মানবাধিকার কনভেনশনকে শক্তিশালী করতে কাউন্সিল অব ইউরোপের অনুরোধ

অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের প্রত্যাবাসন গতিশীল করতে ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশনের পুনর্ব্যাখ্যা চেয়েছে ইতালি, ডেনমার্কসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের নয়টি দেশ

ইউরোপ ডেস্কঃ মঙ্গলবার (২৭ মে) ইউরোপের অভিবাসন বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইনফোমাইগ্রান্ট তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, সম্প্রতি ৪৬টি দেশের সমন্বয়ে গঠিত কাউন্সিল অব ইউরোপের মহাসচিব অ্যালাইন বেরসেট বলেছেন, ‘‘আজকের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের কাজ হলো কনভেনশনকে দুর্বল করা নয়, বরং এটিকে শক্তিশালী করা এবং প্রাসঙ্গিক রাখা৷’’ অর্থাৎ তিনি ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশনকে ‘দুর্বল’ না করতে ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য যে,কাউন্সিল অব ইউরোপের আইনি ভিত্তি হলো ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত (ইসিএইচআর)৷ এই আদালত কনভেনশনটি কার্যকর করে, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলো আইনগতভাবে মানতে বাধ্য থাকে৷ কনভেনশনের পুনর্ব্যাখ্যা চেয়ে খোলা চিঠি ২২ মে মানবাধিকার কনভেনশনের পুনর্ব্যাখ্যা চেয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে খোলা চিঠি দিয়েছে নয়টি দেশ৷ এই খোলা চিঠিতে সই করেছেন অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ইতালি, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া এবং পোল্যান্ডের নেতারা ৷ পুরো প্রক্রিয়াটির নেতৃত্বে ছিল ইতালি ও ডেনমার্ক ৷

ইউরোপীয় মানবাধিকার কনভেনশন ইস্যুতে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের ব্যাখ্যায় সংক্ষুব্ধ হয়েছে দেশগুলো৷ চিঠিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো বলেছে, মানবাধিকার কনভেনশন ইস্যুতে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের ব্যাখ্যার কারণে সরকারগুলোকে প্রত্যাবাসন সীমিত করতে হচ্ছে ৷ শুধু তাই নয়, অপরাধের সঙ্গে জড়িত অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো থেকেও বিরত রাখছে ইইউ দেশগুলোকে ৷

এমনকি, এই ইস্যুতে ‘‘সঠিক ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করতে হবে’’ বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো ৷ চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, ‘‘অপরাধের সঙ্গে জড়িত বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে’’ আদালতের ব্যাখ্যার কারণে ‘‘ভুল ব্যক্তিরা’’ সুরক্ষা পাচ্ছে এবং অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটি অনেক বেশি সীমিত হয়ে গেছে ৷

চিঠিতে সই করা ইউরোপীয় দেশগুলোর নেতারা মনে করেন, অপরাধের সঙ্গে জড়িত বিদেশি নাগরিকদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশের নিজস্ব অধিকার থাকা প্রয়োজন ৷ আদালতে যেন সরকারের ‘হাতিয়ার’ না হয় কাউন্সিল অব ইউরোপ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ নয়৷ সংস্থাটির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইইউ সদস্য না হয়েও তুরস্ক, যুক্তরাজ্য এবং ইউক্রেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ৷ রাশিয়াও এই সংস্থার সদস্য ছিল, কিন্তু ইউক্রেনে আক্রমণের জের ধরে দেশটিকে বহিষ্কার করা হয় ৷

৯টি দেশের দেয়া এই খোলা চিঠি হতাশ করেছে কাউন্সিল অব ইউরোপকে৷ সংস্থাটির মহাসচিব বেরসেট বলেন, বিতর্ক ‘স্বাস্থ্যকর’ চর্চা হলেও হলেও, ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতকে নিজেদের ‘হাতিয়ার’ হিসাবে ব্যবহার করা সরকারগুলোর জন্য উচিত সিদ্ধান্ত নয় ৷

তিনি বলেন, ‘‘মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনীতির চক্রে আটকা পড়তে পারে না৷ যদি তারা তা করে, তাহলে আমরা সেই স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ব, যা নিশ্চিত করতে এসব তৈরি করা হয়েছিল ৷’’

বেরসেট বলেন, ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত একমাত্র আন্তর্জাতিক আদালত, যেটি ইউক্রেনে আক্রমণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে রাশিয়ার বিচার করেছে৷ কাউন্সিল অব ইউরোপের মহাসচিব বলেন, ‘‘এই অবস্থান কখনও ক্ষুণ্ণ করা উচিত নয় ৷’’

ইতালির রাজধানী রোমে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনির সঙ্গে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রিডেরেকসেন মধ্যে বৈঠকের পর পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়ে চিঠিটি প্রকাশ করা হয়৷ এই দুটি দেশই অভিবাসন ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ৷

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসন সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় বিচারকাজ শেষে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের দেয়া রায়ে সংক্ষুব্ধ হয়েছে বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ৷ এসব রায়ের কারণে অভিবাসীদের নিজে দেশে ফেরত পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে সরকারগুলো ৷

অভিবাসীদের সঙ্গে নিয়ম বর্হিভূত আচরণ ও পুশব্যাকের অভিযোগে লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া এবং পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি করছে আদালতটি ৷ অন্যদিকে, ডেনমার্ককে তাদের পারিবারিক পুনর্মিলন বিধি সংশোধন করার নির্দেশও দিয়েছে৷ অভিবাসীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণের বিষয়ে ইটালির বিরুদ্ধেও একাধিক রায় দিয়েছে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত৷ আশ্রয়প্রার্থীদের নিজ দেশে না রেখে রুয়ান্ডায় স্থানান্তরে যুক্তরাজ্যের সাবেক রক্ষণশীল সরকারের নেয়া পরিকল্পনাটির বিরুদ্ধেও রায় দিয়েছিল এই আদালত ৷

মানবাধিকার কনভেনশন কেন ? ১৯৫৩ সালে মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় এই মানবাধিকার কনভেনশনটি গৃহীত হয় ৷ এর মধ্য দিয়ে মানবাধিকার সমুন্নত রাখা, দাসপ্রথা বিলুপ্ত করা, নির্যাতন এবং অসহিষ্ণু আচরণ ঠেকানো, বাকস্বাধীনতা রক্ষা করা, সব ধরনের বৈষম্য দূর করা এবং পারিবারিক জীবনের অধিকার নিশ্চিত করা হয় ৷

ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত মানবাধিকার সংক্রান্ত ইউরোপীয় কনভেনশনের অধীনে ইউরোপীয় কাউন্সিলের ৪৬ সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ খতিয়ে দেখে ৷ ফলে অভিবাসন, অভিবাসী এবং আশ্রয়প্রার্থীদের অনেক মামলার নিষ্পত্তিও এই আদালতে হয়৷ আন্তঃসরকারি সংস্থাটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শান্তি ও গণতন্ত্রের প্রচারে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৷

কবির আহমেদইবিটাইমসএম আর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »