চলে গেলেন ভারতীয় সুর সম্রাজ্ঞী এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয়া লতা মঙ্গেশকর

লতা মঙ্গেশকরের মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শোক প্রকাশ

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ভারতের কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ লতা মঙ্গেশকরের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের পাঠানো শোকবার্তায় বলা হয়, এই সুরসম্রাজ্ঞীর মৃত্যুতে উপমহাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকবার্তায় আরও বলেছেন, লতা মঙ্গেশকর তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে চিরদিন এ অঞ্চলের মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রী কিংবদন্তি এই শিল্পীর আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২৭ দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ রোববার মারা যান ভারত রত্ন খেতাবে ভূষিত এই কিংবদন্তী সঙ্গীত শিল্পী। ভারতের জাতীয় সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছেন, আজ রোববার (৬ ফেব্রুয়ারী) ভারতের স্থানীয় সময় সকাল ৮:১২ মিনিটে মারা গেছেন কিংবদন্তী সঙ্গীত শিল্পী লতা মঙ্গেশকর। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। তিনি চির কুমারী ছিলেন।

ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী সঙ্গীত সাম্রাজ্যের সুর-সম্রাজ্ঞী হিসেবে অধিক পরিচিত লতা দিদি ২০২২ সালের ৮-ই জানুয়ারি কোভিডে আক্রান্ত হয়ে ভারতের মহারাষ্ট্রের রাজধানী মুম্বাইয়ের ব্রীচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভর্তি হন। গত সপ্তাহে করোনা মুক্তও হয়েছিলেন তিনি কিন্তু পরবর্তীতে গতকাল শনিবার সকাল থেকেই তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।

১৯৮৯ সালে ভারত সরকার তাকে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে ভূষিত করে। তার অবদানের জন্য ২০০১ সালে তাকে ভারতের সর্বোচ্চ সম্মাননা ভারতরত্নে ভূষিত করা হয়; এম. এস. সুব্বুলক্ষ্মীর পর এই পদক পাওয়া তিনিই দ্বিতীয় সঙ্গীতশিল্পী। ২০০৭ সালে ফ্রান্স সরকার তাকে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা লেজিওঁ দনরের অফিসার খেতাবে ভূষিত করে।

তিনি ৩টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ১৫টি বাংলা চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার, ৪টি শ্রেষ্ঠ নারী নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, ২টি বিশেষ ফিল্মফেয়ার পুরস্কার, ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেছেন। ১৯৭৪ সালে তিনি প্রথম ভারতীয় হিসেবে রয়্যাল অ্যালবার্ট হলে সঙ্গীত পরিবেশন করেন।

পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে লতা সর্বজ্যেষ্ঠ। তার বাকি ভাইবোনেরা হলেন – আশা ভোঁসলে, ঊষা মঙ্গেশকর, মীনা মঙ্গেশকর ও হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর।

প্রারম্ভিক জীবন সম্পাদনা: লতা মঙ্গেশকর ১৯২৯ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর তৎকালীন ইন্দোর রাজ্যের রাজধানী ইন্দোর (বর্তমান মধ্যপ্রদেশ) জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা পণ্ডিত দীনানাথ মঙ্গেশকর একজন মারাঠি ও কোঙ্কিণী সঙ্গীতজ্ঞ এবং মঞ্চ অভিনেতা ছিলেন। তার মাতা শেবন্তী (পরবর্তী নাম পরিবর্তন করে সুধামতি রাখেন) বোম্বে প্রেসিডেন্সির তালনারের (বর্তমান উত্তর-পশ্চিম মহারাষ্ট্র) একজন গুজরাতি নারী ছিলেন। তিনি দীনানাথের দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন। তার প্রথম স্ত্রী নর্মদা শেবন্তীর বড়বোন ছিলেন, যিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

শৈশবে বাড়িতে থাকাকালীন কে এল সায়গল ছাড়া আর কিছু গাইবার অনুমতি ছিল না তার। বাবা চাইতেন ও শুধু ধ্রপদী গান নিয়েই থাকুক। জীবনে প্রথম রেডিও কেনার সামর্থ্য যখন হলো, তখন তার বয়স আঠারো। কিন্তু রেডিওটা কেনার পর নব ঘুরাতেই প্রথম যে খবরটি তাকে শুনতে হয় তা হচ্ছে, কে. এল. সায়গল আর বেঁচে নেই। সঙ্গে সঙ্গেই রেডিওটা ফেরত দিয়ে দেন তিনি।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি সম্পাদনা: লতা মঙ্গেশকর তার কর্মজীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। তিনি ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা ভারতরত্ন (২০০১), দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা পদ্মবিভূষণ (১৯৯৯), তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণে (১৯৬৯) ভূষিত হয়েছেন। এই সঙ্গীতশিল্পীকে ২০০৭ সালে ফ্রান্স সরকার তাদের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মাননা লেজিওঁ দনরের অফিসার খেতাব প্রদান করেছে। এছাড়া তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (১৯৮৯), মহারাষ্ট্র ভূষণ পুরস্কার (১৯৯৭),এনটিআর জাতীয় পুরস্কার (১৯৯৯), জি সিনে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার (১৯৯৯), এএনআর জাতীয় পুরস্কার (২০০৯), শ্রেষ্ঠ নারী নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী বিভাগে ৩টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং ১৫টি বাংলা চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার পেয়েছেন।

তিনি শ্রেষ্ঠ নারী নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী বিভাগে ৪টি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অর্জন করেছেন। তিনি ১৯৬৯ সালে নতুন প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে শ্রেষ্ঠ নারী নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী বিভাগে ফিল্মফেয়ার পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। পরবর্তী কালে তিনি ১৯৯৩ সালে ফিল্মফেয়ার ১৯৯৩ সালে ফিল্মফেয়ার আজীবন সম্মাননা পুরস্কার এবং ১৯৯৪ ও ২০০৪ সালে দুইবার ফিল্মফেয়ার বিশেষ পুরস্কার অর্জন করেন।

লতা মঙ্গেশকরের মৃত্যুতে ভারতে দু’দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। সমগ্র দেশে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আজ রোববার সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হবে তাঁর শেষকৃত্য। লতার প্রয়াণে সোমবার অর্ধ দিবস ছুটি ঘোষণা করেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারও।

কবির আহমেদ/ইবিটাইমস/ এম আর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »