মহাকালের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু

 ১১তম পর্ব   

  ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ ১০১। একথা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে, মহামানব যীশু খ্রিষ্ট, বিদগ্ধ জ্ঞানী সক্রেটিস, ইসলামের তিন মহান খলিফা, মহাত্মা গান্ধী, আব্রাহাম লিংকন এবং জন এফ কেনেডি -প্রমুখ প্রাতস্মরণীয় ব্যক্তিগণকে দুর্বৃত্ত আততায়ীরা হত্যা করেছে এককভাবে। পক্ষান্তরে পাকিস্তানী প্রেতাত্মা নরপশুরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে সপরিবারে। এমনকি তারা অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করেছে নারী ও শিশু এবং নবপরিণীতা কূলবধূ সহ অন্তঃসত্ত্বা নারীকে। যা অত্যন্ত হৃদয় বিদারক, মর্ম বিদারক এবং চিত্ত বিদারক। এরই পাশাপাশি একথা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় যে, বাঙালির মানসনায়ক “বঙ্গবন্ধুর এই অভাবনীয় এবং অচিন্তনীয় হত্যাকাণ্ড কোন নিছক ব্যক্তি এমনকি কোন বিশেষ রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ড ছিলনা। এ হত্যা ছিল একটি ঐতিহাসিক বিজয়ের প্রতি পরাজিত শত্রুর প্রত্যাঘাত এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের প্রতিবিপ্লব।” [দ্রঃ অমর্ত্যলোকে বঙ্গবন্ধু- বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন, সূত্রঃ বাংলার কথা, সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেন, মুক্তধারা প্রকাশনী, ১৯৮৬, পৃষ্ঠা- ২৮]।

১০২। কোন একটি প্রদীপ কিংবা লাইটের আলো যদি কারও সহ্য না হয় তাহলে তা নিভিয়ে দিলেই ঝামেলা মিটে যায়। কিন্তু বাতি নিভিয়ে দেয়ার পরও উক্ত লাইটটি আছাড় মেরে ভেঙ্গে ফেলার মতো অত্যন্ত নোংরা, কুৎসিত এবং জঘন্য মনোবৃত্তি চরম জিঘাংসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই বিবেচিত হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানাকে প্রায় ৫ বছর পর্যন্ত জিয়াউর রহমান দেশে আসতে দেননি। পরে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৮১ সনের ১৭ই মে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও জিয়াউর রহমান যতদিন জীবিত ছিলেন, ততদিন পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে তার পিত্রালয় তথা ধানমন্ডির বাড়িতে ঢুকতে দেননি। ফলে ৩২ নম্বর বাড়ির সামনের রাস্তায় বসে মিলাদ, দোয়া এবং মুনাজাত করে রাস্তা থেকেই তাকে ফিরে যেতে হয়েছে। এতদ সংক্রান্ত ব্যাপারটি যে কোন বিবেচনায় চরম অনৈতিক, অমানবিক এবং প্রতিহিংসা পরায়ণ মনোভাবের পরিচায়ক বলে সন্দেহাতীতভাবেই প্রমাণিত হয়। তাই বঙ্গবন্ধুর ঘাতক পাষণ্ড খুনী চক্র ও তাদের দোসর এবং এই হৃদয় বিদারক হত্যাকাণ্ডের সুবিধাভোগীরা (Beneficiary) বঙ্গবন্ধুর প্রতি কতটা আক্রোশ এবং জিঘাংসা মূলক মনোভাব পোষণ করতো তাদের এহেন নৈতিকতা বিবর্জিত কার্যক্রম এবং অমানবিক ব্যবহার থেকেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

১০৩। বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত বিতর্কিত, নীতিভ্রষ্ট এবং ডিগবাজি বিশারদ রাজনীতিবিদ হিসেবে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের অনেক দুর্নাম রয়েছে। তিনি একসময়ে বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত স্নহেভাজন ছিলেন। পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমানের সাথে ভিড়ে গিয়ে বিএনপি গঠন করেন। তারও পরে এরশাদ আমলে প্রধানমন্ত্রী এবং উপরাষ্ট্রপতি হন। পরবর্তীকালে আবার খালেদা জিয়ার মন্ত্রীসভায় আইনমন্ত্রী হন। ১৯৮৩ সনে তিনি Bangladesh: Era of Sheikh Mujibur Rahman -নামে একটি গবেবষণাধর্মী বই লিখেন। তার উক্ত বইয়ে তিনি উল্লেখ করেন- “…Mujib is the greatest phenomenon of our history. His death was not his end. He will continue to remain as a legend in the political life of Bangladesh. Bengalis might have had leaders in their history more intelligent, more capable and dynamic than Sheikh Mujib but none gave so much to the Bengali’s political independence and national identity. It is Mujib who in the end was able to identify himself not only with the cause of Bengalis but with their dreams. He became the symbol of Bengali nationalism which gave birth to an independent and sovereign identity… the fact that there is a country called Bangladesh is a sufficient testimony of Mujib’s status as a legend of our age.” [দ্রঃ- বঙ্গবন্ধু মানেই বাঙালি জাতির ইতিহাস সমগ্র – এ এইচ আলমগীর, সূত্রঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মারক গ্রন্থ ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬৬২]।

১০৪। মওদুদ আহমেদের উপরোক্ত বইটির প্রথম বাংলা সংস্করণ ১৯৮৭ সনে প্রকাশিত হয়। উক্ত বইয়ের দ্বাদশ অধ্যায়ে তিনি উল্লেখ করেন- “… শেখ মুজিবের আবির্ভাব বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের সব চাইতে বড় ঘটনা। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়েই তাঁর সমাধি রচিত হয়নি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি রূপকথার নায়কের মতোই ভাস্বর হয়ে থাকবেন। হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ মুজিবের চাইতেও প্রজ্ঞাবান, দক্ষতর, সুযোগ্য এবং গতিশীল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অভ্যুদয় ঘটেছে বা ঘটবে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও জাতীয় পরিচিতি নির্ধারণে তাঁর চাইতে বেশি অবদান রেখেছেন এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। … সমাজতন্ত্র, ধনতন্ত্র বা নব্য মৌলবাদ যেটাই বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক বিপ্লবী বা প্রতিক্রিয়াশীল যে সরকারই ক্ষমতায় আরোহণ করুক না কেন, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ চিরদিন শেখ মুজিবের কীর্তি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় অমলিন হয়ে থাকবে। [দ্রঃ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালিঃ এমনটিই হওয়ার কথা ছিল- অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান, প্রাক্তন উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, সূত্রঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মারক গ্রন্থ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১০৫৭]।”

১০৫। বর্তমানে ভারতে ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বি জে পি) -তে মহাত্মা গান্ধীর ঘাতক নাথুরাম গডস্‌ -এর দল আর এস এস (রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ) ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বটে। কিন্তু তারা গান্ধীকে মহাত্মা বলতে একটুও দ্বিধা করেননা। গান্ধীজীর জন্ম মৃত্যু দিবসে পতাকা অর্ধনমিত রাখতেও তারা কোন কার্পণ্য করেননা। গান্ধীজীর আততায়ী নাথুরাম গডস্‌ -কে বিজেপি পূর্বাপর হিরো বলে মনে করে। কিন্তু তাদের নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেশে কিংবা বিদেশে যে কোন জায়গায় গান্ধীর মূর্তির সামনে গেলে হাত জোর করে নত শিরে এবং শ্রদ্ধা ভরে প্রণাম করেন। এতে কিন্তু তার সম্মান কিংবা মর্যাদা কোনভাবেই কমেনি বা ক্ষুণ্ন হয়নি। বরং তার এহেন বিনয় এবং সশ্রদ্ধ প্রণামের মাধ্যমে দেশে বিদেশে তার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। নরেন্দ্র মোদির এহেন বিনম্র এবং সশ্রদ্ধ প্রণামের মানে হলো দেশ ও জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং ইতিহাসের স্রষ্টা তথা জাতীয় বীরকে সশ্রদ্ধ চিত্তে সম্মান করা। আর এরকম মনোভাব এবং মনোবৃত্তিই একজন সরকার প্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধানের থাকা উচিত এবং বাঞ্ছনীয়।

১০৬। সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন, মহাত্মা গান্ধীর নীতি এবং আদর্শের বিরোধিতা করে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ক্ষমতায় এসেছেন। অথচ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গান্ধীর সমাধিস্থলে হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে নতজানু হয়ে বিনম্র
শ্রদ্ধা জানাতে তিনি কোন দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগেননি। ভারতের কোন জাতীয় দিবস কিংবা অন্য কোন বিশেষ দিবসে জাতির জনক কে শ্রদ্ধা জানাতে তাদের মধ্যে কোন বিভেদ কিংবা অনৈক্য নেই। মহাত্মা গান্ধীর রাজনীতির চরম প্রতিপক্ষ এবং কঠোর সমালোচক হওয়া সত্ত্বেও তারা গান্ধী ঘাটের নাম পরিবর্তন করেননি। উপরন্তু গুজরাটের রাজধানীর নাম গান্ধী নগর রাখা হয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক বেসামরিক কত ধরনের সরকার আসে এবং যায়। কিন্তু তাদের কারও রাজনীতিতে জিন্নাহ্‌কে নিয়ে কোন বিরোধ নেই। এমনকি ইন্দিরা গান্ধীর চরম শত্রুরাও দিল্লীর পালাম বিমানবন্দর থেকে কখনো তার নাম মুছে ফেলার
চেষ্টা করেননি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পাকিস্তানী মনোভাবাপন্ন বাংলাদেশী সামরিক স্বৈরশাসকদের পাশাপাশি তাদের উত্ত্সূরীরাও উপরোক্ত শিষ্টাচার এবং সৌজন্যবোধ থেকে কোন শিক্ষাই গ্রহণ করেননি।

১০৭। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ফরাসি বীর নেপোলিয়ন কে বৃটিশরা সেন্ট হেলেনায় বন্দী করে রেখেছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ফরাসি জাতি কোনদিন তাদের এই বীরের মাথা সামান্য ও হেঁট হতে দেননি। তার মর্যাদা কোনভাবেই ক্ষুণ্ন ও হতে দেননি। সেজন্য ফরাসি জাতি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ এক জাতির মর্যাদায় বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এবং ভূষিত। তাই আজ ফ্রান্সে একটি শিশুর জন্ম হলে তার গর্বিত মাতা-পিতা তাকে শিখান- তুমি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উত্তরাধিকারী। গ্রীসে জন্ম গ্রহণকারী শিশুর মাতা-পিতা তাদের সন্তানকে গর্বের সাথে শিক্ষা দেন- তুমি দিগ্বিজয়ী বীর Alexander the Great -এর উত্তরাধিকারী। আমেরিকানরা তাদের সন্তানকে শিক্ষা দেন জর্জ ওয়াশিংটন এবং আব্রাহাম লিংকনের গর্বিত উত্তরাধিকারী হিসেবে। তেমনই আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতীয়রাও তাদের সন্তানকে শিক্ষা দেন মহাত্মা গান্ধীর উত্তরাধিকারী হিসেবে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের অবৈধ, অগণতান্ত্রিক ও স্বঘোষিত প্রেসিডেন্ট এবং তার উত্ত্সূরী সামরিক স্বৈরশাসক এবং তাদের ভাবশিষ্যদের দিকে তাকালে দৃষ্টিকটু রকমের পার্থক্য এবং বৈপরীত্য খোলা চোখেই পরিলক্ষিত হয়।

১০৮। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলেও সত্য যে, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে বর্বরোচিতভাবে হত্যা করার পর খুনীদেরকে বিচারের আওতায় আনা তো অনেক দূরের কথা বরং উক্ত হত্যাকাণ্ডের সহিত সরাসরি জড়িত হত্যাকারীদের (Active participants and striking accused) সবাইকে বিভিন্ন দূতাবাসে উচ্চপদে চাকরি দিয়েছেন জিয়াউর রহমান। এরই পাশাপাশি তিনি ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় সরকারী বেতার এবং টিভিতে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করার ব্যাপারে অলিখিতভাবে নিষেধাজ্ঞা ও আরোপ করেছেন। আমাদের জাতীয় বীরদের অবদান এবং তাদের বীরত্বগাঁথাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার ঔদ্ধত্য এবং বেয়াদবী ও
শুরু হয়েছে তারই আমল থেকে। এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তির পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর পৈশাচিক এবং বর্বর হত্যাকাণ্ডের সুবিধাভোগীরা সুযোগ পেলে আজও কালজয়ী এই মহান নেতার অবদানকে ম্লান কিংবা অস্বীকার করার মতো ধৃষ্টতা দেখায়। যা তাদের কুৎসিত এবং জঘন্য মন-মানসিকতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ বলে যে কেউ সহজেই অনুধাবন করতে পারেন। এরই পাশাপাশি এইসব কুলাঙ্গার নরাধমেরা ইয়াহিয়া, ভুট্টো ও টিক্কা খানের পদলেহী দোসর এবং ভাবশিষ্য বলে যে কোন প্রকার সন্দেহ ব্যতিরেকেই প্রমাণিত হয়।
১০৯। শুভবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি মাত্রই জানেন যে, ঘাতক চক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও তাঁর স্বপ্ন এবং আদর্শের মৃত্যু ঘটাতে পারেননি। আজ তাই ১৭ কোটি বাঙালির অন্তরে অন্তরে লালিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর সুমহান ত্যাগ ও তিতিক্ষার সংগ্রামী জীবনাদর্শ। হাজার বছরের শাশ্বত বাংলার সর্বজনীন অভিব্যক্তি ঘটেছে তাঁর চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা এবং মনন ও মানসিকতায়। তাঁর কঠোর পরিশ্রম, অপরিসীম আত্মত্যাগ, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব এবং দূরদর্শিতা তাঁকে করেছে মহৎ এবং মহিমান্বিত। তাই বর্বর ঘাতকের গুলিতে নিহত হলেও বাঙালির হৃদয়ে তিনি চিরঞ্জীব বীর। প্রতিটি বাঙালির হৃদয় এবং মন জুড়েই তিনি আছেন
এবং হৃদয়ের নিভৃত অন্তরে তিনি থাকবেন চিরকাল। তাঁর নীতি, আদর্শ, নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং কর্মসূচী আজও আমাদের সকল শক্তি এবং প্রেরণার উৎস। তাই বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের প্রাণের স্পন্দনে পরিণত হয়েছেন। কেউ স্বীকার করুন কিংবা না ই করুন বঙ্গবন্ধুর নামের সঙ্গে মিশে আছে আমাদের আবেগ, অনুভূতি এবং স্পন্দন। তিনি আজ আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।

১১০। বঙ্গবন্ধু এমন একজন উঁচু মানের ত্যাগী, সংগ্রামী এবং পরীক্ষিত নেতা ছিলেন যিনি শুধুমাত্র বাঙালি জাতির স্বার্থ সংরক্ষণ তথা বাঙালির স্বাধিকার এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। সারা বিশ্বের যে কোন স্থানে যে কোন ধর্ম, বর্ণ বা
জাতি গোষ্ঠীর উপর শোষণ, বঞ্চনা কিংবা নির্যাতনের বিরুদ্ধে এবং নিপীড়িত জনসাধারণের উপর যে কোন ধরনের জুলুম, অত্যাচার এবং অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সোচ্চার এবং প্রতিবাদমুখর। শোষিত, বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শোষণ বঞ্চনার ব্যাপারে বিগত ১৯৭৩ সনের ৯ই সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাষায় এবং প্রত্যয় দৃঢ় কণ্ঠে বলেন- “সারা বিশ্ব আজ দুইভাগে বিভক্ত। এর একভাগে রয়েছে শোষক এবং অন্যভাগে রয়েছে শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।” গণমানুষের নেতা বঙ্গবন্ধুর এহেন প্রত্যয় দৃঢ় কণ্ঠের দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কিউবার সংগ্রামী এবং বিপ্লবী প্রেসিডেন্ট ড. ফিডেল ক্যাস্ট্রো বঙ্গবন্ধুকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করে বলেছিলেন- “I haven’t seen the Himalayas but I have seen Sheikh Mujib. In personality and in courage this man is the Himalayas. I have thus had the experience of witnessing the Himalayas.” অর্থাৎ “আমি হিমালয় দেখিনি। কিন্তু আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব এবং সাহসিকতার দিক থেকে তিনি হিমালয়ের সাথে তুলনীয়। তাই আমার হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা হলো।” সুতরাং সহজেই বুঝা যায় যে, বঙ্গবন্ধুর হিমালয় তুল্য ব্যক্তিত্ব এবং নেতৃত্বের কথা স্মরণ করেই প্রেসিডেন্ট ক্যাস্ট্রো বঙ্গবন্ধুকে হিমালয়ের সাথে তুলনা করেছেন। বাঙালি জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কিউবার বিপ্লবী নেতা ড. ফিডেল ক্যাস্ট্রোর উপরোক্ত অত্যন্ত প্রশংসাধন্য মন্তব্যটি শুধুমাত্র ব্যক্তি মুজিব তথা বঙ্গবন্ধুকেই গৌরবান্বিত ও মহিমান্বিত করেনি; একই সঙ্গে অনিবার্যভাবেই মর্যাদার আসনে বসিয়েছে আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশকে এবং বাঙালি জাতিকে।

ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ), লেখক ও কলামিস্ট 

(চলবে)

বি রি /ইবিটাইমস/ এম আর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »