ডলার সংকটে বন্ধের পথে পায়রা: বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হলে বাড়বে লোডশেডিং

default

মোঃ নাসরুল্লাহ, ঢাকা: ডলার সংকটে আমদানীকৃত কয়লার বকেয়া পরিশোধ করতে পারছে না পটুয়াখালীর পায়রা তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ফলে কয়লা আমদানীতে অনিশ্চয়তা তৈরী হয়েছে। মজুদ কয়লা দিয়ে এ মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত চলবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উৎপাদন। এরমধ্যে কয়লা আনা না গেলে জ্বালানির অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিপিসিএল) পাঠানো এক চিঠিতে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

উৎপাদন বিবেচনায় পায়রা ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতার বিচারেও দেশের অন্যতম সফল বিদ্যুৎকেন্দ্র এটি। গড়ে দেশের দৈনিক মোট চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ যোগান দেয় কেন্দ্রটি।

বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক মাস আগে জ্বালানি সংকটে দেশে শুরু শুরু হওয়া লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা ছিল। রমজান মাস জুড়ে লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে এই কেন্দ্রের উপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল ছিল পিডিবি। কারণ, এটি একমাত্র বিদ্যুৎকেন্দ্র যা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পর থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে পুরোমাত্রায় এমনকি সক্ষমতার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করে যাচ্ছে।তাদের মতে, পায়রার মত বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় সংকট তৈরী হবে। যার প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও।

পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পুরো সক্ষমতায় চালু রাখতে দৈনিক গড়ে ১০ হাজার টন কয়লার প্রয়োজন। যার পুরোটাই ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করে সিএমসি। কিন্তু, ডলার সঙ্কটে গত ছয় মাস কোনো বিল পরিশোধ না করায় বকেয়া পড়ে গেছে ২৯৮ মিলিয়ন (২৯ কোটি ৮০ লাখ) মার্কিন ডলার বা ৩ হাজার ১৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা (প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ১০৬ টাকা ৫০ পয়সা ধরে)। সিএমসি বলছে, অর্থ না দিলে ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লার নতুন চালান আনা সম্ভব নয়। যদিও প্রয়োজনীয় অর্থ কিস্তিতে নিতেও রাজি আছে প্রতিষ্ঠানটি।

গত ১৩ এপ্রিল বিসিপিসিএলকে চিঠি দিয়ে সিএমসি জানায়, ২৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ওভারডিউয়ের কারণে ‘পিটি বায়ান রিসোর্সেস টিবিকে’ নামের ইন্দোনেশিয়াভিত্তিক কোল-মাইনিং কোম্পানির কয়লা সরবরাহে পুনরায় ঋণপত্র (এলসি) খুলতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে চায়নার বৈদেশিক মুদ্র নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ। সিএমসির চিঠিতে বলা হয়, এপ্রিলে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ( ৫৩২৫ কোটি টাকা) পরিশোধ করা হলে মে মাসের জন্য এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলা যাবে। আবার মে মাসে ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (৭৪৫৫ কোটি টাকা) এবং পরবর্তি প্রতি মাসে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার হারে পরিশোধ করা হলে প্রয়োজনীয় কয়লা সরবরাহ অব্যহত রাখতে ঋণপত্র খোলায় কোন বাধা থাকবে না। পরবর্তিতে এ বিষয়ে ইমেইলের মাধ্যমে বিসিপিসিএল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনী ব্যবস্থা গ্রহণের তাগাদাও দিয়েছে সিএমসি।

সার্বিক বিষয় উল্লেখ করে ২৭ এপ্রিল বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি দেন বিসিপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ এম খোরশেদুল আলম। সংকট সমাধানে বিদ্যুৎ সচিবের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চিঠিতে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়। চিঠিতে বিসিপিসিএল জানায়, এরআগে ওভারডিউ পরিশোধের জন্য দফায় দফায় সোনালী ব্যাংক (বিসিপিসিএল-এর একাউন্ট ব্যাংক) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে সহযোগিতা কামনা করা সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার যোগান না পাওয়ায় ওভারডিউয়ের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ওভারডিউ দ্রুত পরিশোধ করা অত্যন্ত জরুরী উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, অন্যথায় বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে ব্যাপকভাবে লোডশেডিংয় হবে। এর প্রভাবে জাতীয় অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে। চিঠির অনুলিপি অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্ণরের কাছেও পাঠিয়েছে বিসিপিসিএল।

বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশ-চীন পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসি) পটুয়াখালীর পায়রায় ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লা-তাপভিত্তিক এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মাণ করে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির মালিকানায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেড (এনডব্লিউপিজিসিএল) ও চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) সমান অংশীদারিত্ব রয়েছে।

বিসিপিসিএলের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, কয়লা আমদানী সংক্রান্ত চুক্তি অনুযায়ি সিএমসি কয়লা ক্রয়ের ছয়মাস পরে বাংলাদেশ অর্থ পরিশোধ করতে পারবে। তিনি বলেন, ‘ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল প্রোভাইড করে সিএমসি। ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হলো- আমরা ইন্দোনেশিয়া থেকে যে কয়লা কিনি, তার ইনভয়েসের এগেইনস্টে সিএমসি এলসি করে পেমেন্ট করে। চুক্তি অনুযায়ি, আমাদের পেমেন্ট মেথড হলো ডেফার্ড পেমেন্ট (দেরিতে পরিশোধ)। চুক্তি অনুযায়ি, আমরা ছয়মাস পর সিএমসিকে বিল দেই। অর্থাৎ জানুয়ারি মাসে ইন্দোনেশিয়ার কোল-মাইনিং কোম্পানিকে সিএমসি যে পেমেন্ট দেবে, আমরা জুলাইয়ে সিএমসিকে তা পরিশোধ করবো। বাস্তবতা হচ্ছে, ছয়মাস তো পার হয়ে গেছে অনেক আগেই। আরও পাঁচ মাস চলে গেছে। এখন পর্যন্ত বকেয়া শোধ করা সম্ভব হয়নি।’ এত টাকা বকেয়া হওয়ায় চীনের বৈদেশিক মুদ্র নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ কয়লা ক্রয়ে নতুন করে এলসি খুলতে সিএমসিকে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত এই সমস্যার সমাধান করে কয়লা আমদানী অব্যহত রাখা জরুরী। কারণ, কয়লা সরবরাহ নিশ্চিত করতে না পারলে সামনের দিনগুলোতে বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো অসম্ভব হয় পড়বে। ফলে একদিকে সাধারণ মানুষ লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতে পড়বে; অন্যদিকে শিল্পোৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মো. হাবিুবর রহমান বলেন, পায়রার কয়লা আমদানী বাধাগ্রস্থ হবে না। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। জানান, কয়লার যোগান নিরবচ্ছিন্ন রাখার চেষ্টা করবে সরকার।

এদিকে ডলার সংকটে বাগেরহাটের রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রও কয়লা আমদানি জটিলতায় আছে। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ অংশীদারীত্বে নির্মিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির একটি ইউনিট গত ডিসেম্বরে উৎপাদনে আসার পর এ পর্যন্ত কয়েক দফায় বন্ধ হয়েছে। গত ১৫ এপ্রিল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যায়। চার দিন পর এটি আবার চালু হলেও কয়লার অভাবে ২৪ এপ্রিল থেকে বন্ধ রয়েছে উৎপাদন। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, কয়লা আসায় দুই-এক দিনের মধ্যেই রামপাল চালু হবে।’

ঢাকা/ইবিটাইমস/আরএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »