জাপানের হিরোশিমায় জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন শুরু

শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম দিনে রাশিয়ার ওপর আরও অধিকতর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ব্যাপারে ঐক্যমতে জি-৭ জোটের নেতৃবৃন্দ

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ  শুক্রবার (১৯ মে) জাপানের হিরোশিমায় শুরু হয়েছে তিনদিনব্যাপী জি-৭ শীর্ষ সম্মেলন। এবারের জি-৭ সম্মেলন আয়োজন করেছে জাপান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার নিজ শহর হিরোশিমায় শুরু হয়েছে তিনদিনব্যাপী এই শিল্পোন্নত দেশ সমূহের এই শীর্ষ সম্মেলন।

জি-৭ হলো অর্থনীতিতে শীর্ষ শক্তিধর ৭ দেশের একটি জোট। জোটটির সদস্য রাষ্ট্রগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা ও ইতালি। সদস্য না হলেও সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এবার আরও ৮টি দেশকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সম্মেলনের প্রথম দিনে সম্মেলনের শুরুতেই রাশিয়ার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এখন থেকে জি-৭ দেশগুলো থেকে কোনো প্রযুক্তি, শিল্প সরঞ্জাম ও পরিষেবা রাশিয়ায় যাবে না।

তবে অর্থনৈতিক শক্তি হ্রাস পাচ্ছে জি-৭ জোটের। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় অর্ধেকেরও বেশি থাকতো এই ৭ দেশের হাতে, এখন তা নেমে এসেছে ৩০ শতাংশে। তাই মিত্র তৈরির দিকে জোটভুক্ত দেশগুলো ঝুঁকছে বলে মনে করছেন অনেকে। ধারণা করা হচ্ছে, এ কারণেই বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ব্রাজিলসহ বেশ কয়েকটি দেশকে সম্মেলনে যোগদানে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী কিশিদা।

এছাড়া, গত ১৮ মাসে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় ১৬টি দেশ সফর করেছেন কিশিদা। সফর করা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারত, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ। মূলত চীনা ও রুশ সাহায্য ছাড়াও যে বিকল্প পথ খোলা আছে তা প্রমাণের উদ্দেশ্যেই ছিল এই সফর।

একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, সম্মেলনের নিমন্ত্রিতরা এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশ। আবার চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে মিশ্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে দেশগুলোর। এবারের জি-৭ সম্মেলনের অন্যতম লক্ষ্যই হলো মস্কোর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করা। স্পষ্টতই সে লক্ষ্যে পদক্ষেপ নিয়ে চলেছেন কিশিদা। তবে এ নিয়ে তাকে পোহাতে হবে বেশ কিছু প্রতিকূলতা।

আগ্রাসনের কারণে বারবার মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও বহাল রাখতে বিভিন্ন দেশকে উৎসাহিত করে চলেছে জি-৭ জোটভুক্ত দেশগুলো। সম্মেলনে বিভিন্ন দেশকে নিমন্ত্রণের এটি অন্যতম কারণ হলেও তা কতটা ফলপ্রসূ হবে এ নিয়ে সন্দিহান অনেকেই। যেমন আমন্ত্রিত দেশ ভারত কখনোই রাশিয়ার এমন পদক্ষেপকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করে না। সুতরাং পশ্চিমাদের মতো রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপে নারাজ ভারত।

এদিকে যুদ্ধের কারণে খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তে থাকা দাম নিয়ে শঙ্কিত উন্নয়নশীল দেশগুলো। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে কৃষ্ণ সাগরের শস্যচুক্তি থেকে দেশটির সরে যাওয়া নিয়েও ভয়ে আছে দেশগুলো, কেননা এতে ইউক্রেনীয় শস্য পাওয়া বন্ধ হবে এবং এর মাধ্যমে বৈশ্বিক খাদ্য সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

তবে এ ছাড়া রয়েছে বেশ কিছু বিষয়। রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে ভিয়েতনামের। দেশটির অস্ত্রের প্রায় ৬০ শতাংশ ও সারের প্রায় ১১ শতাংশই আসে রাশিয়ার কাছ থেকে। আবার ইন্দোনেশিয়াও রাশিয়ার ওপর খুব নির্ভরশীল না হলেও ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে চলে। তবে দেশটির অস্ত্র ও আমদানির উল্লেখযোগ্য অংশ আসে মস্কো থেকে। সুতরাং রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের এই প্রয়াস বিফল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাছাড়াও তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে যে উত্তেজনা শুরু হয়েছে তা নিয়ে সংকটের আশঙ্কা করছে জোটভুক্ত দেশগুলো। এ কারণে চীনকে প্রতিহত করতে উদ্যোগ নিচ্ছে তারা। তবে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বেশ প্রভাবশালী অবস্থায় রয়েছে চীন। তাই রাশিয়ার চেয়েও যেন চীনকে চ্যালেঞ্জ করা বেশি কঠিন বিষয়। চীনা পণ্যের ওপর নির্ভর করে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ। এ নিয়ে সম্প্রতি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইউরোপকে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

বিশ্বজুড়ে অনেক দেশ চীনের ঋণে জর্জরিত অবস্থায় রয়েছে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও অনেক দেশ চীনের শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদার। তাই এই ক্ষেত্রেও জি-৭ সম্মেলনে চীন বিরোধী অবস্থান নেওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান অনেকেই।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ১৯৪৫ সালে জাপানের এই হিরোশিমা শহরে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে শহরটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। নিহত হয় প্রায় দুই লক্ষাধিক বাসিন্দা। নিহতদের স্মরণে শহরটিতে ‘হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল পার্ক’ নামে একটি স্মৃতিশৌধ নির্মাণ করা হয়েছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদন মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ৭৮ বছর পর সেই স্মৃতিশৌধেই শুক্রবার জি-৭ নেতাদের স্বাগত জানান জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা। এদিন সকালে স্মৃতিশৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান নেতারা।

এরপর শুরু হয় মূল আলোচনা পর্ব। যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জি-৭ সম্মেলনের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান। একই সঙ্গে রাশিয়াকে কিভাবে এ অভিযানের জবাব দেয়া যায় তাও রয়েছে আলোচ্যসূচীতে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিও শিগগিরই এই আলোচনায় যোগ দেবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

মস্কোর লাভজনক হীরা বাণিজ্য ও ইউক্রেন অভিযানের সঙ্গে যুক্ত আরও কিছু সংস্থার বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। মূলত ইউক্রেন অভিযান শুরুর পরপরই মস্কোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো।

এখন মূলত আগের নিষেধাজ্ঞাগুলোকে আরও কঠোর করা, ত্রুটিগুলো খুঁজে বের করা ও আরও বেশি রাশিয়ান সংস্থা এবং তাদের আন্তর্জাতিক অংশীদারদের শাস্তিমূলক বিধিনিষেধের আওতায় আনতে চাচ্ছে জি-৭। নিষেধাজ্ঞার ব্যঅপারে মার্কিন প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, রাশিয়া ও অন্যান্য দেশে থাকা আরও ৭০টি সংস্থাকে মার্কিন কালো তালিকাভুক্ত করা হবে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘নতুন নিষেধাজ্ঞার আওতায় তিন শতাধিক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, জাহাজ ও বিমান সংস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।’ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বলেছেন, ‘জি-৭ এর নিষেধাজ্ঞার ঘোষণাগুলো রাশিয়াকে হুমকির মুখে ফেলবে।’

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেল বলেন, ‘রাশিয়ার হীরা চিরদিনের জন্য নয়। আমরা রাশিয়ার হীরা বাণিজ্যের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করব।’ ইইউর সদস্য দেশ বেলজিয়াম, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে রাশিয়া হীরার বৃহত্তম পাইকারি বাজার রয়েছে।

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন বাংলা ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম

কবির আহমেদ/ইবিটাইমস/এম আর   

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »