রিচার্লিসনের জোড়া গোলের জয়ে ব্রাজিলের কাতার বিশ্বকাপ শুরু

বিশ্বকাপের ‘জি’ গ্রুপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে সার্বিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে কাতার বিশ্বকাপ শুরু করেছে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল

 

স্পোর্টস ডেস্কঃ গতকাল বৃহস্পতিবার (২৪ নভেম্বর) কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম খেলায় সার্বিয়াকে ২-০ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করলো হট ফেভারিট ব্রাজিল। প্রথমার্ধে ব্রাজিলকে আটকে দিয়েছে সার্বিয়া। গোলশূন্য থেকে বিরতিতে গেছে দু’দল। তবে বিরতি থেকে ফিরেই জোড়া গোল করে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

খেলার ৬২ ও ৭৩ মিনিটে গোল দুটি করেন রিচার্লিসন। দ্বিতীয় গোলটি ছিল চোখ জুড়ানো চোখ ধাঁধানো। প্রথমার্ধে ব্রাজিলকে চেনা ছন্দে দেখা যাচ্ছিল না। দ্বিতীয়ার্ধেই দেখা যায় সাম্বার তাল। মুহুর্মুহু আক্রমণে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল সার্বিয়ান ডিফেন্সকে। দুটি বল বারে লেগে ফিরে আসে। প্রথমার্ধে চারটি আক্রমণ করা ব্রাজিল দ্বিতীয়ার্ধে করেছে ১৮টি! অন টার্গেট শট ছিল মোট ৮টি। ৫৯ শতাংশ সময় বল ছিল নিজেদের পায়ে।

খেলার তৃতীয় মিনিটে নিজেদের প্রান্ত থেকে গুছিয়ে আক্রমণ করে ব্রাজিল। ডান প্রান্ত থেকে বল নিয়ে সার্বিয়ার ডি বক্সে ঢুকে যায় রাফিনহা। সেখান থেকে বাড়ানো বল সার্বিয়ার ডিফেন্ডারদের গায়ে লেগে প্রতিহত হয়। খেলার ৫ মিনিটে মাঝমাঠে নেইমারকে ফাউল করার কারণে হলুদ কার্ড দেখেন স্ট্রাহিনা প্যাভলোভিচ। খেলার দশম মিনিটে ডি বক্সে বল পান নেইমার। কিন্তু গোলমুখে শট করতে পারেননি তিনি।

খেলার মিনিটে বাম প্রান্ত ধরে সার্বিয়ার ডি বক্সে ঢুকে যায় ভিনিসিয়াস জুনিয়র। সেখান থেকে কর্নার পায় ব্রাজিল। তবে কর্নার থেকে গোল পেতে ব্যর্থ হয় ব্রাজিল। ম্যাচের ২০ মিনিটে ডি বক্সের বাইরে থেকে সার্বিয়ার গোলমুখে জোড়ালো শট করেন নেইমার। তবে তা সার্বিয়ার ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে প্রতিহত হয়। খেলার ২৫ মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাকে যায় সার্বিয়া। ডান দিক থেকে ভেসে আসা বল সহজেই গ্লোভস বন্দি করেম অ্যালিসন বেকার।

খেলার ২৭ মিনিটে ডিফেন্স চেরা পাস দেন থিয়াগো সিলভা। তবে তা জালে জড়াতে ব্যর্থ হন ভিনিসিয়াস। খেলার ৩১ মিনিটে শট কর্নার থেকে পাস বাড়ান রাফিনহা। তবে তা লুফে নেন সার্বিয়ার গোলরক্ষক। ম্যাচের ৩৪ মিনিটে ডি বক্সের ভেতর বল পান রাফিনহা। তার নেওয়া দুর্বল শট সহজেই গ্লোভসে নেন সার্বিয়ার গোলরক্ষক। খেলার ৩৬ মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাকে যায় সার্বিয়া। তবে সেখান থেকে গোল করতে ব্যর্থ হয় সার্বিয়া।

খেলার ৪০ মিনিটে বাম দিক থেকে আক্রমণ সাজায় ব্রাজিল। ভিনিসিয়াস ডি বক্সে ঢুকলেও তা গোলমুখে শত নিতে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত গোল করতে ব্যর্থ হলে গোলশূন্য থেকে বিরতিতে যায় ব্রাজিল ও সার্বিয়া।

বিরতি থেকেই ৪৬ মিনিটে গোলের সহজ সুযোগ নষ্ট করে ব্রাজিল। গোলরক্ষককে এক পেয়েও বল জালে জড়াতে ব্যর্থ রাফিনহা। খেলার ৪৯ মিনিটে ডি বক্সের বাইরে নেইমারকে ফাউল করে সার্বিয়ার ডিফেন্ডার। নেইমারের নেওয়া ফ্রি কিক সার্বিয়ার ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে প্রতিহিত হয়। খেলার ৫২ মিনিটে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে যায় ভিনিসিয়াস। তবে ফিনিশিং ব্যর্থতায় গোল বঞ্চিত হয় ব্রাজিল। ম্যাচের ৫৫ মিনিটে বাম প্রান্ত ধরে বল নিয়ে ক্রস করে ভিনিসিয়াস। ডি বক্সের ভেতরে বল পেয়েও তা জালে জরাতে ব্যর্থ হয় নেইমার।

গোল পেতে মরিয়া হয়ে একের পর একে আক্রমণ চালাতে থাকে ব্রাজিল। তবে গোলের দেখা পায় না তারা। ম্যাচের ৫৮ মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাকে যায় সার্বিয়া। বাম দিক থেকে বাড়ানো বলে হেড করে ক্লিয়ার করে অ্যালেক্স সান্দ্রো। খেলার ৫৮ মিনিটে ডি বক্সের বাইরে থেকে জোড়ালো শট করে অ্যালেক্স সান্দ্রো। কিন্তু তা সাইডবারে লেগে ফিরে আসে। এতে গোল বঞ্চিত হয় ব্রাজিল।

তবে খেলার ৬২ মিনিটে অবশেষে গোলের দেখা পায় ব্রাজিল। বাম প্রান্ত থেকে শট করেন ভিনিসিয়াস। সেই শট সার্ভিয়ার গোলরক্ষকের হাতে লেগে বল যায় ডি বক্সে দাঁড়িয়ে থাকা রিচার্লিসন। সেখান থেকে শট করে বল জালে জড়ান তিনি। এতে ম্যাচে প্রথম গোলের দেখা পায় ব্রাজিল। ম্যাচের ৬৭ মিনিটে কাউন্টার অ্যাটাকে আবারও গোলের সুযোগ পায় ব্রাজিল। তবে ডি বক্সে বল নিয়ে গিয়ে শট করতে ব্যর্থ হয় ভিনিসিয়াস।

ম্যাচের ৭৩ মিনিটে ফের গোলের দেখা পায় ব্রাজিল। বাম দিক থেকে ভিনিসিয়াসের ক্রস থেক বাইসাইকেল কিকে বল জালে জড়ান প্রথম গোল করা সেই রিচার্লিসন। অসাধারণ ফিনিশিংয়ে ব্রাজিলকে দুই গোলের লিড এনে দেন তিনি।

ম্যাচের ৭৮ মিনিটে রিচার্লিসনকে উঠিয়ে জেসুসকে নামান ব্রাজিলের কোচ তিতে। সেইসঙ্গে নেইমারকেও তুলে নেন তিনি। নেইমারের পরিবর্তে মাঠে নামেন অ্যান্টোনি। ম্যাচের ৮১ মিনিটে ডি বক্সের বাইরে থেকে ক্যাসেমিরোর নেওয়া শট ক্রসবারের লেগে ফিরে এলে গোল বঞ্চিত হয় ব্রাজিল।

ম্যাচের ৮৫ মিনিটে সাজানো আক্রমণ থেকে ডি বক্সের বাইরে থেকে শট করেন রদ্রিগেজ। তবে তা চলে যায় ক্রসবারের ওপর দিয়ে। ম্যাচের ৮৯ মিনিটে বাম প্রান্ত ধরে আক্রমণ সাজায় ব্রাজিল। সেখান থেকে ডানিলোর ক্রস থেকে মার্টিনেল্লির হেড চলে যায় গোলপোস্টের বাইর দিয়ে। এরপর আর কোন গোল না হলে ২-০ গোল জিতে মাঠ ছাড়ে তিতের শীর্ষরা।

কাতার বিশ্বকাপ ব্রাজিলের মিশন হেক্সা: অপেক্ষার প্রহর সব সময়ই ক্লান্তিকর। সবশেষ ২০০২ সালে বিশ্বকাপের শিরোপা জিতেছিল ব্রাজিল। এরপর কেটে গেছে ২০ বছর। সেই শিরোপা আর শোকেসে তুলতে পারেনি তারা। এই সময়ের মধ্যে ব্রাজিল মাত্র একবার সেমিফাইনাল খেলেছিল। তিনবার কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নিয়েছিল। সবশেষ আসরে বেলজিয়ামের কাছে হেরে শেষ আট থেকেই বিদায় নিয়েছিল তারা।

প্রতি আসরেই হেক্সা মিশন নিয়ে আসে তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেতে পারে না। তবে এবার নেইমারের শেষ বিশ্বকাপে তারা শেষ পর্যন্ত যেতে বদ্ধ পরিকর। নেইমার-ভিনিসিউস-রদ্রিগো, রিচার্লিসন, রাফিনহাদের নিয়ে শিরোপা জেতার মতো শক্তিশালী দল নিয়েই কাতারে এসেছেন তিতে। যারা আগের চেয়ে আরও অভিজ্ঞ আরও ধারালো। যা তারা বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব ও অন্যান্য ম্যাচে প্রমাণ করেছে।

২১ থেকে অপরাজিত ব্রাজিল বিশ্বকাপের ২২ আসরেই খেলছে তারা। তার ওপর লাতিন আমেরিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখিয়েছে তারা। ১৭ ম্যাচ খেলে একটিতেও হারেনি তারা। ১৪টি জয়, ৩টি ড্র। সর্বোচ্চ ৪৫ পয়েন্ট নিয়ে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থেকে কাতার বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে।

সবশেষ তারা হেরেছিল ২০২১ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে। এরপর থেকে অপরাজিত আছে সেলেসাওরা। সে কারণে সার্বিয়ার বিপক্ষে নিঃসন্দেহে ফেভারিট ব্রাজিল।

সার্বিয়া অবশ্য স্বাধীন হওয়ার পর এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো খেলছে বিশ্বকাপে। আগের দুই আসরে গ্রুপপর্বের বাঁধা পেরুতে পারেনি তারা। এবার অবশ্য গ্রুপপর্বের গণ্ডি পেরোনের লক্ষ্য নিয়েই কাতার এসেছে তারা।

মজার বিষয় হলো রাশিয়া বিশ্বকাপেও ব্রাজিলের গ্রুপে পড়েছিল তারা। সেখানে হেরেছিল ২-০ গোলে। তার আগে ২০১৪ সালে এক প্রীতি ম্যাচে হেরেছিল ১-০ গোলে।

তবে সার্বিয়ার সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বেশ ভালো। সম্প্রতি তারা নেশন্স লিগে উন্নতি করে ‘লিগ এ’ তে উঠেছে। তাছাড়া বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে তাদের পারফরম্যান্স ছিল ঈর্শনীয়। আট ম্যাচের ছয়টিতে জিতে ও দুটিতে ড্র করে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থেকে কাতার বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েছিল তারা। এ যাত্রায় তারা ২-১ গোলে হারিয়েছিল পর্তুগালের মতো দলকেও।

ব্রাজিল একাদশ: অ্যালিসন; দানিলো, মারকুইনহোস, থিয়াগো সিলভা, অ্যালেক্স সান্দ্রো; কাসেমিরো, লুকাস পাকেটা; রাফিনহা, নেইমার, ভিনিসিয়াস জুনিয়র; রিচার্লিসন।

সার্বিয়া একাদশ: ভি মিলিঙ্কোভিক-সাভিক; ভেলজকোভিচ, মিলেনকোভিক, পাভলোভিক; জিভকোভিচ, লুকিক, গুডেলজ, ম্লাদেনোভিক; ট্যাডিক, এস মিলিঙ্কোভিক-সাভিক; এ মিত্রোভিক।

কবির আহমেদ/ইবিটাইমস 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »