ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ

২য় পর্ব

 ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ ১১। পরবর্তীকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক জনসভা করে বঙ্গবন্ধু তাঁর ৬ দফা কর্মসূচী দেশবাসীর নিকট সবিস্তারে তুলে ধরেন। তাঁর এই কর্মসূচী দেশবাসী গভীর আগ্রহের সাথে গ্রহণ করেন। পক্ষান্তরে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান দমন-পীড়নের পথ বেছে নেন এবং ৬ দফা আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অস্ত্রের ভাষা প্রয়োগের হুমকি দেন। এরই পাশাপাশি ৬ দফার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রচারণা শুরু করেন। তাদের এহেন কঠোর মনোভাব এবং দমন- পীড়নমূলক আচরণ সহ নেতিবাচক বিরূপ প্রচারণার কারণে ৬ দফা ক্রমে ক্রমে দেশবাসীর নিকট আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠে। বঙ্গবন্ধু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন ৬ দফা বাস্তবায়ন ছাড়া বাঙালি জাতির সার্বিক মুক্তি সম্ভব নয়। তাঁর এহেন বিরামহীন প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে সচেতন দেশবাসী খুব ভালভাবেই বুঝতে পারেন যে পাকিস্তানের পূর্ব এবং পশ্চিম অংশকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য শেখ মুজিব ৬ দফা ঘোষণা করেননি।

১২। বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিব তাঁর ঐতিহাসিক ৬ দফার মধ্যে পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানে সহজে বিনিময়যোগ্য পৃথক দুটি মুদ্রা ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রস্তাব করেছিলেন। সুতরাং একই দেশে দুটি স্বতন্ত্র মুদ্রা ব্যবহারের প্রস্তাব করে দূরদর্শী মুজিব বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে অন্য কিছু নয়, বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। ফলে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত ৬ দফার আসল উদ্দেশ্য শুরু থেকেই পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর নিকট দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায়। তাই এই দফা ওয়ারি কর্মসূচী তাদেরকে নিদারুণভাবে শঙ্কিত করে তুলে। এমতাবস্থায় তারা এই কর্মসূচীকে কখনো “বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন” কখনো “বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ধ্বংসাত্মক কর্মসূচী” আবার কখনোবা “বিদেশী মদদপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন” হিসেবে অভিহিত করতে থাকেন। তাই ৬ দফার কারণে মুজিবকে বিভিন্নভাবে নাজেহাল এবং অপদস্ত করা ছাড়াও তাঁকে অবদমনের পাশাপাশি এই ৬ দফাকে কিভাবে প্রতিরোধ এবং প্রতিহত করা যায় পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক জান্তা গভীর আগ্রহ নিয়ে তার উপায় খুঁজতে থাকেন।

১৩। পাকিস্তান সরকারের উপরোক্ত অপচেষ্টা এবং অপতৎপরতার পাশাপাশি ৬ দফাকে আমাদের প্রাণের দাবি এবং মুক্তির সনদ বলে বঙ্গবন্ধু ব্যাপকভাবে প্রচার করেন এবং প্রতিটি দফা জনগণের কাছে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন। তাঁর এহেন ব্যাপক ভিত্তিক প্রচারণার ফলে ৬ দফা আন্দোলন দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠায় পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান প্রবলভাবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় স্বৈরাচারী পাকিস্তানী সরকার বঙ্গবন্ধুকে আবারও গ্রেফতার করে। তাঁকে গ্রেফতারের পরিপ্রেক্ষিতে ৬ দফার সমর্থনে এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে দেশবাসী সোচ্চার হয়ে উঠে। এহেন আন্দোলন সংগ্রাম ধীরে ধীরে অনেকটা দানা বেঁধে উঠায় বঙ্গবন্ধু সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের  স্বায়ত্বশাসন সহ ৬ দফা দাবির সমর্থনে বিগত ১৯৬৬ সনের ৭ই জুন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র সর্বাত্মক এবং স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। এই হরতাল কর্মসূচী পালন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে শ্রমিক নেতা মনু মিয়া এবং ওয়াজি উল্লাহ সহ ঢাকা, টঙ্গী
এবং নারায়ণগঞ্জে মোট ১১ জন শহীদ হন এবং বহু সংখ্যক লোকজন হতাহত হন। ফলে খুব স্বাভাবিক এবং সঙ্গত কারণেই বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ৬ দফা দাবি এবং ৭ই জুন শহীদদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে নতুন মাত্রা ও মর্যাদা লাভের পাশাপাশি বাঙালির ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছে।

১৪। বঙ্গবন্ধুর বিরামহীন এবং ব্যাপকভিত্তিক প্রচারণার ফলে ছয় দফা দাবি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমান বাংলাদেশে তুমুলভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এই ছয় দফা মেনে নেয়া হলে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতার অনেকটাই বাঙালিদের হাতে চলে আসতো। আর মেনে নেয়া না হলে যে পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখা সম্ভব হবে না সামরিক স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সরকার তা খুব ভালভাবেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। এহেন উভয় সংকটে পড়ে ক্ষমতাসীন সরকার হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। ফলে ছয় দফার বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানে ভুট্টো সাহেব সোচ্চার হয়ে উঠেন। এমতাবস্থায় ছয় দফা নিয়ে প্রকাশ্যভাবে বিতর্কে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু ভুট্টোকে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু সেই আমন্ত্রণ তথা চ্যালেঞ্জ ভুট্টো গ্রহণ করেননি দেশবাসী জানেন পাকিস্তানের সামরিক অভিযানের সমর্থনে জাতিসংঘে ভুট্টো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তৃতা দিতেন। অথচ ছয় দফা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে বিতর্কে অবতীর্ণ হওয়ার মতো সাহস কিংবা মনোবল তিনি দেখাতে পারেননি। কেননা ভুট্টোর কাছে সততা, স্বচ্ছতা এবং নৈতিকতা ছিল না। বরং তার কাছে ছিল কপটতা, অযুক্তি এবং কুযুক্তি। পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধুর ছিল সততা, স্বচ্ছতা, যুক্তি এবং দেশপ্রেম। তাই বঙ্গবন্ধুর সামনে দাঁড়ানোর মতো মনোবল, সৎ সাহস এবং নৈতিক ভিত্তি ভুট্টো সাহেব খুঁজে পাননি। তাই বঙ্গবন্ধুর সামনে তাকে যুক্তিহীন, অসহায় এবং অরক্ষিত মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। এমতাবস্থায় ছয় দফা নিয়ে ভুট্টোর এহেন পিছুটান বঙ্গবন্ধুর নৈতিক ভিত্তি, মনোবল এবং প্রত্যয় বহুলভাবে বৃদ্ধি পায়।

১৫। একজন প্রাজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ রাজনীতিক হিসেবে বঙ্গবন্ধু ভালভাবেই জানতেন যে, “আজাদ হিন্দ ফৌজ” গঠন করে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু ইংরেজদের হৃদকম্প শুরু করে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পক্ষে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেননি কিংবা সম্পৃক্ত ও করতে পারেননি। তাই ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আসেনি। মাস্টারদা সূর্য সেন চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড় ৩ (তিন) দিন দখল করে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু তার পক্ষে তিনি জনমত গঠন করতে পারেননি। তাই দেশের স্বাধীনতাও আসেনি। বড়লাটের গাড়িতে বোমা নিক্ষেপ করে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু ইংরেজদের ঘুম হারাম করে দিয়েছিলেন। কিন্তু জনগণের সম্পৃক্ততা কিংবা সচেতনতা না থাকায় দেশের স্বাধীনতা আসেনি। উপরোল্লিখিত দৃষ্টান্তগুলোর আলোকে বঙ্গবন্ধু একটি বিষয় খুব ভালো ভাবেই বুঝেছিলেন যে, দেশের জনগণ সচেতন, সংগঠিত এবং সম্পৃক্ত না হওয়া পর্যন্ত আর যা ই হোক না কেন দেশের স্বাধীনতার জন্য কোন আন্দোলন কিংবা সংগ্রাম করা যাবে না। তাঁর এহেন উপলব্ধি তাঁর প্রখর অন্তর্দৃষ্টি এবং দূরদর্শিতার প্রকৃষ্ট প্রমাণ।

১৬। মহান মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের ব্যক্তিগণ অবশ্যই জানেন যে, অধিকার হারা বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে ৭ই জুন একটি যুগান্তকারী মোড় পরিবর্তন বটে। বিগত ১৯৬৬ সনের পর থেকে শহীদদের রক্তরঞ্জিত ৭ই জুন প্রতি বছর “৬ দফা দিবস” হিসেবে পালিত হয়ে থাকে। সচেতন দেশবাসী জানেন ঐতিহাসিক ৬ দফাতেই নিহিত ছিল আমাদের স্বাধীনতার এক দফা। তাই এই ৬ দফার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু বরাবরই ছিলেন অটল, অনড় এবং অবিচল। তিনি সবসময়ই বলতেন ৬ দফা মানেই হলো এক দফা অর্থাৎ স্বাধীনতা। পরবর্তীকালে এই ৬ দফার ভিত্তিতেই ১৯৭০ সনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। যা তৎকালীন পাকিস্তান সরকার কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। সুতরাং ৬ দফাকে উপজীব্য করে ১৯৭০ এর নির্বাচনে ভূমিধ্বস (Landslide) বিজয় অর্জন করায় ৬ দফার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু সবসময়ই ছিলেন প্রচণ্ড রকমের আপোষহীন। তাই বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে রক্তরঞ্জিত ৭ ই জুন এবং ৬ দফা নিতান্ত অবধারিতভাবেই Magna Carta হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে গেছে।

১৭। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর পাকিস্তানের কোন সরকারই বাঙালিদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য কিংবা দেশের বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর মঙ্গলের জন্য কখনো কোন চেষ্টাই করেননি কিংবা কোন প্রকল্প গ্রহণ করেননি। অবিভক্ত
পাকিস্তানে বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের কোন একটি ক্ষেত্রেই বাঙালিদের ন্যায্য পাওনা কিংবা সমান অধিকার পাকিস্তানের কোন সরকারই প্রদান করেননি। বাঙালিদের মেধা, প্রজ্ঞা এবং যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রায় সব ব্যাপারেই
এবং সর্বক্ষেত্রেই বাঙালিদেরকে কোন না কোনভাবে ঠকানো হয়েছে এবং বঞ্চিত করা হয়েছে। বাঙালিদেরকে এমনভাবে অবজ্ঞা, অবহেলা এবং অবমূল্যায়ন করার পাশাপাশি প্রায় সকল পর্যায়ে তাদেরকে ঠকানো এবং বঞ্চিত করার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কোন নেতাই কখনো সোচ্চার হননি কিংবা কোন প্রতিবাদ করেননি। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে দেখা গেল ১৯৬৫ সনের পাক-ভারত যুদ্ধের সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে সম্পূর্ণভাবে অরক্ষিত এবং নিরাপত্তাহীন রেখে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিম পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য সমস্ত শক্তি এবং সেনাবাহিনী নিয়োগ করেন। পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার উপরোক্ত যুদ্ধে আদৌ কোন চেষ্টাই করেননি কিংবা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। যা ছিল চরম বৈষম্যমূলক মনোভাব এবং একপেশে ও পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গির নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।

১৮। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে এহেন অবদমন, অবমূল্যায়ন ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বলে গণ্য করা এবং বিভিন্নভাবে নিগ্রহের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু বরাবরই ছিলেন সোচ্চার এবং প্রতিবাদ মুখর। তদুপরি বাঙালিদের ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের চরম পক্ষপাতমূলক মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং তৎসহ নজিরবিহীন ও সীমাহীন বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে সংক্ষুব্ধ বঙ্গবন্ধু দেশ ও জাতির প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার তাগিদে বাঙালি জাতির সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে ৬ দফা দাবি পেশ করেন। তাঁর ধারণা ছিল বাঙালিদের ব্যাপারে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের এহেন অবমূল্যায়ন এবং চরম বৈষম্যমূলক আচরণে অতীষ্ট দেশের আপামর জনসাধারণের পাশাপাশি সকল বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দ বাঙালি জাতির স্বাধিকারের দাবি সম্বলিত ৬ দফার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুকে অকুণ্ঠভাবে সমর্থন জানাবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, পাকিস্তানী ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগ, পিডিপি এবং নেজামে ইসলাম সহ মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী ও এই ৬ দফা দাবিকে সমর্থন করেননি। উপরন্তু ৬ দফা দাবিকে তিনি বিভিন্নভাবে সমালোচনা করেছেন। “এমনকি আইয়ুব খানের অগণতান্ত্রিক
আচরণকে সমর্থন করে তিনি (মাওলানা ভাসানী) আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য দলকে সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল বলে গালি দিতেও দ্বিধা করেননি।” [দ্রঃ স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা – মোস্তফা জব্বার; ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী; দৈনিক জনকণ্ঠ, ০৭- ০৬-২০২১]। বাঙালি জাতির স্বাধিকারের প্রশ্নে মাওলানা ভাসানীর এহেন বিপরীতমুখী অবস্থান এবং বিরূপ সমালোচনা ছিল দেশ ও জাতির জন্য নিদারুণভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অনভিপ্রেত।

১৯। ১লা মার্চ তারিখে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত ৭ই মার্চ তাঁর জন্য ছিল অগ্নিপরীক্ষা। আর তাই ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল বিশ্ববাসীর কাছে একটি জাতির আগমনী বার্তা। বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু কর্তৃক পরিচালিত তাঁর সারা জীবনের আন্দোলন এবং সংগ্রাম ছিল সম্পূর্ণভাবে আইনসঙ্গত এবং ন্যায়সঙ্গত। বিগত ১৯৬৬ সনে ঘোষিত ৬ দফা থেকে শুরু করে ১৯৭১ সনে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ এবং কর্মসূচী ছিল সম্পূর্ণভাবে নীতি, আদর্শ, নৈতিকতা এবং দেশপ্রেমের মহান আদর্শের উপর ভিত্তি করে প্রণীত। ফলে দেশে বিদ্যমান আইনের আলোকে উপরোক্ত প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল শতভাগ আইনসঙ্গত, ন্যায়সঙ্গত এবং যুক্তিসঙ্গত। আর ঠিক একারণেই মহান মুক্তিযুদ্ধকে অত্যাসন্ন এবং অবশ্যম্ভাবী হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে ৭ই মার্চের পুরো ভাষণের প্রতিটি শব্দ, বাক্য এবং নির্দেশ আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরোপুরিভাবে বৈধ, সঠিক এবং আইনানুগ। নিপীড়িত বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের নিমিত্তে বঙ্গবন্ধুর উপরোক্ত কালজয়ী ভাষণে উত্থাপিত প্রতিটি দাবি শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় নয় বরং দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকই মনে করেন। এমতাবস্থায় সুদীর্ঘদিন ধরে শোষণ, বঞ্চনা, অবজ্ঞা, অবহেলা এবং তুচ্ছতাচ্ছিল্যের কারণে বঙ্গবন্ধুর তেজোদীপ্ত এবং জ্বালাময়ী ভাষণের সমুদয় বক্তব্যসমূহ আইন, মানবিকতা এবং ন্যায়পরায়ণতার মাপকাঠিতে অত্যন্ত স্বাভাবিক, প্রাসঙ্গিক এবং সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য বলে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।

২০। পূর্ব নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী ৭ই মার্চ বিকাল সোয়া তিনটায় বঙ্গবন্ধু সভামঞ্চে উপবিষ্ট হন। এর কয়েক মিনিট পর বক্তৃতা দেয়ার জন্য উঠে দাঁড়ান। চারিদিক তাকিয়ে দেখে নেন। তখন লক্ষ লক্ষ লোকের গগনবিদারী স্লোগানে মুখরিত রেসকোর্স ময়দান। মাউথপিসের সামনে পোডিয়ামের উপর চশমাটি রাখেন। অতঃপর একটানা ১৯ মিনিট ধরে অনর্গলভাবে বলে গেলেন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অমর মহাকাব্য। সচেতন ব্যক্তি মাত্রই জানেন সেদিন বঙ্গবন্ধুর সামনে দু’টি পথ খোলা ছিল। তন্মধ্যে একটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা। আর দ্বিতীয়টি ছিল পাকিস্তান ভাঙ্গার দায়িত্ব নিজের কাঁধে না নিয়ে এবং তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত এবং অভিযুক্ত করার জন্য পাকিস্তান সরকারকে কোন প্রকার সুযোগ কিংবা অবকাশ না দিয়ে তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্য জনসমক্ষে উপস্থাপন করা। ইতিহাসের আলোকে দেখা যায় যে, বিচক্ষণ ও দূরদর্শী মুজিব তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যের মাধ্যমে অত্যন্ত সতর্কতার সহিত এবং খুবই সুকৌশলে উপরোক্ত দু’টি দায়িত্বই নিষ্ঠার সাথে পালন করেছেন।

ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ), লেখক ও কলামিস্ট

(চলবে)

বি /ইবিটাইমস/এম আর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »