স্বপ্ন এবং চ্যালেঞ্জের পদ্মা সেতু

পর্ব- ৭ 

 ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ ৭৬। উপরোক্ত একই প্রবন্ধে মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল আরও বর্ণনা করেছেন– “পদ্মা সেতু নির্মাণে বর্তমান প্রকৌশলীদের মধ্যে আছেন প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মোঃ শফিকুল ইসলাম, উপপ্রকল্প পরিচালক (টেকনিক্যাল) প্রকৌশলী মোঃ কামরুজ্জামান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সড়ক ও সেতু) প্রকৌশলী শাহ মোহাম্মদ মূসা, নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক (মূল সেতু) প্রকৌশলী দেওয়ান মোঃ আবদুল কাদের, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুনর্বাসন) প্রকৌশলী মোঃ ফরিদুল আলম, সিনিয়র মনিটরিং স্পেশালিস্ট প্রকৌশলী মোঃ আবদুস সালাম, প্রকৌশলী (ম্যানেজমেন্ট) মোহাম্মদ ইকবাল। এ ছাড়া এই প্রকল্পে ছিলেন প্রকৌশলী মোঃ রফিকুল ইসলাম, প্রকৌশলী মোঃ জাফর উল্লাহ, প্রকৌশলী মোঃ আজহারুল ইসলাম, প্রকৌশলী মোঃ দলিল উদ্দিন, প্রকৌশলী মোঃ জুলফিকার ইসলাম, প্রকৌশলী আবদুল আউয়াল মোল্লা, প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, প্রকৌশলী এন শেখ মোঃ শাহেদ-উল-কালাম, প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া, প্রকৌশলী শওকত আহমেদ মজুমদার, প্রকৌশলী মোঃ ফিরোজ আকতার, প্রকৌশলী সৈয়দ হালিমুর রহমান, প্রকৌশলী আশিক কাদির, প্রকৌশলী ফারহিন রুখসানা, প্রকৌশলী আব্দুল্লাহেল বাকী (মৃত) সহ পরামর্শক বা উপদেষ্টা হিসেবে আরও ৮ – ১০ জন যুক্ত ছিলেন। এই সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ১৩৮ জন। বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্ত ছিলেন চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, জাপান, ডেনমার্ক, ইটালি, মালয়েশিয়া, কলম্বিয়া, ফিলিপিন, তাইওয়ান, নেপাল এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।”

৭৭। নদ-নদী সম্পর্কে যাদের সম্যক ধারণা রয়েছে তারা নিশ্চয়ই জানেন আমাদের পদ্মা নদী একটি এলোভিয়াল (Alluvial) নদী। অর্থাৎ পলল-শীলার মধ্য দিয়ে এই নদী এঁকে বেঁকে সাপের মতো প্রবাহিত হচ্ছে। উপরন্তু প্রাকৃতিকভাবেই এই নদী একটি খামখেয়ালী নদী ও বটে। কারণ এই নদীর চরিত্র বিচিত্র রকমের। এই নদীর পাড় ও ভাঙ্গে অনেক বেশি। তাই খুব স্বাভাবিক কারণেই এরকম একটি উন্মত্ত এবং প্রমত্ত নদীর উপর এত বড় একটি সেতু নির্মাণের কাজ শুধু অর্থনৈতিক দিক দিয়েই নয়, বরং কারিগরি এবং প্রকৌশলগত দিক দিয়েও ছিল অনেক বড় চ্যালেঞ্জ এবং কষ্টসাধ্য। এছাড়া এই সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে সামগ্রিক পরিবেশ এবং পারিপার্শ্বিক বিষয়সমূহকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাই এই নদীর স্বাভাবিক গতিপথে কোন বাধা দেয়া হয়নি। এই নদীকে কোথাও সংকুচিত ও করা হয়নি। তদুপরি সেতু নির্মাণের মহা কর্মযজ্ঞের সময়ে যাতে ইলিশ মাছ কোনভাবেই বিরক্ত না হয় এবং নির্বিঘ্নে ও অবাধে চলাচল ও বিচরণ করতে পারে এবং ডিম পাড়তে পারে তথা ইলিশের উৎপাদন যাতে কোনভাবেই ব্যাহত কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা হয়েছে। এরই পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিকে মাথায় রেখে পরিবেশগত দিক এবং জীববৈচিত্রের ভারসাম্য বজায় রাখার নিমিত্তে সর্বাত্মক সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। এরই ফলশ্রুতিতে মাওয়া প্রান্তে ১.৬ কিলোমিটার এবং জাজিরা প্রান্তে ১২.৪ কিলোমিটার মিলে মোট ১৪ কিলোমিটার এলাকা নদী শাসনের আওতায় আনা হয়েছে। এটি ও একটি নতুন রেকর্ড বটে।

৭৮। আমাদের স্বপ্নের এই সেতুর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ছিল চায়না রেলওয়ে মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি (MBEC) লিমিটেড। পরামর্শক হিসেবে নিয়োজিত ছিল কোরিয়া এক্সপ্রেসওয়ে কর্পোরেশন এন্ড এসোসিয়েটস্। এছাড়া ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট হিসেবে নিয়োজিত ছিল রেনডেন লিমিটেড এন্ড এসোসিয়েটস্। এই সেতুটি প্রশাসনিকভাবে তিনটি জেলার উপর দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। তন্মধ্যে উত্তর প্রান্তে মুন্সীগঞ্জ জেলায় পিয়ার ১ হতে পিয়ার ১৬ এবং দক্ষিণ প্রান্তে মাদারীপুর জেলায় পিয়ার ১৭ হতে পিয়ার ৩২ এবং শরীয়তপুর জেলায় পিয়ার ৩৩ হতে পিয়ার ৪২ অবস্থিত। এই ৪২ টি পিয়ারে স্প্যান রয়েছে মোট ৪১ টি। এছাড়া এই ৪২ টি পিয়ারে মোট পাইলিংয়ের সংখ্যা ২৯৪ টি। উপরোক্ত ৪২ টি পাইলের মধ্যে নদীর অভ্যন্তরে ৪০ টি পিয়ারে মোট পাইল রয়েছে ২৬২ টি। এছাড়া সেতুর দুই প্রান্তে দু’টি পিয়ারের প্রত্যেকটিতে ১৬ টি করে ৩২ টি রোড পাইল রয়েছে। প্রতিটি স্টিল পাইলের ব্যাস ৩ মিটার এবং পুরুত্ব ৬২ মিলিমিটার। অধিক ভার বহনের জন্য কেন্দ্রীয় পাইল ব্যতীত  প্রতিটি  পাইল ১ : ৬ অনুপাতে সিল করা হয়েছে। মূল সেতুর সবচেয়ে বড় পাইলের দৈর্ঘ্য ১২৫.৪৬ মিটার। যা পৃথিবীর সকল সেতুর চেয়ে বেশি গভীরতায় প্রবেশ করানো হয়েছে। পাইলিংয়ের গভীরতা বিবেচনায় সারা বিশ্বে এটি একটি নতুন রেকর্ড।

৭৯। উপরোল্লিখিত প্রতিটি পাইল ৮,২০০ টন লোড ধারণ করতে সক্ষম। এছাড়া প্রতিটি পিয়ার ৫০ হাজার টন লোড বহন করতে সক্ষম। এই সেতুর ৪১ টি স্প্যানের প্রত্যেকটির দৈর্ঘ্য ১৫০ মিটার। এমতাবস্থায় মূল সেতুর দৈর্ঘ্য (১৫০ x ৪১) = ৬১৫০ মিটার বা ৬.১৫ কিলোমিটার। সেতুটি রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে টিকে থাকার মতো করে এবং ৪,০০০ ডেড ওয়েট টনেজ জাহাজের ধাক্কা সহনশীল বিবেচনা করে নির্মাণ করা হয়েছে। ভূমিকম্প প্রতিরোধক হিসেবে এই সেতুতে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ Friction pendulum bearing ব্যবহার করা হয়েছে। এই বিয়ারিং -এর সক্ষমতা ১০ হাজার টন। পৃথিবীর কোন সেতুতে এখনো পর্যন্ত এত বেশি সক্ষমতা সম্পন্ন বিয়ারিং লাগানো হয়নি। তাই এটিও একটি নতুন বিশ্ব রেকর্ড। সেতুর নিচ দিয়ে নৌযান চলাচলের সুবিধার জন্য ‘এ’ শ্রেণী বিবেচনা করে পানির Standard High Level স্তর হতে ১৮.৩০ মিটার বা ৬০ ফুট Navigation clearance বা ফাঁকা রয়েছে। এই ফাঁক রাখার কারণে যে কোন ধরনের ফেরি বা নৌযান সেতুর নিচ দিয়ে সারা বছর ধরে চলাচল করতে পারবে। এই সেতুতে ৪ লেনের সড়ক, ব্রডগেজ রেল, ৪০০ কেভিএ বিদ্যুৎ লাইন, ৭৬২ মিলিমিটার বা ৩০ ইঞ্চি গ্যাস পাইপ লাইন এবং অপটিকাল ফাইবার ড্যাপ্ত সুবিধা বিদ্যমান রয়েছে বিধায় এই সেতুকে পদ্মা বহুমুখী সেতু আখ্যা দেয়া হয়েছে।

৮০। পদ্মা সেতুতে ব্যবহৃত মালামাল এবং উপকরণাদিঃ শিক্ষিত এবং সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন দেশী-বিদেশী নানামুখী ষড়যন্ত্রের মুখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অদম্য সাহস, দৃঢ় মনোবল এবং প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে পদ্মা সেতু নির্মাণের ব্যাপারে ধীরে ধীরে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে গিয়েছেন। এই সেতু নির্মাণের সময়ে তিনি কোন একটি ব্যাপারেই কোন আপোষ করেননি। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি এবং সর্বোৎকৃষ্ট মালামাল ও যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ব্যাপারে তিনি সদা সর্বদা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থেকেছেন। দেশবাসীর জানা আবশ্যক যে এই সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে দেশী-বিদেশী মিলে মোট ৩০ রকমের উপকরণাদি ব্যবহার করা হয়েছে। সেতু বিভাগের তৈরী করা তালিকা থেকে জানা যায় যে মূল সেতুর কাজে বাংলাদেশ ছাড়াও চীন, ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, লুক্সেমবার্গ, সিঙ্গাপুর এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে বিভিন্ন উপকরণাদি আনয়ন করা হয়েছে। এছাড়া সেতুর কাজে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, বেলজিয়াম এবং নেদারল্যান্ড (হল্যান্ড) সহ আরও অনেক দেশের যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়েছে।

৮১। সেতু বিভাগের হিসাব মতে এই সেতুতে সিমেন্ট লেগেছে আড়াই লাখ টনের ও বেশি। এর সবই আমাদের দেশে উৎপাদিত সিমেন্ট। এছাড়া আমাদের দেশে তৈরী রড ব্যবহৃত হয়েছে ৯২ হাজার টনের ও বেশি। বালু লেগেছে সাড়ে তিন লাখ টন। বিটুমিন লেগেছে দুই হাজার টনের ও বেশি। নদীতীর রক্ষা করার জন্য ২৫০ কেজি ওজনের জিও ব্যাগ বসানো হয়েছে ২৪ লাখ। এই সব মালামালের সবই বাংলাদেশে উৎপাদিত মালামাল। এছাড়া আমাদের দেশে তৈরী বিদ্যুতের কেবল ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় পৌনে তিন লাখ মিটার। পাইপ লেগেছে ১ লাখ ২০ হাজার মিটার। মাটিতে বেশি ওজন বহনে সক্ষম এক ধরনের বিশেষ সিমেন্ট তথা Microfine বা অতি মিহি সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। এই সেতুতে ব্যবহারের জন্য এই ধরনের অতি মিহি ২ হাজার টন সিমেন্ট আনা হয়েছে সিঙ্গাপুর থেকে। পদ্মা সেতুর পাইলিং এর উপরের অংশে ব্যবহার করা হয়েছে এই সিমেন্ট। লুক্সেমবার্গ থেকে আনা হয়েছে ৯ হাজার টনের বেশি রেলের গার্ডার (স্ট্রিঞ্জার)।

৮২। এই সেতুর পানি নিষ্কাশনের জন্য পাইপ এবং পাইল বসানোর জন্য ব্যবহৃত পলিমার আনা হয়েছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। তন্মধ্যে পাইপ আনা হয়েছে ৩৯ হাজার মিটার এবং পলিমার ব্যবহৃত হয়েছে ২৪৯ টন। এই সেতুর উপরে নির্মিত কংক্রিটের পথের উপরে প্রথমে ২ মিলিমিটারের পানি নিরোধক একটি স্তর বসানো হয়েছে যা Water proof membrane নামে পরিচিত। এছাড়া ৫৬০ টন পানি নিরোধক উপকরণ আনা হয়েছে যুক্তরাজ্য থেকে। সেতুর পাশে রেলিং দেয়ার জন্য এ্যালুমিনিয়াম ও আনা হয়েছে যুক্তরাজ্য থেকে। এই সেতুতে ব্যবহার করার জন্য ৫–২০ মিলিমিটারের ৫২৫ লাখ টন পাথর আনা হয়েছে ভারত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। তদুপরি আমিরাত থেকে কিছু এ্যালুমিনিয়াম ও আনা হয়েছে। উপরোল্লিখিত বিপুল পরিমাণ মালামাল এবং উপকরণাদির তালিকা সমূহ পর্যালোচনা করলে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব এবং বিশালত্ব সম্পর্কে যে কেউই ধারণা করতে পারবেন। প্রসঙ্গক্রমে আরও উল্লেখ্য যে, পদ্মা সেতুর মূল নকশা, পাইলিং ফাউন্ডেশনের নকশা, ভূমিকম্প সহনীয় বিয়ারিং স্থাপন এবং নদী শাসন সংক্রান্ত বিষয়বস্তুসমূহ অত্যন্ত উচ্চমানের বিধায় এবং এগুলির সব কিছুই নতুন নতুন বিশ্ব রেকর্ড বিধায় এই সমস্ত সামগ্রিক বিষয়বস্তুসমূহ আন্তর্জাতিকভাবে পাঠ্য বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

৮৩। পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে জাদুঘর নির্মাণঃ পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এবং নির্মাণসামগ্রী নিয়ে একটি জাদুঘর নির্মাণ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সময়োপযোগী বিধায় তা গুরুত্বের সাথে বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। সবাই জানেন বিগত বছরগুলোতে পদ্মা সেতু নিয়ে অনেক পানি ঘোলা করা হয়েছে। এই সেতুর নির্মাণ কাজ বন্ধ করার জন্য অনেক গুজব রটনা করা হয়েছে। অনেক রকমের কল্পকাহিনী সৃজন করা হয়েছে এবং তা ব্যাপকভাবে প্রচার ও করা হয়েছে। সাঁকোর কার্টুন এঁকে পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে বিভিন্নভাবে ব্যঙ্গ করা হয়েছে এবং হাস্যরসের সৃষ্টি করা হয়েছে। এরই পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক সংবাদ প্রচার করে এবং অপপ্রচারের আশ্রয় নিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তাই পদ্মা সেতু নিয়ে যিনি এবং যারা দিনের পর দিন মিথ্যা কল্পকাহিনী রচনা করেছেন, বিভিন্ন ধরনের অবান্তর এবং অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন উত্থাপন করে আপামর জনগণকে উস্কে দেয়ার চেষ্টা করেছেন – তাদের এই সব অপকর্ম সমূহ নতুন প্রজন্মের কাছে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ঐ সমস্ত অপপ্রচারণামূলক কর্মকাণ্ড সমূহ এবং পত্রপত্রিকা সমূহের প্রতিবেদন ও কার্টুন জাদুঘরে যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করে রাখা আবশ্যক।

৮৪। পদ্মা সেতুর স্বপ্নকে আঁতুড় ঘরেই গলা টিপে হত্যা করার জন্য যিনি এবং যারা দিনের পর দিন প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, দেশ ও জাতির সামনে তাদেরকে চিহ্নিত করে রাখা আবশ্যক। পদ্মা সেতু বিরোধী কতিপয় জ্ঞানতাপস তাদের পাণ্ডিত্যের তেজস্ক্রিয়তা দিয়ে দেশের সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য প্রতিনিয়ত মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালিয়েছেন। দেশের বহুল প্রচারিত ইংরেজী পত্রিকা The Daily Star এবং দৈনিক প্রথম আলো এই সেতুর বিরুদ্ধে যেন অঘোষিত যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। বিভিন্ন ধরনের প্রবন্ধ, নিবন্ধ, আর্টিকেল, কার্টুন এবং দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের কল্পকাহিনী রচনা করে বিগত বছরগুলোতে তারা মিথ্যাকে শিল্পে পরিণত করেছিলেন। তাই এই সব বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে পদ্মা জয়ের সংগ্রামের অদম্য ইতিহাস এবং সেতু নির্মাণের গৌরবগাথা এই জাদুঘরে সংরক্ষণ করা উচিত। এরই পাশাপাশি এই সেতু নির্মাণের সহিত সংশ্লিষ্ট দেশী-বিদেশী যে সমস্ত কর্মকর্তা এবং কর্মচারী অক্লান্ত পরিশ্রম করে আবার কেউবা জীবনের বিনিময়ে এই সেতু নির্মাণে অমূল্য অবদান রেখেছেন তাদের এই অবিস্মরণীয় অবদানের কথাও এই জাদুঘরে সযতনে সংরক্ষণ করা উচিত। উপরন্তু দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে পরবর্তী প্রজন্মের জানার জন্য ও তা সংরক্ষণ করা উচিত। এতে করে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের পূর্বসূরীদের গৌরবগাথা এবং দেশের শত্রু মিত্রদের সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন ধারণা পেয়ে নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করতে পারবেন।

৮৫। পদ্মা সেতু নির্মাণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের মনে বিপুল পরিমাণে আশা উদ্দীপনার সঞ্চার হয়েছে। এই সেতু দেশের দক্ষিণাঞ্চলের পাশাপাশি সারা দেশের সব মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলবে বলে যে কেউ সহজেই বুঝতে পারেন। দেশের কৃষি, শিল্প এবং বাণিজ্য সহ সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যমুনা সেতুর তুলনায় পদ্মা সেতু আরও বিপুল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলে এবং বহুমাত্রিক প্রভাব সৃষ্টি করবে বলে খুব সহজেই অনুধাবন করা যায়। এই সেতু হবে বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং প্রবৃদ্ধির ট্রাম্প কার্ড। এই সেতুর কারণে দেশের জিডিপির আকার ১.২৩% বৃদ্ধি পাবে বলে দেশের বরেণ্য অর্থনীতিবিদগণ তাদের বিভিন্ন পর্যালোচনায় ইতিমধ্যেই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এছাড়া এই সেতু দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বেগবান এবং ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ও বৃদ্ধি করবে বলে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদগণ ইতিমধ্যেই তাদের বিভিন্ন প্রবন্ধ এবং আর্টিকেলে মতামত ব্যক্ত করে চলেছেন। ফলে দেশের নিজস্ব অর্থায়নে বিভিন্ন প্রকল্প প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে আমাদের সক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস আরও অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি করবে বলে আমরা খুব সঙ্গত কারণেই আশা পোষণ করতে পারি।

৮৬। পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দনঃ কেউ মানুন আর নাই মানুন, একথা সত্য যে বঙ্গবন্ধুর পরে বাংলাদেশের মানুষ শেখ হাসিনার মতো একজন সাহসী, দৃঢ়চেতা এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন তথা Visionary leadership পেয়েছেন। তাই বিশ্বব্যাংকের অনিচ্ছা, অনাগ্রহ এবং তাদের বিরোধিতা তিনি অবলীলাক্রমে উপেক্ষা করতে পেরেছেন। এরই পাশাপাশি প্রজ্ঞা, সাহস, দৃঢ়তা এবং দূরদর্শিতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং বিদগ্ধ জ্ঞানতাপসদের সুপারিশকে অগ্রাহ্য করে প্রমত্তা পদ্মার বুকে সেতু নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এই সেতু নির্মাণের মাধ্যমে দেশী-বিদেশী চক্রান্ত এবং ষড়যন্ত্রকারীদেরকে দাঁত ভাঙ্গা জবাব দিতেও তিনি সক্ষম হয়েছেন। তাই এই সেতু আমাদের গর্ব, অহংকার, সক্ষমতা এবং আত্মনির্ভরতার প্রতীক। একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না থাকলে কোনদিনই পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হতো না। এহেন অবস্থায় শত প্রতিকূলতার মাঝেও এই সেতু সফলভাবে নির্মাণ করার পর তা জাঁকজমকভাবে উদ্বোধন করায় শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছে চীন, ভারত, পাকিস্তান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব এবং জাপান। এরই পাশাপাশি অভিনন্দন জানিয়েছে নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা এবং সিঙ্গাপুর। এমনকি বিশ্বব্যাংক এই সেতু বাবদ কোন টাকা অনুমোদন না দিয়ে তাদের প্রতিশ্রুত ঋণচুক্তি বাতিল করা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এবং শেখ হাসিনাকে সাধুবাদ জানাতে তারাও ভুল করেনি। কিন্তু অবিশ্বাস্য এবং আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, পদ্মা সেতু নির্মিত হওয়ায় সারা বিশ্বের বাঙালি এবং বাংলাদেশীরা খুশি হলেও খুশি হতে পারেনি দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং তাদের নেতৃবৃন্দ। দলীয়ভাবে এটি তাদের সংকীর্ণতা এবং হীনমন্যতা কি না তা তারা ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে দেখতে পারেন।

৮৭। পদ্মা সেতুর সুরক্ষা এবং নিরাপত্তাঃ দেশী বিদেশী নানা ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে গত ২৫-০৬-২০২২ ইং তারিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাঁকজমকপূর্ণভাবে পদ্মা সেতু উদ্বোধন করেন। এই সেতু নির্মিত হওয়ায় রাজধানীর সাথে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ টি জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থায় এনে দিয়েছে অভাবনীয় গতি। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিশ্বব্যাংক নিতান্তই অন্যায় এবং অযৌক্তিকভাবে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়ায় দেশের এক শ্রেণীর মানুষ নিদারুণভাবে উল্লসিত হয়েছিলেন। আবার আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণ না করার জন্য তারাই আবার প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দিয়েছেন, নিরুৎসাহিত করেছেন এবং বিরোধিতাও করেছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর প্রবল ইচ্ছায় এবং অফুরন্ত দৃঢ়তায় এই সেতু নির্মিত হয়েছে। পদ্মা সেতুর ব্যাপারে যারা শুরু থেকেই বিরোধিতা করেছেন এবং বৈরী মনোভাব পোষণ করেছেন, সেতুর নির্মাণকাজ চলাকালে তারা বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছেন এবং অপপ্রচার চালিয়েছেন। আবার কখনোবা বিষোদগার ও করেছেন। সেতু নির্মাণের পরেও তাদের এহেন বিরোধিতা অব্যাহত রয়েছে।

৮৮। অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও সত্য যে, পদ্মা সেতু নির্মাণের আগে যারা এই সেতু বিরোধী অপপ্রচার চালিয়েছেন এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ও সম্পৃক্ত ছিলেন, তাদের বংশধর এবং উত্তরসূরী ও ভাবাদর্শে বিশ্বাসীরা এই সেতু নির্মাণের পরেও সেই বিরোধিতা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। তাই এই সেতু সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার দিন তথা গত ২৬-০৬-২০২২ ইং তারিখে বিএনপি -এর অঙ্গ সংগঠন যুবদলের পটুয়াখালী জেলার এক তরুণ নেতা বায়েজিদ তালহা খুবই সাবধানে এবং সুকৌশলে এই সেতুর রেলিং এর নাটবল্টু খুলে ফেলে এবং তা ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। এরই পাশাপাশি জামায়াতের অঙ্গ সংগঠন ছাত্র শিবিরের প্রাক্তন কর্মী মাহাদি হাসান ওরফে মেহেদি ও ঠিক একই কাজ করে। তাদের এহেন দুরভিসন্ধিমূলক এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বর্তমান সরকার এবং দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করার শামিল। এরই পাশাপাশি অত্যন্ত ব্যয়বহুল এই সেতুর গুণগতমান এবং স্থায়িত্ব নিয়ে বিভ্রান্তি ও হাস্যরস সৃষ্টি করার অপপ্রয়াস বলেও বিবেচিত হয়। তাই অনাগত ভবিষ্যতে এই সব দুস্কৃতিকারীদের এহেন পরিকল্পিত অপপ্রয়াস এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড থেকে দেশের অন্যান্য ব্যয়বহুল মেগা প্রকল্পগুলো সহ আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতুর সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি একটু গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত।

৮৯। দেশ-বিদেশের নদ-নদী এবং বিভিন্ন সেতু সম্পর্কে যাদের ধারণা রয়েছে তারা নিশ্চয়ই জানেন পৃথিবীর সবচেয়ে খরস্রোতা নদী হচ্ছে দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন। কিন্তু এই নদীর উপর এখনো পর্যন্ত কোন সেতু নির্মাণ করা হয়নি। অবশ্য এই নদীর একটি শাখা নদীতে ৩৫৯৫ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু বিগত ২০১১ সনে নির্মাণ করা হয়েছে। নদীতে তীব্র স্রোত এবং প্রতি সেকেন্ডে পানি প্রবাহের হিসাব বিবেচনায় সারা বিশ্বে আমাজন নদীর পরেই প্রমত্তা পদ্মা নদীর অবস্থান। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিভিন্ন ধরনের বাধা-বিপত্তি, প্রতিবন্ধকতা এবং দেশি-বিদেশি নানামুখী ষড়যন্ত্র সফলভাবে মোকাবেলা করে এই নদীতে ইতিমধ্যেই চ্যালেঞ্জিং সেতু নির্মিত হয়েছে। এহেন অবস্থায় এই সেতু বিরোধী রথী মহারথীদের পাশাপাশি বখাটে টিকটকারদের বিভিন্ন ধরনের অনভিপ্রেত আচরণ, পরিকল্পিতভাবে নাট-বল্টু খুলে ফেলা, সেতুর মাঝখানে যানবাহন দাঁড়া করিয়ে নানান ভঙ্গিতে ছবি তোলা এবং গাড়ি থেকে নেমে সেতুর উপর নৃত্য করার মতো অসুস্থ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। এহেন অবাঞ্চিত আচার-আচরণ কঠোরভাবে দমন করা আবশ্যক। তাই এই সেতুতে জরুরী ভিত্তিতে একাধিক সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা আবশ্যক। এরই পাশাপাশি সেতুর উপর Speedmeter বসানো দরকার। তদুপরি নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধি করা আবশ্যক। উপরন্তু যে কোন প্রকার নাশকতামূলক এবং অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ও সম্পৃক্ত দুষ্কৃতিকারীদেরকে বিচারের সম্মুখীন করা জরুরী এবং আবশ্যক।

৯০। দেশের আর্থ সামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়নে পদ্মা সেতুর গুরুত্ব এবং অবদানঃ

কৃষিখাতে পদ্মা সেতুর প্রভাবঃ বহুল আকাঙ্ক্ষিত পদ্মা সেতু বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতা এবং সক্ষমতার এক অনন্য প্রতীক। এই সেতুর কারণে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ইতিমধ্যেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। আর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে যানজট এবং ফেরি ঘাটের বিড়ম্বনার অবসান হওয়ায় বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন ধরনের কৃষি পণ্যের পাশাপাশি মাছ ও শাক সবজি অবাধে রাজধানীতে প্রবেশ করতে পারছে। এরই পাশাপাশি সাতক্ষীরা এবং বাগেরহাট অঞ্চলের চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ এবং পান ও সবজি নিয়ে কোন যানবাহনকে আর কখনো পদ্মা পাড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। এহেন অবস্থায় এই সমস্ত পচনশীল মালামাল (Perishable goods) ও দ্রব্যসামগ্রী খুবই অল্প সময়ে পৌঁছে যাচ্ছে রাজধানী শহর ঢাকা সহ দেশের অন্যান্য জেলাসমূহে। তাই দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত এবং উপেক্ষিত থাকলেও বর্তমানে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবেন বলে আশার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ), লেখক ও কলামিস্ট  

(চলবে)

বি/ ইবিটাইমস /এম আর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »