খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শুভ বড়দিন (ক্রিসমাস)
কবির আহমেদঃ আজ শনিবার দিবাগত রাতে পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের (ক্যাথলিক) প্রধান ধর্মীয় উৎসব ক্রিসমাস (বাংলায় বড়দিন) পালন করছে। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন এই দিনে মধ্যপ্রাচ্যের জেরুজালেমের বেথেলহামে যীশু খ্রিস্টের (হযরত ঈসা আ:) জন্ম হয়। অবশ্য রাশিয়া সহ পূর্ব ইউরোপের কিছু দেশ এবং আফ্রিকার কিছু দেশের অর্থোডক্স খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা জানুয়ারির ৬ তারিখ ক্রিসমাস পালন করে থাকেন।
আজ বিশ্বের অধিকাংশ খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে খুশির দিন। আনন্দ-হাসি-গানে আজ প্রাণ মিলবে প্রাণে। গির্জায় গির্জায় হবে প্রার্থনা। মানবতার কল্যাণে যিশুখ্রিষ্টের শান্তির বাণী ছড়িয়ে যাবে মানুষে মানুষে। আলোকসজ্জা, ক্রিসমাস ট্রি আর সান্তাক্লজের উপহারে মেতে উঠবে শিশুরা। এই ক্রিসমাস ট্রি অবশ্য খ্রিস্টান ধর্মের প্রথম দিকে ছিল না।
ক্রিসমাসের দিন ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে ক্রিসমাস ট্রি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে মনে করেন যে ক্রিসমাস ট্রি খুবই শুভ জিনিস। বলা হয়, কয়েক শতাধিক বছর আগে সম্ভবত ১৬০০ শতকে উত্তর ইউরোপের জার্মানিতে প্রথম ক্রিসমাস ট্রি সাজানোর প্রথা শুরু হয়। কারণ এই গাছকে সুখ ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে ধরা হত। দেবদারু জাতীয় চিরসবুজ ফার গাছকে ক্রিসমাস ট্রি হিসেবে সাজানো হত। সেখানকার মানুষরা বিশ্বাস করতেন, এই গাছ অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটায়। সেই থেকেই ক্রিসমাস ট্রি বড়দিনের অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। ক্রিসমাস ট্রি ছাড়া বড়দিন বা ক্রিসমাস উৎসব অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী প্রায় দুই হাজার বছর আগে এ শুভ দিনেই জন্মগ্রহণ করেন খ্রিষ্ট ধর্মের প্রবর্তক যিশুখ্রিষ্ট। বেথেলহেমের এক গোয়ালঘরে কুমারী মাতা মেরির কোলে জন্ম হয়েছিল তার। খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, মানবজাতিকে সত্য, সুন্দর ও ন্যায়ের পথে পরিচালিত করতে যিশুর জন্ম হয়। ‘ঈশ্বরের আগ্রহে ও অলৌকিক ক্ষমতা’য় মা মেরি কুমারী হওয়া সত্ত্বেও গর্ভবতী হন।
ঈশ্বরের দূতের কথামতো শিশুটির নাম রাখা হয় যিশাস, বাংলায় বলা হয় ‘যিশু’। শিশুটি কোনো সাধারণ শিশু ছিল না। ঈশ্বর যাকে পাঠানোর কথা বলেছিলেন মানবজাতির মুক্তির জন্য। যিশু নামের সেই শিশুটি বড় হয়ে পাপের শৃঙ্খলে আবদ্ধ মানুষকে মুক্তির বাণী শোনান। তাই তার জন্মদিনটিকে ধর্মীয় নানা আচার ও উৎসবের মধ্য দিয়ে উদ্যাপন করেন তারা। এটি তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব।
আজ বিশ্বের নানা দেশের মতো বাংলাদেশের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ও পালন করছে এ উৎসব। বড়দিন উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। তারা এতে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষকে শুভেচ্ছা জানান। বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’-এ মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে আমরা সবাই একসঙ্গে উৎসব পালন করি।
আমাদের সংবিধানে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে সবাই মিলে মুক্তিযুদ্ধ করে আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি। তাই এ দেশ আমাদের সবার। বাংলাদেশ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের নিরাপদ আবাসভূমি।
কোভিড-১৯ প্রেক্ষাপটে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এবারের বড়দিন উৎসব উদযাপনের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের দেশ ও জাতি তথা বিশ্ববাসীকে এ মহামারি থেকে যেন মুক্তি দেন-এ প্রার্থনা করি।
বড়দিন উপলক্ষ্যে গির্জাগুলো সাজানো হয়েছে রঙিন বাতিতে। সকালে সেখানে বিশেষ প্রার্থনা দিয়ে দিনের শুরু হবে আজ। গির্জায় ধর্মীয় গান হবে। এছাড়া নানা আয়োজন করেছেন যিশুভক্তরা। ঘরে ঘরে জ্বালানো হয়েছে রঙিন আলো। সাজানো হয়েছে ক্রিসমাস ট্রি। যিশু গোয়ালঘরে জন্মেছিলেন বলে তার অনুসারীরা ঘরে ঘরে প্রতীকী গোশালা তৈরি করেছেন। পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মেলবন্ধনের এদিনে অনেকে বেড়াতে যাবেন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে।
বড়দিনের উৎসব ঘিরে আনন্দমুখর আয়োজনে পিছিয়ে নেই ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরের অভিজাত হোটেলগুলো। রঙিন বাতি, ফুল আর প্রতীকী ক্রিসমাস ট্রিতে সাজানো হয়েছে বড়দিন। দিবসটি উপলক্ষ্যে আজ সরকারি ছুটির দিন। সংবাদপত্রগুলো দিনটিতে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ বেতার, সরকারি-বেসরকারি টিভি ও রেডিওতে দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্র্রচার করা হচ্ছে।
ইউরো বাংলা টাইমসের পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী পাঠক-পাঠিকাদের প্রতি রইল ক্রিসমাস বা বড়দিনের শুভেচ্ছা।
বি /ইবিটাইমস