স্বপ্ন এবং চ্যালেঞ্জের পদ্মা সেতু

পর্ব-৮

  ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ  ৯১। এমতাবস্থায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হবে। এহেন অবস্থায় এতদিন ধরে বঞ্চিত কৃষকেরা কৃষি কাজে তাদের মেধা, শ্রম এবং অর্থ বিনিয়োগ করতে বিপুলভাবে উৎসাহ বোধ করবেন। ফলে কৃষি ক্ষেত্রে নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং তা ব্যবহারের ক্ষেত্র প্রসারিত হবে এবং তাতে করে কৃষি পণ্য উৎপাদন বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হবে। এরই পোষকতায় পদ্মা সেতুর উভয় পাড়ে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। কৃষকের আয় রোজগার বৃদ্ধি পেলে তাদের জীবনমান উন্নত হবে। ফলে মানব উন্নয়ন সূচকের অগ্রগতি সাধিত হবে। আর এসব উন্নতি, প্রগতি এবং সমৃদ্ধি সব কিছুই সম্ভব হচ্ছে দুঃসাহসী নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের গণমুখী উন্নয়নের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ উপহার পদ্মা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে।

৯২। শিল্পক্ষেত্রে পদ্মা সেতুর ভূমিকাঃ নদীমাতৃক বাংলাদেশে যোগাযোগের ক্ষেত্রে যে কোন সেতুর ভূমিকা এবং গুরুত্ব যে অনস্বীকার্য তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। এহেন অবস্থায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষগুলোর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বহুমুখী পদ্মা সেতু এই যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক অনন্য সংযোজন। এছাড়া এই সেতু হয়ে উঠেছে সব ধরনের অপমান এবং অসহযোগিতার বিপরীতে প্রতিশোধ গ্রহণের উপযুক্ত এবং সর্বোৎকৃষ্ট জবাব। তাই চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নের অভিপ্রায়ে নির্মিত এই সেতুকে শুধুমাত্র ইট-পাথরের একটি সেতু হিসেবেই নয়, বরং সর্বাধুনিক এবং সমকালীন বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির এক অসাধারণ স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কৃষি, শিল্প, শিক্ষা ও ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নয়ন এবং আত্মমর্যাদার অনন্য প্রতীক হিসেবে এই সেতু ইতিমধ্যেই প্রতিভাত হয়ে উঠছে। এই সেতুর কারণে সমৃদ্ধ হবে কৃষি ও শিল্প। সম্প্রসারিত হবে ব্যবসা, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পর্যটন শিল্প। এই সেতু চালু হতে না হতেই সেতু এলাকার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন শুরু হয়েছে। নতুন নতুন শিল্প উদ্যোক্তাদের বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার কারণে এইসব এলাকার জমিজমার দাম ইতিমধ্যেই বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে।

৯৩। আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ায় ফেরিঘাটে যানজটের অসহনীয় বিড়ম্বনা ইতিমধ্যেই দূর হয়েছে। দক্ষিণবঙ্গের মানুষগুলোর ভোগান্তি, যন্ত্রণা এবং মর্মবেদনা লাঘব হয়েছে। বিভিন্ন পেশাজীবী এবং বিপুল সংখ্যক কর্মজীবী মানুষগুলোর অপরিমেয় শ্রম ঘণ্টা রক্ষা পেয়েছে। ফলে এতদ অঞ্চলে শিল্পায়নের আগ্রহ এবং গতি ত্বরান্বিত হয়েছে। এইসব এলাকায় নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠার অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এমতাবস্থায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্প বিপ্লব ঘটবে বলে অনেক জোর দিয়েই বলা যায়। এইসব শিল্প কারখানায় বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর কর্ম সংস্থান সৃষ্টির সুযোগ এবং সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। খুলনা অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা বহু কল কারখানা চালু হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। খুলনা এবং মোংলা বন্দরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার কারণেও নতুন নতুন শিল্প কারখানা স্থাপিত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। ফলে বেকারত্ব হ্রাস পাবে। মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়ে যাবে। এমতাবস্থায় সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হবে।

৯৪। শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে পদ্মা সেতুর অবদানঃ একথা সর্বজনবিদিত যে আমাদের দেশের দক্ষিণাঞ্চল মূলত প্রান্তিক এবং উপকূল অঞ্চল বেষ্টিত। তাই দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সহিত তুলনামূলক বিচারে এই উপকূল পরিবেষ্টিত অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটা কষ্টদায়ক, সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়সাপেক্ষ। আর ঠিক একারণেই কৃষি, শিল্প এবং ব্যবসা বাণিজ্যের মতো উচ্চ শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রেও এই অঞ্চল বরাবরই উপেক্ষিত এবং অবহেলিত রয়ে গিয়েছে। যে কোন অঞ্চলের সামগ্রিক এবং সামষ্টিক উন্নয়নের জন্য সহজসাধ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার ইতিবাচক প্রভাব অনেক বেশি প্রয়োজন এবং গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা নদী পার হয়ে ওপারে যাওয়ার জন্য মাওয়া-কেওড়াকান্দি ফেরিঘাটের বিড়ম্বনার জন্য রাজধানী ঢাকার সাথে সড়কপথে বৃহত্তর বরিশাল এবং খুলনার যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক কষ্টসাধ্য, ব্যয়সাপেক্ষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কিন্তু বহুল আকাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ায় এহেন কষ্ট, যন্ত্রণা, দুর্ভোগ এবং বিড়ম্বনার অবসান ঘটেছে। তাই এতদ অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষগুলো এখন কাজের সন্ধানে এবং অন্যান্য নানাবিধ প্রয়োজনে খুব সহজেই ঢাকা আসতে পারবেন। এরই পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত হওয়ায় এতদ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও এখন উচ্চশিক্ষা লাভের আশায় আরও অনেক বেশি উৎসাহিত এবং আগ্রহান্বিত হবেন।

৯৫। সুতরাং যোগাযোগ ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার কারণে এতদিন ধরে যারা উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং সুবিধা লাভ করা থেকে বঞ্চিত ছিলেন তারা এখন তাদের মনের সুপ্ত আশা পূরণ করতে পারবেন। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুবিধা বঞ্চিত এসব ছাত্র ছাত্রী তাদের কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা লাভ করে নিজেকে দেশের গর্বিত সন্তান হিসেবে পরিচয় দিতে সক্ষম হবেন। এমতাবস্থায় এতদ অঞ্চলে উচ্চশিক্ষা বিস্তারের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে মানসম্মত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। সময় সাশ্রয়ী এবং ব্যয় সাশ্রয়ী যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত হওয়ার কারণে উচ্চশিক্ষা লাভের ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর হবে। এহেন অবস্থায় দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় একাধিক বিশ্ব বিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, কৃষি কলেজ ও বিশ্ব বিদ্যালয় এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভের ক্ষেত্র প্রসারিত হবে। সুতরাং পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং পরিবেশগত উন্নতির পাশাপাশি বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত হবে। এমতাবস্থায় দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা এবং বিশেষায়িত শিক্ষার প্রসারে পদ্মা সেতু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।

 

৯৬। ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে পদ্মা সেতুর গুরুত্বঃ বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতির অসামান্য গৌরব, অপরিসীম মর্যাদা এবং সুবিশাল অহংকারের অনন্য প্রতীক পদ্মা সেতু। এই সেতুর কারণে দেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর মোংলা, চট্টগ্রাম বন্দরের মতো যথাযথভাবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই সেতু নির্মিত হওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বঞ্চিত এবং অবহেলিত কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করণে এবং এই সমস্ত পণ্য সামগ্রীর বাজার সম্প্রসারণ করার ক্ষেত্রে এই সেতু ব্যাপকভাবে অবদান রাখবে। এতদ অঞ্চলে উৎপাদিত কাঁচামাল অনেক দ্রুততার সাথে রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এই সমস্ত পণ্য সামগ্রী উৎপাদনে কৃষককূল ব্যাপকভাবে উৎসাহিত এবং অনুপ্রাণিত হবেন। সাতক্ষীরা এবং বাগেরহাট অঞ্চল সহ পুরো দক্ষিণবঙ্গের মাছ চাষীগণ অনেক কম সময়ে রাজধানী ঢাকা সহ দেশের অন্যসব জেলাগুলিতে মাছ বিক্রি করে আবার তাদের নিজ নিজ জেলায় ফিরে যেতে পারবেন। স্বরূপকাঠি এলাকার পেয়ারা চাষীদেরকে তাদের পেয়ারা নিয়ে আর দুশ্চিন্তায় পড়তে হবে না। এই সেতুর কারণে কোরবানির পশু পারাপার সহজ হয়েছে। ফেরিঘাট কেন্দ্রিক খামারিদের সমস্যা এবং বিড়ম্বনার অবসান হয়েছে। ফলে খামারি, বিপণনকারী এবং ভোক্তাদের দুর্ভোগ এবং দুশ্চিন্তা লাঘব হয়েছে। তাই পদ্মা সেতু কোরবানি কেন্দ্রিক অর্থনীতিতেও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে।

৯৭। স্বাধীনতার পর থেকে বিগত বছরগুলোতে শুধুমাত্র চট্টগ্রাম বন্দরেই দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য চলমান এবং সীমাবদ্ধ থেকেছে। এহেন অবস্থায় বর্তমানে পদ্মা সেতুর কারণে পায়রা নদী বন্দর এবং মোংলা সমুদ্র বন্দর কর্মচঞ্চল হয়ে উঠবে। এছাড়া নেপাল এবং ভুটানের পাশাপাশি ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের জন্য সহজ পথ হবে পায়রা এবং মোংলা বন্দর। তদুপরি পদ্মা সেতুর প্রভাবে বেনাপোল স্থল বন্দরের কর্মতৎপরতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হিমায়িত মৎস্য শিল্প এবং পাট শিল্পের অধিকাংশ খুলনাতে অবস্থিত। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় এই খাতগুলোতে গতি সঞ্চার হবে এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে। এমতাবস্থায় এই সেতুর কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। ফলে দেশবাসীর জীবনমান উন্নত হবে। আর ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি হলে দেশের অর্থনীতির চাকা আরও অধিক পরিমাণে চাঙ্গা এবং সমৃদ্ধ হবে।

৯৮। স্বাস্থ্যখাতে পদ্মা সেতুর অবদানঃ বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু দেশের অর্থনীতি সহ অন্যান্য খাতের পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতেও ব্যাপকভাবে অবদান রাখবে বলে আশা করা যায়। ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়াও ফেরি পারাপারের জন্য ইতিপূর্বে মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে ফেরিঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কখনোবা সারা রাত ধরে অপেক্ষা করতে হতো। ফেরি ঘাটে গাড়ির দীর্ঘ লাইনে অ্যাম্বুলেন্সে থাকাবস্থায় কখনো কখনো মুমূর্ষু রোগীর অক্সিজেন শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ফেরি ঘাটের অসহনীয় এবং দুরতিক্রম্য যানজটে আটকা পড়া অবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে অক্সিজেন সংগ্রহ করা সম্ভব হতো না। এমতাবস্থায় অক্সিজেনের অভাবে কাওড়াকান্দি, কাঁঠালবাড়ি এবং মাঝিরকান্দি ফেরি ঘাটে অ্যাম্বুলেন্সের ভিতরে থাকাবস্থায় বিনা চিকিৎসায় খুবই অসহায়ভাবে অনেক রোগী মৃত্যুবরণ করেছেন। যা খুবই দুঃখজনক এবং অত্যন্ত হৃদয়-বিদারক। তাই স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় এহেন অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং মর্মস্পর্শী ঘটনা থেকে জাতি মুক্তি পাবে।

৯৯। সুতরাং পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীরা এখন খুব সহজে, স্বল্প সময়ে এবং বিনা বাধায় সেতুর উপর দিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করতে পারবেন। এরই পাশাপাশি এইসব রোগীরা তাদের পছন্দের চিকিৎসা কেন্দ্রে সেবা নিয়ে জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হবেন। ফলে গ্রাম-গ্রামান্তরের রোগীরা রাজধানীতে এসে চিকিৎসা নিতে আগ্রহান্বিত হবেন। উপরন্তু এই সেতু চালু হওয়ায় ফেরি ঘাটে কিংবা লঞ্চে অথবা স্পিডবোট কিংবা ট্রলার ডুবিতে আর কখনো কোন সলিল সমাধি হবেনা বলে জোরালোভাবেই বলা যায়। তাই এই সেতু যেমন বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর সময় বাঁচাবে তেমনই বাঁচাবে অনেক অমূল্য প্রাণ। স্বাস্থ্য খাতে এহেন অবদানের কারণে দেশের মানুষের গড় আয়ুও বৃদ্ধি পাবে। তাই বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবায় নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হবে বলে খুব সহজেই অনুধাবন করা যায়।

১০০। পর্যটন শিল্পে পদ্মা সেতুর ভূমিকাঃ পদ্মা সেতু চালু হওয়ার কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে রাজধানী ঢাকা সহ অন্যান্য জেলাগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে। এহেন অবস্থায় দেশের কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য এবং স্বাস্থ্যখাত সহ অন্যান্য আরও বিভিন্ন খাতের পাশাপাশি পর্যটন খাতের বিকাশের ও বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। এই সেতু নির্মিত হওয়ায় মোংলা এবং পায়রা বন্দরের গুরুত্ব আরও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সেতু ব্যবহার করে আমদানি এবং রপ্তানি পণ্য পরিবহণে সময় কম লাগবে বিধায় এই বন্দর দু’টির গতিশীলতা বেড়ে গিয়েছে। এই সেতুর কারণে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের আকর্ষণ এবং গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে প্রত্যুষে সূর্যোদয় এবং সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের অত্যন্ত মনোরম এবং অভাবনীয় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কষ্টসাধ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে যারা এতদিন তা পূরণ করতে পারেননি, তাদের সেই প্রত্যাশা এবার পূরণ হবে। এছাড়া বিশ্ববাসী নিশ্চয়ই জানেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লিলাভূমি সুন্দরবন পৃথিবীর অন্যতম Natural heritage site। উপরন্তু সুন্দরবন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র এবং অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ মহিমায় উদ্ভাসিত বিশ্ব নন্দিত এই বনভূমির প্রতি দেশী-বিদেশী পর্যটকদের বিপুল আগ্রহ রয়েছে। এরই পাশাপাশি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র, প্রাকৃতিক নৈসর্গিক দৃশ্য এবং বনের অভ্যন্তরে হিরণ পয়েন্টের প্রতিও ভ্রমণবিলাসী পর্যটকদের আগ্রহ প্রচুর। তাই পদ্মা সেতু হবে প্রকৃতি প্রেমিক পর্যটকদের চিত্ত বিনোদন এবং ইচ্ছা পূরণের অন্যতম আকর্ষণ।

১০১। শিক্ষিত এবং সজ্জন ব্যক্তিমাত্রই জানেন, বাংলাদেশের তিনটি World heritage site -এর দু’টিই দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত। এ দু’টি সাইট হচ্ছে সুন্দরবন এবং ঐতিহাসিক ষাট গম্বুজ মসজিদ। প্রকৃতি প্রেমিক পর্যটকেরা জানেন অপরূপ সৌন্দর্যের আধার সুন্দরবন বিশ্বের বৃহত্তম Mangrove forest. যা মহান সৃষ্টিকর্তার এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। এরই পাশাপাশি ষাট গম্বুজ মসজিদের সাথে জড়িয়ে রয়েছে মহান ধর্ম প্রচারক খান জাহান আলী (রঃ) -এর বহু অবিস্মরণীয় এবং পুণ্যময় স্মৃতি। জীব বৈচিত্রের দিক দিয়ে সুন্দরবন বরাবরই অনেক সমৃদ্ধ এবং সুপ্রসিদ্ধ। যুগ যুগ ধরেই এই বন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত। সারা বিশ্বের আরও বিভিন্ন বন সমূহের মধ্যে শুধুমাত্র সুন্দরবনেই এই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অবস্থান রয়েছে। এছাড়াও বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে এই বনে রয়েছে ২৯০ প্রজাতির পাখি, ১২০ প্রজাতির মাছ, ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৮ টি উভচর প্রজাতি সহ ৪৫৩ রকমের বিভিন্ন আকৃতির ও প্রকৃতির প্রাণী। বিশ্বের গুটিকয়েক বনে বিলুপ্তপ্রায় প্যারা পাখি রয়েছে। তন্মধ্যে আমাদের গর্বের সুন্দরবন অন্যতম। তাই সচেতন এবং ভ্রমণ পিপাসু পর্যটকদের নিকট সুন্দরবনের আকর্ষণ বরাবরই অনেক বেশি।

১০২। আমরা সবাই জানি কোন পর্যটক কোন বিশেষ এলাকায় ভ্রমণ করতে গেলে তার উক্ত ভ্রমণে একই সঙ্গে কতগুলি দর্শনীয় স্পট এবং নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়, সে ব্যাপারে তিনি আগ্রহী হয়ে থাকেন। তাই পদ্মা সেতুর কল্যাণে কোন পর্যটক খুলনা এবং বাগেরহাট এলাকায় সফর করতে এলে অনিন্দ্য শিল্প কৌশল এবং দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে বিগত ষোড়শ শতাব্দীতে খান জাহান আলী (রঃ) কর্তৃক নির্মিত ইসলামিক ঐতিহ্য এবং স্থাপত্যের অনন্য স্থাপনা ষাট গম্বুজ মসজিদ, খান জাহান আলী (রঃ) -এর মাজার শরীফ এবং মাজার সংলগ্ন বিশাল দীঘি অবলোকন করতে পারবেন। এরই পাশাপাশি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুর বাড়ি খুলনার দক্ষিণ ডিহির রবীন্দ্র কমপ্লেক্স, নড়াইলের বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের সংগ্রহশালা, কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের মাজার এবং কুষ্টিয়ার শিলাইদহে বিশ্বকবির কুঠিবাড়ি পরিদর্শন করে তাদের ভ্রমণ পিপাসা পরিতৃপ্ত করতে পারবেন। ফলে পর্যটকদের পদভারে প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে এই সমস্ত দর্শনীয় স্থানসমূহ। তাই মাওয়া এবং জাজিরা পাড়ের রিসোর্ট সমূহের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন পর্যটন শিল্প স্থাপিত হবে এবং তাতে করে পর্যটকদের আগমনে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে।

১০৩। দেশবাসী নিশ্চয়ই জানেন ১৯৭৫ -এর ১৫ই আগস্ট কতিপয় নরপশু ঘাতক জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে অত্যন্ত কাপুরুষোচিতভাবে হত্যা করে। তাঁকে তাঁর প্রাণপ্রিয় জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার জন্য পাষণ্ড ঘাতকেরা খুবই তড়িঘড়ি করে এবং অত্যন্ত সাবধানতার সাথে সামরিক হেলিকপ্টারে করে তাঁর লাশ টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যায়। পরে নিতান্তই অযত্ন এবং অবহেলায় বঙ্গবন্ধুর মাতা পিতার কবরের পাশে তাঁর লাশ দাফন করা হয়। ঘাতক খুনীরা ভেবেছিল টুঙ্গিপাড়ার প্রত্যন্ত গ্রামে বঙ্গবন্ধুর লাশ দাফন করা হলে তাঁর জীবনের চূড়ান্ত পরিসমাপ্তি ঘটে যাবে। মুজিব নামে যে এই বাংলায় কেউ ছিলেন – অনাগত ভবিষ্যতে হয়তোবা কেউ আর তা মনে করবে না। নরপিশাচ খুনীরা ভেবেছিল রাজধানীর বাহিরে এবং দৃষ্টিসীমার আড়ালে মুজিবকে সমাহিত করা হলে বাঙালির এই স্বপ্নদ্রষ্টা মহামানব কালক্রমে একদিন মনের আড়ালে এবং স্মৃতির আড়ালে চলে যাবেন। বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মোশতাক আহমদের মতো দুই সামরিক স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমান এবং এইচ এম এরশাদ এমনকি খালেদা জিয়াও এই একই ধরনের ভ্রান্ত চিন্তা চেতনায় আচ্ছন্ন এবং প্রচ্ছন্ন ছিলেন। তাই তাদের আমলে চট্টগ্রাম, রংপুর এবং বগুড়ার রাস্তাঘাট একাধিকবার মসৃণ করা হলেও মহান মুজিবের জন্মস্থানসহ পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা বরাবরই উপেক্ষিত, অবহেলিত এবং কণ্টকাকীর্ণই থেকে যায়।

১০৪। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মানুষদের জন্য সুখকর সংবাদ হলো যে পাষণ্ড খুনীদের শত চেষ্টা এবং তৎপরতা সত্ত্বেও তাদের সেই ভ্রান্ত ধারণা ভুল এবং মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এহেন বাস্তবতার প্রেক্ষিতে বৃহত্তর খুলনা, বরিশাল এবং ফরিদপুর তথা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনসাধারণের নিকট পদ্মা সেতুর গুরুত্ব এবং প্রয়োজন কেন এবং কি কি কারণে কতটা অনিবার্য এবং অপরিহার্য ছিল এবং এই সেতু তাদের নিকট কতটা কাঙ্ক্ষিত এবং বাঞ্চিত ছিল একটু খোলা মন এবং পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিবেচনা করলে তা খুব সহজেই অনুধাবন করা যায়। সবাই জানেন পদ্মা পাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য সব বয়সের মানুষদেরকে এমনিতেই আকৃষ্ট করে থাকে। তদুপরি এই সেতুর কারণে রাস্তাঘাটের অনাকাঙ্ক্ষিত বিড়ম্বনা এবং অব্যবস্থাপনা দূর হয়েছে এবং ফেরিঘাটের অব্যক্ত যন্ত্রণা ও জটিলতার অবসান ঘটেছে। এহেন অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধের প্রতি সাধারণ জনগণের আগ্রহ এবং ঐকান্তিকতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে এই সমাধি ইতিমধ্যেই বাঙালি জাতির তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। তাই দেশী-বিদেশী দর্শনার্থী এবং পর্যটকদের আগমনে দিনদিনই মুখরিত হয়ে উঠছে জন গণ মন অধিনায়কের এই সমাধি। এহেন অবস্থায় দেশের কৃষি, শিল্প এবং বাণিজ্যের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর সমাধি সৌধের কারণেও এখন উদ্ভাসিত এবং বিকশিত হয়ে উঠছে দেশের পর্যটন শিল্প।

১০৫। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পদ্মা সেতুর বহুমাত্রিক প্রভাবঃ আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের উন্নয়নের অধিকার পূরণের অপর নাম পদ্মা সেতু। দেশের কোটি কোটি মানুষের আবেগ এবং গর্বের এই সেতু বাস্তবায়নের ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি সহ বহুমাত্রিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এই সেতু দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের সামগ্রিক অর্থনীতির Lifeline হিসেবে বিবেচিত হবে। এরই পাশাপাশি South Asian connectivity, শিল্পায়ন, কৃষি এবং বাণিজ্যের অগ্রগতির মাধ্যমে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই সেতু গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে জোরালোভাবেই বিবেচিত হয়। তাই এই সেতুর কারণে দেশের সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে উপকৃত হবে। এই সেতুর মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইতিমধ্যেই প্রভূত উন্নতি সাধিত হওয়ায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই সেতু ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলবে বলে খুব সহজেই ধরে নেয়া যায়। এহেন কর্মসংস্থানের কারণে বিভিন্ন ধরনের পরিবহণ, ছোট ছোট হোটেল রেস্টুরেন্ট স্থাপন, কৃষিজ পণ্য উৎপাদন এবং আবাসন প্রকল্প স্থাপনের সমূহ সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। এরই ফলশ্রুতিতে দেশের অর্থনীতির চাকা সমৃদ্ধ এবং গতিশীল হবে।

১০৬। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার দৃশ্যমান প্রতীক পদ্মা সেতু। এই সেতুর কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে রাজধানী শহর ঢাকা সহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক সহজতর হয়েছে, সময়সাশ্রয়ী হয়েছে এবং ব্যয়সাশ্রয়ী হয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় সব জেলাই কৃষি নির্ভর। বৃহত্তর বরিশালের ধান ও পান, যশোহরের সবজি ও ফুল, খুলনা ও বাগেরহাটের চিংড়ি মাছ তথা পুরো দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন প্রকার কৃষিজাত পণ্য দেশের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রেখে থাকে। এছাড়া এতদ অঞ্চলের প্রতিটি জেলাতেই বিভিন্ন রকমের ধান এবং মাছ চাষ করা হয়। তদুপরি নদী বহুল এলাকা বলে প্রাকৃতিক উৎস থেকেও আহরিত হয় বিপুল পরিমাণ মাছ। পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় উন্নততর এবং নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে উপরোক্ত কৃষিজাত পণ্য পরিবহণ এবং তা বাজারজাতকরণ অনেক সহজতর হয়েছে। ফলে মাছ এবং কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে কৃষককূল উৎসাহিত এবং অনুপ্রাণিত হবেন। তাই কৃষিজাত পণ্যের রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে। এহেন অবস্থায় দেশের দারিদ্র্য বিমোচন হবে এবং আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।

১০৭। পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ায় ফেরি পারাপারের অসহনীয় দুর্ভোগ এবং বিড়ম্বনার অবসান হয়েছে। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর সাথে রাজধানী ঢাকা সহ দেশের অন্যান্য জেলাগুলোর নিবিড় যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। এহেন অবস্থায় আন্তঃ আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই সেতু অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। উপরন্তু বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (BBIN) মোটরযান চুক্তি বাস্তবায়নের পরিপ্রেক্ষিতে এই সেতুর ভূমিকা হবে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ। এহেন অবস্থায় যোগাযোগ সংযোগ, বিনিয়োগ সংযোগ এবং বাণিজ্য সংযোগ– এই ত্রিবেণী সংযোগের সার্থক সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হলে পদ্মা সেতু হবে দেশের অর্থনৈতিক করিডরের প্রধান কেন্দ্র বিন্দু। ফলে বৈষম্যপীড়িত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কর্মহীন মানুষগুলোর বেকারত্বের অবসান ঘটবে। তাদের জন্য নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে এবং তাদের আয় রোজগারের পথ সুগম হবে। তাই এই সেতুর কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে নিশ্চিতভাবেই ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হবে। এমতাবস্থায় এই সেতুর সুবাদে এতদ অঞ্চলের ২১ টি জেলার অর্থনীতির হালচালে ব্যাপক ভিত্তিক পরিবর্তন সাধিত হবে। তাই খুব স্বাভাবিক এবং সঙ্গত কারণেই বদলে যাবে এতদ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান।

১০৮। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইতিপূর্বে বিভিন্ন ধরনের অব্যবস্থা, অনিশ্চয়তা এবং প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান ছিল বিধায় এতদ অঞ্চল অনেকটা উপেক্ষিত এবং অবহেলিত ছিল। ফলে গৃহায়ণ, শিল্পায়ন, উৎপাদন, চিকিৎসা এবং কর্ম সংস্থানের গতি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অনেকটা অন্তরায় ছিল। এহেন অবস্থায় পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ায় এই সমস্ত বাধা এবং প্রতিবন্ধকতার অবসান হয়েছে। এহেন অবস্থায় উপরোক্ত সকল ক্ষেত্রেই সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত এবং বিকশিত হবে। তাই পদ্মা সেতু দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সমৃদ্ধ এবং ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে জাতীয় রাজস্বের পরিমাণ ও বৃদ্ধি করবে। ফলে আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে নতুন নতুন প্রকল্প প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে আমাদের সক্ষমতাকে বৃদ্ধি করবে। এরই পাশাপাশি এই সেতু আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হবে। এই সেতুর কারণে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। অনাগত ভবিষ্যতে দক্ষিণাঞ্চল হবে শিল্প এবং বাণিজ্যিকভাবে সমৃদ্ধ নগরী। এই সেতু নির্মাণের ফলে নদীর দুইপাড়ের মানুষগুলোর কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গিয়েছে। তদুপরি প্রতি বছর নদী ভাঙ্গনের সঙ্গে সঙ্গে যারা ভাগ্য বিপর্যয়ের শিকার হন, যাদের জীবন-জীবিকা কখনো ঝুঁকিপূর্ণ আবার কখনোবা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, এই সেতু নির্মাণের প্রেক্ষিতে তাদের জীবনধারা বহুলাংশে পাল্টে যাবে। ফলে তারা নতুন নতুন সম্ভাবনার আশায় উজ্জীবিত হয়ে উঠবেন। যা দেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ), লেখক ও কলামিস্ট  

(চলবে)

বি/ ইবিটাইমস /এম আর

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »