বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশে নিউক্লিয়ার যুগ শুরু, ইউরেনিয়াম হস্তান্তর

মো. নাসরুল্লাহ, বাংলাদেশ:  বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি ইউরেনিয়াম আসার মধ্য দিয়ে পারমাণবিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র ৷ বৃহস্পতিবার (৪ অক্টোবর) প্রকল্প এলাকায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের কাছে ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করেন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি করপোরেশনের (রোসাটম) মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। হস্তান্তর অনুষ্ঠানে ভাচুর্য়ালি যুক্ত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসিও।

জ্বালানি এলেও কেন্দ্রটি পরীক্ষামূলক উৎপাদনে যাবে আগামী বছরের সেপ্টেম্বরে৷ আর জনগণের কাছে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছাবে ২০২৫ সালের শুরুতে।  আর্থিকভাবে দেশের সবচেয়ে বড় এই প্রকল্পের অন্যতম সুবিধাভোগী হবে উত্তরাঞ্চল৷ সার্বিকভাবে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি মোট দেশজ উৎপাদন-জিডিপিতে ২% অবদান রাখবে।

রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ১২০০ মোগাওয়াটের দুটি ইউনিট রয়েছে৷ প্রথম ইউনিটের কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর৷ তিনি জানান আগামী এপ্রিলের মধ্যে প্রথম ইউনিট জ্বালানি স্থাপনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হবে ৷ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ শেষ হলে ইউরেনিয়াম ফুয়েল স্থাপন করা হবে ৷ ড. শৌকত আকবর বলেন, সব ঠিক থাকলে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।

প্রকল্প পরিচালক জানান, প্রথম ধাপে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে।  সেটি সফলতার সাথে সম্পন্ন করা গেলে পরবর্তিতে ধাপে ধাপে ৫০ ও ৭০ শতাংশ এবং শেষ ধাপে পুরোপুরি উৎপাদন শুরু হবে রূপপুর কেন্দ্রে।  তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী এই ধাপগুলো শেষ হতে সাধারণত ১০ মাস সময় লাগে।  সে হিসাবে ২০২৫ সালের শুরুতে প্রথম ইউনিটে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হবে৷

সাধারণ নিয়মে নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিটি ইউনিটের জন্য ১৬৩ টি ফুয়েল অ্যাসেম্বিলি দরকার পড়ে।  প্রতিটি অ্যাসেম্বিলিতে ৩১২টি ইউরেনিয়াম রড থাকে ৷ গেল ২৮ সেপ্টেম্বর প্রথম ব্যাচের ইউরেনিয়ামের প্রথম চালান বাংলাদেশে আসে ৷ ২৯ সেপ্টেম্বর তা রূপপুরে নিয়ে সিলগালা করা হয়।  আজ ৫ অক্টোবর আসবে ইউরেনিয়ামের দ্বিতীয় চালান।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান প্রকল্পের অগ্রগতি ও বাস্তবায়ন বিষয়ে বলেন, গত ৭ টি বছর নিরলসভাবে কাজ করা হয়েছে।  করোনা সময়েও কাজ ব্যহত হয় নি।  তিনি বলেন, স্বাধীনতার পরপরেই বঙ্গবন্ধু কাজ শুরু করতে চেয়েছিলেন।  ফরাসি ও রাশিয়ানদের সঙ্গে কথা শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।  এখন তার কণ্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে পারমানবিক বিদ্যুতে সফল হলো বাংলাদেশ।

স্থপতি ইয়াফেস ওসমান বলেন, আমরা এখন নিউক্লিয়ার ক্লাবের গর্বিত সদস্য।  মাত্র সাড়ে ৬ বছরে এর চুড়ান্ত ধাপে পৌঁছে গেছি।  বিশ্বে আর কোথাও এত কম সময়ে পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের রেকর্ড নেই।  কোথাও কোথাও পনের বছর সময় লেগেছে।  তিনি বলেন, কেন্দ্র প্রস্তুত হলেই চলবে না, সঞ্চালন লাইন লাগবে।  তিনি বলেন, আশা করছি ২০২৫ সালের প্রথম দিকে জনগণের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে পারব।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পেমেন্ট নিয়ে কোন জটিলতা আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে ইয়াফেস ওসমান বলেন, সারাবিশ্বেই এখন নানা রকম সংকট চলছে।  বাংলাদেশও কিছু মোকাবেলা করছে।  দু’পক্ষই আর্থিক বিভিন্ন বিষয নিয়ে কাজ করছে।  তাই এটি নিয়ে চিন্তিত হবার কারণ নেই।

নিরাপত্তা ঝুঁকি :

রূপপুরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. শৌকত আকবর  বলেন, বিভিন্ন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।  বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের ধাপে ধাপে আনবিক শক্তি সংস্থার গাইডলাইন মেনে অনুমোদন নিতে হয়েছে।  তিনি জানান, মোট ৮ টি স্তরে একটি থেকে পরবর্তী অন্য স্তরে যেতে আইএইএ- এর অনুমোদন নিতে হয়েছে।  অর্থাৎ পরীক্ষায় পাস করে পরবর্তী ধাপে প্রবেশ করতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

ড. শৌকত আকবর বলেন, রূপপুরে আন্তর্জাতিক অনেকগুলো সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান নিবিড় পর্যবেক্ষণ করেছে।  এখানে ঘাটতির কোনো সুযোগ নেই।  তিনি বলেন, রেডিয়েশন নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কোন কারণ নেই। রেড়িয়েশনের মাত্রা মানুষের সহন ক্ষমতার মধ্যে থাকবে।  রূপপুরকে কেন্দ্র করে আমরা ২৩টি রেডিয়েশন স্টেশন চালু করা হবে, সেখানে রেডিয়েশনের মাত্রা প্রদর্শিত হবে।  সাধারণ যে কেউ দেখতে পারবেন।  এসব স্টেশন ১৮ কি.মি. দূরে পর্যন্ত থাকবে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিচালনায় জনবল প্রসঙ্গে শৌকত আকবর বলেন, প্রশিক্ষিত জনবল প্রস্তুত হয়েছে এবং সুরক্ষা দেয়ার সক্ষমতা অর্জন হয়েছে বলেই ইউরেনিয়াম আমদানির অনুমোদন মিলেছে।  তিনি গর্বের সাথে বলেন, আজ থেকে (৫ অক্টোবর)  আন্তর্জাতিক নিউক্লিয়ার ক্লাবের সদস্য হলো বাংলাদেশ।  তিনি জানান, কমিশনিংয়ের প্রথম দিন থেকে দেশের প্রশিক্ষিত জনবল যুক্ত থাকবে।  নিজেদের পক্ষে পরিচালনা সম্ভব কিনা বা কতবছর লাগবে সেটি কয়েক বছর পরই নিশ্চিত করা যাবে।

রূপপুর পারমানবিক প্রকল্পের ব্যয় ও ঋণ পরিশোধ সম্পর্কে ড. শৌকত আকবর বলেন, দ্বিতীয় ইউনিটের বাণিজ্যিক উৎপাদনের দুই বছর পর কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে ৷ এ প্রকল্পে মোট ব্যয় হচ্ছে প্রায় এক লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা ৷ ব্যয়ের ৯০ শতাংশ  অর্থ ঋণ দিচ্ছে রাশিয়া।  চুক্তি অনুযায়ী এই অর্থ ২৮ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।

রূপপুরেই হবে আরও দুটি ইউনিট :

২০৪১ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ৪০ শতাংশ ক্লিন এনার্জি থেকে বিদ্যুৎ পাওয়ার যে পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে, সেই লক্ষ্যপূরণের অংশ হিসেবে রূপপুরে আরো দুই ইউনিটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র করার কথা রয়েছ বলে জানান প্রকল্প পরিচালক।

পারমানবিক প্রকল্পের ইতিকথা :

১৯৬১ সালে দেশে প্রথম ২০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সেই সময়ের পাকিস্তান সরকার। ১৯৬৮ সালে পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর রূপপুরে ২৬০ একর এবং আবাসিক এলাকার জন্য ৩২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন ও কিছু আবাসিক ইউনিটের নির্মাণকাজ আংশিক সম্পন্ন হয়।  পরে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বাতিল করে দেয়।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু তা বেশি দূর এগুতে পারেনি ৷ ১৯৮৬ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১২৫ মেগাওয়াটের  পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র  নির্মাণ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয়।  এই প্রকল্পটিও বাস্তবায়িত হয়নি।

১৯৮৭-১৯৮৮ সালে জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের দুটি কোম্পানি দ্বিতীয়বার ফিজিবিলিটি স্টাডি করে।  এ স্টাডিতে ৩০০-৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করা হয়।

১৯৯৭-২০০০ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার উদ্যোগে ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়া হয়।

২০০৯ সালের ১৩ মে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন এবং রাশিয়ান ফেডারেশনের স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি করপোরেশনের (রোসাটোম) মধ্যে ‘পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার’ বিষয়ক একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়।

২০১০ সালের ২১ মে বাংলাদেশ এবং রাশিয়া সরকারের মধ্যে ‘পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার’ বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়।

২০১০ সালের ১০ নভেম্বর জাতীয় সংসদে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য সিদ্ধান্ত প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

২০১১ সালের ২ নভেম্বর বাংলাদেশ এবং রাশিয়া সরকারের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত আন্তরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি (আইজিএ) স্বাক্ষরিত হয়।

২০১২ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ অ্যাটমিক এনার্জি রেগুলেটরি অ্যাক্ট-২০১২ পাস করা হয়।

২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাশিয়া সফরকালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পাদনের জন্য স্টেট এক্সপোর্ট ক্রেডিট চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

২০১৩ সালের ২ অক্টোবর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রথম পর্যায় কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনার জন্য নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল) গঠন করা হয়। সে বছরের ২৫ ডিসেম্বর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মূল পর্যায়ের কার্যাবলি সম্পাদনের জন্য আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

২০১৬ সালের ২১ জুন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাইট লাইসেন্স দেয়  পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। ওই বছরের ২৬ জুলাই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের মূল পর্যায়ের কার্যাবলি সম্পাদনের জন্য বাংলাদেশ সরকার এবং রাশান ফেডারেশন সরকারের মধ্যে স্টেট ক্রেডিট চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়।

স্পেন্ট ফুয়েল রাশিয়ায় ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও রাশান ফেডারেশনের সঙ্গে ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট এক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

২০১৭ সালের ৪ নভেম্বর বিদ্যুৎকেন্দ্রের ডিজাইন ও কন্সট্রাকশন লাইসেন্স দেয়  পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।

২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর প্রথম ইউনিটের প্রথম কংক্রিট ঢালাই প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করেন।

২০২১ সালের ১০ অক্টোবর এবং ২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লিপাত্র বা রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।

ইবিটাইমস/ঢাকা/আরএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »