১২তম পর্ব
ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ ১১১। ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে, আজীবন সংগ্রামী বঙ্গবন্ধু ছিলেন অসীম সাহসী এবং প্রচণ্ড রকমের অনমনীয় মনোভাবের অধিকারী একজন অকুতোভয় নেতা। রাষ্ট্রের অন্যতম নীতি ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি তাঁর আস্থা, বিশ্বাস এবং দায়বদ্ধতা ছিল বিস্ময়কর। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, ১৯৭৩ সনে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগদান করতে গিয়ে তিনি এক পর্যায়ে লিবিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফির সম্মুখীন হন। আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি হঠাৎ করেই প্রস্তাব দিয়ে বসলেন, বঙ্গবন্ধুর সাথে তিনি “আন্তরিকতাপূর্ণ বন্ধুত্ব” করতে চান। কিন্তু এ বিষয়ে শর্ত হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে দেশের নাম পাল্টিয়ে ‘বাংলাদেশ ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ করতে হবে। প্রত্যুত্তরে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে এবং স্মিত হাস্যে বঙ্গবন্ধু বলেন- “Your Excellency মিস্টার প্রেসিডেন্ট, এ ধরনের প্রস্তাব কার্যকর করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় বলে আমি দুঃখিত। কারণ সমগ্র লিবিয়াতে অমুসলিম জনসংখ্যা নেই বললেই চলে। কিন্তু বাংলাদেশে অমুসলিম জনসাধারণের সংখ্যা প্রায় এক কোটির মতো। তাছাড়া Your Excellency পরম করুণাময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তো শুধুমাত্র আল মুসলিমিন নন, তিনি তো রাব্বুল আলামীন।”
১১২। উপরোল্লিখিত একই সম্মেলনে সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশাহ ফয়সালের সাথেও তাঁর সাক্ষাত হয়। তার সাথে আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি ও বঙ্গবন্ধুকে বলেন- “সৌদি স্বীকৃতি পেতে হলে বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করে ইসলামিক রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ করতে হবে।” এই শর্তের জবাবেও বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু উপরোক্ত একই জবাবের পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি বাদশাহকে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলেন- “বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ মুসলমান হলেও এদেশে প্রায় এক কোটির মতো অমুসলিম জনসংখ্যা রয়েছে। তারা সবাই একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়ে দুর্ভোগ পোহিয়েছে এবং সম্মিলিতভাবে লড়াই করে দেশকে স্বাধীন করেছে। তাছাড়া Your Excellency, আপনার দেশটির নাম ও তো ইসলামিক রিপাবলিক অফ সৌদি এরাবিয়া নয়, বরং Kingdom of Saudi Arabia। কই আমরা তো কখনো এই নামে আপত্তি করিনি।” অত্যন্ত দৃঢ়চেতা বঙ্গবন্ধুর এহেন তাৎক্ষণিক, প্রত্যয়দৃপ্ত এবং তেজোদীপ্ত জবাবের প্রেক্ষিতে আকস্মিকভাবেই উপরোক্ত সাক্ষাৎকারের পরিসমাপ্তি ঘটে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত এবং সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত অত্যন্ত দুর্বল অর্থনীতির বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এহেন উচ্চ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন এবং অত্যন্ত পৌরষদীপ্ত জবাব তেলসমৃদ্ধ লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট এবং সৌদি বাদশাহ ফয়সাল সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি এবং তা হজম ও করতে পারেননি বলে পরবর্তীকালে তাদের বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে জোরালোভাবেই প্রমাণিত হয়েছে।
১১৩। আইন-আদালতের সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অবশ্যই জানেন যে, বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুবিধাভোগীরা (Beneficiary) প্রথমে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি এবং পরবর্তীকালে তা সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আমাদের রক্তস্নাত সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়ায় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকার্য সুদীর্ঘ প্রায় ২১ বছর পর্যন্ত বন্ধ থাকে। পরে ১৯৯৬ সনের ১২ই জুন অনুষ্ঠিত ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়। এহেন অবস্থায় ঐ বছরের ২৩শে জুন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করেন। তার সরকারের আমলে সংসদে উপরোক্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ রদ ও রহিত করা হয়। ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকার্য শুরু করার পথ ও উন্মুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে কিংবা দ্রুত বিচার আদালতে উক্ত হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করার পরিবর্তে সাধারণ আদালতে
বিচারকার্য সম্পন্ন করা হয়। অভিযুক্ত আসামীদেরকে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আইনানুগভাবে প্রাপ্য সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয়। তারও পরে বিচার কার্য সম্পন্ন হওয়ার পর বিচারিক আদালতের রায়ে মোট ১৫ জন আসামীর বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ প্রদান করা হয়। পরে মাননীয় হাইকোর্টের বিভক্ত রায়ের পরও ১২ জন আসামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে।
১১৪। উপরোল্লিখিত রায় প্রদানের পর ২০০১ সালে সরকার পরিবর্তন হয়। এহেন অবস্থায় উক্ত রায় মহামান্য আপীল বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকে। ঐ সময় আপীল বিভাগে মাত্র একজন অতিরিক্ত বিচারপতিকে নিয়োগ দেয়া হলে উক্ত হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় তথা আপীল বিভাগের কার্যক্রম অনেক আগেই সম্পন্ন হয়ে যেত। এতদ সংক্রান্ত ব্যাপারে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জনাব মাহমুদুল আমীন চৌধুরী তৎকালীন বিএনপি সরকারের কাছে লিখিতভাবে আবেদন ও জানিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মন্ত্রী পরিষদে না থাকাবস্থায় গবেষণাধর্মী একাধিক বই লিখে যিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের এবং তাঁর বিভিন্ন গুণাবলীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, সেই ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বেগম খালেদা জিয়ার কেবিনেটে আইনমন্ত্রী থাকাবস্থায় তারই কুপরামর্শে ঐ সময়ের বিএনপি সরকার জনাব মাহমুদুল আমিন চৌধুরীর উপরোক্ত আবেদনে সাড়া দেননি। ফলে মহামান্য আপীল বিভাগে উক্ত মামলাটি আবারও দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীনই থেকে যায়। এরই পাশাপাশি অপ্রিয় হলেও সত্য যে, দেশের জাতির পিতা এবং রাষ্ট্রপতি হওয়া সত্ত্বেও মহামান্য হাইকোর্টের সাত জন বিচারপতি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকার্য পরিচালনা করতে বিব্রত বোধ করেছেন এবং অপারগতা প্রকাশ করেছেন। যা ছিল নিদারুণভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অনভিপ্রেত।
১১৫। পরবর্তীকালে ২০০৯ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতাসীন হন। এহেন অবস্থায় উপরোক্ত হত্যাকাণ্ডের রায় আপীল বিভাগে যথারীতি নিষ্পত্তি হয়। নিষ্পত্তি শেষে ১২ জন আসামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ মহামান্য আপীল আদালতেও যথারীতি বহাল থাকে। এমতাবস্থায় পদ্ধতিগত সমুদয় কার্যক্রম এবং আনুষ্ঠানিকতা (Procedural all the formalities and obligations) সম্পূর্ণ আইনানুগভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে গত ২০১০ সালের ২৮শে জানুয়ারি ৫ জন আসামীর ফাঁসির আদেশ কার্যকর করা হয়। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অন্যতম আসামী আজিজ পাশা জিম্বাবুই -তে পলাতক থাকাবস্থায় বিগত ২০০১ সনে পরলোকগমন করেছে। এছাড়া অপর এক আসামী ক্যাপ্টেন মাজেদকে ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারের নিকট হস্তান্তর করায় গত ২০২০ ইং সনের ১১ই এপ্রিল তার ফাঁসির আদেশ ও ইতোমধ্যেই কার্যকর করা হয়েছে। এছাড়া বাদবাকি ৫ জন আসামী অদ্যাবধি বিভিন্ন দেশে পলাতক রয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করার পর কোন একজন খুনীই কোন প্রকার অনুশোচনায় কিংবা আত্মগ্লানিতে ভুগেনি। বরং পচাত্তরের পরবর্তী প্রতিটি সরকারের বিভিন্ন ধরনের আনুকূল্য এবং পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে তারা বরাবরই ঔদ্ধত্য এবং দাম্ভিকতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছে। জাতির পিতার হত্যাকারী হয়েও তারা সারা দেশে বুক ফুলিয়ে এবং বীরদর্পে দাপিয়ে বেড়িয়েছে। আজ তারা মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে নাম পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন দেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
১১৬। অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও সত্য যে, আমাদের এই বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ড এবং এই ভূখণ্ডের অধিবাসী তথা আবহমান কালের বাংলা এবং বাঙালির ইতিহাস বড়ই অদ্ভুত এবং বিচিত্র। আমাদের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য যেমনি গৌরবান্বিত, ঠিক তেমনি কলংকের কালিমায় লিপ্ত। আমাদের ইতিহাসে রয়েছে অবিশ্বাস্য এবং বিস্ময়কর আত্মত্যাগের মহিমায় মহিমান্বিত মানুষ। ঠিক তেমনি রয়েছে জঘন্য রকমের বিশ্বাসঘাতক এবং পিলে চমকানো রকমের ঘৃণিত ও পাপিষ্ঠ মুনাফেক। আর এই সমস্ত কুলাঙ্গার নরপশুদের উত্তরসূরীরাই তাদের দুর্দমনীয় জিঘাংসা এবং উচ্চাভিলাস চরিতার্থ করার অসৎ উদ্দেশ্যে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করেছে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদেরকে। অত্যন্ত মর্মান্তিক এবং হৃদয়বিদারক হলেও সত্য যে, পরবর্তীকালে খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রীসভায় যোগদান করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করায় কারাপ্রকোষ্ঠে অন্তরীণ থাকাবস্থায় বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী বিপথগামী নরপিশাচদের একটি দলই আবার নির্বিচারে গুলি করে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করেছে মহান
মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী অকুতোভয় এবং অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন জাতীয় চার নেতাদেরকে। তাদের অপরাধ ছিল তারা বঙ্গবন্ধুর রক্তের সাথে বেঈমানী কিংবা বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেননি। তাদের বড় দোষ ছিল তারা মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিশ্বস্ত, অনুগত এবং নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন।
১১৭। বাঙালি মাত্রই স্বীকার করেন যে বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। মুজিব মানেই স্বাধীনতা। তাই বঙ্গবন্ধু ইতিহাসের পাতায় কেবল একটি নাম নয়। তিনি একটি প্রত্যয়, একটি আদর্শ, একটি দর্শন এবং একটি দীর্ঘ সংগ্রাম। তিনি অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মহান প্রবর্তক ও একনিষ্ঠ প্রচারক। তিনি সারা বিশ্বের শোষিত, বঞ্চিত এবং নিপীড়িত মানুষের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। বাঙালি জাতিকে হাজার বছরের দাসত্বের শৃংখল থেকে মুক্ত করেছেন বঙ্গবন্ধু। তাই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, তিনি না হলে ১৯৭১ সনে বাংলাদেশের উদ্ভবই হতো না। দেশ স্বাধীনের পর বহু কষ্টে এবং দিনরাত পরিশ্রম করে যুদ্ধ বিধ্বস্ত শ্মশান বাংলাকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার ঐকান্তিক প্রত্যাশায় সব ধরনের অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য এবং আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য তিনি গণমুখী সংবিধান প্রবর্তন, প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষা কমিশন গঠন সহ নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছিলেন। দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র সহ সব ধরনের বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশ ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছিল সোনার বাংলা অভিমুখে। তিনি একদিকে ছিলেন আপোষহীন সংগ্রামী নেতা অন্যদিকে ছিলেন আপাদমস্তক মানবতাবাদী রাজনীতির অমর কাব্যের কবি। তাই বঙ্গবন্ধু যেমন ইতিহাসের মহানায়ক, ঠিক তেমনি মহাকালের মহানায়ক ও বটেন। আর ঠিক একারণেই জীবিত মুজিবের চেয়ে লোকান্তরিত মুজিব আজ অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক, প্রাণবন্ত এবং শক্তিশালী।
১১৮। ইতিহাসের প্রয়োজনেই বলা আবশ্যক যে, একটি অজ গ্রামের নিভৃত পল্লীতে জন্মগ্রহণকারী শেখ মুজিব কালক্রমে বঙ্গবন্ধু এবং জাতির পিতা হয়ে উঠার পেছনে তদীয় প্রিয়তমা পত্নী বেগম ফজিলাতুন্নেসার অবদান ও অনেক ব্যাপক এবং অপরিসীম। তিনি তাঁর সারাটি জীবন ধরে বঙ্গবন্ধুর পাশে থেকে তাঁর ছায়াসঙ্গী হিসেবে বিভিন্ন সময়ে অনেক বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন, সাহস যুগিয়েছেন এবং অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে নির্ভরশীল বন্ধু, বিশ্বস্ত পরামর্শক, প্রেরণাদানকারী সমর্থক এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল সার্বক্ষণিক একজন রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধুর রচিত অসমাপ্ত আত্মজীবনী পাঠ করে দেখা যায় তাঁর সুযোগ্যা সহধর্মিণীর অনুরোধে এবং তাঁর দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই বঙ্গবন্ধু উপরোক্ত অসামান্য বইটি রচনা করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে বলা আবশ্যক যে, রাজনৈতিক কারণে তাঁদের পারিবারিক জীবনে
বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের আঘাত এসেছে এবং বিপর্যয় নেমে এসেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অত্যন্ত ধৈর্যশীলা, পুণ্যবতী এবং সর্বংসহা নারী বেগম মুজিব কখনো ভেঙ্গে পড়েননি কিংবা মনোবল হারাননি। অভিমান ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি কখনো মহান মুজিবকে রাজনীতি ছেড়ে দিতে বলেননি। রাজনীতির প্রতি কখনো বিরক্ত হননি কিংবা কোন বিরূপ মন্তব্য ও করেননি।
১১৯। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মতো আমাদের দেশের দিকে দৃষ্টিপাত করলে ও দেখা যায় যে, মন্ত্রিত্বের লোভে এবং মোহে পড়ে অতীতে অনেক ত্যাগী এবং পরীক্ষিত নেতা বিভিন্ন সময়ে দলত্যাগ করেছেন। এছাড়া তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন এবং বারংবার উচ্চারিত নীতি, আদর্শ এবং নৈতিকতা অসংকোচে এবং অকপটে বিসর্জন দিয়ে মন্ত্রিত্বকে বেছে নিয়েছেন। এক্ষেত্রে বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এখনো পর্যন্ত একমাত্র ব্যতিক্রম। যিনি দলের প্রয়োজনে এবং রাজনৈতিক টানাপোড়েনে পড়ে মন্ত্রিত্বের মতো লোভনীয় এবং সম্মানজনক অবস্থান দ্বিধাহীন চিত্তে পরিত্যাগ করেছেন। তাই মন্ত্রিত্ব ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মন্ত্রিত্বের সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা তিনি স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরিত্যাগ করেছেন। তাঁর এহেন নির্লোভ, নির্মোহ এবং নিঃস্বার্থ অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে অকস্মাৎ সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত হওয়ার ঘটনাও বেগম মুজিব হাসিমুখে এবং উৎফুল্ল চিত্তে মেনে নিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় জীবনের শেষ দিন এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অত্যন্ত পতিপরায়ণা এই অনন্যা নারী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব অকাতরে এবং পরম সাহসিকতার সাথে নিজের জীবন উৎসর্গ করে
দিয়ে অনন্য সাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে যা সারা জীবন ধরে অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস এবং বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগের মহত্তম দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে বলে জোরালোভাবেই বলা যায়।
১২০। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে আরাধ্য পুরুষ বঙ্গবন্ধু। স্বাধিকার, স্বাধীনতা এবং জাতীয়তাবাদের মহান স্থপতি ও তিনি নিজে। ইতিহাস সাক্ষী বাংলা মায়ের মহান স্বাধীনতার ঘোষক ও বঙ্গবন্ধু নিজে স্বয়ং। অধিকার হারা বাঙালিকে বিশ্ব মানচিত্রে বঙ্গবন্ধুই এনে দিয়েছেন গর্বিত পরিচয়। বিজাতীয় শাসনের দুঃসহ গ্লানি থেকে তিনিই নেতৃত্ব দিয়ে মুক্ত করেছেন এই দেশ। বিশ্ব মানচিত্রে প্রতিষ্ঠা করেছেন বাংলা মায়ের গৌরবান্বিত অস্তিত্ব। তাই এই শতাব্দীতে বঙ্গবন্ধু অমানিশার প্রগাঢ় অন্ধকারে অত্যুজ্জ্বল ইতিহাসের অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী। পৃথিবীতে একটি গর্বিত জাতির জন্মদাতা মুজিব। বিশ্ব মানচিত্রে তিনি একটি নতুন পতাকার রূপকার। তাই বাঙালির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু অমর, অবিনশ্বর এবং চিরঞ্জীব। নরপিশাচ ঘাতক দুর্বৃত্তরা তাঁকে হত্যা করলেও মহাকালের ইতিহাসে অবিসংবাদিত নেতার আসন তাঁর জন্য অক্ষুণ্ন, অমলিন এবং চিরন্তন বলে খুব সহজেই
অনুধাবন করা যায়। তাই অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং সঙ্গত কারণেই বলা যায় যে “ভগবান শ্রী রামচন্দ্র বিহীন যেমন রামায়ণ রচিত হয় না কিংবা চিন্তাও করা যায় না, ঠিক তেমনি বঙ্গবন্ধু বিহীন বাংলাদেশ ও হতে পারে না- এই স্বয়ংসিদ্ধ সত্যটিকে বাংলাদেশের
সার্বভৌম অস্তিত্বের এবং স্থায়িত্বের স্বার্থে স্বীকার করে নিতেই হবে… ।” [দ্রঃ বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু- বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন, সূত্র- বাংলার কথা- বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন, মুক্তধারা প্রকাশনী, ১৯৮৬, পৃষ্ঠা- ২২]।
ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ), লেখক ও কলামিস্ট
(চলবে)
বি রি/ ইবিটাইমস/এম আর