বিশ্বকাপে অঘটন ঘটিয়ে দিল স্পেন, গোলের বন্যা দিয়ে যাত্রা শুরু

ইতিমধ্যেই অঘটনের বিশ্বকাপ খ্যাত কাতার বিশ্বকাপে স্পেন দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কোস্টারিকাকে ফেবারিটদের মতোই ৭-০ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে কাতার বিশ্বকাপ শুরু করল

স্পোর্টস ডেস্কঃ গতকাল বুধবার (২৩ নভেম্বর) কাতার বিশ্বকাপের অঘটনের মাঝে গোল বন্যায় টিকিটাকার জয়গান ২৭ ঘণ্টার মাঝে দুটি বড় অঘটন দেখেছে ফুটবল বিশ্ব। খর্ব শক্তির দলের কাছে পরাজিত ফুটবলের দুই পরাশক্তি আর্জেন্টিনা-জার্মানি। এর মাঝেই ফেবারিট হিসেবে, ফেবারিটদের মতোই প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে দিয়ে কাতার বিশ্বকাপ শুরু করেছে স্পেন।

টিকিটাকা (Tiki-taka) আসলে কি ? টিকিটাকা আসলে ফুটবলের অলংকারকে বা কারুকার্যকে বুঝায়। মাঠের বল দখলের লড়াইয়ের প্রধান মারণাস্ত্র এই “টিকিটাকা” ফুটবল কৌশল। মাঠে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্যে এর চেয়ে শৈল্পিক কোনো উপায় হয়তো নেই। মাঝমাঠের এই শিল্প একদিকে যেমন বলের দখল ধরে রাখে, অন্যদিকে প্রতিপক্ষের রক্ষনভাগকে সুকৌশলে গুঁড়িয়ে দেয়ার জন্যে যথেষ্ট।

এবার দেখা যাক টিকিটাকা আসলে কি…! ছোট ছোট পাস এবং মুভমেন্টের মাধ্যমে বল দখলে রেখে অন্য খেলোয়াড়ের কাছে নিখুঁতভাবে বল পাস দেয়ার কৌশলই মূলত টিকিটাকা। মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের ভূমিকা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি থাকে। টিকিটাকায় নিজের দক্ষতা ব্যবহারের মাধ্যমে বল বের করে নিতে হয়। তবে এক্ষেত্রে আক্রমনভাগ কিঞ্চিৎ পরিমাণ দুর্বল থেকে যায়।

বলা হয়ে থাকে, ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৬ এর দিকে ইয়োহান ক্রুইফ যখন বার্সেলোনার ম্যানেজারের দায়িত্ব নেন, তখন তিনি এই কৌশলের আংশিক প্রয়োগ করেন। তবে এর যাবতীয় উন্নয়ন ঘটেছে ভিসেন্তে দেল বস্কের অধীনে স্পেন জাতীয় দলের। টিকিটাকার আজকের এই অবস্থানে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান হচ্ছে বার্সেলোনার সাবেক ও বর্তমান বায়ার্ন মিউনিখের কোচ পেপ গার্দিওলার। অবশ্য এক্ষেত্রে যতটা অবদান গার্দিওলার রয়েছে, সেই পরিমাণ অবদান বার্সার ইনিয়েস্তা এবং অনস্বীকার্যভাবে লিওনেল মেসির রয়েছে।

আর সফলতার দিক বিবেচনায় আনলে টিকিটাকা ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি সফল স্পেন জাতীয় ফুটবল দল (ইউরো ২০০৮, বিশ্বকাপ ২০১০ এবং ইউরো ২০১২)। আর ২০০৯ সালে বার্সেলোনার হেক্সা জয়ের পেছনে মূল অবদান এই কারুকার্যমন্ডীত ফুটবল শিল্পের।

টিকিটাকার এতো এতো জয়গানের মধ্যেও কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে। গতিময় ফুটবল খেলা দলগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জার্মান ফুটবল টিম এবং ক্লাবের মধ্যে জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখ, ইংলিশ ক্লাব চেলসি সহ আরও কয়েকটি দল। এই দানবীয় গতির কাছে মাঝেমাঝে এই টিকিটাকা শিল্পকে অসহায় মনে হয়। যার প্রমান পাওয়া যায় ২০১১-১২ এর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে, যেখানে চেলসির মাঠে ১-০ গোলে ধরা খেয়ে যায় আকাশে ভাসতে থাকা বার্সেলোনা। চেলসির হয়ে একমাত্র গোলটি করেন দিদিয়ের দ্রগবা। টিকিটাকা দিয়ে বার্সার চন্দ্র জয়ের স্বপ্নকে ধরাশায়ী করে স্টামফোর্ড ব্রীজের দল চেলসি।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই টিকিটাকার ফলে এমনও হয়েছে মাঝে মাঝে খেলায় ১-০/২-০/২-১ গোলে হেরে যাওয়ার পরও বল দখল থাকে প্রায় ৮০% এবং এক ম্যাচে ১০৫০/১১০০ টি পাস সম্পূর্ণ করেছে বার্সেলোনা।

কাতার বিশ্বকাপ ফুটবলের গ্রুপ ‘ই’র দ্বিতীয় ম্যাচে বুধবার (২৩ নভেম্বর) রাতে কোস্টারিকাকে ৭-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে লুইস এনরিকের দল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্প্যানিশদের এটিই সবচেয়ে বড় জয়। এর আগে সবশেষ ২০১০ সালে পর্তুগাল কোরিয়াকে একই ব্যবধানে হারিয়েছল।স্পেনের
পক্ষে জোড়া গোল করেছেন ফেরান টরেস। বাকি ১টি করে গোল করেছেন ডানি ওলমো, মার্কো অ্যাসেনসিও, গাভি, কার্লোস সোলার ও আলভেরো মোরাতা।

১১ মিনিটে ডি বক্সের বাইরে থেকে আলতো করে তুলে দেন গাবি। দারুণ দক্ষতায় বল নিজের দখলে নেন ওলমো। একটু সামনে গিয়ে আলতো শটে কোস্টারিকার গোলরক্ষককে ফাঁকি দেন ওলমো। এর আগে নিশ্চিত গোল মিস করেছেন, এবার উল্লাসে ভাসিয়েছেন দলকে। ২০০২ বিশ্বকাপ থেকে এই প্রথম ১১ মিনিটের মধ্যে গোলের দেখা পায় স্পেন।

২১ মিনিটে ২-০ গোলে এগিয়ে স্পেন। প্রথম গোলের ১০ মিনিট পরেই আবার স্পেনের লিড। আলবার বাম দিক থেকে নেওয়া ক্রস থেকে নাভাসকে ফাঁকি দিয়ে বল জালে জড়ান অ্যাসেনসিও।

দ্বিতীয় গোলের ১০ মিনিট পর এবার টরেস গোল দেন পেনাল্টি থেকে। ডি বক্সে ২৯ মিনিটে দুয়ার্তে ফাউল করেন আলবাকে। পেনাল্টি পায় স্পেন। টরেস বাঁ দিকে নিচু শটে ফাঁকি দেন নাভাসকে। কোস্টারিকার তারকা গোলরক্ষক ডান দিকে ঝাঁপ দেন। ৩-০ গোলে এগিয়ে যায় স্পেন। রেকর্ড গড়ে প্রথমার্ধ শেষ করেছে স্পেন। কোস্টারিকার বিপক্ষে ৩-০ গোলে এগিয়ে আছে দলটি। ১৯৩৪ বিশ্বকাপের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচের প্রথমার্ধে ৩ গোল দেয় স্পেন।

৫৩ মিনিটে দ্বিতীয় গোলের দেখা পান টরেস। এর আগে প্রথমার্ধে পেনাল্টি থেকে গোল দেন এই স্ট্রাইকার। ৪-০ গোলে এগিয়ে স্পেন। গাবির কাটব্যাক খুঁজে নেয় টরেসকে। কোস্টারিকার ডিফেন্ডারদের ফাঁকি দিয়ে টরেস খুব কাছে থেকে গোলে শট নেন। খুব কাছে থাকা নাভাদের কিছু করার ছিল না। জাতীয় দলের জার্সিতে টরেসের এটি ১৫তম গোল।

এর আগের শট নাভাস রুখে দিয়েছিলেন। কিন্তু বল নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। বাঁ দিক থেকে মোরাতা বল ডি বক্সে আলতো শটে তুলে দেন। ৭৪ মিনিটে গাবির শট ডান পোস্টে লেগে জালে জড়ায়। নাভাস কিংবা কোস্টারিকার ডিফেন্ডাররা কেউই বুঝতে পারেননি।

বাঁ দিক থেকে উলিয়ামস শট নিলে সামনে এসে রুখে দেন নাভাস। কিন্তু বল নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। ডি বক্সে দৌড়ে এসে ৯০ মিনিটে নিখুঁত শটে লক্ষ্যভেদ করেন সোলার। ৬-০ গোলে এগিয়ে স্পেন।

অবশেষে গোলের দেখা পেলেন মোরাতা। যোগ করা সময়ের ২ মিনিটে ওলমোর সহায়তায় গোল করেন মোরাতা। ৭-০ গোলে এগিয়ে যায় স্পেন। শেষ পর্যন্ত কোস্টারিকা কোনো গোল শোধ করতে পারেনি।

পুরো ম্যাচে দাপট দেখিয়ে খেলেছে স্পেন। ফিফার পরিসংখ্যান অনুযায়ী শতকরা ৮১ শতাংশ বল ছিল তাদের পায়ে, ১৬টি শটের ৭টিই গোল। তবে বড় কিছু ভুলও ছিল, একবার বারে লেগে ফিরে আসে। না হয় ব্যবধান আরও বড় হতে পারতো। অন্যদিকে ১টি শটও নিতে পারেন কোস্টারিকা। গতি, নিখুঁত পাস সবকিছু স্প্যানিশদের নিয়ন্ত্রণে। ২০১০ বিশ্বকাপে মাত্র ৭ গোল দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া স্পেন এবার এক ম্যাচেই দিয়েছে ৭ গোল! এ যেন টিকিটাকার মাঝে গোল উৎসব।

গতকাল কাতার বিশ্বকাপের অন্যান্য খেলার মধ্যে ক্রোয়েশিয়া-মরোক্কোর খেলা গোল শূন্য ড্র (০-০) হয়েছে। জাপানের কাছে শক্তিশালী জার্মানি (১-২) গোলে পরাজিত হয়েছে এবং রাতের শেষ খেলায় বেলজিয়াম ১-০ গোলে কানাডাকে পরাজিত করেছে।

কবির আহমেদ/ইবিটাইমস 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »