ইতালির অভিবাসন ব্যবস্থাপনা ও বিচার বিভাগ নিয়ে ইলন মাস্কের মন্তব্যে প্রতিবাদের ঝড়

সম্প্রতি জার্মানির চ্যান্সেলরকে বোকা এবং ইতালির অনিয়মিত অভিবাসনপ্রত্যাসীদের আলবেনিয়ায় পাঠানো নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছের ইলন মাস্ক পুনরায় সংবাদ শিরোনাম

ইউরোপ ডেস্কঃ বুধবার (১৩ নভেম্বর) ইতালির অভিবাসন ইস্যুতে আবারও ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মে পোস্ট করেছেন ইলন মাস্ক৷ অনিরাপদ দেশে অভিবাসীদের ডিপোর্ট করতে পারবে না ইতালি, এমন সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় তিনি লিখেছেন, ‘‘এটা গ্রহণযোগ্য নয়৷ ইতালির জনগণ কি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বসবাস করছেন না-কি অনির্বাচিত স্বৈরশাসকেরা এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন ?’’

উল্লেখ্য যে,জার্মানির জোট সরকার ভেঙে যাওয়ায় দেশটির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎসকে ‘বোকা’ বলার পর, এবার আলবেনিয়ায় ইতালির অভিবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে মন্তব্য করে নতুন বিতর্কে জড়িয়েছেন বিলিয়নিয়ার ও টেক টাইটান ইলন মাস্ক৷ তার মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়েছেন ইতালির আইনজীবী ও বিরোধী রাজনীতিবিদেরা ৷

ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধারের পর ৮ নভেম্বর আট আশ্রয়প্রার্থীকে তাদের আশ্রয় আবেদন যাচাই-বাছাইয়ে আলবেনিয়ায় নির্মাণ করা আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়েছে ইতালি ৷ এই আট জনের মধ্যে পাঁচ জন বাংলাদেশি এবং তিন জন মিশরীয়৷ ১১ নভেম্বর রোমের একটি আদালত বাংলাদেশি ও মিশরীয় আশ্রয়প্রার্থীদের আলবেনিয়ায় রেখে আশ্রয় আবেদন যাচাই-বাছাই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন৷ এ প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত দিতে ইউরোপীয় বিচার আদালতের কাছেও আবেদন জানিয়েছেন ইটালির বিচারকেরা ৷

এর আগে গত মাসে আশ্রয়প্রার্থীদের আরেকটি দলকে ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধারের পর প্রথমবারের মতো আলবেনিয়ার নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়েছিল রোম ৷ সেবারও আদালতের রায়ে আশ্রয়প্রার্থীদের ইটালিতে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হয় সরকার৷ আদালতের যুক্তি, বাংলাদেশ ও মিশর পুরোপুরি নিরাপদ দেশ নয় ৷ তাই এই দুইটি দেশ থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের আলবেনিয়ার আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ইতালিতে ফেরানোর নির্দেশ দিয়েছিল আদালত৷ ওইবার ইতালির আদালত বলেছে, ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিস বা ইউরোপীয় বিচার আদালতের একটি রায়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই এমন নির্দেশ দেয়া হয়েছে ৷

আদালতের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়েছেন ইতালির অতি ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি এবং তার অনুসারীরা৷ আদালতের সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন তিনি এবং তার মন্ত্রিসভা৷ ইতালি-আলবেনিয়া চুক্তিকে সফল করে ইউরোপজুড়ে মডেল হিসেবে দাঁড় করাতে চান জর্জা মেলোনি ৷ এর মাধ্যমে এ বছরের জুনে সরকার ঘোষিত ১৯টি নিরাপদ দেশের তালিকাকে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যেন আদালত কোনো বাধা দিতে না পারে ৷ এর অর্থ হলো, এই ১৯টি দেশ থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের আশ্রয় আবেদনগুলো দ্রুততম সময়ে আলবেনিয়ায় প্রক্রিয়াকরণ করে সেখান থেকেই ডিপোর্ট বা নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে পারবে ইতালি ৷

কিন্তু বিরোধী রাজনীতিবিদেরা আদালতের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়ে আসছেন৷এমন উত্তপ্ত বিতর্ককে আরো উসকে দিয়েছেন এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখা ব্যক্তি ইলন মাস্ক৷ নিজের মালিকানাধীন মাইক্রো ব্লগিং সাইট ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মে তিনি লিখেছেন, ‘‘এই বিচারকদের পদ ছাড়তে হবে ৷’’

মাস্কের এমন মন্তব্য সঠিক বলে মনে করেন ইতালির উপ প্রধানমন্ত্রী এবং কট্টর ডানপন্থি ও অভিবাসনবিরোধী লীগ পার্টির প্রধান মাত্তেও সালভিনি৷ ‘এক্স’ প্ল্যাটফর্মে তিনি লিখেছেন, ‘‘ইলন মাস্ক সঠিক বলেছেন৷’’ দেশটির মধ্য-বামপন্থি ডেমোক্রেটিক পার্টি ইলন মাস্কের সমালোচনা করে বলেছেন, ইতালির অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে এমন মন্তব্য ‘‘অপ্রত্যাশিত হস্তক্ষেপ ৷’’

ইলন মাস্ককে ‘নব্য অলিগার্কস’ বা ‘নব্য অভিজাত’ হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন ইতালির হাই কাউন্সিল অব জুডিশিয়ারি-এর আইনজীবী আর্নেস্তো কারবোন ৷ তিনি বলেন, ইলন মাস্ক তাদেরই একজন ‘‘যারা বিশ্ব রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান এবং গণতন্ত্রণের জন্য বিপজ্জনক ৷’’ ইতালির ন্যাশনাল ম্যাজিস্ট্রেটস অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, টেক টাইটান ইলন মাস্ক এমন মন্তব্য করে নিজের ‘‘মূর্খতা’’ প্রকাশ করেছেন৷ অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট আলেসান্দ্রা মাদালেনা বলেন, ‘‘এর মধ্য দিয়ে শুধু বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকেই নয়, বরং প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে ইতালি নামের রাষ্ট্রটির সার্বভৌমত্ব নিয়ে ৷’’

উত্তর আফ্রিকার উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে আসা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ২০২২ সালে ইতালির ক্ষমতায় আসেন জর্জা মেলোনি ৷ তারই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের সালের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী এডি রামার নেতৃত্বাধীন আলবেনিয়া সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে ইতালির ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনির সরকার ৷ ‘বিতর্কিত’ এই চুক্তির অধীনেই আলবেনিয়াতে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে ৷

চুক্তি অনুযায়ী, এই প্রকল্প আগামী পাঁচ বছরের জন্য কার্যকর থাকবে৷ ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধার করা অভিবাসীদের আলবেনিয়ায় আনার পর দেশটির শেনজিন বন্দরের কেন্দ্রটিতে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করা হবে ৷ পরে তাদের নেয়া হবে গজদারের তিনটি ভিন্ন অবকাঠামোতে৷ তিনটি অবকাঠামোর একটিতে রাখা হবে ‘ডিপোর্ট’ এর সিদ্ধান্ত পাওয়া অভিবাসীদের, দ্বিতীয়টিতে রাখা হবে আশ্রয়প্রার্থীদের এবং তৃতীয়টিতে রাখা হবে অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত বা অভিযুক্ত অভিবাসীদের ৷

যাদের আশ্রয় আবেদন মঞ্জুর করা হবে তাদের আলবেনিয়া থেকে সরাসরি ইতালি নিয়ে যাওয়া হবে৷ আর যাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হবে তাদের আলবেনিয়া থেকেই ডিপোর্ট করা হবে বা নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে ৷

কবির আহমেদ/ইবিটাইমস 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »