মাসজিদুল ফালাহ, ভিয়েনা মুসলিম সেন্টার ও এশিয়ান ইসলামিক কমিউনিটির যৌথ প্রতিনিধি দল অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় অস্ট্রিয়ায় নব নিযুক্ত বাংলাদেশী মান্যবর রাষ্ট্রদূত তৌফিক হাসান এর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন
ভিয়েনা ডেস্কঃ আমাদের ইউরো বাংলা টাইমসের ভিয়েনা সংবাদদাতা জানান, প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে নব নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে স্বাগতম শুভেচ্ছা শেষে দীর্ঘ সময় আন্তরিক পরিবেশে মত বিনিময় হয়।
আট সদস্য বিশিষ্ট প্রতিনিধি দলের পক্ষে ভিয়েনা মুসলিম সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, এশিয়ান ইসলামিক কমিউনিটির সভাপতি, ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি ইন অস্ট্রিয়ার সুপ্রিম কাউন্সিল মেম্বার, ভিয়েনাস্ত জাতিসংঘের সদর দপ্তরে কর্মরত প্রকৌশলী এম এ হাসিম অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশী কমিউনিটি প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করেন, ৮০ র দশকে বাংলাদেশিদের সংখ্যা অস্ট্রিয়াতে খুবই কম ছিল।
৯০ দশকের শেষার্ধে অনেকেই আসতে শুরু করেন। বিশেষ করে ৯০ পরবর্তী অনেক বাংলাদেশী অস্ট্রিয়ায় আসেন। ২০০৫ এর পর আবার অনেকেই ব্রিটেন চলে যান। বর্তমানে অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রবাসী নাগরিক আনুমানিক ৭,০০০ (স্ট্যাটিস্টিক অস্ট্রিয়া)।
এরমধ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রিয়ান নাগরিক আনুমানিক ৩০০০ মোট আনুমানিক ৭০০০। অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশী নাগরিক ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রিয়ান নাগরিকদের একটা পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেস তৈরী করে জন শক্তির সঠিক তালিকা প্রণয়ন করার জন্য রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ করেন হাসিম।
অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে রাষ্ট্রদূতের প্রশ্নের জবাবে হাসিম অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশী মুসলিমদের দাওয়াতী সংস্থা ও মসজিদ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন- ১৯৯২ সনে মহান আল্লাহর ইচ্ছায় কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে আমার বাসায় দ্বীন চর্চার কাজ শুরু করি, যে সময় ভিয়েনায় বাংলাদেশী মুসলিম কমিউনিটিতে কোনো মসজিদ বা ধর্ম চর্চার কোনো সংস্থা ছিল না।
পরবর্তীতে প্রায় সকল বাংলাদেশী মুসলিম ভাই বোনেরা সম্মিলিত ভাবে ১৯৯৭ সনে প্রথম মসজিদ প্রতিষ্টা করি, তারও কয়েক বৎসর পর একটা পুরনো ভবন ক্রয় করা হয়। দুৰ্ভাগ্যজনক ভাবে প্রতিষ্টানটি দেউলিয়া হয়ে যায় এবং বিক্রি করে দেয়া হয় গত কয়েক বৎসর আগে যা বাংলাদেশী মুসলিম কমিউনিটির জন্য খুবই বেদনাধায়ক।
২০০৪ সনে প্রতিষ্টা করা হয় মাসজিদুল ফালাহ। ভিয়েনার অত্যন্ত জনবহুল মিলেনিয়াম সিটি সংলগ্ন একটা কফি হাউস ক্রয় করে ২০১৩ সনে প্রতিষ্ঠা করি বাংলাদেশী সহ মুসলিম বিশ্বের বহু দেশের মুসল্লিদের প্রাণ কেন্দ্র “ভিয়েনা মুসলিম সেন্টার“ যা বাংলাদেশী কমিউনিটি কর্তৃক পরিচালিত একমাত্র ক্রয়কৃত স্থায়ী মুসলিম সেন্টার।
এশিয়ান ইসলামিক কমিউনিটি ” প্রসঙ্গে হাসিম জানান অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান সহ দক্ষিণ এশিয়ান দেশগুলোর মসজিদ সমূহের একটি সংস্থা যা ফেডারেল চ্যান্সেলারি (বুন্ডেসকানসলারআমত) কর্তৃক অনুমোদিত এবং অস্ট্রিয়ান পাবলিক আইনের অধীনে একটি স্বাধীন কর্পোরেশন ।
ইসলাম ও ‘ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি ইন অস্ট্রিয়া’ প্রসঙ্গে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশ সমূহের মধ্যে অস্ট্রিয়ায় মুসলমানদের আইনি মর্যাদা অনন্য। সমগ্র ইউরোপের মাঝে অস্ট্রিয়া একটি ইউনিক কান্ট্রি যেখানে ১৯১২ সন থেকে ইসলাম সাংবিধানিক ভাবে স্বীকৃত। অটোমান বা উসমানীয় সম্রাজ্য কর্তৃক ১৪৬৩ সাল থেকে ১৮৭৮ সাল পর্যন্ত শাসিত ও ১৯০৮ পর্যন্ত অটোমান অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে ১৯০৮ সালে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য (১৮৬৭ থেকে ১৯১৮) তাদের অধীনে সংযুক্ত করে।
অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের এই অঞ্চলে ৬ লাখ মুসলমান বাস করত, যাদের ধর্মীয় অনুশীলনকে রক্ষা করা জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। সেই সময় বসনিয়ান মুসলমানরা সম্রাটের দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করতেন, ইমামরা সামরিক চ্যাপ্লেন হিসেবে কাজ করতেন।
মুসলমানদের ধর্মীয় অনুশীলন রক্ষা সংক্রান্ত উদ্যোগটি, ১৮৭৪ সালে সম্পাদিত স্বীকৃতি আইন ১৮৭৪ (Anerkennungsgesetz 1874, RGBl. Nr. 68/1874) যা ধর্মীয় সমাজের আইনি স্বীকৃতি মোতাবেক ১৯১২ সালে অস্ট্রিয়ায় ইসলাম আইনি স্বীকৃতি পায়। ( Art. 15 Staatsgrundgesetz, RGBl. Nr. 142/1867, Art. I Islamgesetz, RGBl. Nr. 154/1912 gesetzlich anerkannt.)
১৯৭১ সালে মুসলমানদের একটি সংস্থা ‘ইসলামী আইন ১৯১২’-এর ধারা মোতাবেক একটি ইসলামিক কমিউনিটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য আবেদন করলে, ফলস্বরূপ ১৯৭৯ সালে ‘ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি ইন অস্ট্রিয়া’ পাবলিক আইনের অধীনে একটি কর্পোরেশন হিসেবে গঠিত হয়। অস্ট্রিয়ায় বসবাসকারী টার্কিশ, বসনিয়ান, অ্যারাবিয়ান, আলবেনিয়ান, আফ্রিকান ও এশিয়ানদের নেতৃত্বাধীন প্রায় চার শ’ মসজিদ ও ইসলামিক সংস্থার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা প্রধানত ১০টি বৃহৎ ইসলামিক কমিউনিটির (Kultusgemeinde) কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘ইসলামিক রিলিজিয়াস অথরিটি ইন অস্ট্রিয়া’।
সংস্থাটি পাবলিক আইনের অধীনে একটি কর্পোরেশন হিসেবে অস্ট্রিয়ায় বসবাসকারী সমস্ত মুসলমানদের ধর্মীয় বিষয়ের সরকারী প্রশাসনের প্রতিনিধিত্ব করে, অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসনও উপভোগ করে। এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং অস্ট্রিয়ার নাগরিক প্রতিষ্ঠানের ইন্টারফেস। অস্ট্রিয়ান সকল স্কুলে সংস্থাটি কর্তৃক নিয়োগকৃত ও অস্ট্রিয়ান সরকারের বেতনভুক্ত ইসলামী ধর্মীয় শিক্ষকদের মাধ্যমে ইসলামী ধর্মীয় শিক্ষার ব্যবস্তা করা, ইসলামী ধর্মীয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং তাদের চলমান প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা করাসহ মুসলমানদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বহুবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
ভিয়েনা ভিত্তিক একটি “এন জি ও” এর সভাপতি ও ভিয়েনা মুসলিম সেন্টারের সহ সভাপতি জনাব মহিউদ্দিন আহমেদ কর্তৃক বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রিয়ার ভিসা প্রাপ্তির জন্য নয়াদিল্লীর আসা যাওয়ার জটিলতা এড়িয়ে বাংলাদেশে কোন সংস্থা বা দূতাবাসের মাধ্যমে ভিসা প্রসেস করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্তা করার প্রশ্নের জবাবে মান্যবর রাষ্ট্রদূত জানান, এ বিষয়ে অস্ট্রিয়ার যথাযথ কর্তৃপক্ষের সাথে উনার ইতিমধ্যে কথা হয়েছে এবং জনদুর্ভোগ নিরসনে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব ও দিয়েছেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে উনাকে জানিয়েছেন।
দূতাবাসটি যেন অতীতের মত দলীয় কার্যালয় না হয় এই প্রসঙ্গে মাসজিদুল ফালাহর সভাপতি হাবিবুর রহমানের কথার জবাবে মান্যবর রাষ্ট্রদূত নিশ্চিত করেন, দূতাবাস দলমত নির্বিশেষে সবার জন্য নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করে যাবেন।
ভিয়েনায় বাংলাদেশী দূতাবাসের প্রায় এক যুগ হতে চলছে অথচ বাংলাদেশী কমিউনিটি কর্তৃক পরিচালিত একমাত্র ক্রয়কৃত স্থায়ী প্রপার্টি „ ভিয়েনা মুসলিম সেন্টার „টিতে আজ পর্যন্তও কোন বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত নামাজ পড়তে বা ভিজিট করতে যাননি মর্মে ” ভিয়েনা মুসলিম সেন্টার” এর সভাপতি মুরাদুল আলমের কথার প্রেক্ষিতে মান্যবর রাষ্ট্রদূত নিশ্চিত করেন রোজার পরপরই তিনি কোন এক শুক্রবারে নামাজ পড়তে যাবেন।
এক প্রশ্নের জবাবে জানানো হয়, উপস্থিত প্রতিনিধি দলে এরকম লোক ও আছেন ভিয়েনা ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ” ইউরেশিয়া হিউমান রাইটস” এর মাধ্যমে ২০১২ সন থেকে স্বদেশের বিরোধী দলীয় নেতৃবৃন্দের জেল, জুলুম,গুম, হত্যা , বি ডি আর ও হেফাজতের গণহত্যা ইত্যাদি নানাবিধ মানবাধিকার ইস্যুতে কাজ করতে গিয়ে, সেই সাথে বেশ কয়েকটা “এন জি ও” এর মাধ্যমে রোহিঙ্গা সহ বাংলাদেশে দল –মত- ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গ্রাম বাংলার হত দরিদ্র মানুষদের মাঝে মানবতার সেবায় কাজ করতে গিয়ে বিগত সরকারের রোষানলে পড়ে, ফলশ্রুতিতে সুদীর্ঘ ১৫ বৎসর যাবৎ মাতৃভূমিতে যাওয়া অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন মসজিদুল ফালাহ এন্ড ভিয়েনা মুসলিম সেন্টার এর নেতৃবৃন্দের মধ্যে মহিউদ্দিন আহমেদ, প্রকৌশলী রবিউল আলম, মুরাদুল আলম, হাবিবুর রহমান, মাসুদুর রহমান, সায়েদুর রহমান বকুল, ইমাম হাফেজ আবু মুসা প্রমুখ।
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস/এম আর