বিশ্বের সুখী দেশের তালিকায় ১১ তম অস্ট্রিয়া, ৯৪ তম স্থানে বাংলাদেশ

একটানা পঞ্চমবারের মতো ইউরোপের উত্তরের দেশ ফিনল্যান্ড বিশ্বের সবচেয়ে সুখী জনসংখ্যার দেশ হিসেবে প্রথম স্থান অর্জন করেছে

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ সম্প্রতি ২০২২ সালের জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে ১৪৬টি দেশের তালিকায় পঞ্চমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ নির্বাচিত হয়েছে ফিনল্যান্ড। অন্যদিকে আফগানিস্তানকে বিশ্বের সবচেয়ে কম সুখের দেশ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এই তালিকায়। এই তালিকায় এই সুখী দেশের তালিকায় ১১ তম স্থানে আছে অস্ট্রিয়া।

এই বছরের বিশ্বের সুখী দেশের র‌্যাঙ্কিংয়ে সাত ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। এ বছর জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে ১৪৬টি দেশের তালিকায় ৯৪ নম্বরে রয়েছে বাংলাদেশ। গত বছরের প্রতিবেদনে বিশ্বের ১৪৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০১। এবারের তালিকায় প্রতিবেশী দেশ ভারতের অবস্থান ১৩৬ এবং পাকিস্তান ১২১ নম্বরে রয়েছে।

বিশ্বের কয়েকটি নামকরা দেশের মধ্যে জার্মানির স্থান ১৪ তম,যুক্তরাজ্যের অবস্থান আছে ১৫ তম স্থানে, যুক্তরাষ্ট্র আছে ১৬ তম স্থানে এবং ফ্রান্সের অবস্থান ২০ তম স্থানে।

এই বছরের তালিকা অনুযায়ী শীর্ষ ১০টি সুখী দেশ হচ্ছে যথাক্রমে ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, লুক্সেমবার্গ, সুইডেন, নরওয়ে, ইসরায়েল ও নিউজিল্যান্ড।

জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস দেশের রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে এই বছর সার্বিয়া, বুলগেরিয়া ও রোমানিয়া শারীরিক সুস্থতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছে। সব মিলিয়ে সবচেয়ে বড় পতন হয়েছে লেবানন ও ভেনেজুয়েলার। অর্থনৈতিক মন্দার মুখে পড়া লেবানন সবচেয়ে কম সুখের দিক দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে নেমে এসেছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানে গত আগস্টে তালেবান আবার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে মানবিক সংকট গভীরতর হয়েছে।

সুখী দেশের তালিকা করার ক্ষেত্রে মানুষের সুখের নিজস্ব মূল্যায়ন, সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে শূন্য থেকে ১০ সূচকে নম্বর পরিমাপ করা হয়। পাশাপাশি প্রতিটি দেশের মানুষের ব্যক্তিগত সুস্থতার অনুভূতি, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, জিডিপি ও দুর্নীতির মাত্রা বিবেচনায় নেওয়া হয়।

এই বছর নব নির্বাচিত বিশ্বের সুখী দেশের মধ্য থেকে প্রথম দশটি দেশের সংক্ষিপ্ত বিবরণী নিম্নে উপস্থাপন করা হল,

১. ফিনল্যান্ড
বিশ্বের সবচেয়ে সুখী দেশ ফিনল্যান্ড। একটানা ৫ বছরের মতো জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড হ্যাপিনেস রিপোর্টে দেওয়া হয়েছে এ খেতাব। এ ছাড়া ফিনল্যান্ডের তিন নর্ডিক প্রতিবেশী- নরওয়ে, ডেনমার্ক এবং আইসল্যান্ডও রয়েছে সুখী দেশের তালিকায় উপরের অবস্থানে। ফিনল্যান্ডের রাজনীতি একটি অর্ধ-রাষ্ট্রপতি শাসিত প্রতিনিধিত্বমূলক বহুদলীয় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংগঠিত।

শিক্ষা একটি জন্মগত অধিকার ও তা রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত সেবা হিসেবে বিবেচিত হয় ফিনল্যান্ডে। এখানে ৭ থেকে ১৬ বছর বয়সী ছেলেমেয়ে বিনামূল্যে শিক্ষালাভ করে। উচ্চশিক্ষায় ফিনল্যান্ড এগিয়ে।

২. ডেনমার্ক
ছবির মতো সুন্দর দেশ ডেনমার্ক। শুধু সৌন্দর্য নয়, বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ সুখী মানুষের দেশগুলোর তালিকায়ও রয়েছে ডেনমার্ক। এ দেশের মানুষগুলোর মধ্যে শান্তির প্রথম ও প্রধান কারণ হিসেবে গবেষকরা বলেন, ‘ডেনমার্কের লোকজন কখনই যুদ্ধবিগ্রহে জড়ান না, তাদের প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য নিজেদের অর্থনৈতিক দিক’। আরও একটি দিক হলো ডেনমার্কের নাগরিকরা অনেক বেশি বন্ধুভাবাপন্ন ও সহযোগী মনমানসিকতা সম্পন্ন। এ বছর বিশ্বের সুখী দেশের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ডেনমার্ক। করোনাকালেও দেশটি ছিল সমানভাবে সফল।

৩. আইসল্যান্ড
আইসল্যান্ড ইউরোপ মহাদেশের একটি প্রজাতান্ত্রিক দ্বীপরাষ্ট্র। এর রাজধানীর নাম রেইকিয়াভিক। এখানকার মানুষ শান্তিপ্রিয় হিসেবে সারা বিশ্বেই সুনামের অধিকারী। বাইরের দেশের অতিথিদের আপ্যায়নেও রয়েছে সুনাম।

শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব ক্ষেত্রে আইসল্যান্ডের সূচক ওপরের দিকে। ভৌগোলিকভাবে উত্তর সুমেরুর কাছে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও উত্তরে আটলান্টিক মহাসাগরের উষ্ণ উপসাগরীয় সমুদ্রস্রোতের কারণে এখানকার জলবায়ু তুলনামূলকভাবে মৃদু। ফলে আইসল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তরে অবস্থিত মানব বসতিগুলোর একটি।

৪. সুইজারল্যান্ড
পৃথিবীর বুকে এক টুকরো স্বর্গ বলা হয় যে দেশটিকে তার নাম সুইজারল্যান্ড। দেশটি বিশ্বজুড়ে ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে অন্যতম কাক্সিক্ষত গন্তব্য। এখানে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাংক, নানা ধরনের চকোলেট এবং আলপস পর্বতমালা। অনেকেই বলে থাকেন, ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে সুইজারল্যান্ড সবচেয়ে সুন্দর। পাহাড়, পর্বত, লেক, ভ্যালি এবং অ্যালপাইন বনাঞ্চলঘেরা এই দেশটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার। এ বছর শান্তিপ্রিয় সুইজারল্যান্ড বিশ্বের চতুর্থ সুখী মানুষের দেশের মর্যাদা পেয়েছে। ইউরোপের বিখ্যাত আলপস পর্বতমালা দেশটির সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

৫.নেদারল্যান্ডস
আয়তনে নেদারল্যান্ডস ছোট্ট একটি দেশ হলেও অত্যন্ত সুন্দর সাজানো-গোছানো। নেদারল্যান্ডসের অর্থনীতির মূল ভিত্তি কৃষি। এ বছর সুখী মানুষের দেশ হিসেবে দেশটির অবস্থান পঞ্চম। নেদারল্যান্ডসের কৃষকরা দেশের প্রথম শ্রেণির ধনী। তাদের প্রধান খাদ্য ব্রেড, আলু, সালাদ। আর এ ব্রেডের সঙ্গে অন্তত হাজার রকমের উপকরণ আছে যা মিলিয়ে তারা খেতে পছন্দ করে। দেশটির মানুষ অনেক অতিথিপরায়ণ। খুব পরিশ্রমী হিসেবেও সুনাম রয়েছে তাদের। শত শত বছরের পরিশ্রমের ফসল আজকের এই নেদারল্যান্ডস। এখানে আইনের যথাযথ প্রয়োগও রয়েছে।

৬. লুক্সেমবার্গ
বিশ্বের ষষ্ঠ সুখী দেশ লুক্সেমবার্গ পশ্চিম ইউরোপের একটি ক্ষুদ্রায়তন রাষ্ট্র। রাজধানীর নামও লুক্সেমবার্গ। আয়তন মাত্র ২ হাজার ৫৮৬ বর্গকিলোমিটার (বিশ্বে ১৭৯তম)। ১৮১৫ সালের ৯ জুন থেকে স্বাধীন দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। মাথা পিছু আয়ের হিসাবে এটি পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ধনী দেশ।

দেশটির প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ফরাসি ভাষায় পাঠদান করা হয়। হাইস্কুলে পৌঁছার আগে শিখে নেয় জার্মান ভাষা। আর হাইস্কুলে পড়ার প্রধান ভাষা ইংরেজি। তা ছাড়াও তাদের নিজস্ব ভাষা আছে ‘লিতজিবুয়িরগেস’। লুক্সেমবার্গ ট্যাক্স-হেভেন নামে সুখ্যাত।

৭.সুইডেন

পৃথিবীর সবচেয়ে ‘ভালো’ দেশের খেতাব আগেই পেয়েছে সুইডেন। আর সুখী দেশ হিসেবে অবস্থান সপ্তম। নিজের দেশ এবং অন্য দেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব যথাসম্ভব এড়িয়ে দেশের মানুষের স্বার্থরক্ষায় সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রাখার কারণে প্রশংসিত দেশটি। করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরও দেশটি ছিল স্বাভাবিক। ইউরোপের অধিকাংশ দেশ যখন অবরুদ্ধ ছিল লকডাউনে তখন হালের বিপরীতে হেঁটেছিল বিশ্বের অন্যতম সুখের দেশ সুইডেন। করোনার সময়েও অধিকাংশ নাগরিক স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যেতে পারছেন।

৮.নরওয়ে
একটি পর্বতমালার দেশ নরওয়ে। এর রাজধানী অসলো। নিশিত সূর্যের দেশ নামেও পরিচিত নরওয়ে। সুখী দেশ হিসেবে এ বছর দেশটির অবস্থান অষ্টম। দেশটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ জাদুকরী একটি শহর হলো অসলো। রঙিন কাঠের ঘরগুলোর সঙ্গে বার্গেন এবং এর নিখুঁত কারুকার্যগুলো পর্যটকদের মন ছুঁয়ে যায়। এ ছাড়াও মাছধরা, হাইকিং এবং স্কিইং, বিশেষত লিলহ্যামারের অলিম্পিক রিসোর্টের জন্য পর্যটকদের কাজে সুপরিচিত বিশ্বের সুখী মানুষের এই দেশটি।

৯.ইসরাইল
ধীরে ধীরে বিশ্বের সুখী দেশের তালিকায় ওপরের দিকে চলে এসেছে ইসরাইল। এ ছাড়া গত কয়েক দশক ধরে নিজেদের পৃথিবীর অন্যতম প্রযুক্তিধর দেশ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে। মাত্র ৯০ লাখের সামান্য বেশি জনসংখ্যার এই দেশে অবিশ্বাস্যভাবে ৪ হাজারেরও বেশি প্রযুক্তি কোম্পানি রয়েছে। সিসকো, পেপাল, মাইক্রোসফট, গুগল, ফেসবুক, অ্যাপল কিংবা ইনটেল হচ্ছে এমনই কিছু হাতে গোনা কোম্পানির নাম; যারা ইসরায়েলে নিজেদের নতুন পণ্য উৎপাদন ও গবেষণায় কাজ করে।

১০.নিউজিল্যান্ড

দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অনন্য দেশ নিউজিল্যান্ড। বিশ্বের দশম সুখী এই দেশটি ওশেনিয়া মহাদেশের একটি দ্বীপরাষ্ট্র। এটি অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। নিউজিল্যান্ড একটি চমৎকার বন্ধুবৎসল দেশ হিসেবে সুপরিচিত। মনোমুগ্ধকর ফটোজেনিক প্রকৃতি যেন অপার্থিব সৌন্দর্যের আধার। এখানে আছে ঘন বন, পাহাড়, সমুদ্রসৈকত, গ্লাসিয়ার, উষ্ণ অঞ্চল সব কিছু। ঐতিহ্যবাহী মাউরি সংস্কৃতি মিশেছে শহুরে আধুনিকতার সঙ্গে, চমৎকার সব গ্রাম আর বিশাল অপূর্ব বন্য জীবন। এমন সংস্কৃতি দেশটিকে পরিণত করেছে বিশ্বের সুখী দেশে।

কবির আহমেদ/ ইবিটাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »