রমজানের শেষ দশকের ফজিলত ও তাৎপর্য

অস্ট্রিয়া সহ সমগ্র পশ্চিমা দুনিয়ায় রমজানের শেষ দশক শুরু হতে যাচ্ছে

 কবির আহমেদঃ আজ মঙ্গলবার (১১ এপ্রিল) অস্ট্রিয়ায় ২০ তম রমজান। অর্থাৎ পবিত্র রমজান মাসের প্রথম ও দ্বিতীয় দশক শেষ হয়ে গেল। হাদিস শরীফে এসেছে, ‘রমজানের প্রথম দশক হলো রহমতের, মধ্য দশক হলো মাগফিরাতের, আর শেষ দশক হলো নাজাতের।’ আজ সূর্যাস্তের সাথে সাথেই পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশক শুরু হবে।

আল্লাহর নবী রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, রমজান মাসের প্রথম ১০ দিন হলো রহমত; তার দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফিরাত; এর শেষ ১০ দিন হলো নাজাত। সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে, প্রথম ১০ দিন আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের প্রতি রহমত বা দয়া বণ্টন ও বিতরণ করতে থাকবেন। দ্বিতীয় ১০ দিন আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের ক্ষমা করতে থাকবেন। শেষ ১০ দিন আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের জাহান্নাম থেকে নাজাত বা মুক্তি দিতে থাকবেন।

এখানে অনুধাবনের বিষয় হলো; আল্লাহ যদি রহমত বা করুণা করতে চান, ক্ষমা করতে চান, মুক্তি দিতে চান; তা তো এক মুহূর্তেই করতে পারেন, তা যতসংখ্যক মানুষের জন্যই হোক না কেন এবং যে পরিমাণেই হোক না কেন; এতে ১০ দিন করে ৩০ দিন সময় লাগবে কেন?

আসলে রমজান হলো একজন মুসলমানের জন্য প্রশিক্ষণের মাস। আল্লাহ চান তাঁর বান্দা তাঁর গুণাবলি অর্জন করে সেই গুণে গুণান্বিত হোক। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও।’ আল্লাহর রং বা গুণ কি? তা হলো আল্লাহতাআলার ৯৯টি গুণবাচক নাম। পবিত্র রমজান মাসে মানুষের মধ্যে তাকওয়া বৃদ্ধি পায় বলে আল্লাহর এই মহত গুণ সমূহ মানুষের মাঝে বিকশিত হতে দেখা যায়।

পবিএ রমজান মাসের রোজা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার।” [সূরা আল বাকারা,আয়াত: ১৮৩]

আসলে পবিত্র রমজান মাসের রোজার এই এক মাসের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে অদৃশ্য মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালার ওপর বিশ্বাস বা
তাওয়াক্কুল সুদৃঢ় হয়। মহান আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও নির্ভরশীলতা বৃদ্ধির অর্থ হলো একজন আদর্শ মুসলমান হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা।

রমজান মাসের শেষ ১০ দিন নাজাত বা মুক্তির, সুতরাং এই সময়ে আমাদের করণীয় হলো দুনিয়ার সবকিছুর আকর্ষণ ও মোহ থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর প্রেমে বিভোর হওয়া। গাড়ি, বাড়ি, নারী এবং সম্পদ, সন্তান, সম্মান এগুলোর মোহমায়া থেকে আপন মন ও মানসকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা এবং সেসবের আকর্ষণ থেকে পরিপূর্ণরূপে মোহমুক্ত থাকা।

সর্বোপরি আল্লাহ পাকের স্বয়ম্ভরতা, স্বনির্ভরতা, মুক্ততা ও নিরপেক্ষতাসংক্রান্ত নামসমূহ হৃদয়ঙ্গম করে এর প্রভাব লাভ করে এবং বৈশিষ্ট্য অর্জন ও অধিকার করে আত্মস্থ করার চেষ্টা করা এবং আজীবন তার ধারক-বাহক হয়ে তা দান করা বা বিতরণ করা, তথা আল্লাহর গুণাবলি নিজের মাধ্যমে তাঁর সৃষ্টিরাজির কাছে পৌঁছে দেওয়া।

রমাদান বা রমজান মাস মহান আল্লাহতায়ালার নিকট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাস। কেননা এই মাসের এক রাতে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালা তাঁর মনোনীত শেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ সা: এর ওপর পবিত্র আসমানী কিতাব আল কোরআন অবতরণের সূচনা করেছিলেন। এই রমজান মাস সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘রমজান মাস, যে মাসে নাজিল করা হয়েছে আল–কোরআন, মানুষের জন্য হিদায়াত রূপে এবং পথনির্দেশনার প্রমাণ ও সত্য-মিথ্যা পার্থক্য নির্ণয়কারী হিসেবে (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২৮৫)।’

আল্লাহর নবী ও রাসূল মুহাম্মাদ সা: এর হাদিস থেকে জানা যায় পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশকের কোন এক রাতে কোরআনের আয়াত অবতরণের সূচনা হয়েছিল। তাই রমজান মাসের শেষ দশকের বিশেষ কিছু ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আল্লাহতায়ালা এই রাত বর্ণনা দিতে গিয়ে একটি স্বতন্ত্র সূরা আল-কদর নাযিল করেন।

সূরা আল-কদর:

■ “নিঃসন্দেহ আমি এটি অবতারণ করেছি মহিমান্বিত রজনীতে।”

■ “শবে-কদর (মহিমান্বিত রাত) সমন্ধে আপনি কি জানেন?”

■ “শবে-কদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।”

■ “এতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে।”

■ “এটা নিরাপত্তা, যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।”

এই রাত সম্পর্কে মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র আল কোরআনে সূরা আদ দোখানের প্রথম চার আয়াতে বলেন,

■ “হা-মীম।”
■ “শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের।”
■ “আমি একে নাযিল করেছি। এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী।”
■ “এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।”

রাসূল মুহাম্মাদ (সাঃ) রমজানের শেষ দশকের রাতে ইবাদত- বন্দেগিতে বেশি সময় ও শ্রম দিতেন, যা অন্য কোন রাতে দেখা যেত না। যেমন মুসলিম শরীফে আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত হাদিসে এসেছে যে, তিনি রমজানের শেষ দশকের রাতে কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, সালাত ও দোয়ার মাধ্যমে জাগ্রত থাকতেন এরপর সাহরী গ্রহণ করতেন।

রমজানের শেষ দশদিন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মসজিদে এতেকাফ করতেন। প্রয়োজন ব্যতীত তিনি মসজিদ থেকে বের হতেন না। লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ রাতকে সকল রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছেন।

বরকতময় রজনি হল লাইলাতুল কদর। আল্লাহ তাআলা একে বরকতময় বলে অভিহিত করেছেন। কারণ এ রাতে রয়েছে যেমন বরকত তেমনি কল্যাণ ও তাৎপর্য। বরকতের প্রধান কারণ হল এ রাতে আল-কোরআন নাজিল হয়েছে। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-সিদ্ধান্ত লওহে মাহফুজ থেকে ফেরেশতাদের হাতে অর্পণ করা হয় বাস্তবায়নের জন্য। এ রাতের অপর একটি বৈশিষ্ট্য হল আল্লাহ তাআলা এ রাত সম্পর্কে একটি পূর্ণ সূরা আল-কদর অবতীর্ণ করেছেন। যা কিয়ামত পর্যন্ত পঠিত হতে থাকবে।

লাইলাতুল কদর কখন ?

আল-কোরআনে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি লাইলাতুল কদর কোন রাত। তবে কুরআনের ভাষ্য হল লাইলাতুল কদর রমজান মাসে। কিয়ামত পর্যন্ত রমজান মাসে লাইলাতুল কদর অব্যাহত থাকবে। এ রজনি বা রাত রমজানের শেষ দশকে হবে বলে সহিহ হাদিসে এসেছে এবং তা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে হাদিসে এসেছে: “তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ কর।”[বোখারি শরীফ ]

রমজানের শেষ সাত দিনে লাইলাতুল কদর থাকার সম্ভাবনা অধিকতর। যেমন হাদিসে এসেছে: ‘যে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করতে চায় সে যেন শেষ সাত দিনে অন্বেষণ করে।’ [বোখারি ও মুসলিম]

অধিকতর সম্ভাবনার দিক দিয়ে প্রথম হল রমজান মাসের সাতাশ তারিখ। দ্বিতীয় হল পঁচিশ তারিখ। তৃতীয় হল ঊন ত্রিশ তারিখ। চতুর্থ হল একুশ তারিখ। পঞ্চম হল তেইশ তারিখ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এ রাতকে গোপন রেখেছেন আমাদের উপর রহম করে। তিনি দেখতে চান এর বরকত ও ফজিলত লাভের জন্য কে কত প্রচেষ্টা চালাতে পারে। লাইলাতুল কদরে আমাদের করণীয় হল বেশি করে দোয়া করা। আয়েশা (রাঃ) নবী করিম (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করলেন, লাইলাতুল কদরে আমি কি দোয়া করতে পারি? তিনি বললেন: ‘হে আল্লাহ ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে ভালোবাসেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করুন।’ [ তিরমিজি ]

এতেকাফ: এতেকাফ হল সকল কাজ থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর ইবাদতের জন্য মসজিদে অবস্থান করা। এটা হল সুন্নত। আয়েশা (রাঃ) বলেন: ‘রাসুলুল্লাহ (সাঃ) রমজান মাসের শেষ দশকে মসজিদে এতেকাফ করতেন। যতদিন না আল্লাহ তাকে মৃত্যু দান করেছেন ততদিন তিনি এ আমল অব্যাহত রেখেছেন। তার ইন্তেকালের পর তার স্ত্রী-গণ এতেকাফ করেছেন।’ [বোখারি ও মুসলিম]

এতেকাফের উদ্দেশ্য: মানুষের ঝামেলা থেকে দূরে থেকে আল্লাহ তাআলার ইবাদতে একাগ্রচিত্তে নিয়োজিত হওয়া। এ লক্ষ্যে কোন মসজিদে অবস্থান করে আল্লাহর তরফ থেকে সওয়াব ও লাইলাতুল কদর লাভ করার আশা করা।এতেকাফকারীর কর্তব্য হল অনর্থক কথা ও কাজ পরিহার করে সালাত, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, ইস্তিগফার, দোয়া ইত্যাদি ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকা। তবে পরিবার পরিজন বা অন্য কারো সাথে অতিপ্রয়োজনীয় কথা বলতে দোষ নেই। এতেকাফকারী নিজ অন্তরকে সর্বদা আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত রাখতে চেষ্টা করবে। নিজের অবস্থার দিকে খেয়াল করবে। আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনের ব্যাপারে নিজের অলসতা ও অবহেলা করার কথা মনে করবে। নিজের পাপাচার সত্ত্বেও আল্লাহ যে কত নেয়ামত দিয়েছেন তা স্মরণ করে তার প্রতি কৃতজ্ঞ হবে। গভীরভাবে আল্লাহর কালাম অধ্যয়ন করবে। খাওয়া-দাওয়া, নিদ্রা ও গল্প গুজব কমিয়ে দেবে। কেননা এ সকল কাজ-কর্ম আল্লাহর স্মরণ থেকে অন্তরকে ফিরিয়ে রাখে। অনেকে এতেকাফকে অত্যধিক খাওয়া-দাওয়া ও সাথিদের সাথে গল্প-গুজব করে সময় কাটানোর সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। এতে এতেকাফের ক্ষতি হয় না বটে তবে আল্লাহর রাসূলের এতেকাফ ছিল অন্য রকম। এতেকাফ অবস্থায় স্ত্রী সহবাস, চুম্বন, স্পর্শ নিষেধ। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন: ‘তোমরা মসজিদে এতেকাফরত অবস্থায় স্ত্রীদের সাথে মিলিত হবে না।’ [সূরা আল-বাকারা : ১৮৭]

শরীরের কিছু অংশ যদি মসজিদ থেকে বের করা হয় তাতে দোষ নেই। নবী করিম (সাঃ) এতেকাফ অবস্থায় নিজ মাথা মসজিদ থেকে বের করতেন। তখন আম্মাজান আয়েশা (রাঃ) তাঁর মাথার চুল বিন্যস্ত করে দিতেন।

এতেকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে বের হওয়া ও তার বিধান: এতেকাফ অবস্থায় মসজিদ থেকে বের হওয়া তিন ধরনের হতে পারে:—

এক. মানবীয় প্রয়োজনে বের হওয়ার অনুমতি আছে। যেমন পায়খানা, প্রস্রাবের জন্য, খাওয়া-দাওয়ার জন্য, পবিত্রতা অর্জনের জন্য। তবে শর্ত হল এ সকল বিষয় যদি মসজিদের গণ্ডির মাঝে সেরে নেয়া যায় তবে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না।

দুই. এমন সকল নেক আমল বা ইবাদত-বন্দেগির জন্য বের হওয়া যাবে না যা তার জন্য অপরিহার্য নয়। যেমন রোগীর সেবা করা, জানাজাতে অংশ নেয়া ইত্যাদি।

তিন. এমন সকল কাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না যা এতেকাফের বিরোধী। যেমন ক্রয়-বিক্রয়, চাষাবাদ ইত্যাদি। এতেকাফ অবস্থায় এ সকল কাজের জন্য মসজিদ থেকে বের হলে এতেকাফ বাতিল হয়ে যায়।

পরিশেষে আমরা ইউরো বাংলা টাইমসের পরিবারের পক্ষ থেকে মহান আল্লাহতায়ালার নিকট দোয়া করছি তিনি যেন আমাদের সকলকে এই বছর পবিত্র লাইলাতুল কদর পাওয়ার সৌভাগ্য দান করেন।

কবির আহমেদ, লেখক ও কলামিস্ট

নির্বাহী সম্পাদক(আন্তর্জাতিক)/ইবিটাইমস 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »