ভূমধ্যসাগর হয়ে আসা অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধে তিউনিশিয়ার সঙ্গে নতুন চুক্তি করেছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ বুধবার (১৭ এপ্রিল) তিউনিশিয়ার রাজধানী তিউনিশ এ ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনিকে অভ্যর্থনা জানান তিউনিশিয়ার প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইয়েদ।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানায়, উত্তর আফ্রিকার এই দেশটিকে অর্থ সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি কয়েক হাজার কাজের ভিসা দেয়ার বিষয়েও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী মেলোনী।
উত্তর আফ্রিকার যে দেশগুলো থেকে ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে আশ্রয়প্রার্থীরা ইতালিতে আসেন তার অন্যতম এই তিউনিশিয়া ৷ এই নিয়ে গত এক বছরে চতুর্থবার দেশটি সফরে গেলেন ইতালির ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনি ৷ তিউনিশিয়ার উপকূল হয়ে আসা অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণই সফরের মূল উদ্দেশ্য ৷
তবে তার কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ, টানাপড়েন রয়েছে৷ সেগুলো দূর করে মেলোনি ভূমধ্যসাগরের অভিবাসন মোকাবিলায় তিউনিশিয়ার ভূমিকার প্রশংসা করেন ৷ মানবাপাচারকারীদের বিরুদ্ধে লড়াই এবং ইউরোপে আসা আফ্রিকার দেশগুলোর অভিবাসীদের প্রত্যাবাসনে তিউনিশিয়া ও ইতালি একসঙ্গে কাজ করবে বলে জোর দেন ৷
১২ হাজার ভিসার ঘোষণা: মেলোনি ও তিউনিশিয়ার প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইদ ইতালির ‘মাত্তেই পরিকল্পনার’ অংশ হিসেবে একটি নতুন চুক্তি করেছেন৷ এই পরিকল্পনার লক্ষ্য, আফ্রিকায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে মহাদেশটির মানুষের ইউরোপমুখী অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধ করা ৷
নতুন চুক্তির মধ্যে শিক্ষা খাতের উদ্যোগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে পাঁচ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বাজেট সহায়তা প্যাকেজ রয়েছে৷ সেই সঙ্গে অভিবাসীদেরকে নিজ দেশে পুনর্বাসনে সহায়তা এবং তিউনিশিয়া থেকে ইতালিতে নিয়মিত অভিবাসনের দুয়ার খোলারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মেলোনি ৷ তিনি বলেন, ‘‘তৃতীয় সহস্রাব্দের দাসত্ব এবং উন্নত জীবন প্রত্যাশীদের বৈধ আকঙ্খাকে যারা শোষণ করছে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের একসাথে লড়াই অপরিহার্য ৷’’
অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধে আফ্রিকার দেশগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে মেলোনি বলেন, ‘‘ইতালি নতুন এই দৃষ্টিভঙ্গি অব্যাহত রাখবে এবং ইউরোপীয় পর্যায়েও তার প্রচার চালাবে ৷’’
নিয়মিত অভিবাসনকে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১২ হাজার তিউনিশিয়ানকে দেশটির ভিসা দেয়ার ঘোষণা দেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী৷
যে কারণে তিউনিশিয়াকে ইতালির এত গুরুত্ব: সাব সাহারা থেকে ইউরোপে আগত অভিবাসীদের অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত তিউনিশিয়া, যাদের প্রাথমিক গন্তব্য থাকে ইতালি৷ চলতি বছর প্রায় ১৬ হাজার অভিবাসী উত্তর আফ্রিকার তিন দেশ আলজেরিয়া, তিউনিশিয়া ও লিবিয়ার উপকূল থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির উপকূলগুলোতে পৌঁছেছেন ৷ বসন্তের বাকি সময়ে ও গ্রীষ্মে এই সংখ্যা আরো অনেক বাড়তে পারে শঙ্কা রয়েছে ৷
তবে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হিসাবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছরের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত অর্ধেক অভিবাসী এই পথে ইতালি পৌঁছেছেন৷ এর একটি কারণ তিউনিশিয়ার উপকূলে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নজরদারি বৃদ্ধি৷ চলতি বছর এখন পর্যন্ত তারা ২১ হাজার জনকে ইউরোপীয় জলসীমা অতিক্রমে বাধা দিয়েছে৷ ততিউনিশিয়া কর্তৃপক্ষের হিসাবে গতবছর সংখ্যাটি ছিল ৭০ হাজার ৷
তবে এ নিয়ে ক্ষোভ আছে তিউনিশিয়ার প্রেসিডেন্টের ৷ তার দেশ ইউরোপের ‘সীমান্তরক্ষী বাহিনী’ হবে না বলে উল্লেখ করে আসছেন তিনি৷ চলতি সপ্তাহের শুরুতে সাইদ বলেছেন, ইতালিতে যাওয়া আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ‘বন্দিকেন্দ্র’ খুলতে আলবেনিয়ার মতো রোমের সাথে কোনো চুক্তি করবে না তিউনিশ ৷
এমন অবস্থায় গত বছর তিন দফা দেশটি সফর করেছেন মেলোনি৷ এরমধ্যে দুইবার এসেছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ফন ডেয়ার লেয়েনের সাথে৷ এর অংশ হিসেবে গত জুলাইতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঋণগ্রস্ত টিউনিশিয়াকে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয় ৷ বিনিময়ে তিউনিশিয়া তার উপকূল ব্যবহার করে অভিবাসী আগমনে বাধা দেয়ার অঙ্গীকার করে৷ চুক্তির অংশ হিসেবে অনিয়মিত অভিবাসন বন্ধে ১০ কোটি ইউরোর তহবিল ছাড় করতে শুরু করে ইইউ ৷ সেই সঙ্গে পাঁচ কোটি ইউরোর বাজেট সহায়তা প্যাকেজও দেয়া হচ্ছে ৷
তবে দেশটির মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির কারণে এই চুক্তির সমালোচনা করে আসছেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আইনপ্রণেতারা ৷ ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলের পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী সাইদের কর্তৃত্ববাদী শাসন নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে ৷
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস