ইতালির আটকাদেশ থেকে মুক্ত হল অভিবাসী উদ্ধারের জাহাজ অরোরা

আদেশ অমান্য করার অভিযোগে আটক হওয়া ভূমধ্যসাগরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উদ্ধারকারী জাহাজ অরোরা-কে মুক্তি দিয়েছে ইতালি

ইউরোপ ডেস্কঃ মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) জার্মানির বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা সি-ওয়াচ জানিয়েছে,ইতালির ভূমধ্যসাগরের দ্বীপ লাম্পেদুসা বন্দর ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছে অরোরা৷ ফলে, সংকটাপন্ন মানুষদের প্রাণ বাঁচাতে আবারো ভূমধ্যসাগরে ভাসবে অরোরা ৷ উল্লেখ্য যে,গত ১৪ জুলাই থেকে এই জাহাজটি ইতা‌লির লাম্পেদুসায় আটক ছিল ৷

সি-ওয়াচ তাদের ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মে লিখেছে, ইতা‌লির সিসিলির অ্যাগ্রিজেন্তোর একটি আদালত সোমবার এই প্রশাসনিক আটকাদেশটি বাতিল করেছে ৷
এতে আরা বলা হয়েছে, আদালত তার দেয়া রায়ে জানিয়েছে, উদ্ধার-জাহাজ অরোরা-র নাবিক আন্তর্জাতিক আইন মেনেই কাজ করেছেন ৷

কেন এই আটকাদেশ? মধ্য ভূমধ্যসাগরে বিপদগ্রস্ত ৭০ জন অভিবাসীকে উদ্ধারের পর ইতা‌লির সবচেয়ে ছোটো দ্বীপ লাম্পেদুসার বন্দরে নোঙ্গর করে অরোরা৷ কিন্তু জাহাজটিকে সিসিলির পোৎসালো বন্দরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল ইতালি কর্তৃপক্ষ ৷ সেই আদেশ অমান্য করার অভিযোগেই অরোরাকে আটক করা হয়েছিল ৷

যদিও এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে সি-ওয়াচ৷ সংস্থাটি বলেছে, প্রতিকূল আবহাওয়ায় দীর্ঘ পথ পেরিয়ে পোৎসালো বন্দরে অভিবাসীদের নিয়ে যাওয়া অসম্ভব ছিল ৷ তাই অরোরা-এর নাবিকেরা বিষয়টি ইতালীয় কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে লাম্পেদুসায় নোঙ্গরের অনুমতি নিয়েছিল ৷

অভিবাসীদের জীবন বাঁচাতে কাজ করা অরোরা-এর প্রতি এই আটকাদেশকে ইতা‌লির ডানপন্থি সরকারের একটি রাজনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছে সি-ওয়াচ ৷

অনিয়মিত অভিবাসন ইস্যুতে কঠোর ইতালি: অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে অভিবাসনপ্রত্যাশী, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা থেকে নৌকায় আসা আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির অতি-ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি৷ লিবিয়ার সঙ্গে চুক্তি ও আর্থিক সহযোগিতা, ভূমধ্যসাগরে টহল বাড়ানোসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটি ৷

ভূমধ্যসাগরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উদ্ধারে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর উদ্ধারকারী দল বরাবরই ইতালি সরকারে বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করে আসছেন৷ তারা বলছেন, মেলোনির সরকার তাদের কাজকে পদ্ধতিগতভাবে বাধা দেয়ার চেষ্টা করছে ৷

ভূমধ্যসাগরে একটি উদ্ধার অভিযান শেষে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ইতালির কোথায় পৌঁছে দেয়া হবে তার অনুমতি নিতে হয় উদ্ধারকারী জাহাজগুলোকে৷ এক্ষেত্রে সবসময় দূরের বন্দর বরাদ্দ দিয়ে থাকে ইতালি ৷ এতে দুর্বল ও অসুস্থ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জীবনের ঝুঁকি তৈরি হয় বলে মনে করে বেসরকারি সংস্থাগুলো৷ এছাড়াও দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে গিয়ে উদ্ধারকারী জাহাজগুলোকে অতিরিক্ত জ্বালানি ও খাবারের জন্য গুণতে হয় বাড়তি অর্থ ৷

এদিকে ভূমধ্যসাগরে দুর্দশাগ্রস্ত নৌকাগুলো থেকে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উদ্ধারকারী এনজিওগুলোকে আর আর্থিক সহায়তা না দেয়ার কথাও জানিয়েছে রক্ষণশীলদের নেতৃত্বাধীন জার্মানির জোট সরকার৷ আরো অনেক উৎস্য থেকেও তাদের অনুদান কমে আসছে ৷

লিবিয়া ও তিউনিশিয়ার উপকূল থেকে ইতালি বা মাল্টামুখী সমুদ্রপথটি সেন্ট্রাল ভূমধ্যসাগরীয় অভিবাসন রুট নামে পরিচিত৷ এই পথটিকে সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে মনে করা হয়৷ কারণ এই রুটে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে ৷

জাতিসংঘ ও জার্মানির কয়েকটি এনজিওর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ভূমধ্যসাগরে ঝুঁকিতে থাকা এক লাখ ৭৫ হাজারের বেশি অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা৷ তবে, এই সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন অন্তত ২০ হাজার ৮০০ জন, যাদের মধ্যে রয়েছে সাড়ে তিন হাজার শিশু ৷

চলতি বছর এই পথে শীর্ষে বাংলাদেশিরা: ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে ইতালিতেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অভিবাসনপ্রত্যাশী আসেন ৷ দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার ১৬ জন আশ্রয়প্রার্থী ইতালি পৌঁছেছেন ৷ সংখ্যাটি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কিছুটা বেশি৷ ২০২৩ সালের তুলনায় অনেক কম৷ কারণ, ওই বছর একই সময়ে অন্তত ৯৩ হাজার ৪৬৭ জন অভিবাসী এসেছিলেন দেশটিতে ৷

চলতি বছর ইতালিতে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশি নাগরিকেরা ৷ ১১ হাজার ৮৬৬ জন বাংলাদেশি চলতি বছর ইতালিতে ঢুকেছেন সমুদ্রপথে, যা মোট আগমনের ৩২ শতাংশ৷ এরপরেই আছেন ইরিত্রিয়া, মিশর, পাকিস্তান ও ইথিওপিয়ার নাগরিকেরা ৷

কবির আহমেদ/ইবিটাইমস 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »