জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক সম্মেলনে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন ও এর বৈশ্বিক প্রভাব
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ গতকাল বুধবার(২১ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দফতরে শুরু হয়েছে সাধারণ পরিষদের ৭৭ তম অধিবেশন। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের নেতৃত্বে আছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভয়েস অফ আমেরিকার খবরে বলা হয়েছে,বিশ্ব নেতৃবৃন্দ বৈশ্বিক মহামারী করোনা ও ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতে বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত রাখতে তারা সারা বিশ্বের কৃষকদের কাছে শস্য রোপণের মৌসুম আসার আগেই গ্রহণযোগ্য মূল্যে সার পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সাধারণ পরিষদের ৭৭ তম অধিবেশনের উদ্বোধন করে তার প্রথম বক্তব্যে বলেন, ‘এখুনি উদ্যোগ নেওয়া না হলে বৈশ্বিক সার সংকট খুব দ্রুত রূপ পাল্টে বৈশ্বিক খাদ্য সংকটে পরিণত হবে।’
সেনেগালের প্রেসিডেন্ট ও আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ারপার্সন ম্যাকি সাল খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি মন্ত্রক-পর্যায়ের বৈঠকে মন্তব্য করেন, ‘২০২১ সালের তুলনায় সারের দাম ৩ গুণ বেড়েছে।’
২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর থেকে রাশিয়া সার রপ্তানির ওপর কোটা বসিয়েছে। কারণ হিসেবে নিজেদের কৃষকের জন্য যথেষ্ট মজুত রাখার কথা জানিয়েছে দেশটি। মস্কো বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সার রপ্তানিকারক। ফলে সরবরাহে বিঘ্ন ও স্বল্পতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। কিছু ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য সার আওতার বাইরে চলে গেছে, যেটি তাদের শস্য উৎপাদনকে নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেবে। এতে ইতোমধ্যে নাজুক অবস্থায় থাকা বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা আরও হুমকির মুখে পড়বে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, বিশ্বের প্রায় ৮০ কোটি মানুষ ক্ষুধার্ত রয়েছে।
কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানানো হলেও, রাশিয়া ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা এতে রাজি নয়। শিগগির লুহানস্ক ও ডনেটস্ক অঞ্চলকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার জন্য তারা গণভোটের আয়োজন করতে যাচ্ছে। এ উদ্যোগের ফলে যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। রাশিয়ার খাদ্য ও সার রপ্তানির ওপর পশ্চিমের দেশগুলো কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করেনি। তবে রাশিয়ার দাবি ভিন্ন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান মঙ্গলবার কূটনীতির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান করার আহ্বান জানান। তবে রাশিয়া বা ইউক্রেন, কোনো দেশেরই নেতা এ সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে আসছেন না। ফলে এ ধরনের কোনো কিছু ঘটার আপাত: সম্ভাবনা নেই।
এদিকে ৭৭ তম সাধারণ পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন, ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেনে আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এ দিকে গতকালই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন উল্লেখযোগ্যভাবে যুদ্ধের প্রচেষ্টা বাড়ানোর ষোষণা এবং পারমাণবিক হামলার হুমকি দিয়েছেন।
নিউইয়র্কে বুধবার সকালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) বার্ষিক সমাবেশে বাইডেনের বক্তৃতার বেশিরভাগ সময় জুড়েই ছিল মস্কোর বিরুদ্ধে তাঁর নিন্দা জ্ঞাপন।
বাইডেন বলেন, “আসুন আমরা পরিষ্কারভাবে কথা বলি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একজন স্থায়ী সদস্য তার প্রতিবেশীকে আক্রমণ করেছে, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। রাশিয়া নির্লজ্জভাবে জাতিসংঘের সনদের মূল নীতিগুলি লঙ্ঘন করেছে, প্রতিবেশীর ভূখণ্ড দখল করা দেশগুলির বিরুদ্ধে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার চেয়ে আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়।”
অন্যদিকে, জাতির উদ্দেশ্যে একটি টেলিভিশন ভাষণে পুতিন বলেন, “যদি আমাদের দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা হুমকির সম্মুখীন হয়, আমরা নিঃসন্দেহে রাশিয়া এবং আমাদের জনগণকে রক্ষা করার জন্য সমস্ত উপলব্ধ উপায় ব্যবহার করব – এটি কোনও ধোঁকা নয়।”
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেন্সকির বুধবার বিকেলে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল। গত সপ্তাহে, সাধারণ পরিষদের ১৯৩ সদস্য-রাষ্ট্রের একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ইউক্রেনীয় নেতাকে জাতিসংঘের নিয়মগুলির ব্যতিক্রম করার অনুমতি দিয়েছে যাতে বলা হয়েছে , এই বছরের অধিবেশনে শীর্ষ পর্যায়ের বক্তৃতাগুলো অবশ্যই ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত হয়ে প্রদান করতে হবে।
তবে বেলারুশ, কিউবা, ইরিত্রিয়া, নিকারাগুয়া, উত্তর কোরিয়া এবং সিরিয়া জেলেন্সকির ভিডিও বক্তৃতার অনুমতি দেওয়ার বিরুদ্ধে রাশিয়ার ভোটে সমর্থন দিয়েছিল। যেহেতু পুতিন সশরীরে যোগ দিচ্ছেন না, তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ শনিবার তার দেশের পক্ষে ভাষণ দেবেন, কারণ রাষ্ট্রনেতাদের পরে মন্ত্রীদের কথা বলার স্লট দেওয়া হয়।
ঐতিহ্যগতভাবে, আতিথ্য দেয়া দেশ হিসাবে, আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা সবসময় ব্রাজিলের পরেই কথা বলেন। তবে ব্রিটেনের রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে লন্ডনে থাকায় প্রেসিডেন্ট বাইডেন মঙ্গলবার তাঁর জন্য নির্ধারিত সময়ে বক্তৃতা দিতে পারেননি।
বাইডেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া তাঁর মন্তব্যে, চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে “গণতন্ত্রপন্থী কর্মী এবং জাতিগোষ্ঠীগত সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বেইজিংয়ের ভয়ঙ্কর নির্যাতন” এবং “আফগানিস্তানে তালিবানের দ্বারা নারী ও মেয়েদের বর্ধিত নিপীড়নের কথা উল্লেখ করেছেন।”
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলি চীনের বিরুদ্ধে শিনজিয়াংয়ে ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে বেইজিংয়ের প্রচারণার আড়ালে ১০ লাখেরও বেশি সংখ্যালঘুকে শিবিরে আটকে রাখার, চলাফেরার স্বাধীনতা সীমিত করা এবং নির্যাতন, জোরপূর্বক বন্ধ্যাকরণ এবং যৌন সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ করেছে। তবে চীন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
বাইডেন ইথিওপিয়ার টিগ্রায় অঞ্চলে যুদ্ধ, হাইতির সহিংসতা এবং ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক নিপীড়নসহ অন্যান্য বৈশ্বিক সংঘাতের বিষয়গুলো নিয়েও কথা বলেছেন। এছাড়া তিনি ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের জন্য তাঁর সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেন, “ইউক্রেনের পরিস্থিতিতে রাশিয়ার ভেটো’র ব্যবহার সত্যিই ভেটোর প্রতি নতুন মনোযোগ আকর্ষণ করেছে এবং এটি স্পষ্টতই সামগ্রিকভাবে জাতিসংঘের সদস্যদের কাছে আদৌ জনপ্রিয় নয়। ”
গত সপ্তাহে, জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত, লিন্ডা টমাস-গ্রিনফিল্ড, উল্লেখ করেন, ২০০৯ সাল থেকে, রাশিয়া ২৬টি ভেটো দিয়েছে এবং ১২টি ভেটো দেয়ার ক্ষেত্রে চীন তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ২০০৯ সাল থেকে ভেটো ব্যবহার করেছে মাত্র চারবার।
বাইডেন তাঁর মন্তব্যে, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যপদ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তাঁর সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ” নিরাপত্তা পরিষদ আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার প্রয়োজন, যাতে তারা আজকের বিশ্বের প্রয়োজনে আরও ভালভাবে সাড়া দিতে পারে।”
মহামারীর ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী খাদ্যের দাম নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে। উপরন্তু রাশিয়ার ইউক্রেনে আক্রমণের কারণে ক্রমবর্ধমান জ্বালানী এবং সারের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
হোয়াইট হাউজ অনুসারে, এই বছর বাইডেন প্রশাসন ইতোমধ্যে প্রতিশ্রুত ৬৯০ কোটি ডলার ছাড়াও বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা মোকাবেলায় আরও ২৯০ কোটি ডলারের বেশি অনুদানের ঘোষণা দিয়েছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৭ তম অধিবেশনে যোগদান করতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। প্রধানমন্ত্রীর আগামীকাল সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘ থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সদর দপ্তরে পদ্মা সেতুর ওপর একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী পরিদর্শন করেছেন। বুধবার বিকেলে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের লেভেল-১ এর আঁকাবাঁকা দেয়ালে আয়োজিত প্রদর্শনী পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনের সময় জাতিসংঘের ইকোসক প্রেসিডেন্ট লাচেজারা স্টোভাসহ কয়েকজন বিদেশি অতিথি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। অতিথিদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করেছি। কারণ, এটি নির্মাণ করা আমাদের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির অভিযোগ এনে আমাদের দোষারোপ করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পরে প্রমাণিত হয়েছে যে কোনো দুর্নীতি হয়নি।’
এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, অ্যাম্বাসেডর-অ্যাট-লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, সিনিয়র পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব মো. তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। পদ্মা সেতুর ওপর ১৯ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীটি আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে।
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস