শেষ পর্ব
ড. মোঃ ফজলুর রহমান: ১২১। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক এবং ন্যক্কারজনক হলেও সত্য যে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর সেই ১৯৭৫ সন থেকে ১৯৯৬ সনের জুন পর্যন্ত সুদীর্ঘ প্রায় ২১ বছর ধরে ক্ষমতাসীন সবগুলি সরকার অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের স্থপতি এবং জাতির পিতা হিসেবেবঙ্গবন্ধুর নাম, পরিচয় এবং অবদান সমূহ মুছে ফেলার জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রচেষ্টা এবং তৎপরতা চালিয়েছে। সরকারের পাশাপাশি সততা এবং নৈতিকতা বিবর্জিত সংকীর্ণমনা রাজনৈতিক গোষ্ঠী গুলিও দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ধরনের ষড়যন্ত্র করেছে। তাদের এহেন নানা মুখী ষড়যন্ত্র অদ্যাবধি অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু এই সমস্ত জ্ঞানপাপীরা কিছুতেই বুঝতে চায় না যে, ব্যক্তির মৃত্যু হয়। কিন্তু কোন আদর্শ এবং প্রতিষ্ঠানের মৃত্যু হয়না। তাই বৃটেনের রাজার মৃত্যু হলেও গাওয়া হয়- “King is dead, long live the king.” বাংলাদেশেও ব্যক্তি মুজিবের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু নামক অবিনশ্বর প্রতিষ্ঠানটির মৃত্যু হয়নি। তিনি চিরঞ্জীব, তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী। তাই আজ আমেরিকা বলতেই যেমন বুঝায় জর্জ ওয়াশিংটন এবং আব্রাহাম লিংকন; ভারত বলতেই যেমন বুঝায় মহাত্মা গান্ধী- ঠিক তেমনই বাংলাদেশ বলতেও বুঝায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাঙালির গৌরবদীপ্ত ইতিহাস বিকৃতকারী স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তিসমূহ প্রাণপণ চেষ্টা করেও এই চিরন্তন সত্য থেকে শুভবুদ্ধি সম্পন্ন কোন একজন ব্যক্তিকে কোনভাবেই বিভ্রান্ত করতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না।
১২২। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেক জাতীয়তাবাদী নেতা সুদীর্ঘ দিন ধরে আন্দোলন ও সংগ্রাম করে তাদের দেশের স্বাধীনতা অর্জন করেছেন। তাদের এহেন নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ এবং কালজয়ী আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে তারা তাদের নিজ নিজ দেশের জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন এবং প্রাতঃস্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। এহেন প্রথিতযশা নেতৃবৃন্দের মধ্যে বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম মুখর, আপোষহীন এবং বিচক্ষণ নেতৃত্বের কালোত্তীর্ণ ইতিহাস মানব সভ্যতার ইতিহাসে চির অম্লান, চিরভাস্বর এবং চিরস্মরণীয়। নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে এবং নিরপেক্ষভাবে বিচার বিশ্লেষণ করলে যে কেউ খুব সহজেই তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারবেন। এরই পাশাপাশি আরও দেখা যাবে যে, বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে মহাত্মা গান্ধীর মতো উদারতা ও মহত্ত্ব, প্যাট্রিস লুমুম্বার মতো সাহসিকতা, নেলসন ম্যান্ডেলার মতো ঔদার্য, ড. সুকর্ণোর মতো বাগ্মিতা এবং হো চি মিন -এর মতো দৃঢ়চেতা মনোভাব তাঁর সারা জীবন ধরেই বিদ্যমান ছিল। তাই একথা অকপটে এবং অসংকোচে বলা যায় যে, একজন ব্যক্তি মুজিবের মধ্যে বিশ্বের উপরোক্ত বরেণ্য এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেতৃবৃন্দের বিভিন্ন ধরনের মহৎ গুণাবলী তাঁর জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত পুরোপুরিভাবেই বিদ্যমান এবং দৃশ্যমান ছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক চেতনায় সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে এদেশকে সকল ক্ষেত্রে এগিয়ে নেয়ার ঐকান্তিক প্রত্যাশায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন একান্তভাবে নিবেদিতপ্রাণ।
১২৩। অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও সত্য যে, “ইতিহাস বিকৃতিই বাংলাদেশের ইতিহাস।” এহেন চরম গ্লানিকর এবং মর্মভেদী তির্যক মন্তব্যটি স্মরণ রেখে পরিচ্ছন্ন মন নিয়ে চিন্তা করলে সহজেই অনুধাবন করা যায় যে, মহাত্মা গান্ধীকে বাদ দিয়ে ভারতের ইতিহাস লেখা যাবে না। কামাল আতাতুর্ককে বাদ দিয়ে তুরস্কের ইতিহাস, মাও সে তুং -কে বাদ দিয়ে চীনের ইতিহাস লেখা সম্ভব না। ঠিক তেমনই বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস রচনা করাও কোনভাবেই সম্ভব নয়। জর্জ ওয়াশিংটন, মহাত্মা গান্ধী, কামাল আতাতুর্ক, হো চি মিন, মাও সে তুং, নেলসন ম্যান্ডেলা এবং ইয়াসির আরাফাত – প্রমুখ প্রথিতযশা এবং প্রাতঃস্মরণীয় নেতৃবৃন্দের সাথে তুলনামূলক বিচারে ত্যাগ-তিতিক্ষা, সংগ্রামী ঐতিহ্য, অর্জন ও বিসর্জন এবং আত্মত্যাগের দিক দিয়ে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কখনো তাদের সমতুল্য আবার কখনোবা তাদের চেয়ে বহুলাংশে অগ্রগামী ছিলেন। আজ সারা বিশ্ব তাঁকে এভাবেই দেখে এবং মূল্যায়ন ও করে। বাংলাদেশের কতিপয় কুলাঙ্গার জ্ঞানপাপীরা এই সহজ এবং নির্মল সত্যটিকে যত তাড়াতাড়ি অনুধাবন করবেন, তত তাড়াতাড়ি দেশ ও জাতি কলংকমুক্ত হবে এবং দেশের রাজনীতি পরিচ্ছন্ন ও পরিশুদ্ধ হবে।
১২৪। আকাশের চাঁদকে যদি কেউ স্বীকার করেন তবে ভালো। আর যদি স্বীকার না করেন তাও ভালো। তবে সেক্ষেত্রে বলতে হবে যিনি স্বীকার করেন না তিনি হয়তোবা অন্ধ তাই চোখে দেখেন না। আর তা না হলে দেখেও মিথ্যা কথা বলেন। এহেন অবস্থায় কেউ স্বীকার করেন কিংবা নাই করেন, আমাদের দেশের বীর শহীদদের রক্তে রঞ্জিত ভাষা আন্দোলন সহ স্বাধিকার এবং রক্তস্নাত স্বাধীনতা সংগ্রামের সুদীর্ঘ ইতিহাস অত্যন্ত জোরালোভাবেই সাক্ষ্য দেয় যে, বঙ্গবন্ধু শুধুমাত্র একজন ব্যক্তি নন। তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। একটি অদম্য এবং অপ্রতিরোধ্য আন্দোলন। সমাজ পরিবর্তনের জন্য একটি বিপ্লব। তিনি একটি সফল অভ্যুত্থান। একটি জাতি নির্মাণের সুদক্ষ এবং সুনিপুণ কারিগর। একটি অবিস্মরণীয় মহাকাব্যের অমর গাঁথা। এরই পাশাপাশি তিনি একটি দেশ ও জাতির সুবিন্যস্ত এবং সুশৃঙ্খল ইতিহাস। আর ঠিক একারণেই বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করার সুদীর্ঘ ২৯ বছর পর বিগত ২০০৪ ইং সনের ১৪ই এপ্রিল (১লা বৈশাখ ১৪১১ বাং) তারিখে বিবিসি থেকে প্রচারিত এবং বিশ্বব্যাপী পরিচালিত বিবিসি’র শ্রোতাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক জরিপের ফলাফল অনুযায়ী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে “সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি” হিসেবে মূল্যায়ন করা হয় এবং এই মর্মে স্বীকৃতি ও প্রদান করা হয়। তাঁর এই ঐতিহাসিক মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি তথা “এই ইতিহাসের ব্যাপ্তি হাজার বছর। তাই সমকাল তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে। ভাবীকাল তাঁকে স্বীকৃতি দিবে মহাকালের মহানায়ক রূপে।” [দ্রঃ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান- আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সূত্র- চিরঞ্জীব শেখ মুজিব- কবীর চৌধুরী, জনতা প্রকাশ, পৃষ্ঠা- ৭৯]।
১২৫। দেশবাসী নিশ্চয়ই জানেন, বঙ্গবন্ধু ছিলেন ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে অত্যন্ত সোচ্চার এবং প্রতিবাদমুখর রাষ্ট্রনায়ক। উপরন্তু তিনি ছিলেন আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় বিশ্বাসী, প্রচণ্ড রকমের উদার মন মানসিকতা সম্পন্ন এবং সংবেদনশীলতায় পরিপূর্ণ একজন সিংহ হৃদয়ের মানুষ। এরই পাশাপাশি তিনি ছিলেন সারা বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত এবং নিপীড়িত মানুষদের জন্য নিবেদিতপ্রাণ একজন মহান নেতা। বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের সমুদয় ঘটনাবলীর আলোকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিক ইতিহাস এবং ঘটনা প্রবাহের ভিতর দিয়ে এই সত্য বেরিয়ে আসে যে, মহান
মুজিবের জন্ম না হলে বাংলাদেশ আদৌ স্বাধীনই হতো না। বাঙালি জাতি স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে স্বীকৃতিও পেত না। তাই বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু এক এবং অবিচ্ছেদ্য। সুতরাং আক্ষরিক অর্থেই বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ সমার্থক। যেন একই মুদ্রার এপিঠ এবং ওপিঠ। তাই মহাকালের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে প্রখ্যাত কবি এবং বরেণ্য কথাসাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায় যথার্থই বলেছেন-
“যতদিন রবে পদ্মা-মেঘনা-গৌরী-যমুনা বহমান
ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান।”
সহায়ক গ্রন্থাবলী
১। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান।
২। অসমাপ্ত আত্মজীবনী- শেখ মুজিবুর রহমান।
৩। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মারক গ্রন্থ- ১ম, ২য় এবং ৩য় খণ্ড, জ্যোৎস্না
পাবলিশার্স।
৪। বাংলার কথা- বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন, মুক্তধারা প্রকাশনী, ১৯৮৬।
৫। চিরঞ্জীব শেখ মুজিব- কবীর চৌধুরী, জনতা প্রকাশ, ২০১০।
৬। Bangladesh: Era of Sheikh Mujibur Rahman – Moudud Ahmed
(Dhaka; University Press Limited, 1983).
৭। Witness to Surrender- Major Siddik Salik.
ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ), লেখক ও কলামিস্ট
বি রি/ ইবিটাইমস/ এম আর