ওয়াশিংটনে আসার পথে পোল্যান্ডে যাত্রাবিরতি করেন।
বুধবার দিনে আরও পরের দিকে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে, যখন বাইডেনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, ইউক্রেন যেমনটি চেয়েছিল সেই সমস্ত অস্ত্রের সক্ষমতা কেন দেওয়া হয়নি বাইডেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে আত্মরক্ষা করতে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে সফল হওয়ার জন্য যা প্রয়োজন, ঠিক তাই দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ” এ রকম ধারণা যে আমরা ইউক্রেনকে ইতোমধ্যে যা দিচ্ছি তা থেকে মূলত ভিন্ন কোন উপাদান দেয়া হয় তা হলে নেটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভাঙার এবং বাকি বিশ্বকে ভেঙে ফেলার আশংকা থেকে যায় ।”.বাইডেন বলেন, তিনি ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার জন্য ইউরোপীয় মিত্রদের সাথে “কয়েকশ ঘন্টা” কাটিয়েছেন।
তিনি বলেন, “তারা এটা পুরোপুরি বোঝে, কিন্তু তারা রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে যেতে চাইছে না। তারা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ চাইছে না।” ক্রেমলিনের মুখপাত্র দ্যমিত্রি পেসকভ বুধবার সাংবাদিকদের বলেছেন, ইউক্রেনে নতুন অস্ত্র সরবরাহ সংঘাতকে আরও গভীর করবে এবং রাশিয়া ইউক্রেনের সাথে শান্তি আলোচনার কোন সুযোগ পায়নি।
এদিকে, জেলেন্সকি যৌথ সংবাদ সম্মেলনের সময় তার কাছে “ন্যায় শান্তি” বলতে কী বোঝায় তা সংজ্ঞায়িত করতে বলেছেন। এর অর্থ ইউক্রেনের “সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার” সাথে “কোন আপোষ নয়”। তিনি রাশিয়ার সাথে কোন প্রকার আপোষ নয় বলে অত্যন্ত দৃঢ় কন্ঠে তা ব্যক্ত করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসনের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেছেন, হোয়াইট হাউজ থেকে শান্তির সম্ভাবনা সম্পর্কে একটি হতাশাবাদী বার্তাও আসছে। মস্কো গুরুতর আলোচনায় জড়িত হওয়ার কোন ইচ্ছা দেখায়নি এবং বাইডেন ইউক্রেনকে রাশিয়ার শুরু করা যুদ্ধের অবসানের জন্য আলোচনার জন্য চাপ দেবেন না। কর্মকর্তারা বলেন, বাইডেন এর পরিবর্তে “কংগ্রেস এবং আমাদের মিত্রদের সাথে যুদ্ধের ময়দানে ইউক্রেনকে সর্বোত্তম সম্ভাব্য অবস্থানে রাখতে কাজ করবেন, যাতে সঠিক সময়ে তারা আলোচনার টেবিলে সর্বোত্তম অবস্থানে থাকে।”
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস