ঝালকাঠির নৌ ট্রাজেডির ঘটনায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত, নিখোজের সন্ধানে পরিবারের সদস্যরা

ঝালকাঠি প্রতিনিধি: ঝালকাঠির লঞ্চ ট্রাজেডির ঘটনায় শনিবার সকাল থেকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং কোস্টগার্ডের ডুবুরীরা নিখোজের সন্ধানে সুগন্ধা নদীতে উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে এবং এই দুর্ঘটনায় ঝালকাঠি থানায় গ্রাম পুলিশ বাদী হয়ে অপমৃত্যু একটি মামলা দায়ের করেছে। এই ঘটনায় নৌ- মন্ত্রনালয়ের গঠিত তদন্ত টিম পুড়ে যাওয়া লঞ্চ এবং বিভিন্ন ব্যাক্তির সাক্ষ্য গ্রহন শুরু করেছে।

শুক্রবারের পরে বেলা ৪টা পর্যন্ত উদ্ধার অভিযানে নিখোজ ব্যাক্তিদের মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। কোস্টগার্ড জানিয়েছেন, তাদের উদ্ধার অভিযান নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অব্যহত থাকবে। সাবেক নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমান নৌ পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি শাজাহান খান সকাল সাড়ে ১০টায় লঞ্চঘাট এসে ক্ষতিগ্রস্ত লঞ্চটি পরিদর্শন করেছেন।

তিনি জানিয়েছেন, এই ঘটনায় লঞ্চের শ্রমিকদের কোন গাফিলতি থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঝালকাঠি রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটের সেচ্ছাসেবকরা পৌর মিনি পার্কে এ পর্যন্ত নিখোজ ৫২ জনের তালিকা পেয়েছে এবং স্বজন হারানো মানুষ স্বজনদের সন্ধানে ঝালকাঠি আসছেন। ঝালকাঠি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২ জন লঞ্চ যাত্রীর চিকিৎসা চলছে।

ঝালকাঠিতে উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের মধ্যে ৪ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে এবং তাদের ময়নাতদন্ত শেষে মৃতদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এরা বরগুনা পাথরঘাটা উপজেলার বরইতলা গ্রামের মৃত হোসেন আলীর পুত্র আব্দুর রাজ্জাক(৬২)। বরগুনা জেলার বামনা উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামের সঞ্জীব হাওলাদেরর পুত্র স্বপ্নীল (১৪)। বরগুনা জেলার আমতলীর বশীর আহমেদ এর স্ত্রী জাহানারা বেগম(৬০)। বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার কাজিরাবাদ এলাকার কাদের হাওলাদেরর পুত্র রিয়াজ হাওলাদার (৪০)।

শুক্রবার দিবাগত রাত ৯টায় ময়নাতদন্ত শেষে অবশিষ্ট ৩২ জনের মৃতদেহ বরগুনার সংসদ সদস্য এস.শওকত হাসানুর রহমান লিমন এর নেতৃত্বে বরগুনা জেলা প্রশাসকের কাযার্লয়ের সহকারি কমিশনার মেহেদী হাসানের কাছে মৃতদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে এবং ডিএনএ টেস্টর জন্য স্যাম্পল সংরক্ষন করে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখনো স্বজন হারানো মানুষের কান্নার রোল থামেনি এবং তারা স্বজনদের খোজে ছুটে চলছে।

শনিবার সকাল ১১টায় তদন্ত কমিটির আহবায়ক নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয়ের যুগ্ম সচিব তোফায়েল হাসান, সদস্য সচিব বিআইডব্লিউটি এর অতিরিক্ত পরিচালক সাইফুল ইসলাম, নৌ পুলিশ সুপার কফিল উদ্দিন , নৌ চলাচল বিভাগের মামুন অর রশিদ ও ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স এর উপ-পরিচালক তাইফুর আহমেদ এবং ঝালকাঠির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(রাজস্ব) এই ৭সদস্যর তদন্ত কমিটি তাদের তদন্ত কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছেন। এরা লঞ্চটিতে আগুন লাগার কারন, লঞ্চ কতৃপক্ষের কি ধরনের অবহেলা ছিল এই সব বিষয়ে তদন্ত করে সরকারের কাছে ৩ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। এছাড়াও বিআইডব্লিউটিএ ৬ সদস্যের এবং জেলা প্রশাসক ৫ সদস্যর আরো ২টি তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে এবং তারাও তদন্তের কাজ শুরু করেছেন।

অন্যদিকে লঞ্চ দুর্ঘটনায় যেভাবে বেচে গেলেন একই পরিবারের তিন জন। ঝালকাঠির নৌ দুর্ঘটনায় থেকে ঢাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ফাতেমা আক্তার(২০) ও তার বোন নাসিং ডিপ্লোমা বিভাগের ৩য় বর্ষের ছাত্রী মুক্তা আক্তার (২১) বিপদের মধ্যেও ঝুকি নিয়ে ৩ জনকে মৃত্যুর দুয়ার থেকে বাচিয়েছেন। তখন লঞ্চটি চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ছে। বড়দিনের ছুটিতে মুক্তা আক্তার চাচাতো বোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ও বোনের ছেলে শিশু সন্তান নিয়ে বরগুনা জেলার বামনা গ্রামে আসছিলেন। পথিমধ্যে লঞ্চের আকস্মিক আগুন লাগার ঘটনায় তারা মানসিক ভাবে ভীত বিহ্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু এর মধ্যে বাচার জন্য দৃঢ় মনোভাব নিয়ে মুক্তা আক্তার লঞ্চের পাশে চলে আসে এবং এক পযার্য়ে পানির মধ্যে অন্ধকারে পাড় আছে ভেবে এদেরকে নিয়ে ঝাপ দেয়। তার কোল থেকে শিশু রুমান পড়ে যায় এবং ঝাপ দেয়ার পড়ে সে পায়ে মাটি পায়। পরবর্তিতে সে হাত থেকে ফসকে যাওয়া শিশুটিকে তুলে আনতে পেরেছে।

এ সময়ে আরো কিছু লোক নদীতে ঝাপ দিয়ে তীরে উঠতে সক্ষম হয়। তবে দুজনেই অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। মুক্তা আক্তার বামনা উপজেলার চালিতাবুনিয়া গ্রামের কন্যা এবং ফাতেমা আক্তার ঢাকার কেরানীগঞ্জের দেলোয়ার হোসেনের কন্যা। রুমান (৮) তার বোনের সন্তান। এরা সকলে মিলে ছুটিতে মুক্তা আক্তারের গ্রামের বাড়িতে আসছিলেন। মুক্তা আক্তার জানান, এই ঘটনা থেকে বেচে গিয়ে তাদের কাছে মনে হয়েছে তারা নতুন জীবন ফিরে পেয়েছেন এবং আগামী দিনগুলিতে ভালো মানুষ হয়ে বেচে থাকার চেষ্টা করবেন।

বাধন রায়/ইবিটাইমস/এম আর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »