সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে মডেল পিএসএসির খসড়া অনুমোদন

মো. নাসরুল্লাহ, ঢাকা: সাগরে হাইড্রোকার্বন (তেল-গ্যাস ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ) অনুসন্ধানের জন্য উৎপাদন ও বন্টন চুক্তির (মডেল পিএসসি-২০২৩) খসড়া অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়ক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।

বুধবার অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামালের সভাপতিত্বে কমিটির বৈঠকে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট-২০২৩’ শীর্ষক এ নীতিমালার অনুমোদন দেয়া হয়।

এতে দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকা গভীর সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের দুয়ার খুলে দেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

এদিকে পেট্রোবাংলার এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, মডেল পিএসসি অনুমোদনের ফলে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বহুদিন ধরে যে স্থবিরতা ছিল তার অবসান হবে। আগামী ২-৩ মাসের মধ্যেই অনুসন্ধান কাজের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহবান করার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে বিদেশী কোম্পানি অনুসন্ধানে আগ্রহ দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত চলে যায়। তবে এবার বিদেশীদের আকৃষ্ট করতে পিএসসিতে বেশ কিছু সংশোধন করা হয়েছে। ফলে বিদেশী বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা।

সভা পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সাঈদ মাহবুব খান বলেন, দেশের উত্তরোত্তর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানোর নিমিত্তে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে প্রণীত অফসোর মডেল পিএসসির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে সেখানে কী কী পরিবর্তন এসেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি মাহবুব খান।

বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশের অংশে ২৬ টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। এরমধ্যে অগভীর সমুদ্রে ১১ টি এবং গভীর সমুদ্রে ১৫ টি ব্লক রয়েছে। সাগরে তেল-গ্যাস মজুদ থাকার বিষয়টি প্রমানিত হওয়ার পরও এর অনুসন্ধান এবং উৎপাদন অলাভজনক দাবি করে বিদেশী অনেক প্রতিষ্টান কাজ শুরুর পরও মাঝপথে চলে গেছে। আবার সাগরে কী পরিমান তেল-গ্যাস মজুদ আছে তা জানতে যে মাল্টিক্লায়েন্ট সার্ভে দরকার সেটিও বাংলাদেশের না থাকায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্টানগুলোকে এখানে আকৃষ্ট করানো যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে ২০২০ সালের নভেম্বরে মডেল পিএসসি হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য ২০১৯ সালের মডেল পিএসসি অনুযায়ী অগভীর ও গভীর সমুদ্রের প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম যথাক্রমে ৫ দশমিক ৬ ডলার এবং ৭ দশমিক ২৫ ডলার। কিন্তু এই দামে কোন কোম্পানি জ্বালানি অনুসন্ধানে রাজি না হওয়ায় সরকার পিএসসি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। এবারের পিএসসিতে গ্যাসের দর নির্ধারিত থাকছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ড ক্রুডের দরের সঙ্গে উঠানামা করবে গ্যাসের দর। প্রতি হাজার ঘনফুট গ্যাসের দাম ধরা হয়েছে ব্রেন্ট ক্রুডের ১০ শতাংশ দরের সমান। অর্থাৎ ব্রেন্ট ক্রডের দাম ৮০ ডলার হলে গ্যাসের দাম হবে ৮ ডলার। ব্রেট ক্রডের দামের ক্ষেত্রে সারা মাসের গড় দর বিবেচ্য হবে।

দামের পাশাপাশি বাংলাদেশের হিস্যার অনুপাতও কমিয়ে আনা হয়েছে। মডেল পিএসসি-২০১৯ অনুযায়ী গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে বাংলাদেশের অনুপাত বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর কমতে থাকে বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ার। গভীর সমুদ্রে ৩৫ থেকে ৬০ শতাংশ এবং অগভীর সমুদ্রে বাংলাদেশের হিস্যা ৪০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠানামা করবে। তবে ঠিকাদার নির্ধারিত সময়ের দুই বছরের মধ্যে কূপ খনন করে গ্যাস না পেলে কিংবা, বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য না হলে শর্তসাপেক্ষে যথাক্রমে ১ ও ২ শতাংশ হিস্যা বাড়ানোর সুযোগ থাকছে। গ্যাস বিক্রির ক্ষেত্রে প্রথম প্রস্তাব পেট্রোবাংলাকে দিতে হবে, পেট্রোবাংলা নিতে না চাইলে তৃতীয়পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির সুযোগ পাবে বিদেশি কোম্পানি।

কোন ধরণের দুর্ঘটনা ঘটলে তার ক্ষতিপুরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে পিএসসিতে। এক্ষেত্রে পরিবেশের ক্ষতির বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে সুপারিশ অনুযায়ী চুড়ান্ত করা হয়েছে। এছাড়া জানমাল ও গ্যাসের রিজার্ভের ক্ষতি হলে পেট্রোবাংলা কমিটি করে এর পরিমাণ নির্ধারণ করবে। কোন কারণে বিবাদ তৈরি হলে সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক আদালতে বিষয়টির ফয়সালা করা সুয়োগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্ণ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে প্রথমবারের মতো।

ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সাগরে অনুসন্ধান কাজ বন্ধ রয়েছে। স্থলভাগেও অনুসন্ধান কাজ চলছে ঢিমেতালে। এর ফলে দেশে বড় ধরনের গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে। ঘাটতি মেটাতে সরকারের আমদানি নির্ভরতা বাড়ছে। যা দেশের জন্য হুমকিস্বরুপ।

তিনি বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সাগরের সম্পদ দিয়ে তাদের অর্থনীতি সূদৃড় করছে। প্রতিবেশি দেশ ভারত ও মিয়ানমার তাদের অংশে বিপুল পরিমান গ্যাস উত্তোলন করছে। কিন্তু বাংলাদেশের সাগরে তেল-গ্যাস পাওয়ার বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্বেও সেখানে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। গত ২০ বছরে কোন অনুসন্ধান পরিকল্পনা নেয়া হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে পিএসসি সংশোধন খুবই ইতিবাচক। তবে বিদেশী কোম্পানির সাথে চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ যাতে পুরোপুরি অটুট থাকে সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে।

পিএসসি প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কলেছেন, এবার মডেল পিএসসি চূড়ান্তকরণে যেসব বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো গ্যাসের মূল্য, ট্যাক্স, বণ্টন ইত্যাদি। তিনি বলেন, ‘আশা করছি এখন বিশ্বের বড় বড় কোম্পানি বাংলাদেশের সমুদ্রে তেল গ্যাস অনুসন্ধানে সহজে আকৃষ্ট হবে।’

অনুসন্ধান কাজের জন্য আগামী ২-৩ মাসের মধ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, আগে বিদেশি কোম্পানি অনুসন্ধানে আগ্রহ দেখিয়েও শেষ পর্যন্ত চলে যেত। তবে এবার তাদের আকৃষ্ট করতে পিএসসিতে বেশকিছু সংশোধন করা হয়েছে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করছি। প্রতিমন্ত্রী জানান, এরইমধ্যে এক্সন মবিলসহ বেশ কয়েকটি বড় কোম্পানি আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা অন্তত ৪০০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে ২২টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ২৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হচ্ছে। এছাড়া গড়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস আমদানি করছে সরকার। 

নাসরুল্লাহ/ঢাকা/আরএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »