স্বপ্ন এবং চ্যালেঞ্জের পদ্মা সেতু

পর্ব-৪ 

 ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ ৩১। সত্তরোর্ধ্ব বয়স হয়ে যাওয়ায় দেশে প্রচলিত আইন এবং ব্যাংকিং আইনের বিধিবিধান অনুযায়ীই ড. ইউনুস ব্যাংকের চাকরিতে কর্মরত থাকার যোগ্য ছিলেন না বলে অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মেই তাকে এম ডি পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে। কিন্তু এহেন নিয়ম কিংবা বিধিবিধানকে মাহফুজ আনাম গ্রহণযোগ্য কারণ বলে মনে করেন না বলে তিনি তার আর্টিকেলে ব্যক্ত করেছেন। তদুপরি এম ডি পদের চেয়ে আরও মর্যাদাপূর্ণ এবং সম্মানজনক উপদেষ্টা পদে ড. ইউনুসকে গ্রামীণ ব্যাংকেই নিয়োগ দেয়ার জন্য শেখ হাসিনার সরকারের পক্ষ থেকে তাকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ড. ইউনুস সে প্রস্তাবে রাজি হননি। মাহফুজ আনাম ইচ্ছাকৃতভাবেই তার উক্ত আর্টিকেলে এইসব কথাগুলি উল্লেখ করেননি। উপরন্তু এম ডি পদ হারানোর পর দেশের প্রখ্যাত এবং সিনিয়র আইনজীবী ড. কামাল হোসেনকে নিয়োগ করে ড. ইউনুস সর্বোচ্চ আদালতে মামলা দাখিল করেছেন। কিন্তু উক্ত মামলায় দুতরফা বিচারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সূত্রে তিনি পরাজিত হয়েছেন। মাহফুজ আনাম তার উপরোক্ত বিদ্বেষপূর্ণ এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ আর্টিকেলে এ তথ্যটিও ব্যক্ত করেননি। প্রশ্ন হলো এত জলজ্যান্ত বিষয়গুলি কেন এবং কি কি কারণে মাহফুজ আনাম তার প্রবন্ধে গোপন করে গেলেন? তাহলে অত্যন্ত বিনীতভাবেই তাকে প্রশ্ন করা যায় আইনের নিরিখে এবং যুক্তির নিরিখে কে প্রতিহিংসাপরায়ণ শেখ হাসিনা নাকি তিনি নিজে?

৩২। মাহফুজ আনাম তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন- “… অহংকারের কারণে পদ্মা সেতু হারিয়েছি।” তিনি আরও বলেছেন- “… বুক বাজানো আত্মতুষ্টি ও জনতার মধ্যে উন্মাদনা তৈরীর চেষ্টা হিসেবে ‘নিজস্ব অর্থায়নে’ পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা জাতীয় মর্যাদা নিয়ে ছেলেখেলা ছাড়া আর কিছুই নয়।” তিনি আরও বর্ণনা করেছেন- “… গ্রামীণ অবকাঠামো, সড়ক, রেলপথ, জলপথ, টেলিযোগাযোগ, জ্বালানি ও শিল্পায়নের মতো বিভিন্ন সংকটপূর্ণ খাতে অর্থায়ন বন্ধ রেখে কেবল পদ্মা সেতু নির্মাণের কোন যৌক্তিকতা আছে কি? অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই কয়েকটি ক্ষেত্রে অর্থায়নের অভাবে প্রবৃদ্ধি পিছিয়ে পড়ছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেছেন- “জাতীয় মর্যাদার বিষয়টি বিবেচনা করলে ‘নিজস্ব অর্থায়নের’ কল্পিত গৌরবের চেয়ে দেশের জন্য বহুগুণ বেশি অপমান, অমর্যাদা ও কুখ্যাতি নিয়ে এসেছে পদ্মা সেতুর ঋণ কেলেংকারি। ‘নিজস্ব অর্থায়নের’ বিষয়টি একটি বাজে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। জনস্বার্থের প্রতি এই স্পষ্ট ‘অবমাননার’ জন্য এই সরকারকে একদিন জবাবদিহি করতে হবে।” উপরোল্লিখিত বক্তব্যসমূহ পড়ে যে কেউ খুব সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন যে, মাহফুজ আনাম তার নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে ভাষার কারুকার্যের সাহায্যে শেখ হাসিনাকে খুবই অশালীনভাবে কটাক্ষ করেছেন এবং অমার্জিতভাবে আক্রমণ করেছেন।

৩৩। মাহফুজ আনামের উপরোক্ত বিদ্বেষ এবং প্রতিহিংসাপূর্ণ বক্তব্যসমূহের দাঁত ভাঙ্গা জবাব হলো প্রমত্তা পদ্মা নদীতে বিদ্যমান পদ্মা সেতু। বর্তমান বাস্তবতার আলোকে তিনি নিশ্চয়ই অনুধাবন করছেন যে কোন অহংকারের কারণে আমরা পদ্মা সেতু হারাইনি বরং দূরদর্শী এবং দৃঢ়চেতা নেত্রী শেখ হাসিনার অপরিসীম দেশপ্রেমের কারণে প্রমত্তা পদ্মার বুকে এই সেতু এখন দিবালোকের মতো বিদ্যমান। ‘নিজস্ব অর্থায়নের’ বিষয়টি আদৌ কোন বাজে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না। বরং শেখ হাসিনার অত্যন্ত বলিষ্ঠ এবং প্রখর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্বের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এই সিদ্ধান্তটি ছিল আমাদের আত্মসম্মান, আত্মমর্যাদা এবং অহংকারের গর্বিত ও প্রত্যয়দীপ্ত অভিব্যক্তি। মাহফুজ আনামের কথিত মতে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের কারণে গ্রামীণ অবকাঠামো, সড়ক, রেলপথ, জলপথ, টেলিযোগাযোগ, জ্বালানি এবং শিল্পায়ন খাতে অর্থায়ন বন্ধ করা হয়নি। অর্থায়নের অভাবে এই সব খাতের প্রবৃদ্ধি পিছিয়েও পড়েনি। বরং একাধিক বন্ধ রেলপথ শেখ হাসিনার আমলে পুনরায় চালু করা হয়েছে। বন্ধ শিল্প কারখানাও সচল করা হয়েছে। এমনকি পদ্মা সেতুতেও রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। আর এসব কিছু সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র শেখ হাসিনার সুদৃঢ় মনোবল, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, অসীম সাহস এবং প্রশ্নাতীত সততার কারণে।

৩৪। একজন বিদগ্ধ সম্পাদক হিসেবে মাহফুজ আনাম খুব ভালো ভাবেই জানেন পদ্মা সেতুর ব্যাপারে কথিত ঋণ কেলেংকারি সংক্রান্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে কানাডার আদালতে দাখিলকৃত মামলাটি খারিজ হয়ে গিয়েছে। উপরন্তু দুর্নীতির ব্যাপারে দুদকের তদন্তেও কোন প্রকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এহেন অবস্থায় দুদক কর্তৃক ঢাকাতে দাখিলকৃত দুর্নীতির মামলা থেকেও উক্ত মামলার প্রেক্ষিতে অভিযুক্ত মোট ৭ জন আসামীদের মধ্যে সবাই বেকসুর খালাস পেয়েছেন। তাই নিস্ফল আক্রোশে প্রচণ্ড ক্ষোভ এবং বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে মাহফুজ আনাম কর্তৃক শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনীত এবং উত্থাপিত উপরোক্ত অভিযোগ সমূহ তথা পদ্মা সেতুর কারণে ‘জনস্বার্থের অবমাননা’; ‘জাতীয় মর্যাদা নিয়ে ছেলেখেলা’; ‘সর্বোচ্চ দম্ভের বহিঃপ্রকাশ’ এবং ‘নিজস্ব অর্থায়নে’ সংক্রান্ত বিষয়টি একটি ‘বাজে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত’ প্রভৃতি অভিযোগ সমূহের মধ্যে কোন একটি অভিযোগেরই কোন প্রকার সত্যতা, বিশ্বস্ততা এবং যথার্থতা আদৌ ধোপেই টিকেনা। উপরন্তু প্রচণ্ড আক্রোশের বশবর্তী হয়ে এই সমস্ত বালখিল্য অভিযোগ সমূহ উত্থাপন করে মাহফুজ আনাম দেশ ও জাতির সামনে তিনি নিজেই তাকে হাস্যষ্পদ করেছেন এবং তার অগাধ পাণ্ডিত্যকে (?) তিনি নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছেন। কেননা পদ্মা সেতু নির্মাণ করে মাহফুজ আনামের উপরোক্ত জ্ঞানগর্ভ আর্টিকেলের প্রতিটি শব্দ, বাক্য এবং অভিযোগ সমূহকে শেখ হাসিনা ইতিমধ্যেই শতভাগ মিথ্যা এবং অসার বলে প্রমাণ করে দিয়েছেন। তাই মাহফুজ আনামের মধ্যে কোন প্রকার বিনয় এবং শিষ্টাচারবোধ থাকলে এহেন চরম আক্রমণাত্মক ভাষা প্রয়োগ করে প্রবন্ধ লেখার কারণে দেশ ও জাতির নিকট তার ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত বলে বিবেচিত হয়।

৩৫। শেখ হাসিনা কর্তৃক তারই আমলে পদ্মা সেতু নির্মাণের ব্যাপারে বেগম খালেদা জিয়া ও তার দল বিএনপি, ড. ইউনুস, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এবং মাহফুজ আনাম গং সহ কতিপয় জ্ঞানপাপী এবং সুশীল নামধারী গুটিকয়েক Evil genius ব্যক্তিগণ এই সেতু প্রকল্পের ব্যাপারে প্রচণ্ডভাবে অনিচ্ছুক, অনাগ্রহী, চরম বৈরী এবং অত্যন্ত বিরূপ মনোভাবাপন্ন ছিলেন। তাই তাদের নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত এবং দুর্দমনীয় প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে তাদেরই প্রতিভূ হিসেবে সুশীল নামধারী মাহফুজ আনাম চরম অনৈতিক, তীব্র অশালীন এবং অতিশয় অমর্যাদাকর ভাষা প্রয়োগ করে তার উপরোক্ত আর্টিকেলটি তিনি রচনা করেছেন বলে যে কোন প্রকার সন্দেহ (Beyond all types of doubt and controversy) ব্যতিরেকেই প্রমাণিত হয়। তাই জনস্বার্থের প্রতি ‘অবমাননার’ কারণে সরকারকে জবাবদিহি করতে হবে না, বরং জনহিতকর এবং জনকল্যাণকর পদ্মা সেতু নির্মাণ করার কারণে শেখ হাসিনা যুগ যুগ ধরে দেশবাসীর প্রশংসা কুড়াবেন। তাই মাহফুজ আনামের মধ্যে প্রকৃত প্রস্তাবেই কোন বিবেক, নীতিবোধ, শালীনতা এবং সৌজন্যবোধ থেকে থাকলে চরম অশালীন এবং প্রচণ্ড রকমের অবমাননাকর শব্দবোমা এবং বাক্য সন্ত্রাসের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তার Extremely malicious আর্টিকেল রচনা করার জন্য একদিন তাকে এবং তার ভাবাদর্শ ও মতাদর্শে বিশ্বাসী অন্যান্য কুশীলবদেরকেই একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

৩৬। দেশবাসীর জন্য বেদনাদায়ক হলেও সত্য যে উপরোল্লিখিত জ্ঞানতাপস এবং প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গ সম্ভবত একথাটি ভুলে গিয়েছিলেন যে, শেখ হাসিনা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। সারাটি জীবন ধরে অসংখ্যবার কারাবরণ করেও বঙ্গবন্ধু কোন অন্যায় কিংবা অশুভ শক্তির কাছে কখনো মাথা নত করেননি। কোন অবৈধ সরকারের কোন অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে প্রতিবাদ না করে কখনো আপোষ করেননি। তাই কোন প্রকার দুর্নীতির আশ্রয় না নেয়া সত্ত্বেও বিশ্ব ব্যাংকের এহেন ভুয়া এবং কাল্পনিক দুর্নীতির অভিযোগ মেনে নেয়া শেখ হাসিনার পক্ষেও সম্ভব হয়নি। আর তা মেনে নেয়াটা স্বাভাবিক এবং সঙ্গত ও ছিল না। তাই বিশ্ব ব্যাংকের সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের কাছে তিনি মাথা নত করেননি। উপরন্তু বিশ্ব ব্যাংকের অন্যায় সিদ্ধান্তের প্রতি চ্যালেঞ্জ প্রদান করে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বাধা ও ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে আমাদের নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ করে তিনি তার নিষ্ঠা, সততা, নৈতিকতা, দেশপ্রেম এবং আত্মবিশ্বাসের চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। আমাদের সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং আত্মমর্যাদার প্রতীক পদ্মা সেতু নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ করে তিনি বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছেন যে আমরাও পারি। আমাদেরকে অন্যায়ভাবে দাবিয়ে রাখা যায় না।

৩৭। আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক এবং মর্মবিদারক হলেও সত্য যে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্ব ব্যাংক অর্থায়ন করবে না বলে খুবই অসময়ে এবং নিতান্তই অপ্রত্যাশিতভাবে জানিয়ে দেয়। বেদনাদায়ক হলেও সত্য যে, শুধুমাত্র বিশ্ব ব্যাংকই পিছিয়ে গেল না; তারা চাপ দিয়ে জাইকা, আইডিবি এবং এডিবি -কে ও এই প্রকল্প থেকে সরিয়ে দিল। ফলে বিশ্ব ব্যাংক সহ উন্নত বিশ্ব একই অবস্থানে চলে গেল। এহেন অবস্থায় শেখ হাসিনা রয়ে গেলেন ভিন্ন অবস্থানে। এমনকি বিশ্ব ব্যাংক শুধু সরেই গেল না, তারা অর্থায়ন না করলে পদ্মা সেতু হবে না বলে তারা চ্যালেঞ্জ ও ছুড়ে দিল। এসময়ে বিশ্বের বড় বড় দেশ গুলো ও সুর মেলাল বিশ্ব ব্যাংকের সাথে। আমাদের দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদেরাও বিশ্ব ব্যাংকের পক্ষেই অবস্থান নিলেন। কিন্তু তাদের সবাইকে চমকে দিলেন শেখ হাসিনা। তিনি বললেন- “আপনাদের কাউকেই লাগবে না। আমাদের নিজেদের টাকায় আমরাই নির্মাণ করব পদ্মা সেতু।” শেখ হাসিনার কথা শুনে সারা বিশ্ব অবাক হলো। কিন্তু এমন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে গেলে সাহস লাগে, হিম্মত লাগে, বুকের পাটা লাগে। নিজের ভিতরে নিরেট সততা, স্বচ্ছতা, বলিষ্ঠতা এবং চারিত্রিক দৃঢ়তা না থাকলে এমন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা যায় না। তিনি খুব ভালোভাবেই জানতেন যে, কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন–

“অসত্যের কাছে কভু নত নাহি হবে শির

ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ, লড়ে যায় বীর।”

শেখ হাসিনার মধ্যে প্রচণ্ড মনোবল, অবিচল আত্মবিশ্বাস এবং শতভাগ সততা ছিল বলেই উপরোক্ত মহান বাণী প্রাণের গভীরে ধারণ করে তিনি প্রবল ক্ষমতাধর বিশ্ব ব্যাংক এবং তার কট্টর সমালোচকদের সাথে অকুতোভয়ে নিরন্তর লড়াই করে গিয়েছেন। এহেন লড়াইয়ে বিজয়ী হয়ে অত্যন্ত টেকসই এবং দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মাণ করে বিশ্ববাসীকে তা দেখিয়েও দিয়েছেন।

৩৮। আমাদের নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পাশাপাশি শেখ হাসিনা আরও একটি নির্দেশ জারি করেন। আর তা হলো- “বিশ্ব ব্যাংক জড়িত থাকলে যে সব গুণগত মান রক্ষা করা হতো, পদ্মা সেতুতে যেন সেইসব গুণগত মান রক্ষা করা হয়। এহেন অবস্থায় বিশ্ব ব্যাংকের নিয়োগ করা উপদেষ্টাদেরকেই পুনর্নিয়োগ দেয়া হয়। এই সেতু প্রকল্পে বিশ্ব ব্যাংক জড়িত থাকলে পরিবেশগত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে যে মান বজায় রাখা হতো, বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তাদের অধীন সেই একই মান বজায় রাখা হয়েছে। এখানে ৮০ হাজারের ও বেশি লোকদেরকে পুনর্বাসিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে কারও কাছ থেকে কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। পরিবেশের ক্ষেত্রে অনেকে খুঁত খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোন খুঁত তারা পাননি [দ্রঃ পদ্মা সেতু যেভাবে আমাদের হলো (মতামত- কলাম) – আইনুন নিশাত; দৈনিক প্রথম আলো; ২৫-০৬-২০২২]।”

শেখ হাসিনা শুধু পদ্মা সেতু নির্মাণই করেননি- যমকালো এবং চোখ ধাঁধানো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান করে বিশ্ব ব্যাংক এবং বিশ্ব বাসীর ধারণাও পাল্টে দিয়েছেন। এরই পাশাপাশি সারা বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সুমহান বাঙালি জাতির মর্যাদা, সক্ষমতা এবং ভাবমূর্তি। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনা বিশ্ববাসীকে আরও একবার দেখিয়ে দিয়েছেন যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বিজয়ী বাঙালি জাতিকে কোনভাবেই দমিয়ে রাখা যায় না। তাই একথা অকপটে এবং অসংকোচে বলা যায় যে শেখ হাসিনার দৃঢ়তা, বলিষ্ঠতা এবং আত্মবিশ্বাসের মূর্ত প্রতীক পদ্মা সেতু।

৩৯। দেশবাসী নিশ্চয়ই জানেন অমোঘ নিয়তির হাতে বারবার বিধ্বস্ত এবং নিষ্ঠুর প্রকৃতির কাছে বিভিন্ন দুর্যোগ দুর্বিপাকে পর্যদুস্ত বাঙালি জাতির দীর্ঘদিনের স্বপ্নের সার্থক রূপায়ণ আমাদের পদ্মা সেতু। কীর্তিনাশা পদ্মা নদীর উপর নির্মিত এই সেতু আমাদের আবহমান সংগ্রামের বাস্তব প্রতিমূর্তি। এই সেতু নির্মাণের কারণে প্রমাণিত হয়েছে আমরা লড়তে জানি এবং গড়তে জানি। এরই পাশাপাশি প্রমাণিত হয়েছে আমরা যে কোন প্রকার বাধা বিপত্তি অতিক্রম করতে জানি। বিভিন্ন প্রকার কূটচাল এবং ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে সামনে এগুতেও জানি। সবাই জানেন কোন স্বপ্ন কিংবা কোন বিজয় এবং কোন ব্যাপারে কোন প্রকার সাফল্য অর্জনের পথ আদৌ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। পদ্মা সেতু নির্মাণের পথও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। অনেক চড়াই উতরাই পেরিয়ে পদ্মা সেতু আজ এক দৃশ্যমান বাস্তবতা। একথা দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশে সুশীল নামধারী একটি ‘বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত মহল’ রয়েছেন। এরা সবসময়ই সবাক, সোচ্চার এবং সক্রিয়। এরা মুখে যত সুন্দর কথাই বলুন না কেন, প্রকৃত প্রস্তাবে দেশ ও জাতির প্রতি এদের কোন প্রকার Commitment কিংবা দায়বদ্ধতা নেই। এরা বিদেশিদের কথায় এবং তাদেরই অর্থে এদের এনজিও পরিচালনা করে থাকেন। বিদেশিদের মদদে এবং তাদের অঙ্গুলি হেলনেই এরা উঠবস করেন এবং বিভিন্ন ব্যাপারে অযাচিতভাবে মন্তব্য করে থাকেন।

৪০। আমাদের দেশের এই তথাকথিত বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত মহল খুব ভালো করেই জানেন যে বিশ্ব ব্যাংক কোন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নয়। এই ব্যাংক হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কে হবেন তা ঠিক করে দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। এই ব্যাংক কোন দাতা সংস্থা নয়। কোন দেশকেই তারা কোন দান কিংবা অনুদান দেয়না। তারা উন্নয়ন সহযোগী এবং একটি ঋণ প্রদানকারী সংস্থা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে তারা ঋণ প্রদান করে থাকে। এহেন অবস্থায় এই ব্যাংকের একজন অংশীদার হিসেবে আমরাও তাদের নিকট থেকে ঋণ নেই এবং সুদাসল মিলে পরিশোধ করে থাকি। সুবিধা এই যে সুদের হার একটু কম। আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য এই ব্যাংক ১২০ কোটি ডলার ঋণ দিতে সম্মত হয় এবং এই মর্মে যথারীতি ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছে বলে কাল্পনিক অভিযোগ উত্থাপন করে পরবর্তীকালে বিশ্ব ব্যাংক এই ঋণ চুক্তি বাতিল করে দেয়। শেখ হাসিনার সরকার এহেন দুর্নীতির অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশের জ্ঞানী গুণী পণ্ডিতেরা সরকারের কথা বিশ্বাস করেননি। তারা বিশ্বাস করেছেন বিশ্ব ব্যাংকের ভিত্তিহীন মিথ্যাচার। এমতাবস্থায় দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর অন্যতম পদ্মা সেতু নির্মাণ বন্ধে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবেলার লড়াইয়ে উপরোক্ত ভদ্রবেশী সুশীল এবং নামি দামি লোক গুলো আমাদের সঙ্গী হতে ব্যর্থ হলেন। যা খুবই দুঃখজনক এবং হতাশাব্যঞ্জক।

৪১। দেশবাসী অবগত রয়েছেন যে আমাদের স্বপ্ন এবং চ্যালেঞ্জের পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ চলমান থাকাবস্থায় ২০১৬ সালের ১লা জুলাই ঢাকার গুলশানের হোলি আর্টিজান হোটেলে জঙ্গী হামলা চালিয়ে জাপান এবং ইটালির কয়েকজন নিরীহ নাগরিককে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যাবে যে, এই হত্যাকাণ্ডটি ছিল পদ্মা সেতুতে কর্মরত চীনা প্রকৌশলী এবং অন্যান্য কর্মীদের প্রতি একটি নিষ্ঠুর বার্তা- “যদি বাঁচতে চাও তো এদেশ ছেড়ে চলে যাও।” দেশি-বিদেশি যারা পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ভুয়া এবং বানোয়াট অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন, তাদের মধ্যে কেউই এই জঙ্গী হামলা এবং নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে কোন নিন্দা জানাননি কিংবা কোন প্রতিবাদ ও করেননি। উপরোক্ত হামলার ভয়াবহতা কেটে যাওয়ার পর সর্বগ্রাসী মরণব্যাধি COVID -এর তাণ্ডবে সারা বিশ্ব লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে। কিন্তু ১৭ কোটি জনতার বাংলাদেশ খুব সফলতার সাথেই এই ভয়াবহ মহামারী COVID মোকাবেলা করেছে। এই অতিমারি COVID চলমান থাকাবস্থায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সারা বিশ্ব ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক, খাদ্য এবং জ্বালানি সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এই সমস্ত কোন একটি সংকট এবং দুর্যোগের কারণেও পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজ একটি দিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। বরং তা পূর্ণোদ্যমে এগিয়ে গিয়েছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন না করে বিশ্ব ব্যাংক এবং জাইকা (JAICA) ভুল করেছে বলে পরে তারা স্বীকার করেছে। কিন্তু তাদের এই ভুলকে জেনে বুঝে আমাদের দেশের যারা সমর্থন করেছেন- তারা কিন্তু একটি বারের জন্যও তাদের ভুল স্বীকার করেননি কিংবা কোন দুঃখ প্রকাশ ও করেননি।

৪২। পদ্মা সেতু নিয়ে ড. বারাকাতের গবেষণা প্রতিবেদনঃ দেশের সুধী সমাজ নিশ্চয়ই জানেন প্রচণ্ড রকমের অপ্রত্যাশিতভাবে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণ চুক্তি বিগত ২০১২ সনের ২৯শে জুন বিশ্ব ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল ঘোষণা করে। এদেশের আপামর জনসাধারণ এখন খুব ভালো ভাবেই বুঝতে পারছেন যে পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিশ্রুত ঋণ চুক্তি বাতিলের পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাজানো সুগভীর ষড়যন্ত্র এবং অসৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। দুর্নীতির ব্যাপারে কোন প্রকার তথ্য প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও এহেন ঋণ চুক্তি বাতিল করায় বিশ্ব ব্যাপী আমাদের দেশ, জাতি এবং সরকারের ভাবমূর্তি নিদারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু এহেন গ্লানিকর এবং বিব্রতকর অভিযোগ সরকার প্রথম দিন থেকেই জোড়ালোভাবে অস্বীকার করে। এরই পাশাপাশি এই অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য বিশ্ব ব্যাংকের প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের ৮ই জুলাই মহান জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রদত্ত সমাপনী ভাষণে আমাদের নিজেদের অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হবে বলে শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন। শেখ হাসিনার উক্ত ঘোষণার অব্যবহিত পরে ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি’ কর্তৃক আয়োজিত একটি সেমিনারে উক্ত সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুঃ জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সুযোগ” শিরোনামে অত্যন্ত সৃজনশীল এবং বাস্তবধর্মী একটি গবেষণা প্রতিবেদন সবার সামনে উপস্থাপন করেন। আমাদের দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং প্রায়োগিক প্রেক্ষাপটের আলোকে বিভিন্ন ধরনের অকাট্ট এবং জোরালো যুক্তির পাশাপাশি নানা রকমের তথ্য উপাত্ত দিয়ে অর্থনীতি সমিতির প্লাটফর্ম থেকেই ড. বারাকাত তার উপরোক্ত সুচিন্তিত এবং বিশ্লেষণধর্মী গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনটি তিনি দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।

৪৩। ড. বারাকাতের অসাধারণ প্রাজ্ঞ এবং মৌলিক চিন্তাচেতনার সোনালী ফসল উপরোক্ত গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর আমাদের দেশের নেতৃস্থানীয় অর্থনীতিবিদদের মধ্যে অনেকেই এই প্রতিবেদনের বিপক্ষে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক অভিমত ব্যক্ত করেন। আমাদের নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণ বাস্তবতা বিবর্জিত একটি কল্পকাহিনী বলে দেশের সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ এই প্রকল্পের বিপক্ষে তাদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়ন ছাড়া এই সেতু নির্মাণ করা অসম্ভব এবং অবাস্তব বলে দেশের চিহ্নিত সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী মহলের একটি বড় অংশ এই প্রস্তাবনা বর্জন করার আহবান জানান। এরই পাশাপাশি বিশ্ব ব্যাংক কর্তৃক আনীত এবং উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও তারা অত্যন্ত সোচ্চার হন এবং সমালোচনা মুখর হন। এমনকি আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ একটি ‘বাজে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত’ বলে একটি বিখ্যাত ইংরেজী পত্রিকার বিদগ্ধ সম্পাদক অত্যন্ত তির্যকভাবে সরকারের সমালোচনা করেন। তাই এই সেতু নির্মাণ প্রকল্প থেকে সরে আসার জন্য উপরোক্ত সমালোচনাকারীগণ জোরালোভাবে অভিমত ব্যক্ত করেন। পক্ষান্তরে আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা সফলভাবে বাস্তবায়নের কারণে বিশ্ব দরবারে আজ আমাদের দেশের ভাবমূর্তি এবং সম্মান অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি উজ্জ্বল হয়েছে। এরই পাশাপাশি আমাদের সামর্থ্য, সক্ষমতা এবং নেতৃত্বের দূরদর্শিতা বিশ্ববাসীর নিকট পরিস্ফুট হয়েছে। তাই উপরোল্লিখিত প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদদের বিভিন্ন ধরনের বিরূপ সমালোচনা এবং নেতিবাচক অভিব্যক্তির পরিপ্রেক্ষিতে ড. বারাকাতের সুচিন্তিত গবেষণালব্ধ প্রতিবেদনটি অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত, বাস্তবসম্মত এবং সময়োপযোগী ছিল বলে দেশ এবং জাতির সামনে আজ তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়েছে।

৪৪। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে আমাদের নিজেদের অর্থে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেয়ায় দেশের বহু বরেণ্য অর্থনীতিবিদ এবং তথাকথিত সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ হতবাক এবং আশ্চর্যান্বিত হয়ে গিয়েছিলেন। বিশ্ব ব্যাংকের সাহায্য ছাড়া এই সেতু নির্মাণ করা আদৌ সম্ভব নয় বলে বিভিন্ন প্রবন্ধ, নিবন্ধ এবং আর্টিকেল লিখে তারা ঐ সময়ে সরকার তথা শেখ হাসিনাকে নিবৃত্ত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। প্রসঙ্গক্রমে আরও উল্লেখ্য যে শেখ হাসিনা কর্তৃক এই ঘোষণা দেয়ার সময়ে তথা বিগত ২০১২ সনের ৮ই জুলাই এই সেতু প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় সাব্যস্ত করা হয়েছিল ২৩ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার সংস্থান কোথা থেকে এবং কিভাবে হবে তার একটি বিস্তারিত রূপরেখা ও শেখ হাসিনা তার উপরোক্ত সমাপনী বক্তব্যে উল্লেখ করেন। এরই পাশাপাশি বিশ্ব ব্যাংক এবং অন্যান্য ঋণ দাতা সংস্থা কর্তৃক সেতু প্রকল্পের জন্য একটি টাকা প্রদান না করা সত্ত্বেও এবং ঐ দিন পর্যন্ত এই সেতুর কোন প্রকার নির্মাণ কাজ শুরু না করা সত্ত্বেও শুধুমাত্র কাল্পনিক দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপন করে বিশ্ব ব্যাংক এবং অন্যান্য ঋণ দাতা সংস্থা ঋণ চুক্তি বাতিল করায় প্রধানমন্ত্রী তার উপরোক্ত ভাষণে তাদের তীব্র সমালোচনা করেন। বাংলাদেশের উন্নয়নে কোন প্রকার বাধা কিংবা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার জন্যও তিনি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। শেখ হাসিনা ছাড়া আর কারও পক্ষে এমন ঘোষণা দেয়া এবং হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা সম্ভব ছিলনা বলে তার কট্টর সমালোচনাকারীগণ ও আজ স্বীকার করেন।

৪৫। সচেতন দেশবাসীর জানা আবশ্যক যে বিশ্ব ব্যাংকের মালিকানা জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ১৮৯ টি দেশের। এই ব্যাংকে সবচেয়ে বড় ৫ টি মূলধনকারী দেশ হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং জাপান। সম্মিলিতভাবে এই ৫ টি দেশের মূলধন ৩৭.১২ শতাংশ। আমাদের বাংলাদেশের ও এই ব্যাংকে অতি সামান্য অংশীদারিত্ব রয়েছে। এই অংশীদারিত্বের পরিমাণ ০.৩০ শতাংশ। অর্থাৎ শতকরা এক শতাংশ এমনকি আধা শতাংশের ও কম। সুতরাং বিশ্ব ব্যাংক কার কথায় এবং কাদের কথায় উঠবস করবে তা খুব সহজেই অনুধাবন করা যায়। এহেন অবস্থায় পৃথিবীর কোন দরিদ্র কিংবা স্বল্পোন্নত দেশ যদি কখনো উপরোক্ত ধনী দেশ গুলোর কোন পরামর্শ কিংবা সরাসরি হস্তক্ষেপ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তখনই বিশ্ব ব্যাংক এবং আইএমএফ সহ অন্যান্য অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান সমূহ চোখ রাঙানি শুরু করে দেয়। অপ্রিয় হলেও সত্য যে পৃথিবীর অনেক দেশই বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক কিংবা অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর উপর নির্ভরশীল। এই সমস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণগ্রহিতা দেশগুলি তাদের নিজেদের স্বার্থে এবং কল্যাণের কথা চিন্তা করে স্বাধীনভাবে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের জাতীয় স্বার্থ। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে ঋণগ্রহিতা কোন দেশই শেখ হাসিনার মতো এমন সাহস, দৃঢ়তা এবং মনোবল দেখাতে পারেননি। বাংলাদেশের অপমান তিনি মেনে নেননি। বরং যোগ্য জবাব দিয়েছেন। আমাদের পদ্মা সেতু নির্মাণ এই সব দৈত্য দানব ঋণ প্রদানকারী আগ্রাসীদের জন্য একটি বড় চপেটাঘাত। সুতরাং এই সেতুর বাস্তবায়ন আগামীতে বিশ্বের দেশে দেশে ঋণগ্রহিতাদের জন্য একটি উজ্জ্বলতম এবং সাহসী দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তাই বিশ্বের অসংখ্য দরিদ্র রাষ্ট্রের আপামর জনসাধারণ এবং রাষ্ট্রগুলোর কাছে প্রশংসিত হচ্ছে আমাদের দেশ ও জাতি। প্রশংসিত হচ্ছেন জননেত্রী শেখ হাসিনা।

ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ), লেখক ও কলামিস্ট  

(চলবে)

বি/ ইবিটাইমস /এম আর

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »