ইউক্রেনের পক্ষে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ইউক্রেনের নাগরিক মোহাম্মদ তাইয়েফ !
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলা বিভাগের পূর্ব ইউরোপীয় সংবাদদাতা এই চমকপ্রদ খবর দিয়েছেন। বাংলাদেশী বাবা ও ইউক্রেনের মায়ের সন্তান মোহাম্মদ তাইয়েফের বয়স মাত্র ১৮ বছর। সে সবেমাত্র স্কুল শেষ করে ভর্তি হয়েছিল কিউভেক্সি টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে।
তার বাবা হাবিবুর রহমান ৩০ বছর ধরে ইউক্রেনে বসবাস করছেন। হাবিবুর রহমান ভালোবেসে বিয়ে করেছেন ইউক্রেনের এক নারীকে। তাদের ঘরে দুই ছেলে সন্তান মোহাম্মদ তাইয়েফ ও মোহাম্মদ কারিম। রুশ বাহিনী ইউক্রেন আক্রমণ করেছে শোনার পরপরই অন্যান্য ইউক্রেনীয়দের সাথে তাইয়েফও সিদ্ধান্ত নেয় সে তার জন্মভূমি ইউক্রেনের পক্ষে রাশিয়ার বিরুদ্ধে এই অসম যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে। সে তার বাবা-মাকে জানায় “আমি যুদ্ধে যাবো, আমি আমার দেশকে রাশিয়ার হাত থেকে রক্ষা করবো।”
বাংলাদেশের গাজীপুর জেলার কাপাশিয়া থেকে আগত প্রবাসী হাবিবুর রহমান অবাক হলেন ছেলের কথা শুনে। কিন্তু ভাবেননি সত্যি সত্যি সে যুদ্ধে চলে যাবে। হাবিবুর রহমান অনেক বছর যাবৎ কাপড়ের ব্যবসা করেন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ শহরে।
রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণের পর একদিন সকাল বেলা উঠে দেখেন ছেলে বাড়িতে নেই,যুদ্ধে চলে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই বাবা হাবিবুর রহমান মন খারাপ করলেন। তার ইউক্রেনী মায়ের চোখেও পানি। ছোট ভাই কারিম রীতিমতো কাঁদছে।
ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলা বিভাগের সাথে এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানালেন হাবিবুর রহমান নিজেই। বললেন, “আমি চিন্তিত,মন খারাপ হয়ে আছে। আবার পরক্ষণেই আমি ভাবি, তাইয়েফ তো দেশের জন্যই যুদ্ধ করতে গেছে।” জন্মসূত্রে তাইয়েফ ইউক্রেনের নাগরিক। ৪০ মিলিয়ন মানুষের দেশ এই ইউক্রেনে প্রায় দুই মিলিয়ন মুসলমান রয়েছেন বলে ভয়েস অফ আমেরিকাকে জানিয়েছেন হাবিবুর রহমান।
হাবিবুর রহমান ভোয়াকে (VOA) আরও বললেন, “তার ছেলে তাইয়েফ এখন কিয়েভ শহর থেকে ১৫০ মাইল দূরে রয়েছে। সে রীতিমতো একজন সৈনিক। গায়ে সেনাপোশাক। কাঁধে ৯ এমএম রাইফেল। হাতে মোবাইল ফোন।”
গত বুধবার সর্বশেষ তার সঙ্গে কথা হয় ছেলে তাইয়েফের । বলেছে, “রণাঙ্গনে আছি,ভয় পেয়ো না। আমি দেশের জন্য শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়বো।” হাবিবুরের কথা- যুদ্ধের তীব্রতা যতো বাড়ছে ততোই কেন জানি মনে হয়, ছেলের সাথে দেখা হবে তো! তিনি বলেন, এই মুহূর্তে ইউক্রেন ছাড়ার কোনো কথা ভাবছেন না। যদিও খাওয়া-দাওয়ার সংকট রয়েছে। বুধবার তিন কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে কিছু আলু আর রুটি সংগ্রহ করেছেন।
এদিকে লন্ডন থেকে সম্প্রচারিত জনপ্রিয় ION টিভিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে একজন প্রবাসী জানিয়েছেন, প্রায় ৫০০ শত বাংলাদেশী এখনও ইউক্রেনে রয়েছেন। তিনি আরও জানান, যে,প্রবাসীরা এই যুদ্ধে একটা বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে আছেন। কেননা ইউক্রেনের ১৬ বছরের উপরের বয়সের প্রায় সকলেই রাশিয়ার সাথে অসম যুদ্ধ জেনেও নিজের মাতৃভূমি রক্ষার জন্য
এই লড়াইয়ে নিজের জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানিয়েছে।
ইউক্রেনের জনগণের এই সর্বাত্মক ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের ফলে রাশিয়ান সেনাবাহিনীরও বেশ ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। রাশিয়া সরকারিভাবে গত এক সপ্তাহে তার পাঁচ শতাধিক সৈন্য নিহত ও প্রায় দেড় হাজার আহতের কথা জানিয়েছে। তবে ইউক্রেন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে তারা এই পর্যন্ত প্রায় ৫,০০০ হাজারের উপরে রুশ সেনাকে হত্যা করেছে।
এদিকে প্যারিস ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি গত সপ্তাহে ছবি সহ সংবাদ প্রকাশ করেছে যে, রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেন যুদ্ধে অগ্রগামী দলে রয়েছে চেচনিয়ার মুসলিম সেনাবাহিনীর একাধিক ইউনিট।
চেচনিয়া, আনুষ্ঠানিকভাবে চেচেন প্রজাতন্ত্র। কাস্পিয়ান সাগরের কাছাকাছি, পূর্ব ইউরোপের উত্তর ককেশাসে অবস্থিত রাশিয়ার অধীনস্থ ও নিয়ন্ত্রণাধীন একটি প্রজাতন্ত্র। দেশটির প্রায় শতভাগ মুসলিম।
চেচনিয়া প্রায় ২০ বছর যাবৎ রাশিয়ার বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করেও স্বাধীনতা লাভ করতে পারেনি। পরবর্তীতে অনেকটা স্বায়ত্বশাসনের মতোই স্ট্যাটাস নিয়ে রাশিয়ার ক্রেমলিন সরকারের সাথে একাধিক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে রাশিয়ার অধীনেই থাকতে বাধ্য হন। তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণে অনেক মুসলমান হতভম্ব কেননা রাশিয়ার এই ইউক্রেন আক্রমণের অগ্রবর্তী দলে আছে চেচনিয়ান সেনাবাহিনীর মুসলিম সদস্যরা।
তথ্যসূত্র: এএফপি ও ভয়েস অফ আমেরিকা
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস