ঝিনাইদহ প্রতিনিধিঃ পুকুরের পানির নিচে ঝুলে থাকা ঝিনুকগুলো নীরব। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়,এদের ভেতরে কিছুই নেই। কিন্তু সময় আর ধৈর্যের পরীক্ষায় এই নীরবতার মধ্যেই জন্ম নেয় ঝকঝকে মুক্তা। ঠিক তেমনি নীরব পরিশ্রম আর দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্য দিয়েই নিজের জীবনের মুক্তাটিকে গড়ে তুলেছেন ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার পাশলিয়া গ্রামের নজরুল ইসলাম।
উচ্চ বেতনের চাকরি,বিদেশের নিরাপদ জীবন আর প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার-সবকিছু হাতের নাগালে থাকলেও সেই পথে হাঁটেননি তিনি। বরং ঝুঁকিপূর্ণ হলেও
নিজের স্বপ্নের পথে পা বাড়িয়েছেন। আজ ঝিনুক চাষ ও ঝিনুকজাত পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে নজরুল ইসলাম হয়ে উঠেছেন ব্যতিক্রমী এক কৃষি উদ্যোক্তা, যার সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে শিক্ষিত যুবসমাজকে।
দেশের একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের লক্ষ্যে নজরুল ইসলাম পাড়ি জমান জাপানে। সেখানে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ গ্রহণের পাশাপাশি যুক্ত হন উচ্চ বেতনের চাকরিতে। কর্মজীবনে সাফল্য এলেও মনের ভেতরে ক্রমেই দানা বাঁধছিল ভিন্ন এক ভাবনা-চাকরির নিরাপত্তার চেয়ে নিজের কিছু করার তাগিদ। নজরুল বুঝেছিলেন, ব্যক্তিগত সাফল্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা সমাজ ও পরিবেশের জন্যও ইতিবাচক কিছু বয়ে আনে। সেই উপলব্ধিই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনে। ফিরে আসেন গ্রামের মাটিতে, যেখানে শেকড়, মানুষ আর সম্ভাবনা-সবকিছুই
অপেক্ষা করছিল নতুন উদ্যোগের।
২০২১ সালে তিনি গড়ে তোলেন ‘রাইয়ান জৈব কৃষি প্রকল্প’। শুরুটা ছিল পরীক্ষামূলক। প্রচলিত মাছ চাষের বাইরে গিয়ে তিনি বেছে নেন ঝিনুক চাষকে, যেখাত বাংলাদেশে এখনও অনেকটাই অচেনা। লক্ষ্য ছিল শুধু মুক্তা উৎপাদন নয়; বরং ঝিনুকের প্রতিটি অংশকে কাজে লাগিয়ে একটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করা।
খামারের পুকুরে গেলে চোখে পড়ে ভাসমান প্লট,নেট আর রশির সুবিন্যস্ত কাঠামো। পানির নিচে সেই কাঠামোর সঙ্গে ঝুলে আছে শত শত ঝিনুক। নদী-নালা থেকে সংগ্রহ করা দেশীয় প্রজাতির ঝিনুক প্রথমে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অপারেশন করা হয়। এরপর সেগুলোকে বিশেষ ব্যবস্থায় পুকুরে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ঝিনুকের ভেতরে ইমেজ প্রযুক্তি ব্যবহার করে মুক্তা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর শুরু হয় ধৈর্যের পরীক্ষা। সাত থেকে আট মাস ধরে নিয়মিত পরিচর্যা, পানির মান পর্যবেক্ষণ আর সঠিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হয়। এই দীর্ঘ সময় শেষে ঝিনুকের গর্ভে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় মুক্তা। কখনো সাধারণ গোল
আকৃতির, আবার কখনো হৃদয়,ফুল কিংবা ভিন্ন নকশার মুক্তা-যা বাজারে বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। মুক্তা আহরণের পরও ঝিনুকের জীবনচক্র শেষ হয় না। ফেলে দেওয়া ঝিনুকের খোলস নজরুল ইসলামের কাছে আর বর্জ্য নয়, বরং সম্পদ। সেই খোলস দিয়েই তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব অর্গানিক চামচ, গহনা ও অলংকার। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে এসব পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে,বিশেষ করে পরিবেশ সচেতন ক্রেতাদের মধ্যে।

বর্তমানে এক বিঘা জমির পুকুরে নজরুল ইসলাম প্রায় ৫ হাজার ঝিনুক চাষ করছেন। প্রতিটি ঝিনুক থেকে গড়ে দুটি করে মুক্তা পাওয়া যাচ্ছে। সে হিসেবে মোট উৎপাদন দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১০ হাজার মুক্তা। একেকটি মুক্তা বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে। আর এসব মুক্তা দিয়ে তৈরি গহনার দাম ১ হাজার
২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। ঝিনুকের খোলস দিয়ে তৈরি চামচ প্রতিপিস বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকায়। নজরুল ইসমাম জানান,ঝিনুক চাষের বড় সুবিধা হলো-এদের জন্য বাড়তি কোনো খাবারের প্রয়োজন হয় না। পানির স্বাভাবিক পুষ্টিতেই ঝিনুক বেড়ে ওঠে। ফলে উৎপাদন খরচ কম,ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম,অথচ লাভের সম্ভাবনা বেশি। এই কারণেই বিশেষজ্ঞরা ঝিনুক চাষকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় কৃষি উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
নজরুল ইসলাম বলেন,‘আমি চেয়েছি এমন কিছু করতে,যা শুধু আমাকে নয়-আমার আশপাশের মানুষকেও উপকৃত করবে। ঝিনুক চাষে পরিবেশের ক্ষতি নেই, লাভ আছে-আর কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করা যায়।’
চার বছরের নিরলস পরিশ্রমে আজ তিনি একজন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁর খামার দেখতে আসছেন বিভিন্ন জেলার মানুষ, আগ্রহী তরুণরা নিচ্ছেন পরামর্শ। নজরুল মনে করেন,সঠিক প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা পেলে ঝিনুক চাষ গ্রামীণ যুবকদের জন্য একটি কার্যকর কর্মসংস্থানের পথ হতে পারে।
তবে এই সম্ভাবনাকে আরও বড় আকারে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। সহজ শর্তে ঋণ,প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং বিপণন সহায়তা পেলে ঝিনুক চাষ ও ঝিনুকজাত পণ্য উৎপাদন একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পখাতে রূপ নিতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
পাশলিয়া গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন,‘নজরুল ইসলাম আমাদের গ্রামে মুক্তা চাষ করেন। অনেক স্থান থেকে এ মুক্তা চাষ মানুষ দেখতে আসে। আমাদের এটা ভালো লাগে।’
মনির হোসেন নামে আরেকজন বলেন,‘তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছেন। এটি নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ।’
চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা বসির আহমেদ বলেন,‘খোঁজ পেয়ে ঝিনুক চাষ দেখতে এসেছি। প্রশিক্ষণ নিয়ে এই চাষ শুরু করবো।’
ঝিনাইদহের গ্রামবাংলায় গড়ে ওঠা নজরুল ইসলামের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে-চাকরির গণ্ডির বাইরে গিয়েও সঠিক পরিকল্পনা,বিজ্ঞানভিত্তিক চাষ আর অদম্য সাহস থাকলে তৈরি করা যায় টেকসই সফলতার নতুন গল্প। ঝিনুকের ভেতর জন্ম নেওয়া মুক্তার মতোই,নীরব পরিশ্রমে গড়ে ওঠা এই সাফল্য আজ
আলোকিত করছে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।
শেখ ইমন/ইবিটাইমস/এম আর




















