স্বপ্ন এবং চ্যালেঞ্জের পদ্মা সেতু

পর্ব- ৬

 ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ ৬১। শিক্ষিত এবং সচেতন ব্যক্তিগণ অবশ্যই জানেন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত চিলির সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট ড. সালভেদর আলেন্দে এবং বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পিছনে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হেনরি কিসিঞ্জার জড়িত ছিলেন বলে ব্যাপকভাবে জনশ্রুতি রয়েছে। ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মেনাহেম বেগিনকে প্যালেস্টাইনের জনগণ ‘কসাই’ বলে ধিক্কার দেন। বিগত ১৯৭৩ সনে আরব ইসরাইল যুদ্ধের সময় সমগ্র আরব বিশ্বের বিরোধিতা উপেক্ষা করে মার্কিনীদের চাপে এবং হেনরি কিসিঞ্জারের প্রভাবে আরব লীগের পিঠে ছুরিকাঘাত করে মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন। উপরোল্লিখিত সুধীজনদের সবাইকে পরবর্তীকালে একই সঙ্গে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। তাই শান্তি পুরস্কার বিজয়ী উপরোক্ত বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের শান্তির সপক্ষে আদৌ কোন অবদান ছিল কিনা অথবা রয়েছে কিনা – তাদের উপরোক্ত অনুদার, অমানবিক এবং চূড়ান্ত বিবেচনায় অনভিপ্রেত কার্যক্রম সমূহ পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিবেচনা করলে কোন সদুত্তর পাওয়া যায় না। আর তা পাওয়া যায় না বলেই নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানের নিমিত্তে গঠিত নোবেল কমিটি কেমন ধরনের লোকদেরকে পছন্দ করেন এবং বেছে নেন উপরোল্লিখিত বিতর্কিত (?) ব্যক্তিদেরকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদান করায় এতদ সংক্রান্ত ব্যাপারে খুব সহজেই ধারণা করা যায়।

৬২। আমাদের দেশের অভ্যন্তরের এবং সারা বিশ্বের নদ-নদী সম্পর্কে যাদের সম্যক ধারণা রয়েছে তারা নিশ্চয়ই জানেন গতি প্রকৃতির দিক দিয়ে পৃথিবীতে সাতটি বৃহৎ এবং বিচিত্র রূপ ও গতি প্রকৃতির নদ-নদী রয়েছে। এই সব নদ-নদী গুলো হচ্ছে মিশরের নীল নদ, চীনের এক সময়ের দুঃখ বলে পরিচিত হোয়াং হো, কঙ্গো, নাইজার, জাম্বেসী, দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন এবং আমাদের দেশের পদ্মা নদী। এই সব নদ-নদী গুলো এতটাই অশান্ত, উত্তাল, প্রমত্তা এবং ভয়াল প্রকৃতির যে এগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনা অত্যন্ত কঠিন। তীব্র স্রোত এবং অশান্ত গতি প্রকৃতির দিক দিয়ে আমাজনের পরেই পদ্মা নদীর স্থান। এই নদীতে সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে সমীক্ষার সময়ে দেখা যায় যে এই নদী বার বার তার গতি এবং রূপ পরিবর্তন করে থাকে। তাই এই নদীকে বাগে আনাটা অনেক কষ্টসাধ্য এবং ব্যয়সাপেক্ষ ছিল। ইতিপূর্বে এই নদীর বিশালতা এতটাই ব্যাপক ছিল যে নদীর এপাড় থেকে ওপাড় দৃষ্টিসীমার বাহিরে ছিল। এই নদীর বিশেষত্ব হলো বর্ষা মৌসুমের রুদ্র মূর্তি, গভীরতা, ভাঙ্গন প্রবণতা এবং ত্রিমুখী ঘূর্ণিস্রোত। এই নদীর তীব্র ভাঙ্গনে বিস্তীর্ণ জনপদ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদী তীরবর্তী অসংখ্য পরিবার সর্বশান্ত হয়েছে এবং পরিবর্তন হয়ে গেছে আঞ্চলিক-ভৌগলিক মানচিত্র। আর এই প্রমত্তা খরস্রোতা নদীতে এখন শোভা পাচ্ছে দেশের ১৭ কোটি মানুষের প্রাণের স্পন্দন দৃষ্টিনন্দন পদ্মা সেতু। এই সেতু পাল্টে দিতে চলেছে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো এবং চালচিত্র।

৬৩। পদ্মা নদী এবং পদ্মা সেতু সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যঃ একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে এক সময়ের প্রমত্তা পদ্মা নদীর উপর নির্মিত হয়েছে দেশের বৃহত্তম পদ্মা সেতু। এই নদীর উৎপত্তি হিমালয়ের গঙ্গোত্রী হিমবাহ থেকে। এই নদীর ভারতীয় অংশের নাম গঙ্গা। গঙ্গা জল সেদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের নিকট অতি পবিত্র জিনিস হিসেবে বিবেচিত। ভারতের সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশের চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার সীমানা দিয়ে এই নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং পদ্মা নাম ধারণ করেছে। অতঃপর রাজশাহী, কুষ্টিয়া, পাবনা এবং রাজবাড়ী জেলার উপর দিয়ে এই নদী প্রবাহিত হয়েছে। উৎপত্তি স্থল থেকে ২২০০ কিলোমিটার দূরে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া এবং মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার আরিচার সংলগ্ন অর্থাৎ দৌলতদিয়া-আরিচার মধ্যবর্তী স্থানে এই পদ্মা নদী যমুনা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। পরে পদ্মা-যমুনার মিলিত ধারা চাঁদপুরের কাছে মেঘনা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে এবং এই মেঘনা নামেই বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। রাজা রাজবল্লভের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি এই প্রমত্তা পদ্মা খুবই নির্দয়ভাবে গ্রাস করেছে। এহেন গ্রাসের পরিপ্রেক্ষিতে এই নদী “কীর্তিনাশা পদ্মা” নামে অভিহিত হয়েছে। এই বিবেচনায় পদ্মার অপর নাম কীর্তিনাশা ও বটে। দৌলতদিয়া থেকে ভাটির দিয়ে চাঁদপুর পর্যন্ত পদ্মা বরাবরই চির যৌবনা। এই নদীর উথাল পাথাল করা ঢেউ এবং তীব্র স্রোতধারা সব সময়ই বিদ্যমান। এই নদীতে সেতু নির্মাণের সময়ে খরচের কথা মাথায় রাখা হয় এবং কোন্ এলাকায় এই নদীর চওড়া সবচেয়ে কম তা খুবই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। এসব বিবেচনার মাধ্যমে মাওয়া-জাজিরা পয়েন্টকেই প্রকৃষ্ট স্থান হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়। তাই এই পয়েন্টেই সেতু নির্মাণ করা হয়।

৬৪। বাংলাদেশে এই নদীর দৈর্ঘ্য ১২০ কিলোমিটার। প্রস্থ গড়ে ১০ কিলোমিটার। এই নদীর সর্বোচ্চ গভীরতা ১৫৭১ ফুট (৪৭৯ মিটার) এবং গড় গভীরতা ৯৬৮ ফুট (২৯৫ মিটার)। এই নদী স্বাভাবিক সময়েই ১০০ ফুটের মতো গভীর। বর্ষার সময়ে এই গভীরতা আরও বেড়ে যায়। এই নদী দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩৮ হাজার ১২৯ ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়। এই সেতুর দৈর্ঘ্য (মূল সেতু) ৬.১৫ কিলোমিটার। কিন্তু এই সেতুর দুই প্রান্তে উড়ালপথ (Viaduct) ৩.৬৮ কিলোমিটার। এই ভায়াডাক্ট মিলিয়ে সেতুর দৈর্ঘ্য (৬.১৫ + ৩.৬৮) ৯.৮৩ কিলোমিটার। এই সেতুর প্রস্থ ৭২ ফুট। এতে রয়েছে ৪ লেনের সড়ক এবং মাঝখানে রোড ডিভাইডার। এই সেতুর মাওয়া এবং জাজিরা প্রান্তে সংযোগ সড়ক রয়েছে ১৪ কিলোমিটার। এই সেতুতে ভায়াডাক্ট পিলার রয়েছে ৮১ টি।

৬৫। আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতুতে মোট পিলার রয়েছে ৪২ টি। তন্মধ্যে নদীবক্ষে ৪০ টি এবং দুই প্রান্তে দুইটি পিলার রয়েছে। এছাড়া পাইল রয়েছে ২৯৪ টি। এই পাইল গুলির মধ্যে মাটির জটিলতার কারণে ২২ টি পিলারের প্রত্যেকটিতে ৭ টি করে (২২ x ৭) ১৫৪ টি পাইল রয়েছে। অন্য ১৮ টি পিলারের প্রত্যেকটিতে (১৮ x ৬) ১০৮ টি পাইল রয়েছে। এছাড়া দুই প্রান্তের দুইটি পিলারের প্রত্যেকটিতে ১৬ টি করে (১৬ x ২) ৩২ টি পাইল রয়েছে। এই সেতুতে মোট Lamp post রয়েছে ৪১৫ টি। তন্মধ্যে মূল সেতুতে ৩২৮ টি এবং ভায়াডাক্টে ৮৭ টি। এই সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে প্রকল্প এলাকায় প্রায় ১৪ কিলোমিটার নদী শাসন করতে হয়েছে। তন্মধ্যে মাওয়া এলাকায় ১.৬ কিলোমিটার এবং জাজিরা এলাকায় ১২.৪ কিলোমিটার। এছাড়া এই সেতুর জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছে ২,৬৯৩.২১ হেক্টর জমি। এই সেতুর স্থায়িত্বকাল তথা Design life নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ বছর [দ্রষ্টব্যঃ আমাদের অর্থে আমাদের পদ্মা সেতু- এ কে আব্দুল মোমেন; সূত্রঃ এক নজরে পদ্মা সেতু (পরিমার্জিত দ্বিতীয় সংস্করণ) জুলাই, ২০২২, পৃষ্ঠা নং ৩৬৪]।

৬৬। পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে বিধায় ব্যাপকভাবে দুর্নীতি হয়েছে বলে বিএনপি নেতৃবৃন্দ বিরামহীনভাবে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অবগতির জন্য বলা আবশ্যক যে আমাদের দেশের পদ্মা নদী অন্যান্য নদীগুলির মতো নয়। এই নদীর গতি প্রকৃতি অনেক বৈচিত্র্যময় এবং খরস্রোতা। এই নদীর স্রোত যেমন বৈচিত্র্যময়, নদীর ঠিক তলদেশেও রয়েছে নানা রকম বৈচিত্র্যময় মাটির গঠন। স্রোত এবং বৈচিত্র্যের দিক দিয়ে এই নদী অনেকটা দক্ষিণ আমেরিকা তথা ব্রাজিলের আমাজন নদীর মতো। তাই নদীর বৈচিত্র্য এবং সেতুর স্থায়িত্বের কথা চিন্তা করে এই সেতুতে খাঁজ কাটা (ট্যাম্প) পাইল স্থাপন করা হয়। যা পৃথিবীর অন্য কোন সেতুতে করা হয়নি। পদ্মা সেতুর ১১ টি খুঁটিতে বিশেষ পদ্ধতিতে ৭৭ টি টিউব ওয়ার্কশপে খাঁজ কেটে ৩ মিটার ডায়ামিটারের প্রতিটি পাইল টিউবে ১০ টি করে খাঁজ লাগানো হয়। এই খাঁজ দিয়েই সিমেন্টের মিশ্রণ চলে যায় নদীর তলদেশের নরম মাটিতে। এই বিশেষ সিমেন্টের মিশ্রণ মাটিকে শক্ত ভিতে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। ১১ টি খুঁটিতে এমন বিশেষ ৭৭ টি পাইল বসানো হয়।

৬৭। অতি সম্প্রতি ভারতে নির্মাণ করা হয়েছে ভূপেন হাজারিকা সেতু। এই সেতুটি এখনো পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘতম সেতু। এই সেতুর দৈর্ঘ্য ৯.১৫ কিলোমিটার। পক্ষান্তরে দুই প্রান্তের ৩.৬৮ কিলোমিটার উড়ালপথ (Viaduct) ব্যতিরেকে পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার। সুতরাং মূল সেতুর দৈর্ঘ্য বিবেচনায় ভূপেন হাজারিকা সেতুর চেয়ে পদ্মা সেতু ছোট হলেও এই সেতুর নির্মাণ ব্যয় অনেক বেশি। এই ব্যয় কেন বেশি তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। অনেকেই এই সেতু নির্মাণে খুবই যত্নের সাথে এবং আগ্রহ সহকারে দুর্নীতির সন্ধান করে বেড়াচ্ছেন। দুর্নীতির কাল্পনিক অভিযোগ উত্থাপন করার পর অনেক চেষ্টা করেও বিশ্ব ব্যাংক তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে তাদেরই ইঙ্গিতে এবং প্ররোচনায় কানাডার আদালতে দাখিল করা মামলাটিও খারিজ হয়ে গিয়েছে। এমনকি দুদক কর্তৃক বাংলাদেশের আদালতে দাখিলকৃত মামলা থেকেও উক্ত মামলার সবকয়জন আসামীই বেকসুর খালাস পেয়েছেন। এহেন অবস্থায় কোন প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করার জন্য কিংবা কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য কেউ যদি পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির গন্ধ পান এবং তা জনসমক্ষে তুলে ধরতে চান, যথোপযুক্ত তথ্য প্রমাণাদি সহকারে তিনি তা উত্থাপন করতে পারেন। তবে এহেন তথ্য প্রমাণাদি উপস্থাপন করার সময়ে পদ্মা সেতু এবং ভূপেন হাজারিকা সেতুর নির্মাণশৈলী, সেতুতে ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও কারিগরি মান এবং এই দুই সেতুর গুণগতমান সহ সামগ্রিক পরিবেশ, পরিস্থিতি এবং পারিপার্শ্বিকতা সংক্রান্ত বিষয়বস্তুসমূহ একটু গুরুত্ব সহকারে ভেবে দেখতে পারেন।

৬৮। পদ্মা সেতু এবং ভূপেন হাজারিকা সেতুর মধ্যে কারিগরি, প্রযুক্তিগত এবং গুণগত মানের পার্থক্যসমূহঃ

ক) ভূপেন হাজারিকা সেতুর পাইল লোড মাত্র ৬০ টন। সেখানে পদ্মা সেতুর পাইল লোড ৮ হাজার ২০০ টন। ভারতের ওই সেতুর একেকটি পিলার ১২০ টনের। আর পদ্মা সেতুর একটি পিলার ৫০ হাজার টনের। সে হিসেবে ভারতের সেতুটির চেয়ে পদ্মা সেতু ১৩৩ গুণ বেশি শক্তিশালী।

খ) বিশ্বের আর কোনও সেতু তৈরিতে পদ্মার মতো নদীর এত তলদেশে গিয়ে পাইল গাঁথতে হয়নি, বসাতে হয়নি এত বড় পিলার। আর পদ্মার মতো স্রোতস্বিনী এমন নদীর উপর বিশ্বে সেতু হয়েছে মাত্র একটি। পদ্মা সেতু তার অনন্য বৈশিষ্ট্যের জন্য বিশ্বে সব চেয়ে ব্যতিক্রমী সেতু হবে। কারণ খরস্রোতার দিক দিয়ে আমাজন নদীর পরই বিশ্বে বাংলাদেশের পদ্মা নদীর অবস্থান, যার উপর দিয়ে সেতু করা হয়েছে।

গ) পদ্মা সেতুর মতো দ্বিতল (গাড়ি ও ট্রেন) সেতু পৃথিবীতে হাতেগোনা কয়েকটি আছে। আর দুই লেনের ভূপেন হাজারিকা সেতুর উদাহরণ পৃথিবীতে কয়েক শ পাওয়া যাবে। পদ্মা নদীর শুধু মাওয়া পয়েন্টে মাত্র ২০ সেকেন্ডে যে পানি প্রবাহিত হয় তা রাজধানী ঢাকার সারা দিনের যত পানি লাগে তার সমান। হিসাবমতে, পদ্মা নদীতে প্রতি সেকেন্ডে ১ লাখ ৪০ হাজার ঘন মিটার পানিপ্রবাহ রয়েছে। পানিপ্রবাহের দিক বিবেচনায় বিশ্বে আমাজন নদীর পরেই এই প্রমত্তা পদ্মা।

ঘ) পদ্মা নদীতে পাথরের স্তর মিলেছে ১০ কিলোমিটার গভীরে। বিশ্বের অন্যান্য নদী ও নদীর উপর যেসব সেতু আছে সেগুলোর কোনটিরই পাথরের স্তর এত নিচে নয়। এ কারণে ৪০০ মিটার গভীরে পাইল নিয়ে যেতে হয়েছে, যা পৃথিবীর সেতু নির্মাণে বিরল ঘটনা। একেকটি পাইলের ওজন ৮ হাজার ২০০ টন। আর পাইল এত গভীরে গিয়েছে যে– ভেতরে এটি ৪০ তলা ভবনের সমান হবে।

ঙ) পদ্মা সেতুর পাইল নদীর তলদেশে নিতে যে হ্যামার লেগেছে, সেটি বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোলিক হ্যামার। পৃথিবীর কোথাও আর কোন সেতুতে এমন শক্তিশালী হ্যামার ব্যবহৃত হয়নি। এই হ্যামারটি জার্মানি থেকে বিশেষ অর্ডারে তৈরি করে আনা হয়েছিল। [দ্রষ্টব্যঃ আমাদের অর্থে আমাদের পদ্মা সেতু- এ কে আব্দুল মোমেন; সূত্রঃ পদ্মা সেতু নিয়ে ষড়যন্ত্রঃ এখনও চলছে- সুভাষ সিংহ রায় (পরিমার্জিত দ্বিতীয় সংস্করণ) জুলাই, ২০২২, পৃষ্ঠা নং ২৬২]।

৬৯। প্রকৌশলী এবং অধ্যাপকদের দৃষ্টিতে পদ্মা সেতু বনাম ভূপেন হাজারিকা সেতুঃ অতি সম্প্রতি দেশের একজন প্রখ্যাত প্রকৌশলী এবং অর্থনীতির দু’জন বিশিষ্ট অধ্যাপক সম্মিলিতভাবে “পদ্মা সেতু বনাম ভূপেন হাজারিকা সেতু” শিরোনামে একটি জ্ঞানগর্ভ আর্টিকেল লিখেছেন। তাদের উক্ত আর্টিকেলে তারা উল্লেখ করেছেন– “শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পদ্মা সেতু প্রকল্পকে বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা বিদ্যমান ছিল। এর মধ্যে দু’টি বহুল আলোচিত বিষয় হচ্ছে- ১। বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃক উত্থাপিত দুর্নীতির ষড়যন্ত্র এবং ২। পদ্মা সেতুর নির্মাণ ব্যয়। প্রথম অভিযোগটি প্রমাণিত হয়নি। এমনকি কানাডার আদালতে ও হালে পানি পায়নি। … বলা হচ্ছে ভূপেন হাজারিকা সেতুর দৈর্ঘ্য ৯.১৫ কিলোমিটার। যা সম্পূর্ণ ভুল তথ্য। প্রকৃত পক্ষে লোহিত নদীর উপরে অর্থাৎ জলের উপরে মূল সেতুর দৈর্ঘ্য মাত্র ৪ কিলোমিটার। ভূপেন হাজারিকা সেতুর দুই প্রান্তে তীর সংলগ্ন নিচু জমির (নদীর ফ্ল্যাট প্যানের) উপর নির্মিত দু’টি ভায়াডাক্ট বা উড়াল সড়ক রয়েছে। ২.৬ কিলোমিটার ঢোলা প্রান্তে এবং ২.৫৫ কিলোমিটার সাদিয়া প্রান্তে। অর্থাৎ মোট (২.৬০ + ২.৫৫) ৫.১৫ কিলোমিটার উড়ালসড়ক বা ভায়াডাক্ট সহ ভূপেন হাজারিকা সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ৯.১৫ কিলোমিটার [তথ্যসূত্রঃ ড. পি. ভি. চন্দ্র মোহন, নবযুগ ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড, সেতুর নির্মাতা, এনবিএমসিডাবি-ও ডট কম]। অন্যদিকে জলের উপর নির্মিত পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার। ভায়াডাক্ট ৩.৬৯ কিলোমিটার সহ পদ্মা সেতুর মোট দৈর্ঘ্য ৯.৮৪ কিলোমিটার। কাজেই মূল সেতুর দৈর্ঘ্যের তুলনায় পদ্মা সেতু ভূপেন হাজারিকা সেতুর চাইতে ২.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘতর। আর ভায়াডাক্টসহ পদ্মা সেতু ভূপেন হাজারিকা সেতুর চেয়ে ০.৬৯ কিলোমিটার বেশি দীর্ঘ।”

৭০। উপরোল্লিখিত সেতু দু’টির সাথে পার্থক্য নিরূপণ করতে গিয়ে তারা উপরোক্ত আর্টিকেলে আরও উল্লেখ করেছেন– “ভারতীয় সেতুটির পাশাপাশি পদ্মা সেতুর কিছু বৈশিষ্ট্য বিচার করলেই অভিযোগ উত্থাপনকারীদের যুক্তির অসারতা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হবে।

প্রথমতঃ ভূপেন হাজারিকা সেতু দুই লেন বিশিষ্ট (একতলা) সড়ক সেতু। পদ্মা সেতু একটি সড়ক ও রেলপথ সেতু। দুই তলা বিশিষ্ট পদ্মা সেতুর উপরে চার লেন সড়ক সেতু এবং নিচে রেল চলাচলের ব্যবস্থা। তা ছাড়াও অনেক বেশি লোড ও সৃষ্ট ভাইব্রেশনের কারণে রেল সেতুর নির্মাণ কৌশল অনেক জটিল এবং ব্যয় শুধু সড়ক সেতুর চেয়ে অনেকগুণ বেশি।

দ্বিতীয়তঃ যদিও ভূপেন হাজারিকা সেতু ১৩.২ মিটার চওড়া কিন্তু মোট ক্যারেজ ওয়ে ১০.৫ মিটার যার দু’পাশে ০.৯ মিটার চওড়া দু’টি ফুটপাত রয়েছে। অর্থাৎ সেতুর ভার বহনকারী অংশ ১০.৫ মিটার চওড়া। এর বিপরীতে পদ্মা সেতুর প্রস্থ ১৮.১৮ মিটার। যার সবটাই ভার বহনকারী।

তৃতীয়তঃ ভূপেন হাজারিকা সেতুর প্রতি পাইলের লোড ক্ষমতা ৫২০ টন। আর পদ্মা সেতুর প্রতি পাইলের লোড ক্ষমতা ৮,২০০ টন।

চতুর্থতঃ ভূপেন হাজারিকা সেতুর ওজন নেয়ার ক্ষমতা ৬০ টন (ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্যাটল ট্যাংক -এর জন্য)। পক্ষান্তরে পদ্মা সেতু ১০ হাজার টন ওজন নেয়ার ক্ষমতা সম্পন্ন (মূলত রেলের কারণে)।

পঞ্চমতঃ ভূপেন হাজারিকা সেতুর একটি পিলারের ভার বহন ক্ষমতা ১৩২০ টন। আর পদ্মা সেতুর প্রতি পিলারের ভার বহন ক্ষমতা ৫০ হাজার টন।

ভূপেন হাজারিকা সেতু নির্মাণে ব্যবহৃত পাইলের দৈর্ঘ্য মাত্র ৪০ মিটার। পক্ষান্তরে পদ্মা সেতুতে ব্যবহৃত বিশ্বের গভীরতম পাইল ভূগর্ভে ১২২ – ১২৫ মিটার পর্যন্ত প্রোথিত। উপরোক্ত তথ্য উপাত্ত থেকে এটি প্রতীয়মান হয় যে পদ্মা সেতু নির্মাণের ভূ-প্রকৃতিগত ও ভূতাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ সমূহের মাত্রা ভূপেন হাজারিকা সেতুর চেয়ে অনেক গুণ বেশি। পদ্মা সেতু যদি হিমালয় হয় তবে তার তুলনায় ভূপেন হাজারিকা সেতু একটি টিলা বা বড়জোর পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি পাহাড়ের সমান। সুতরাং দু’টি সেতু কোন মতেই তুলনীয় নয় এবং সেতু দু’টির সর্বমোট ব্যয় বা প্রতি কিলোমিটার ব্যয়ের তুলনা অজ্ঞতাপ্রসূত প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয় [দ্রষ্টব্যঃ পদ্মা সেতু বনাম ভূপেন হাজারিকা সেতু- সায়্যিদ চৌধুরী, মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, মোঃ আবদুর রশিদ সরকার, দৈনিক জনকণ্ঠ, ৩১-০৭-২০২২ এবং ০১-০৮-২০২২, লেখকবৃন্দ- প্রকৌশলী ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক, সিডনি অস্ট্রেলিয়া। অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত সহযোগী অধ্যাপক ইউনিভার্সিটি অফ কুইন্সল্যান্ড, ব্রিসবেন, অস্ট্রেলিয়া। অর্থনীতির অধ্যাপক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়]।”

৭১। পদ্মা নদীর মাটির তলদেশের বৈচিত্র্যময় গঠনের কথা চিন্তা করে ১৪টি পিলারের ডিজাইন পরিবর্তন করে নতুন নকশা করা হয়। এই ১৪টি পিলারের মধ্যে ৪টি পিলারের নিচের মাটির নরম অংশ নিয়ে চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়। ফলে প্রতিটি পিলারে ৬ টির পরিবর্তে ৭টি করে পাইল স্থাপন করা হয়। এই পাইল স্থাপনের জন্য ৫ টি হাইড্রোলিক হ্যামার সেতুর প্রকল্প এলাকায় আনা হয়। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ৩৫০০ কিলো জুল সক্ষমতার এই ৫ টি হ্যামার পদ্মা সেতুর পাইল ড্রাইভ কাজে যুক্ত রেখে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পাইল গুলি স্থাপন করা হয়। অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন Panel of expert team এই পাইলিং কার্যক্রম গভীর মনোযোগ সহকারে খুবই সফলতার সাথে সম্পন্ন করেন। বিশিষ্ট পানি এবং নদী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত পদ্মা সেতু প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই Expert team তথা বিশেষজ্ঞ প্যানেলের অন্যতম সদস্য ছিলেন এবং এখনো রয়েছেন। অসীম ধৈর্য এবং বিপুল পরিশ্রমের মাধ্যমে উপরোক্ত Expert team এর তত্ত্বাবধানে এই পাইলিং কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। এহেন ধৈর্য, আন্তরিকতা এবং পরিশ্রমের প্রতিদানে প্রশংসার পরিবর্তে যদি নিন্দা-মন্দ এবং তীব্র সমালোচনা শুনতে হয়, তাহলে এর চেয়ে দুঃখের এবং দুর্ভাগ্যের আর কিছুই হতে পারে না।

৭২। পদ্মা নদীর উপর সেতু নির্মাণ করার নিমিত্তে “… সেতুর পাইলিং করতে গিয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে নানা ধরনের কারিগরী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। এক্ষেত্রে স্রোত যেমন চ্যালেঞ্জ ছিল তেমনি চ্যালেঞ্জ ছিল গভীরতা ও। যে কোন নদীরই একেক অংশের গভীরতা একেক রকম। যেখানে সেতুটি নির্মিত হচ্ছে, সেখানে এর গভীরতা প্রায় ৪০ মিটার বা ১৩১ ফুট। অর্থাৎ ১৩ তলা ভবনের উচ্চতার সমান। আবার ১৩ তলা উচ্চতার সমান দৈর্ঘ্যের কলাম দিলেই হবে না, এই দৈর্ঘ্য দিয়ে তো কলাম বা পিলারগুলো কেবল নদীর তলদেশ ছুঁতে পারবে। তলদেশে পিলারগুলো গাঁথতে না পারলে স্রোতেই ভেসে যাবে সেতুটি। এখানে হলো আরেক চ্যালেঞ্জ। পদ্মার তলদেশ বেলে ও পলিমাটি দিয়ে গঠিত। ফলে পিলার গাঁথার মতো শক্ত ভিত পেতে তলদেশ ফুঁড়ে বেশ অনেকটা গভীরে যেতে হবে। এক্ষেত্রে নদীর তলদেশের মাটি সরে যাওয়ার আশংকা এবং প্রবণতা মাথায় রেখে পিলার স্থাপন করতে হয়েছে। পদ্মার এই মাটি সরে যাওয়ার বা স্কাওয়ারের সর্বোচ্চ রেকর্ড হলো ৬১ মিটার বা ২১০ ফুট। অর্থাৎ নিরাপদ ভিত পেতেই ২১ তলা ভবনের উচ্চতার সমান দৈর্ঘ্যের পিলার গাঁথতে হবে সেখানে। অর্থাৎ পিলারের দৈর্ঘ্য হতে হবে (১৩ + ২১) ৩৪ তলা ভবনের উচ্চতার সমান। কিন্তু নিরাপদ ভিত পর্যন্ত শুধু পৌঁছালেই হবে না। এতদিন মাটি সরে যাওয়ার রেকর্ড ৬১ মিটার ছিল বলে আজীবন তাই থাকবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। পদ্মা নতুন রেকর্ড করতেই পারে এবং তা সেতুর স্থানটিতেই হতে পারে। তাই নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে পিলারগুলো আরও অনেকটা গভীরে গাঁথতে হয়েছে। কারণ বছর বছর তো আর পদ্মার উপর সেতু নির্মাণ করা যাবে না। তাই গড়ে ১২০ মিটারের পাইল দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চটি ১৫০.১২ মিটার বা ৪৯২.৫ ফুট। অর্থাৎ সেতুটি নির্মাণের জন্য প্রায় ৫০ তলা ভবনের উচ্চতার সমান দৈর্ঘ্যের পিলার স্থাপন করতে হয়েছে [দ্রষ্টব্যঃ বাধা পেরিয়ে যেভাবে নির্মিত হলো- কাওসার রহমান; দৈনিক জনকণ্ঠ (বিশেষ সংখ্যা); ২৫-০৬-২০২২]।”

৭৩। উপরোল্লিখিত একই আর্টিকেলে কাওসার রহমান আরও উল্লেখ করেছেন – “…এসব কারণে পরিবর্তন করতে হয়েছে সেতুর নকশার। এতে সময় ক্ষেপণ হয়েছে। কারিগরি কারণে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন, পরিবর্ধন এবং সংযোজন করতে গিয়ে সময় ক্ষেপণের জন্য নির্মাণ ব্যয়ের প্রাক্কলন ও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ২০১১ সালে প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০১৬ সালে এই ব্যয় গিয়ে দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ২০১৮ সালে মূল সেতু, নদী শাসন, জমি অধিগ্রহণ, দুই পাড়ে সংযোগ সড়ক নির্মাণ, পুনর্বাসন এবং কর্মীদের বেতন- এসব মিলিয়ে তৃতীয়বারের মতো পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এই সেতু প্রকল্পে ৪ (চার) হাজার কর্মী কাজ করেছে। ২০০৭ সালে মার্কিন ডলার ও টাকার বিনিময় হার ছিল ৬৮.৬৫ টাকা। অর্থাৎ ১ মার্কিন ডলারের মূল্য ছিল ৬৮.৬৫ টাকা। ২০১৮ সালে এই হার হয় ৮৪.৮০ টাকা। ডলারের এই মূল্য বৃদ্ধির কারণেও প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ৬.১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৮.২ মিটার প্রস্থের পদ্মা বহুমুখী সেতু বাংলাদেশের যে কোন নদীর উপর নির্মিত সবচেয়ে বৃহৎ সেতু। সেতুটি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং এবং শরীয়তপুরের জাজিরাকে সংযুক্ত করেছে। পানির স্তর থেকে সেতুর উচ্চতা হয়েছে ৬০ ফুট। মোট পিলার ৪২ টি। সেতুটি নির্মিত হয়েছে কংক্রিট ও স্টিল সামগ্রী দিয়ে। প্রতিটি পিলারের জন্য পাইলিং ৬ টি। এই পাইলিংয়ের সংখ্যা ২৯৪ টি। পাইলিংয়ের গভীরতা ৩৮৩ ফুট। পদ্মা সেতুতে সড়ক এবং রেলপথ ছাড়াও আরও আছে গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং অপটিক্যাল ফাইবার লাইন পরিবহণ সুবিধা। সেতুর জন্য ৯১৮ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। পদ্মা সেতুতে পদ্মার দুই পাড়ের জমির মালিক ও জনগণের অবদান অপরিসীম। সকলেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে।”

৭৪। সুতরাং একথা সত্য যে, ড. ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিগত ২০০৭ সনের আগস্ট মাসে প্রথমবারের মতো পদ্মা সেতুর প্রাক্কলিত ব্যয় ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা অনুমোদিত হয়। ঐ সময়ে এই সেতুতে রেল লাইন স্থাপনের জন্য কোন সিদ্ধান্ত কিংবা পরিকল্পনা ছিল না। উপরন্তু ঐ সময়ে পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য নিরুপণ করা হয়েছিল ৫.৫৮ কিলোমিটার। কিন্তু ২০১০ সনের জানুয়ারি মাসে এই সেতুর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (Development Project Proposal) সংশোধন করে এই সেতুতে রেললাইন স্থাপনের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এছাড়া সেতুর দৈর্ঘ্য ৫.৫৮ কিলোমিটারের স্থলে ৬.১৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়। উপরন্তু প্রথম DPP -তে এই সেতুর ৪১ টি স্প্যানের মধ্যে ৩ টির নিচ দিয়ে নৌযান চলাচলের ব্যবস্থা রেখে নকশা করা হয়েছিল। পরে উপরোক্ত ৩ টির স্থলে ৩৭ টি স্প্যানের নিচ দিয়ে নৌযান চলাচলের সুযোগ সংযোজন করা হয়। এছাড়া কংক্রিটের বদলে ইস্পাত বা স্টিলের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরই পাশাপাশি সেতু নির্মাণের জন্য পাইলিংয়ের ক্ষেত্রেও বাড়তি গভীরতা তথা সেতুর পাইলিংয়ের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদেরকে পুনর্বাসনের ব্যয় ও বৃদ্ধি করা হয়। এহেন অবস্থায় সেতু প্রকল্পের ব্যয় ও বেড়ে দাঁড়ায় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা।

৭৫। সচেতন দেশবাসীর জানা আবশ্যক যে “… পদ্মা সেতুর নকশা করেছেন হংকং -এর প্রকৌশলী ড. রবিন স্যাম। সেতুর নির্মাণকাজের তদারকির নেতৃত্ব দেন নিউজিল্যান্ডের নাগরিক রবার্ট জন এভস। আর নদী শাসনের নক্সা প্রণয়নে ছিলেন কানাডার ব্রুস ওয়ালেস। এ কাজে আরও ছিলেন জার্মানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৌশলীরাও। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক প্রকৌশলী কেন হুইলার ডিজাইন ব্যবস্থাপক হিসেবে, নিউজিল্যান্ডের নাগরিক প্রকৌশলী রবার্ট জন এভস প্রধান তদারকি পরামর্শক হিসেবে, অস্ট্রেলিয়ার প্রকৌশলী ডেরিক কিরবি স্থাপত্যবিদ হিসেবে, ব্রিটিশ নাগরিক (পরবর্তীতে নিউজিল্যান্ডের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন) প্রকৌশলী ক্রিস্টোফার জন থমাস টলি কন্ট্রাক্ট স্পেশালিস্ট হিসেবে, কানাডার নাগরিক প্রকৌশলী ব্রস ওয়ালেস নদী শাসনে ডিজাইন প্রকৌশলী হিসেবে, জার্মানির নাগরিক প্রকৌশলী কুনুট ওভারহাগম্যান নদী শাসনের টিম লিডার, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক প্রকৌশলী ডেভিন রয় নদী শাসনে ডেপুটি প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে, ব্রিটিশ নাগরিক সেতু বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী মাইকেল জন কিং, চীনের নাগরিক প্রকৌশলী লিউ জিনহুয়া প্রকল্প ব্যবস্থাপক (কন্ট্রাক্টর- মূল সেতু) হিসেবে, চীনের নাগরিক প্রকৌশলী সুন সুলিয়াং প্রকল্প ব্যবস্থাপক (কন্ট্রাক্টর- নদী শাসন) হিসেবে কাজ করেন [দ্রঃ নিজস্ব উদ্ভাবনী নির্মাণশৈলীতেই আলোর মুখ দেখল- মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল; দৈনিক জনকণ্ঠ (বিশেষ সংখ্যা); ২৫-০৬-২০২২]।”

ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ), লেখক ও কলামিস্ট  

(চলবে)

বি/ ইবিটাইমস /এম আর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »