পর্ব-৫
ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ ৪৬। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনুস দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ ব্যাংকের এম ডি ছিলেন। ব্যাংকের চাকরির বয়স অতিক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি দীর্ঘকাল ধরে এম ডি পদ আঁকড়ে ছিলেন। কিন্তু নির্ধারিত বয়সসীমা উত্তীর্ণ হওয়ায় এবং দেশে প্রচলিত আইনের পাশাপাশি ব্যাংকের চাকরির বিধিবিধান অনুযায়ী ও তিনি তার ঐ বয়সে ব্যাংকের চাকরিতে নিয়োজিত থাকার যোগ্যতা হারিয়েছিলেন বিধায় তথা উক্ত চাকরিতে তিনি তখন যোগ্য বলে বিবেচিত না হওয়ার তাকে এই পদ ছাড়তে হয়। এহেন অবস্থায় তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে প্রতিকার প্রার্থনা করেন। দেশের স্বনামধন্য আইনজীবী ড. কামাল হোসেনকে নিয়োজিত করেও তিনি উক্ত মামলায় পরাজিত হন। কিন্তু তার এহেন পরাজয়কে তিনি নিজে এবং তার অন্ধ সমর্থকগণ কোনভাবেই মেনে নিতে পারেননি। এমতাবস্থায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এবং ইংল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের স্ত্রী চেরি ব্লেয়ারকে দিয়ে তিনি শেখ হাসিনার নিকট তদবির করেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি আর এম ডি পদে পুনর্বহাল হতে পারেননি। ফলে ড. ইউনুস শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের প্রতি প্রচণ্ডভাবে ক্ষুব্ধ হন।
৪৭। যে কোন বেসরকারী ব্যাংকের এম ডি সরকারের যুগ্ম সচিব এবং ক্ষেত্র বিশেষে অতিরিক্ত সচিবের পদমর্যাদা ভোগ করে থাকেন। কিন্তু এহেন পদমর্যাদার চেয়ে আরও উচ্চতর পদমর্যাদায় ড. ইউনুসকে পদায়ন করার জন্য শেখ হাসিনার সরকারের পক্ষ থেকে তার নিকট প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি উক্ত প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। বরং গ্রামীণ ব্যাংকে এম ডি পদে থেকে যাওয়ার ব্যাপারেই আগ্রহ ব্যক্ত করেন। এর অন্তর্নিহিত কারণ সমূহ সন্দেহজনক এবং রহস্যাবৃত (Suspicious and mysterious) বলে বিবেচিত হয়। এহেন অবস্থায় এম ডি পদ হারানোর ক্ষোভে এবং দুঃখে তিনি অন্তর্জ্বালায় জ্বলতে থাকেন। এরই পাশাপাশি তিনি পর্দার অন্তরালে থেকে শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার নিমিত্তে বিরামহীনভাবে চেষ্টা করতে থাকেন। দুঃখজনক হলেও সত্য যে তার এহেন অপচেষ্টা এবং অপতৎপরতা থেকে তিনি অদ্যাবধি মুক্ত হতে পারেননি।
৪৮। পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করে বিশ্ব ব্যাংক এবং তাদেরই চাপে ও প্রভাবে জাইকা, আইডিবি এবং এডিবি ও ঋণ চুক্তি বাতিল করে দেয়। এহেন অবস্থায় এতদ সংক্রান্ত সামগ্রিক বিষয়টি আমাদের দেশ ছাড়াও বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে আলোচিত এবং সমালোচিত হয়। ফলে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে শেখ হাসিনা সরকার অনেকটা বেকায়দায় পড়েন। এমতাবস্থায় সরকার বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া নিজে এবং তার সরকারের অন্যান্য সিনিয়র নেতৃবৃন্দ অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় সরকারের সমালোচনায় মুখর হন। দেশে বহুল প্রচারিত সংবাদ পত্র The Daily Star এবং দৈনিক প্রথম আলো সহ আরও বিভিন্ন পত্র পত্রিকাসমূহ অত্যন্ত তীর্যকভাবে সরকারের সমালোচনা করতে থাকে। সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে এই দুর্নীতি করা হয়েছে বলে তারা অবিরামভাবে প্রচারণা চালাতে থাকেন। পদ্মা সেতুর ব্যাপারে কথিত দুর্নীতির তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকাবস্থায় এবং উক্ত তদন্ত কার্যক্রম শেষ হওয়ার পূর্বেই উপরোক্ত ঋণচুক্তি বাতিল করা হলেও উপরোল্লিখিত কোন একটি রাজনৈতিক দল কিংবা কোন একটি পত্র পত্রিকা বিশ্ব ব্যাংকের বিরুদ্ধে একটি শব্দ ও উচ্চারণ করেননি। তাদের কেউই বিশ্ব ব্যাংকের এহেন অন্যায় এবং অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের কোন নিন্দা কিংবা কোন প্রতিবাদ ও করেননি।
৪৯। ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, পাকিস্তান এবং ভারতের স্বাধীনতার পূর্বে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর অনুরোধে কাজী নজরুল ইসলাম “কাণ্ডারী হুঁশিয়ার” নামে অত্যন্ত বিখ্যাত একটি কবিতা রচনা করেন। ঐ কবিতার দু’টি বিখ্যাত চরণ হচ্ছে –
“হিন্দু না ওরা মুসলিম?” ওই জিজ্ঞাসে কোন্ জন?
কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!”
পদ্মা সেতুর প্রেক্ষিতে বিশ্ব ব্যাংক সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে ঋণচুক্তি বাতিল করায় সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলো বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতি। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা এবং ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হলো। তাই বিশ্ব ব্যাংকের এহেন অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে পুরো দেশ এবং জাতি সমস্বরে প্রতিবাদমুখর হবেন এবং তীব্র ভাষায় আপত্তি জানাবেন– এটিই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, এই ঋণচুক্তি বাতিলকে শেখ হাসিনার বিরোধী মহল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নয়, যেন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত পরাজয় হিসেবে ধরে নিলেন। তাই কোন দলের কোন পর্যায়ের কোন একজন নেতানেত্রী কিংবা তথাকথিত সুশীল সমাজ অথবা বহুল প্রচারিত কোন একটি সংবাদ পত্র – কেউই বিশ্ব ব্যাংকের এই অনৈতিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোন কথা বলেননি। কোন প্রতিবাদ কিংবা কোন সমালোচনাও করেননি। উপরন্তু উপরোক্ত সবাই শেখ হাসিনার তুখোড় সমালোচনা করেছেন এবং বিভিন্নভাবে তার নিন্দা মন্দ করেছেন। যা শুধুমাত্র দৃষ্টিকটু এবং শ্রুতিকটুই ছিল না, বরং ছিল অত্যন্ত নিন্দাজনক এবং ন্যক্কারজনক।
৫০। উপরোল্লিখিত কোন একটি ব্যাংক কিংবা কোন অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান থেকে একটি টাকা বরাদ্দ না দেয়া সত্ত্বেও তাদের কথিত দুর্নীতি কোথায় এবং কিভাবে সংঘটিত হয়েছে আর কে কে কি কি ভাবে এই দুর্নীতির সাথে জড়িত ও সম্পৃক্ত ছিলেন তার কোন তথ্য প্রমাণ দেশের কোন একটি পত্র পত্রিকা কিংবা কোন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কোনদিনই তা কোন জনসমক্ষে প্রকাশ করেননি। এরই পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে কোন্ কোন্ ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান কি কি ভাবে এই দুর্নীতিতে অংশগ্রহণ করেছেন কিংবা টাকা পয়সা মেরে দিয়েছেন অথবা আত্মসাৎ করেছেন উপরোক্ত কোন একজন নেতা নেত্রী কিংবা কোন একটি পত্রিকা কিংবা উক্ত পত্রিকা সমূহের কোন একজন সম্পাদক তা কোনভাবে অনুধাবন করার জন্য কিংবা বিবেচনায় নেয়ার জন্য কোন প্রয়োজনই বোধ করেননি। কিন্তু তা না করা সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি বিরামহীনভাবে অপপ্রচার চালিয়েছেন। শেখ হাসিনার প্রতি উপরোক্ত সমালোচকদের ব্যক্তিগত রাগ এবং প্রচণ্ড ক্ষোভের পাশাপাশি তাদের অনমনীয় আক্রোশের কারণে তারা এমনটি করেছেন বলে এখন জোরালোভাবেই বিবেচিত হয়।
৫১। বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী তথা অন্যতম ঋণ দাতা সংস্থা বিশ্ব ব্যাংকের প্রভাবে প্রমাণবিহীন কথিত দুর্নীতির অভিযোগে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে চাপের মুখে পদত্যাগ করতে হয়। এরই পাশাপাশি সেতু বিভাগের তৎকালীন সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াকে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। এছাড়া ঐ সময়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান এবং সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী সহ আরও বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্যও বিশ্ব ব্যাংক চাপ দেয়। তাদের কথায় ছিল খবরদারি এবং চ্যালেঞ্জের সুর। এমনকি ঐ সময়ে শেখ হাসিনা বিরোধী একটি গ্রুপ একাধিক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গিয়েও শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালান। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তারা ঐ সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে গিয়ে প্রকৃত প্রস্তাবে বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতায় মেতে উঠেন। এহেন সমালোচনা করতে গিয়ে তারা কোন প্রকার নীতি নৈতিকতা তথা Norms and ethics -এর কোন ধারই ধারেননি। যা সত্যিই দুঃখজনক এবং হতাশাব্যঞ্জক বলে বিবেচিত হয়।
৫২। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করার শোকাবহ স্মৃতি বিজড়িত দিন ১৫ই আগস্ট। আর এই দিনটিকে সম্পূর্ণভাবে ভুয়া এবং বানোয়াট জন্মদিন হিসেবে বেছে নিয়ে ভারি ওজনের দামি কেক কেটে উৎসব পালনের মাধ্যমে খালেদা জিয়া প্রমাণ করেছেন, তিনি আর যা ই হোন না কেন কোন সুস্থ বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষ নন। তদুপরি খালেদা জিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাবস্থায় যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত একাধিক আর্জেস গ্রেনেড নিক্ষেপের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এই নির্মম হত্যা চেষ্টার ভয়াল এবং বিভীষিকাময় স্মৃতি বিজড়িত দিন ২১শে আগস্ট। আর এই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের আপত্তিকর এবং অত্যন্ত অশালীন মন্তব্য করার মাধ্যমে খালেদা জিয়া প্রমাণ করেছেন তিনি একজন নির্মম প্রকৃতির চরম অমানবিক এবং প্রচণ্ড রকমের প্রতিহিংসাপরায়ণ ব্যক্তি। তাই শেখ হাসিনার চরম বৈরী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে খালেদা জিয়া এবং তার দল বিএনপি শেখ হাসিনার ঐকান্তিক ইচ্ছায় এবং তারই সরকারের আমলে নির্মাণ হতে যাওয়া পদ্মা সেতু সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করবেন– বাংলাদেশের সংকীর্ণ রাজনীতির আবহ এবং বাস্তবতায় এটি খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুস এবং তারই ইশারায় বাংলাদেশের দু’টি বহুল প্রচারিত এবং নিরপেক্ষতার মুখোশধারী পত্রিকা The Daily Star এবং দৈনিক প্রথম আলো দিনের পর দিন মিথ্যা উপাখ্যান রচনা করে আওয়ামী লীগ এবং তার সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রী সহ পদ্মা সেতু প্রকল্পের সহিত সংশ্লিষ্টদের ক্রমাগতভাবে মুণ্ডুপাত করে যাবেন– এটি ছিল নিদারুণভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অনভিপ্রেত।
৫৩। বিশ্ব ব্যাংকের বানোয়াট এবং কাল্পনিক দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে উপরোল্লিখিত প্রভাবশালী পত্রিকা দু’টি সহ অন্যান্য আরও একাধিক পত্রিকা এবং বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম গুলোর ঐ সময়ে প্রধান খবর ছিল পদ্মা সেতুর তথাকথিত দুর্নীতি। তখন পত্রিকার পাতায় চোখ মেললেই পাওয়া যেত পদ্মা সেতুর খবর। ঐ সময়ের বিভিন্ন পত্রিকার হেডলাইন ছিল পদ্মা সেতু, সম্পাদকীয়তে পদ্মা সেতু এবং উপ-সম্পাদকীয়তেও পদ্মা সেতু। এহেন পত্রিকা এবং প্রচার মাধ্যমসমূহে বিভিন্ন ধরনের কুৎসা সহ অনেক আপত্তিকর ভাষায় নিন্দা-মন্দ এবং অপপ্রচারের কারণে সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত এবং অপদস্থ হয়েছেন ঐ সময়ের যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। অনেক আপত্তিকর এবং অশালীন মন্তব্য, বদনাম এবং অপপ্রচার সমূহ নিতান্তই অসহায়ভাবে তাকে হজম করতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রী সভা থেকে তাকে পদত্যাগ ও করতে হয়েছে। এরই পাশাপাশি ঐ সময়ের সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া সহ সর্বমোট সাত জনকে আসামী শ্রেণীভুক্ত করে মামলা দাখিল করা হয়েছে। ঐ মামলার কারণে তাদের সবাইকে হাজতেও পাঠানো হয়েছে। এছাড়া সেতু সচিবকে চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত ও করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়ার পাশাপাশি উপরোক্ত মামলার আসামী হিসেবে তিনি ৪০ দিন হাজতবাস ও করেন।
৫৪। উপরোল্লিখিত দায়িত্বশীল একাধিক ব্যক্তিদেরকে আসামী শ্রেণীভুক্ত করে মামলা দাখিল করার পর তাদেরকে হাজতে আবদ্ধ করা সত্ত্বেও বিশ্ব ব্যাংক নিবৃত্ত হয়নি। উপরোক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমানকে আসামী শ্রেণীভুক্ত করার জন্যও বিশ্ব ব্যাংক ঐ সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নিকট প্রস্তাব দেয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই প্রস্তাবে চরমভাবে বিরক্ত হন এবং তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তীকালে দুদকের অধিকতর তদন্তে মোশাররফ হোসেন সহ অন্যান্যরা নির্দোষ প্রমাণিত হন। এরই পোষকতায় তারা সবাই উক্ত মামলা থেকে খালাস পান। উপরন্তু কানাডার আদালতের মামলাও খারিজ হয়ে যায়। বিশ্বব্যাংকের বায়বীয় এবং ভিত্তিহীন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এবং তাদেরই প্ররোচনায় যে সমস্ত পত্রিকা এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া বিরামহীন অপপ্রচারের মাধ্যমে উপরোক্ত ব্যক্তিদেরকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন এবং মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত করার মাধ্যমে তাদের জীবন দুর্বিসহ করে তুলেছিলেন– দেশ ও জাতির কাছে তারা এখন কি জবাব দিবেন?
৫৫। বিশ্ব ব্যাংকের ইঙ্গিতে এবং প্ররোচনায় কানাডার মন্ট্রিল ভিত্তিক প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠান এস এন সি- লাভালিনের বিরুদ্ধে অন্টারিও আদালতে দাখিলকৃত মামলাটি পরবর্তীকালে সংশ্লিষ্ট আদালত খারিজ করে দেন। এই রায়ের মাধ্যমে বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃক আনীত এবং উত্থাপিত অভিযোগ সমূহের দায় দায়িত্ব থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হয়। উক্ত রায়ের পর TIB -এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এক সাক্ষাতকারে বলেন- “দেশ হিসেবে আমাদের জন্য সুসংবাদ; সরকারের জন্যও স্বস্তিদায়ক। এতদিন ধরে পদ্মা সেতু নিয়ে যে আলোচনা, তোলপাড় এবং বিতর্ক হয়েছে এর অবসান হলো।” তিনি আরও বলেন- “পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিশ্ব ব্যাংক তদন্ত করল। বাংলাদেশে তদন্ত দল পাঠাল। সেই দলের তথ্যের উপর ভিত্তি করে বিশ্ব ব্যাংক অভিযোগ অব্যাহত রাখল। কিন্তু উক্ত অভিযোগ প্রমাণের আগেই পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন বাতিল করে বিশ্ব ব্যাংক শাস্তি দিয়ে ফেলল। এখন আদালতে প্রমাণ হয়েছে যে দুর্নীতি হয়নি। তাহলে সরকারের উচিত এই বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংকের কাছে জবাব চাওয়া।”
কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করার পরপরই ড. ইফতেখারুজ্জামান কোন যাচাই বাছাই না করেই সরকারের উচ্চমহলকে জড়িত করে যে বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন- তার সেই অনুমানভিত্তিক মন্তব্য যে সঠিক ছিল না সে ব্যাপারে তিনি তার ভুল স্বীকার করেননি। কোন দুঃখ প্রকাশ ও করেননি। যা করা তার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল বলে বিবেচিত হয়।
৫৬। যে কোন সচেতন নাগরিক একটু খোলা মন এবং পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিবেচনা করলে খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন যে বিশ্ব ব্যাংক এবং অন্যান্য অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান সমূহ পদ্মা সেতু ইস্যুতে ঋণ চুক্তি বাতিল করার পর যে সমস্ত বরেণ্য ব্যক্তিবর্গ শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের অন্ধ সমালোচনার নামে সরকারকে তুলাধুনা করেছেন তা শুধুমাত্র সরকার বিরোধী বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ঐ সমস্ত সমালোচনার বহুলাংশ জুড়ে ছিল শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের কোন কোন সদস্যের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রমণ। আবার কোন কোন সমালোচনার বক্তব্য ছিল দেশদ্রোহিতার শামিল। যা ঐ সময়কালের বিভিন্ন পত্র পত্রিকা বিশেষ করে দৈনিক প্রথম আলো সহ আরও বিভিন্ন পত্রিকার ঐ সময়কালীন প্রতিবেদন সমূহ পর্যালোচনা করে তাদের এহেন বৈরী মনোভাব ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যসমূহের সত্যতা এবং যথার্থতা সম্পর্কে অনুসন্ধানী পাঠকবর্গ এবং গবেষকগণ সন্দেহমুক্ত হতে পারবেন। উপরোক্ত কাল্পনিক দুর্নীতির কোন একটি অভিযোগই অদ্যাবধি কোথাও কোনভাবেই প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোন একটি পত্র পত্রিকা কিংবা ঋণ দাতা সংস্থা অথবা দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপনকারীদের কেউই কখনো কোন প্রকার দুঃখ প্রকাশ করেননি কিংবা অনুতপ্ত হননি। ঐ সমস্ত জ্ঞানতাপসগণ আজ পর্যন্ত একটি দিনের জন্যও স্বীকার করেননি যে তারা কোন ভুল করেছেন এবং অন্যায় করেছেন। যা করা হলে তাদের পাণ্ডিত্য, ভাবমূর্তি এবং গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করার কোন সুযোগ কিংবা কোন অবকাশই থাকত না।
৫৭। শিক্ষিত এবং শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি মাত্রই জানেন যে কোন ইস্যু নিয়ে সরকারের বিরোধিতা করা এবং রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা একই কথা নয়। সরকারের সমালোচনা করা কিংবা বিরোধিতা করা যে কোন নাগরিকেরই গণতান্ত্রিক এবং সাংবিধানিক অধিকার। পক্ষান্তরে রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা দেশদ্রোহিতার শামিল। সরকারের ঢালাও সমালোচনা করার নামে কোন ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান যদি তাদের বক্তব্য বিবৃতির মাধ্যমে কিংবা তাদের কোন কার্যক্রমের মাধ্যমে আইনবলে প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রতি ঘৃণা-বিদ্বেষ কিংবা অবজ্ঞা অথবা বৈরিতার সৃষ্টি করেন– তাহলে তিনি বা তারা বাংলাদেশে চলমান ও কার্যকর দণ্ডবিধির ১২৪-ক নং ধারার বিধান মোতাবেক কারাদণ্ড এবং তৎসহ অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন। যা উপরোক্ত ধারার বিধান মোতাবেকই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধ বাংলাদেশের বাহিরে সংঘটিত হলেও দন্ডবিধির ৩ নং এবং ৪ নং ধারা দু’টির বিধান মোতাবেক তা বাংলাদেশেরই এক্তিয়ারভুক্ত বটে। সুতরাং পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি বিশ্ব ব্যাংক বাতিল করায় আমাদের দেশের যে সমস্ত ষড়যন্ত্রকারী মহল তাদের সাফল্য বলে মনে করেছিলেন এবং উৎফুল্ল হয়েছিলেন, উপরোক্ত দণ্ডবিধির ৩, ৪ এবং ১২৪-ক নং ধারাগুলির বক্তব্য সমূহ তারা একটু গভীর মনোযোগ সহকারে পড়ে দেখতে পারেন।
৫৮। পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃক আনীত এবং উত্থাপিত অনুমানভিত্তিক দুর্নীতির ব্যাপারে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) -এর অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান থাকাবস্থায় তথা উক্ত কার্যক্রম অসমাপ্ত থাকাবস্থায় এতদ সংক্রান্ত ব্যাপারে বিশ্ব ব্যাংক উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন একটি Exeprt team গঠন করেন। আন্তর্জাতিক ক্রাইম ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর (আর্জেন্টিনার আইনজীবী) Louis Gabriel Moreno Okampo, যুক্তরাজ্যের সিরিয়াস ফ্রড কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক Richard Alderman এবং হংকং -এর দুর্নীতি বিরোধী স্বাধীন কমিশনের সাবেক কমিশনার Timothy Tong এই Expert team -এর সদস্য ছিলেন। এই টিম একাধিকবার বাংলাদেশ সফর করেছেন। উপরোক্ত Expert team -এর সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক কমিশনার তার অতি সাম্প্রতিক কালের একটি তথ্য বহুল প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন-
“… দুই দিন ব্যাপী আলোচনার প্রথম দিনে নৈশ ভোজ চলাকালীন লুইস ওকাম্পো ইউনুসের গ্রামীণ ব্যাংকের এম ডি পদ থেকে সরে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চান। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার বৈরী সম্পর্ক কেন- তাও জিজ্ঞেস করেন ওকাম্পো। একথাও বলেন, এই বৈরিতা নিরসন হলে সকল জটিলতার অবসান হবে বলে তার বিশ্বাস। আমি তাকে জানাই, নির্ধারিত বয়স উত্তীর্ণ হওয়ায় এবং আইনের বিধান মতে যোগ্য না হওয়ায় তাকে পদ ছাড়তে হয়েছে। ড. ইউনুস উচ্চ আদালতে প্রতিকার চেয়েও ব্যর্থ হয়েছেন। উপরন্তু তিনি বয়স পার হওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘকাল এম ডি পদে বহাল ছিলেন। একথা বলার পর ওকাম্পো স্তম্ভিত হন এবং এ বিষয়ে আর কথা বাড়াননি। তার সঙ্গে কথোপকথনে বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ চুক্তি বাতিলে এবং কথিত দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপনে ড. ইউনুসের ভূমিকা রয়েছে বলে অনুমিত হয়। তাছাড়া বাংলাদেশ থেকে বিশ্ব ব্যাংকের কাছে প্রেরিত কয়েকটি ই-মেইল; যা পরবর্তীতে বিশ্ব ব্যাংক বিষয়বস্তু প্রকাশ না করার শর্ত দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে পাঠায়। সেই ই-মেইলের সেন্ডার নামটি ঘষা মাজা করে দেয় বিশ্ব ব্যাংক। ‘পদ্মা সেতু প্রকল্পের সংশ্লিষ্টরা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত আছে এবং এখানে অর্থায়ন করা সঙ্গত হবে না’ – ই-মেইল পর্যালোচনা করে এমন তথ্যই পাওয়া যায়। বিশ্ব ব্যাংকের কাছে ই-মেইল সমূহ যে ড. ইউনুসই পাঠিয়েছে, ওকাম্পোর কথা এবং উপরোক্ত ঘটনাসমূহ সেটাই সমর্থন করে। [দ্রঃ পদ্মা সেতু থেকে বিশ্ব ব্যাংকের সরে যাওয়ার নেপথ্যে- মোঃ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু; দৈনিক জনকণ্ঠ, ২৪-০৬-২০২২]।”
৫৯। অত্যন্ত দুঃখজনক এবং অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, ড. মুহম্মদ ইউনুস আমাদের ভাষা শহীদদের প্রতি সম্মান কিংবা শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য কখনো শহীদ মিনারে যাননি এবং এখনো যান না। এমনকি স্বাধীনতা দিবস এবং বিজয় দিবস উপলক্ষে একটি দিনের জন্য ও তিনি কখনো জাতীয় স্মৃতি সৌধে যাননি। এর কোন যুক্তি সঙ্গত কারণ কিংবা কোন ব্যাখ্যা ও তিনি দেশ এবং জাতির সামনে কখনো উপস্থাপন করেননি। বাঙালির কোন দুর্যোগ কিংবা দুর্বিপাক তথা কোন ঘূর্ণিঝড় কিংবা কোন জলোচ্ছ্বাস অথবা প্রলয়ংকারী বন্যার সময়ে তিনি কখনো কোন সাহায্যের হাত বাড়াননি কিংবা কোন প্রকার ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে এগিয়ে আসেননি। প্রসঙ্গক্রমে আরও একটি বিষয় উল্লেখ্য যে ড. ইউনুস গ্রামীণ ব্যাংক এবং এই ব্যাংকে তার এম ডি পদে থাকা না থাকা এবং তার নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তি -ইত্যাদি ইত্যাদি কোন একটি বিষয় নিয়ে আজ পর্যন্ত ও তিনি আমাদের দেশের কোন প্রেস তথা কোন সাংবাদিকের মুখোমুখি হননি। প্রশ্ন হলো কেন হননি? এইসব ব্যাপারে আমাদের দেশের কোন তাত্ত্বিক বুদ্ধিজীবী কিংবা তথাকথিত সুশীল সমাজ কখনো কোন প্রশ্ন উত্থাপন করেননি এবং এখনো করেননা। এইসব ঘটনাবলী সম্পর্কে সম্যকভাবে জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও তার সমর্থনে সাফাই গাওয়া লোকের কোন অভাব হয়না। এতদ সংক্রান্ত বিষয়বস্তুসমূহ ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে।
৬০। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারের চরম অগণতান্ত্রিক সামরিক শাসকগণ অত্যন্ত নির্দয়, নিষ্ঠুর এবং অমানবিকভাবে তাদের দেশ থেকে প্রায় ১২ লক্ষ রোহিঙ্গা নরনারীকে তাদের পৈত্রিক ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ করেছেন এবং জোর জবরদস্তিমূলকভাবে সেদেশ থেকে বিতাড়িত করেছেন। ঐ সমস্ত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বর্তমানে বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে অবস্থান করে চলেছেন। এহেন অবস্থায় তাদের দেশেও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অং সাং সুকি উপরোক্ত নির্যাতিত, নিপীড়িত এবং ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়াননি। বরং সামরিক শাসনকর্তাদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে গিয়ে ওকালতি ও করেছেন। অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস এই যে পরবর্তীকালে উপরোক্ত সামরিক জান্তাই আবার অং সাং সুকি কে রাতের অন্ধকারে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন। তারও পরে বিচারের নামে প্রহসন করে কারাদণ্ডাদেশ প্রদান করেছেন। এরই পাশাপাশি অপ্রিয় হলেও সত্য যে, উপরোক্ত বিতাড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পক্ষে কিংবা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনুস আজ পর্যন্ত দেশে কিংবা বিদেশে তথা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি কথা ও বলেননি কিংবা কোন বিবৃতি ও প্রদান করেননি। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া সত্ত্বেও এত বিপুল সংখ্যক নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর পক্ষে অবস্থান না নিয়ে সযতনে নিরব থাকা এবং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তা পাশ কাটিয়ে যাওয়া – দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং হতাশাব্যঞ্জক বলে বিবেচিত হয়।
ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ), লেখক ও কলামিস্ট
(চলবে)
বি/ ইবিটাইমস /এম আর