
শুধু তাই নয়, চারদিকে লাশের সারি। লাশ দেখলেই বোজা যায়, জীবন বাচাতে তারা শেষ পর্যন্ত কত লড়াই করেছিলেন। কোন লাশ গাছে ঝুলে আছে আবার কোন লাশ মাটিতে পড়ে আছে। লাশের পাশে স্বজনদের কান্না আহাজারি। অনেক লাশ পানিতে ভেসে গেছে, খুজে পায়নি পরিবারের সদস্যরা।
৭০ এর ঘুর্নিঝড়ের এভাবেই বর্ননা দিচ্ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী ভোলার মদনপুরের অজিউল্ল্যাহ।
তিনি বলেন, হঠাৎ করেই দেখতে পান ৫টি যুবতি মেয়ে পানিতে ভেসে এসেছে, তখনও তারা জীবিত। তাদের বাচাতে ছুটে যান তার বাবা মোজাম্মেল হক। পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তাদের চুল গাছের সাথে বেধে বাচানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তাদের মধ্যে দুই জন বেচে গেলেও বাকিরা মারা যায়। এ ঘটনা চরফ্যাশন উপজেলার নুরাবাদ গ্রামের।
ঝড়ের সেই দিনের বিভীষিকাময় ভয়ানক এমন ঘটনার বর্ননা দেন তখন বেচে যাওয়া মানুষগুলো। বাসু, সামসুদ্দিন, আবদুল মালেক, হাফেজ ফারুক, মজিবুল হক, মো: ইউসুফসহ কয়েকজন জানালেন ঝড়ের কথা।
সেইদিনের বর্ননা করতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী ইউসুফ জানান, চারদিকে বাতাসের শো শো শব্দের সাথে হঠাই করেই পানির স্রোতে রাতেই তাদের পরিবারের ৭ জনকে ভেসে নিয়ে যায়, তখন একটি গাছের সাথে তারা আশ্রয় নেয়।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী মদনপুরের মজিবুল হক জানায়, ওই ঝড়ে তার বাবাসহ পরিবারের ৪জন মারা হয়। পরিবারের তখন সাত জন একটি বড় গাছের উপরে আশ্রয় নেয়, কিন্তু তার বাবা ঠান্ডার কারনে আস্তে আস্তে শরীর নিস্তেজ হয়ে মারা যায়।
৭০’র ভয়াল সেই দিনের লোমহর্ষক বিভীষিকাময় ঘটনার বর্ননা করতে গিয়ে ইউসুফ, অলিউল্ল্যাহ ও মজিবুলের মত অনেকেই কেদে ফেলেন। সেই ঝড়ে কেউ হারিয়ে বাবা, কেউ মা, কেউবা পরিবারের একমাত্র উপর্জনক্ষম ব্যাক্তিকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ। স্বজনদের হারিয়ে আজো কেদে উঠেন ওই সব পরিবারগুলো। প্রলংকারী ঝড়ের কথা মনে করে আজো আতঁকে উঠেন মানুষ
ভয়াল ১২ নভেম্বর। ১৯৭০ সালের এর এইদিনে ভোলার উপকূলে আঘাত হানে প্রলংকারী ঘূর্নিঝড়টি। এতে প্রান হারায় অর্ধশক্ষাধিক মানুষ।
সেই ঝড়ের কথা মনে করে আজো আতঁকে উঠেন সমগ্র উপকুলের মানুষ।
৭০ এর ভয়াল ঝড়ে পুরো জেলা লন্ড ভন্ড। নদীতে যেমনি ভাসছে লাশ ঠিক তেমনি গাছে গাছে ঝুলে ছিলো মানুষের লাশ। দিনটির কথা স্মরণ করে স্বজনহারা মানুষ। যাদের সংখ্যা অনেক দীর্ঘ। বেশিরভাগ পরিবারেরই বেঁচে থাকার মতো কেউ ছিলো না। সেই ঝড়ে দ্বীপজেলা ভোলা জেলার সাত উপজেলার বিস্তৃর্ণ জনপদ লন্ড ভন্ড হয়ে বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। মারা যায় এক লাখের অধিক মানুষ। ঝড়ের ক্ষতচিহ্নের বর্ণনা করতে গিয়ে আজো শিউরে উঠেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

সেদিনের ঝড়ে স্বজনহারা মনির বলেন, ঝড়ে আমার তিন বোনকে হারিয়েছে। তাদের কথা মনে করে আজো মা কাঁদেন।
তুলাতলী এলাকার বাদশা মিয়া বলেন, মেঘনা নদী দিয়ে মানুষের মরদেহ ভাসতে দেখেছি। অনেক মানুষ উদ্ধার করেছি। বাকি মরদেহ স্রোতে ভেসে গেছে।
স্থানীয় রহমত আলী, ছিদ্দিক ও সিরাজ উদ্দিন বলেন, সেদিনের ঝড়ে মদনপুরের ১৮টি ঘরের মধ্যে ৪০ জনের মরদেহ পাওয়া যায়। একটি পরিবারে কেউ বেঁচে ছিলেন না।
প্রত্যক্ষদর্শী শাহে আলম বলেন, সেদিন দিনভর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি ছিল। রাতে পুরো দমে ঝড় শুরু হয়। ভোরে জলোচ্ছ্বাসে মানুষ মারা যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল মনপুরা, চরফ্যাশন, লালমোহন উপজেলায়।
প্রবীন সংবাদিক ও ভোলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এম হাবিবুর রহমান বলেন, বন্যার পরে দেখেছি সাপ আর মানুষ দৌলতখানের চৌকিঘাটে জড়িয়ে পড়ে আছে। ¯স্নেহময়ী মা তার শিশুকে কোলে জড়িয়ে পড়ে আছে মেঘনার পাড়ে। সোনাপুরের একটি বাগানে গাছের ডালে এক মহিলার লাশ ঝুলছে। এমনিভাবে মনপুরা, চরফ্যাশন, লালমোহন, তজুমুদ্দিন ও দৌলতখানসহ সমগ্র জেলায় মানুষ আর গবাদি পশু সেদিন বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলে ভেসে গেছে। জন-মানুষ শূণ্য হয়ে পড়েছিলো দ্বীপজেলা ভোলা।
ইউরো বাংলা টাইমসের এডিটর ইন চীফ মাহবুবুর রহমান বলেন, আমি তখন ৮ম শ্রেণীর ছাত্র। তিনি বলেন, আমি স্বচক্ষে দেখেছি সেই ভয়াল রাত্র। ঐ দিনের কথা মনে পরলে এখনো শরীর শিহরিয়ে উঠে।
ভয়ানক সেই ঝড়ের কথা এখনো ভুলেনি উপকূলের মানুষ। গাছে ঝুলে ছিল অনেকের মরদেহ। বাঁচার লড়াই করেছেন অনেকে। কেউ বেঁছেছেন তবে বেশিরভাগই তাদের স্বজনদের হারিয়েছেন।
এদিকে উপকূলবাসীদের অভিযোগ, উপকূলে একের পর এক দুর্যোগ আঘাত হানলেও আজো উপকূলবাসীর জন্য টেকশই বেড়িবাঁধ কিংবা আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ হয়নি। প্রতিবছরই ঝড় আসে। অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। কিন্তু এখানের মানুষ মৃত্যু ঝুঁকিতে ভোগে। ঝড় কিংবা ঘূর্ণিঝড় আসলেই মৃত্যু তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়।
১৯৭০ সালের এই দিনে পুরো উপকূলবাসীর জীবনে নেমে আসে এক মহাদুর্যোগ। মহাপ্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে নিমিষে উপকূলীয় চরাঞ্চলে ১০ থেকে ১২ ফুট পানিতে বাড়িঘর, সোনালি ফসলের মাঠ, উঠানে স্তূপাকার ও গোলা ভরা পাকা ধান তলিয়ে যায়। স্রোতের তোড়ে হাজার হাজার মানুষ ও কয়েক লাখ গরু-মহিষ ভেসে যায়। বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয় পুরো উপকূলীয় এলাকা। ক্ষতিগ্রস্থ হয় ব্যাপক ফসলি জমি, প্রাণী ও বনজসম্পদ।
এদিকে ১২ নভেম্বরকে উপকূল দিবসের দাবীতে ভোলায় বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। উপকূল দিবস বাস্তবায়ন কমিটি প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরও দিবসটি পালন করছে। ওই কমিটির উদ্যোক্তা উপকূল সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম মন্টু বলেন, এ বছরের দেশেরর ৫০ টি জেলায় দিবসটি পালিত হবে। ঝড়ে নিহতদের স্মরন এবং ভয়াল সেই দিনটিকে মনে রাখতেই এ আয়োজন।
ভোলা/ইবিটাইমস