মহাকালের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু

৬ষষ্ঠ পর্ব 

 ড. মোঃ ফজলুর রহমানঃ ৫১। দেশবাসী নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে, তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাদের সেনাবাহিনীকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রশিক্ষিত এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাবাহিনী হিসেবে সবসময় প্রচার করতেন এবং এই নিয়ে গর্ববোধ করতেন। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো যে নিরীহ, নিরস্ত্র এবং কোন প্রকার সামরিক প্রশিক্ষণ বিহীন বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট পাকিস্তানের এই প্রশিক্ষিত বর্বর সেনাবাহিনী নয় মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে পরাজিত এবং লজ্জাজনক ভাবে পর্যদুস্ত হয়। এমতাবস্থায় ১৯৭১ -এর ১৬ই ডিসেম্বর তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান সেনা কর্মকর্তা লেঃ জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান (এ এ খান) নিয়াজীর নেতৃত্বে রমনা রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ৯৩ হাজার সৈন্য সহ তারা সবাই আত্মসমর্পণ করেন। তাদের এহেন নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে ৩০ লাখ শহীদ, দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম এবং অগণিত বীরের অপরিমেয় রক্তস্রোতের বিনিময়ে বাঙালি চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনে। অতঃপর বিশ্বের বুকে দর্পভরে আত্মপ্রকাশ করে বীর বাঙালি জাতি।

৫২। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, সারা বিশ্বে সকল দেশেরই স্বাধীনতা দিবস রয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর কোন দেশেরই কোন বিজয় দিবস নেই। এদিক দিয়ে আমরা বাঙালি জাতি সারা বিশ্বে দারুণ এক বিস্ময়কর এবং ব্যতিক্রম ইতিহাসের দাবিদার। আমরা সত্যিই পরম সৌভাগ্যবান যে, আমাদের যেমন স্বাধীনতা দিবস রয়েছে তেমনি আবার বিজয় দিবস ও রয়েছে। পৃথিবীতে যে দেশ যেদিন স্বাধীন হয়, সেদিনটিকেই স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এহেন অবস্থায় স্বাধীনতা প্রাপ্ত সকল দেশই বছরের সেই নির্দিষ্ট দিনটিকে তাদের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। ১৯৭১ -এর ২৫শে মার্চ মধ্য রাত শেষে তথা ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। যা সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে বিবৃত এবং বিধৃত রয়েছে। তাই ২৬শে মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। পক্ষান্তরে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করে। তাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আমাদের প্রাণ প্রিয় বাংলাদেশ পাকিস্তানী হানাদার মুক্ত তথা শত্রু মুক্ত হয়। তাই এই দিনটি আমাদের বিজয় দিবস। এটিও সারা
বিশ্বে অনন্য বৈশিষ্ট্যময় বিরল এক ঘটনা বটে।

৫৩। আমরা সবাই জানি ধর্মের নামে শোষণ, নিপীড়ন এবং অগণতান্ত্রিক পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ভেঙ্গে তদস্থলে ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গঠনের আজীবন স্বপ্ন ছিল বঙ্গবন্ধুর। হাজার বছরের নিপীড়িত, নিগৃহীত এবং বঞ্চিত বাঙালির জাতীয় সত্ত্বা তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই হতভাগ্য জাতির জন্য একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে তিনি তাঁর সারা জীবন ধরে সংগ্রাম করেছেন। পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনামলে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনেই নেতৃত্ব দিয়েছেন এই মহান ব্যক্তি। জীবন জয়ী এই সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে কৈশোর, যৌবন এবং প্রৌঢ়ত্বকালকে দেশমাতৃকার টানে উৎসর্গ করেছেন ইতিহাসের বরপুত্র বঙ্গবন্ধু। তাই অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের মহান স্থপতি ও বঙ্গবন্ধু। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন ধর্মপরায়ণ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও আজীবন অসাম্প্রদায়িক চিন্তাচেতনা এবং ধর্মনিরপেক্ষ নীতি ও আদর্শের প্রতি বিশ্বাসী এবং শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাপারে তাঁর মনোভাব এবং দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং পরিচ্ছন্ন।

৫৪। পাকিস্তানের ২৪ বছরের শাসন আমলে আধিপত্যবাদী সামন্ততান্ত্রিক মৌলবাদী চক্র এবং তাদের সহযোগী সামরিক ও ছদ্ম-সামরিক স্বৈরশাসকেরা ধর্মকে কিভাবে রাজনৈতিক হীন স্বার্থে ব্যবহার করেছেন – বঙ্গবন্ধু তা সারা জীবন ধরে প্রত্যক্ষ করেছেন। তাই ধর্মের নামে শাসন, শোষণ ও বাড়াবাড়ি এবং ধর্মের অপব্যবহার রোধ করার আশা নিয়ে তিনি আমাদের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হিসেবে সন্নিবেশিত করেছেন। এ ব্যাপারে বিগত ১৯৭২ সালের ৭ই জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রদত্ত এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন –“বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়।মুসলমান মুসলমানদের ধর্ম পালন করবে। হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে। খ্রিষ্টান তার ধর্ম পালন করবে। বৌদ্ধ ও তার নিজের ধর্ম পালন করবে। এ মাটিতে ধর্মহীনতা নাই, ধর্মনিরপেক্ষতা আছে। এর একটা মানেও আছে। এখানে ধর্মের নামে ব্যবসা করা চলবে না। ধর্মের নামে মানুষকে লুট করে খাওয়া চলবে না। ধর্মের নামে রাজনীতি করে রাজাকার, আল-বদর পয়দা করা বাংলার বুকে আর চলবে না। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে দেয়া হবে না।” উপরোল্লিখিত একই ব্যাপারে বিগত ১৯৭২ সালের ১২ই অক্টোবর জাতীয় সংসদে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান অনুমোদন অধিবেশনে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন- “ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না। যদি কেউ ব্যবহার করে, তাহলে বাংলার মানুষ তাকে প্রত্যাখ্যান করবে এ বিশ্বাস আমি করি।” সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ যে ধর্মহীনতা নয়, তা’ বঙ্গবন্ধু প্রকাশ্য জনসভায় এবং মহান জাতীয় সংসদে প্রদত্ত ভাষণে অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং দ্ব্যর্থহীন (Conspicuously and unequivocally) ভাবে ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু তা’ সত্ত্বেও যদি কেউ না বুঝেন কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে না বুঝতে চান – তাহলে তাকে মূর্খ অথবা জ্ঞানপাপী হিসেবে চিহ্নিত করা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকে না।

৫৫। একথা ঐতিহাসিকভাবেই সত্য যে, দেশী বিদেশী সকল প্রতিক্রিয়াশীল অপশক্তিকে প্রতিহত করে একটি আধুনিক, সেকুলার তথা ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু আজীবন দেখে এসেছেন। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে গৌরবান্বিত বিজয় অর্জনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর আজন্ম লালিত উপরোক্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ অনেকটা সুগম তথা নিষ্কণ্টক হয়েছে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য যে, দেশ শত্রু মুক্ত হওয়ার দিনে তথা আমাদের গৌরবদীপ্ত মহান বিজয় দিবসের দিনে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ২৫শে মার্চের মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর কারাজীবনের এক পর্যায়ে তাঁকে লাহোর থেকে ৮০ (আশি) মাইল দূরবর্তী লায়ালপুর সার্কিট হাউজে প্রতিষ্ঠিত একটি সামরিক আদালতে প্রহসন মূলক গোপন বিচারের রায়ে ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপে সে রায় তখন কার্যকর করা যায়নি। ফলে পাকিস্তানী সামরিক জান্তা উপরোক্ত মৃত্যুদণ্ডাদেশ স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়।

৫৬। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তথা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত হয়ে বিপুল সংখ্যক সৈন্য সহ আত্মসমর্পণের পর বঙ্গবন্ধুকে ছেড়ে দেয়ার জন্য সমগ্র বাঙালি জাতি আবারও সোচ্চার এবং প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠে। এরই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান সরকারের প্রতি আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানাতে থাকে। এরই পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়ার জন্য পাকিস্তানের প্রতি আন্তর্জাতিক চাপ ও দিনদিনই বৃদ্ধি পেতে থাকে। এহেন ক্রমাগত চাপে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার অনেকটা বেসামাল হয়ে পড়েন। ফলে ১৯৭২ সনের ৮ই জানুয়ারি তারা বঙ্গবন্ধুকে তাদের কারাগার থেকে মুক্ত করে দিতে বাধ্য হন। এমতাবস্থায়
পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে ঐ দিনই তিনি লন্ডন যান। আনুষ্ঠানিকভাবে বঙ্গবন্ধু ঐ সময়ে কোন রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা সরকার প্রধান না হওয়া সত্ত্বেও ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ নিজে স্বয়ং তার দেশে বঙ্গবন্ধুকে
বিপুলভাবে অভিনন্দন জানান। যা ছিল অভূতপূর্ব আন্তরিকতাপূর্ণ এবং সহৃদয়তায় ভরপুর। এরই পাশাপাশি এহেন উষ্ণ অভিনন্দন বঙ্গবন্ধুর জন্য ছিল যেমন মর্যাদাপূর্ণ এবং সম্মানজনক ঠিক তেমনি বাঙালি জাতির জন্য তা অবশ্যই গৌরবজনক ও বটে।

৫৮। লন্ডনে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য বিরতিকালে তিনি বিখ্যাত ক্ল্যারিজেস্‌ হোটেলে অবস্থান করেন। ঐ সময়ে বৃটেনের লেবার পার্টির তৎকালীন নেতা এবং পরবর্তীকালে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী হ্যারল্ড উইলসন, পার্টির এমপি পিটার শোর এবং বিবিসি’র সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট সহ দেশ-বিদেশের বহু সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং কুশল বিনিময় করেন। পরে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আগে বৃটিশ রয়েল এয়ার ফোর্সের একটি বিশেষ বিমান ১৯৭২ সনের ১০ই জানুয়ারি সকালে দিল্লীর পালাম বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এহেন অবস্থায় ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভি, ভি গিরি এবং প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী সম্মিলিতভাবে বঙ্গবন্ধুকে উষ্ণ সংবর্ধনা প্রদান করেন। পরে প্যারেড গ্রাউন্ডে নির্মিত মঞ্চে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে মিসেস গান্ধী বক্তৃতা দেন। প্রত্যুত্তরে বঙ্গবন্ধু ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বক্তৃতা করেন।
অত্যন্ত বিস্ময়কর এবং অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, এহেন আন্তরিকতাপূর্ণ পরিবেশে  এবং পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর স্বদেশে আসার পথে প্রথম সাক্ষাতের সুযোগেই বঙ্গবন্ধু তাঁর দেশ থেকে ভারতের সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য শ্রীমতি
গান্ধীকে অনুরোধ করেন। এরই পাশাপাশি মিসেস গান্ধী ও বঙ্গবন্ধুর এই অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সম্মত হন। অতঃপর ঐদিনই বিজয়ী বীরের বেশে বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। ঐদিন বিকালে রমনা রেসকোর্স ময়দানে বীরোচিত সংবর্ধনা দিয়ে বিজয়ী বাঙালি জাতি সশ্রদ্ধ এবং সকৃতজ্ঞ চিত্তে তাদের জাতির পিতাকে সসম্মানে বরণ করে নেয়।

৫৮। বাঙালির কালজয়ী ইতিহাসের স্রষ্টা বঙ্গবন্ধুকে প্রদত্ত উপরোক্ত সম্বর্ধনা প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি বলেন- “… আপনারা জানেন যে, আমার ফাঁসির হুকুম হয়েছিল। আমার সেলের পাশে আমার জন্য কবর ও খোঁড়া হয়েছিল। আমি মুসলমান। আমি জানি, মুসলমান একবারই মাত্র মরে। তাই আমি ও ঠিক করেছিলাম আমি তাদের (পাকিস্তানীদের) নিকট নতি স্বীকার করবো না। ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় আমি বলবো আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।” [দ্রঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মারক গ্রন্থ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৪]। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ফাঁসির আদেশ প্রদান করার পর কবর খোঁড়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে
কোনভাবেই দমন কিংবা ভীত সন্ত্রস্ত করা যায়নি। আর বঙ্গবন্ধু ও কোনভাবেই পাকিস্তানী শাসকবর্গের নিকট নতি স্বীকার করেননি। বরং দেশ শত্রু মুক্ত হওয়ার পর বিজয়ী বীরের ন্যায় বীরদর্পে তাঁর স্বদেশভূমিতে ফিরে এসেছেন।
৫৯। পরবর্তীকালে ১৯৭২ সনের ১২ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে সরকার গঠন করেন। সরকার গঠনের পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে তিনি সর্বশক্তি নিয়ে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি এমন একটি সময়ে দেশের হাল ধরেন যখন তাঁর সামনে অত্যন্ত জরুরী হয়ে দাঁড়ায় ভারতে আশ্রয় নেয়া প্রায় এক কোটি শরণার্থীদের ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করা, পাকিস্তানী নরপশুদের দ্বারা লাঞ্ছিত এবং নির্যাতিত মা-বোনদের সুচিকিৎসা ও সামাজিকভাবে পুনর্বাসিত করা, অবৈধ শিশুদের জন্য আশ্রমের ব্যবস্থা করা, আহত ও পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাদের সুচিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারদেরকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা। এরই পাশাপাশি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাঘাট, পুল- ব্রিজ-কালভার্ট মেরামত ও পুনর্নির্মাণ, নদী বন্দর ও সমুদ্র বন্দর সচল করা, স্কুল- কলেজ-মাদ্রাসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদ মন্দির পুনর্নির্মাণ করা, বিধ্বস্ত অর্থনীতি তথা শূন্য রিজার্ভ মানি মান সম্মত পর্যায়ে নিয়ে আসা, শূন্য খাদ্য গুদামে খাদ্য মজুদের ব্যবস্থা গ্রহণ করাও অত্যাবশ্যক এবং অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। সত্য বলতে কি,
একেবারে শূন্যের উপর দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর প্রাণপ্রিয় জন্মভূমি পুনর্গঠনের যাত্রা শুরু করেন।

৬০। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, বঙ্গবন্ধু দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে, ১৯৭২ সনে সারা বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ হবে এবং এই দুর্ভিক্ষে অন্তত দুই কোটি মানুষ মারা যাবে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো যে, আদৌ কোন দুর্ভিক্ষই হয়নি। তাই অনাহারে কিংবা কোন দুর্ভিক্ষে মানুষ মারা যাওয়ার ও কোন প্রশ্নই আসে না। কিন্তু তার পরও ষড়যন্ত্রকারীরা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন কৌশলে তাদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে। তারা আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা কর্মীদেরকে হত্যা করা এমনকি পবিত্র ঈদের জামাতে আক্রমণ করে সংসদ সদস্যকে হত্যা করা, পাটের গুদামে আগুন, থানা লুট, পুলিশ ফাঁড়ি লুট সহ অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে নানা ধরনের হিংসাত্মক এবং ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালাতে থাকে। এরই পাশাপাশি নানা ধরনের গুজব এবং মিথ্যা অপপ্রচারের মাধ্যমে জনগণকে প্ররোচিত এবং বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা ও
জোরালোভাবেই চালাতে থাকে। চরমপন্থী এবং উগ্র বামপন্থীদের এহেন সন্ত্রাসী ও নাশকতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি নির্বিচারে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে বঙ্গবন্ধু নিদারুণভাবে হিমশিম খেয়েছেন।

ড. মোঃ ফজলুর রহমান,সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ),লেখক ও কলামিস্ট 

(চলবে)

বি রি/ইবিটাইমস/এম আর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »