আধুনিক পশ্চিমা জগতের দার্শনিক ও দর্শন শাস্ত্রের চরণভূমি গ্রীস

গ্রীসকে আধুনিক পশ্চিমা বিশ্বের জ্ঞান বিজ্ঞানের সূতিকাগার এবং গণতন্ত্রের জন্মদায়ক স্থান হিসেবে গণ্য করা হয়

 কবির আহমেদ, ভিয়েনা, অষ্ট্রিয়াঃ প্রাকৃতিকভাবেই গ্রীস পৃথিবীর অন্যতম একটি সুন্দর দেশ। তাই প্রতি বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা এই দেশে বেড়াতে আসেন। অস্ট্রিয়া সহ ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশের পর্যটকরা গ্রীসে গ্রীষ্মকালীন ছুটি কাটাতে আসেন। এজিয়ান সাগরে গ্রীসের দ্বীপ সান্তোরিনির কথা শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে সাদা রং করা বাড়িঘর, নীল রঙা গম্বুজ বিশিষ্ট চার্চ আর নীল সাগরের পাশে ধূসর সৈকত।

পৃথিবী বিখ্যাত দ্বীপ সান্তোরিনি সূর্যাস্ত দর্শনের জন্যও বিখ্যাত। সান্তোরিনির দক্ষিণের শহর ওইসার পাহাড় চূড়ার রেস্টুরেন্টে বসে দেখা যায় স্বপ্নীল সূর্যাস্ত। সূর্যাস্তের সময় লালিমা আঁকা সান্তোরিনির আকাশ দেখলে মনে হয় যেন, শিল্পীর সব লাল রং ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে ঐ এক আকাশেই। আর দিগন্ত থেকে একটু দূরে লাল আলোর চেয়ে তরঙ্গদৈর্ঘ্যে এগিয়ে থাকা কমলা রঙের আভায় পুরো সান্তোরিনিই কমলা হয়ে ওঠে।

গ্রীসের ভৌগলিক অবস্থান:

গ্রীস ইউরোপ মহাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের একটি রাষ্ট্র যা বলকান উপদ্বীপের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। এর সীমান্তবর্তী রাষ্ট্রগুলো হচ্ছে উত্তরে বুলগেরিয়া, উত্তর মেসিডোনিয়া এবং আলবেনিয়া আর পূর্বে তুরস্ক। গ্রিসের মূল ভূমির পূর্বে ও দক্ষিণে এজিয়ান সাগর অবস্থিত, আর পশ্চিমে রয়েছে আইওনিয়ান সাগর। পূর্ব ভূমধ্যসাগরের উভয় অংশে গ্রীসের অনেকগুলো দ্বীপ রয়েছে।

গ্রীস ইউরোপ. এশিয়া এবং আফ্রিকার মিলন স্থলে অবস্থিত। বর্তমান গ্রীকদের পূর্বপুরুষ হচ্ছে এক সময়ের পৃথিবী বিজয়ী প্রাচীন গ্রীক সভ্যতা, বাইজান্টাইন সম্রাজ্য এবং প্রায় ৪ শতাব্দীর অটোমান সম্রাজ্য। এই দেশ পশ্চিমা বিশ্বের জ্ঞান বিজ্ঞানের সূতিকাগার এবং গণতন্ত্রের জন্মদায়ক স্থান হিসেবে সুপরিচিত। গ্রীসের আরও কিছু বৃহৎ অবদান হচ্ছে পশ্চিমা দর্শন, অলিম্পিক গেম্‌স, পশ্চিমা সাহিত্য, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং নাটক। সব মিলিয়ে গ্রীসের সভ্যতা সমগ্র ইউরোপে এক সময়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী সভ্যতা হিসেবে পরিগণিত হত।

বর্তমানে গ্রীস একটি উন্নত দেশ এবং ১৯৮১ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য। এছাড়া এটি ২০০১ সন থেকে ইকোনমিক অ্যান্ড মনিটারি ইউনিয়ন অফ দ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ১৯৫১ সাল থেকে ন্যাটো এবং ১৯৬০ সাল থেকে ওইসিডি-এর সদস্য হিসেবে আছে।

গ্রীসের রাজধানী এথেন্স এবং দেশটির বৃহত্তম নগরী।গ্রীসের সরকারি ভাষা গ্রীক ভাষা। দেশটির জাতিগোষ্ঠী হিসাবে বসবাসকারী জনসংখ্যার মধ্যে শতকরা ৯৪ শতাংশ গ্রীক,শতকরা ৪ শতাংশ আলবেনিয়ান এবং বাকী ২ শতাংশ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর। দেশটিতে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত। ২৫ শে মার্চ গ্রীসের জাতীয় দিবস। ১৮২১ সালের ২৫ শে মার্চ তুর্কীর নেতৃত্বাধীন অটোমান সাম্রাজ্য থেকে গ্রীস স্বাধীনতা লাভ করে।

গ্রীসের মোট আয়তন ১,৩১,৯৯০ বর্গ কিলোমিটার।২০১৯ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশটির মোট জনসংখ্যা আনুমানিক ১ কোটি ৭২ লাখ। দেশটির বার্ষিক জিডিপি (পিপিপি) আনুমানিক $৩,১৮,০৮২ বিলিয়ন ডলার এবং মাথাপিছু জিডিপি বা বাৎসরিক আয় $২৮,৪৩৪ ডলার।

এজিয়ান সাগরের তীরে সুপ্রাচীন কালে ইউরোপের প্রথম উন্নত সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, বর্তমান আধুনিক ইউরোপকে এর ফসল বললে অত্যুক্তি হবে না। Minoan এবং Mycenean সভ্যতার উত্থানের ফলে গ্রিসের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বতন্ত্র জেলা এবং সরকার ও সমাজ কাঠামো বিশিষ্ট রাজ্যের সৃষ্টি হয়। এই রাজ্যগুলো স্পার্টা এবং এথেন্সের অধীনে একত্রিত হয়ে পার্সিয়ানদের অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করেছিল। এথেন্সে গ্রিসের প্রথম সমৃদ্ধ সভ্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হয় যার পরিণতি পেলোপোনেশীয় যুদ্ধ। এ সময় পার্সিয়ানদের হাতে স্পার্টার পতন হয়। এর পর মাত্র এক শতাব্দীর মধ্যে সকল গ্রীকরা আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের নেতৃত্বে একত্রিত হয়ে পার্সীয়দের প্রতিহত করে। ১৪৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এখানে রোমান সম্রাজ্যের সূচনা হয়।

রোমান যুগ সম্পাদনা:

রোমান যুগের সূচনায় হেলেনীয় সমাজ ও সংস্কৃতির কোন পরিবর্তন না হলেও এর ফলে আবশ্যিকভাবেই গ্রীস তার রাজনৈতিক স্বাধীনতা হারায়। খ্রিস্ট ধর্ম বিকাশের পূর্ব পর্যন্ত এখানে হেলেনীয় সংস্কৃতি টিকে ছিল। গ্রীস রোমের একটি প্রদেশে পরিণত হয় এবং তখনও গ্রীস প্রবল প্রতাপে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সংস্কৃতিকে প্রভাবান্বিত করে চলে। এরপর রোমান সাম্রাজ্য দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়; একভাগের নাম পূর্ব রোমান সম্রাজ্য যা গ্রীকদের সাম্রাজ্য নামে প্রতিষ্ঠা পায় এবং পরবর্তীকালে বাইজান্টাইন সম্রাজ্য নাম ধারণ করে। অন্য অংশ ছিল কনস্টান্টিনোপ্‌ল কেন্দ্রিক যার নাম ছিল বাইজান্টিয়াম। বাইজান্টাইন রাজত্বের সময় গ্রীক আগ্রাসী সকল শক্তির মধ্যে হেলেনীয় ভাবধারার প্রভাব সৃষ্টিতে সমর্থ হয় এবং এ সময়েই সিসিলি ও এশিয়া মাইনর থেকে অনেকে গ্রীসে বসতি স্থাপন করে।

একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীকে গ্রিসে বাইজান্টাইন শিল্পকলার স্বর্ণযুগ বলা হয়। তবে ১২০৪ থেকে ১৪৫৮ সালের মধ্যে সংঘটিত ক্রুসেডের সময় ধর্মের নামে প্রতিষ্ঠিত কিছু সেনাদল দ্বারা গ্রীস আক্রান্ত হয়। ১৪৫৩ সালের ২৯ মে তারিখে কনস্টান্টিনোপ্‌লের পতনের পূর্ব পর্যন্ত এখানে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত ছিল।

গ্রীসের ইতিহাস বলতে বোঝায় গ্রীক জাতি এবং অতীতে তাদের দ্বারা বিজিত অঞ্চল তথা বর্তমান গ্রীস রাষ্ট্রের ইতিহাস সংক্রান্ত অধ্যয়ন।গ্রীক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস; তাঁকে “ইতিহাসের জনক” ও “মিথ্যার জনক” বলে অভিহিত করা হয়। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে গ্রীস জাতি অধ্যুষিত ও শাসিত অঞ্চলের সীমারেখায় নানা পরিবর্তন এসেছে। এই কারণে গ্রীসের ইতিহাসেও বিভিন্ন প্রকার বহিরাগত উপাদান এসে মিশেছে। গ্রীসের ইতিহাসের প্রতিটি যুগের সুনির্দিষ্ট লিখিত বিবরণ বিদ্যমান।

প্রথম আদি গ্রিক উপজাতিটি মাইসেনিয়ান নামে পরিচিত। এরা খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের শেষ ভাগে এবং দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রথমার্ধে গ্রিসে মূল ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন করে। মাইসেনিয়ান উপজাতি যখন এই অঞ্চলে অনুপ্রবেশ করেছিল, তখন এখানে একাধিক অ-গ্রীকভাষী ও দেশীয় আদি-গ্রীক উপজাতিগুলি বাস করত। এরা খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম সহস্রাব্দ থেকে এই অঞ্চলে কৃষিকার্য করে আসছিল।

ভৌগোলিক বিস্তারের মধ্যগগনে গ্রীক সভ্যতা গ্রীস থেকে মিশর ও আফগানিস্তানের হিন্দুকুশ পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। এই সময় থেকেই গ্রীক সংখ্যালঘুরা পূর্বতন গ্রীক সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে (যেমন: তুরস্ক, ইতালি, ও লিবিয়া, লেভ্যান্ট ইত্যাদি অঞ্চলে) বসবাস করছেন। বর্তমানে সারা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রীক অভিনিবেশকারীদের সন্ধান পাওয়া যায়। বর্তমানে অধিকাংশ গ্রীকেরা ১৮২১ সালে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত গ্রীস দেশ ও সিরিয়ায় বসবাস করেন।

প্রাগৈতিহাসিক গ্রীস সম্পাদনা:

৭ খ্রীস্টপূর্ব সহস্রাব্দের দিকে গ্রিস এবং বলকানের মধ্য দিয়ে ইউরোপে নিওলিথিক যুগের সূচনা হয়। খ্রীস্টপূর্ব ২৮ শতকের দিকে ব্রোঞ্জ যুগের আগমনের মধ্য দিয়ে এ যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে।খ্রীস্ট পূর্ব ১৯ শতকে মাইসেনিয়ান নামের এক প্রোটো-ইন্দো ইউরোপীয় জাতি বর্তমান গ্রিক ভাষার সূচনা করে।

ব্রোঞ্জ যুগ সম্পাদনা, সাইক্লেডিক এবং মিনোয়ান সভ্যতা সম্পাদনা:

গ্রীসে আবির্ভূত হওয়া প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল ক্রিটি দ্বীপের মিনোয়ান সভ্যতা যেটা ২৭০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ থেকে ১৪৫০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত টিকে ছিল আর গ্রিক মূল ভুখন্ডের আদি হেলাডিক সভ্যতা যার স্থায়িত্বকাল ছিল ২৮০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ থেকে ২১০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত। মিনোয়ানদের সম্পর্কে খুব কম খবরই পাওয়া যায়, তারা ছিল প্রোটো-ইন্দো ইউরোপীয় জাতের মানুষ, লিনিয়ার-এ (Linear A) নামের এক দূর্বোধ্য ভাষায় লেখতো যার অর্থ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তারা মূলত সামুদ্রিক বাণিজ্যে নিয়োজিত ছিল, নিজেদের দ্বীপের উর্বর প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার করে উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন, রপ্তানি দ্রব্যের মধ্যে মূলত ছিল কাঠ। রপ্তানি হত মূলত সাইপ্রাস সিরিয়া মিশর এবং এজিয়ান সাগরের দ্বীপগুলোতে।

মাইসেনিয়ানরা ক্রিটি অধিকার করার পর ক্রিটির সংস্কৃতি নিজেদের মধ্যে আত্মস্ত করে নেয়।মাইসেনিয়ানরা এজিয়ান সাগরে আসতে শুরু করে ১৬০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দের দিকে, ১৪০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে তারা মিনোয়ান সভ্যতার কেন্দ্র ক্রিটি দখল করে নেয়। আদি গ্রীক ভাষা লেখার জন্য তারা ক্রিটির লিনিয়ার এ ভাষা ব্যবহার করতো পরে নিজেদের লিনিয়ার বি (Linear B) ভাষার প্রচলন করে। মাইসেনিয়ানরা এসেছে মাইসেনিয়া নামক অঞ্চল থেকে, অন্যান্য মাইসেনিয়ান অঞ্চল হল এথেন্স, পিলস, থীব, টিরান ইত্যাদী।

মাইসেনিয়ানরা ছিল যোদ্ধা, তাদের কবরে মৃতদেহের সাথে যুদ্ধের সরঞ্জাম সমাহিত করার প্রমাণ পাওয়া যায়। ১১০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে মাইসেনিয়ান সভ্যতা ধংস প্রাপ্ত হয়। কোন কোন গবেষক এর জন্য ডোরিয়ান নামের আরেকটি গোষ্টীর আক্রমণ করাকে দায়ী করে থাকে কিন্তু তার কোন উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মাইসেনিয়ান সভ্যতার পতনের পর গ্রীক একটা সাময়িক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করে। এসময় গ্রীসের জনসংখ্যা এবং শিক্ষার হার আশঙ্খা জনক ভাবে হ্রুাস পায়।

আদি লৌহযুগ সম্পাদনা:

গ্রীসে অন্ধকার যুগের সূচনা হয়েছিল খ্রীস্টপূর্বাব্দে, মাইসেনিয়ান সভ্যতার পতনের মধ্য দিয়ে। অনেকে এর জন্য ডোরিয়ানদের আক্রমনকে দায়ী করেন। ডোরিয়ান দের সাথে ছিল লোহা নির্মিত শক্তিশালী অস্ত্র, যা দিয়ে দূর্বল মাইসেনিয়ান সভ্যতাকে সহজে পরাস্ত করা সম্ভব হয়েছিল। এ অন্ধকার যুগ টিকে ছিল ৮০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দে গ্রীকে নগর রাস্ট্র উদ্ভবের আগ পর্যন্ত, কিংবা হোমারের আগ পর্যন্ত। অন্ধকার যুগে রাজারা খুব দূর্বল ভাবে টিকে ছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত অভিজাত তন্ত্রের কাছে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন, এবং শেষে শেষে অভিজাততন্ত্রের ভেতরে আরো অভিজাত তৈরি হয়।

এ যুগে সুলভ এবং সস্তা হওয়ার কারণে তৈজসপত্র এবং যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে ব্রোঞ্জের বদলে লোহার ব্যবহার শুরু হয়। সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে কিছুটা অর্থনৈতিক সমতা আসে, ফলে রাজাদের সিংহাসনচূত করে পরিবারগুলো সিংহাসনে আরোহণ করতে শুরু করে। অন্ধকার যুগের শেষে গ্রীক নবজাগরণের সূচনা হয় যা কৃঞ্চ সাগর এবং স্পেন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, ফোনেশিয়ানদের কাছ থেকে লেখার কৌশল পুনরায় আয়ত্ত্বে আসে যা উত্তরে ইতালি এবং গাউল পর্যস্ত ছড়িয়ে পড়ে।

খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতকে এ্যাক্রোপালিসের উঁচু ভূমিতে প্রাচীন এথেন্স শহর গড়ে ওঠে। তারপর হাজার বছরের পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র ছিল এই ঐতিহাসিক এথেন্স শহর। কে না জানে, ১৮৯৬ সালে আধুনিক অলিম্পিকের আসর প্রথম বসেছিল এই এথেন্সেই।  সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল ও হোমারের মত জগৎবিখ্যাত দার্শনিকদের জন্ম এই গ্রীসে।

গ্রীসের ল্যাটিন নাম গ্রেইসিয়া। ইতালীতে গ্রানট নামের এক উপজাতি বসতি স্থাপন করেছিল। তারাই পরবর্তীকালে এদেশে এসে বসবাস শুরু করে। তাদের নাম থেকেই গ্রীস নামটির উৎপত্তি। গ্রীসের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সকলকে মুগ্ধ করে। গ্রীসে চারদিকে সবুজের সমারোহ, প্রচুর ফলের বাগান যেমন কমলা, আপেল ইত্যাদিতে ভরপুর। পর্যটন খাত তাই এই দেশটির অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

গ্রীসের কোরিনথস শহরে যেখানে প্রাচীন হেলেনিক সভ্যতার নির্দশন রয়েছে। সেখানে রয়েছে অনেক উঁচু উঁচু পাহাড়। দেখলেই মন ভরে যায়। পাহাড় বেয়ে আঁকাবাঁকা পথে গাড়ী উঠে যায়। গাড়ীর ভেতর বসে থাকলেও মনে হয় নিজেই পর্বত আরোহী হয়ে উঠছি আকাশে ভেসে বেড়ানো মেঘ ধরতে। এথেন্স থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে কোরিনথস যেতে যেতে পথের দুধারে উঁচু পাহাড় আর সবুজের সমারোহে যে কেহ হারিয়ে যেতে বাধ্য হবে প্রকৃতির মাঝে।

গ্রীসের বিখ্যাত কোরিনথস খাল দেখতে আসে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক।কথিত আছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে হিটলারের সৈন্যরা পথ সহজ করার জন্য এই খালটি খনন করেছিল। আগে এক দ্বীপ থেকে অন্যদ্বীপে যেতে অনেক ঘুরে আসতে হতো। কিন্তু এই খালটির কারণে এখন আর ঘুর পথে যেতে হয় না।তাই এই খাল দেখতে হাজার হাজার পর্যটক ভিড় করে।

যতটা না ঐতিহাসিক কারণে পর্যটকরা ভিড় করে, তারচেয়ে বেশি করে এর অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে। স্বচ্ছ নীলাভ পানির দিকে তাকিয়ে থাকলে যে কারও বিষন্ন মন প্রসন্ন হয়ে উঠবে। পানিতে সূর্যের আলোর খেলা দেখতে দেখতে সময় যে কেমনভাবে কেটে যাবে, টেরও পাওয়া যায় না। কোরিনথস শহর ছাড়াও  রয়েছে আরও অসংখ্য সুন্দর সুন্দর প্রাকৃতিক দ্বীপ।

গ্রীস দ্বীপের দেশ, অসংখ্য দ্বীপ রয়েছে এখানে। অনেকে বলে থাকেন প্রকৃতি তার সবটুকু ঢেলে সাজিয়েছে কয়েকট দ্বীপকে। ক্রিট, সান্তোরিনা, সিকোনাস এই তিনটি দ্বীপে সব সময়ই ভিড় করেন পর্যটকরা।

প্রাকৃতিক শোভার জন্য গ্রীস বিখ্যাত। তবে বেশি বিখ্যাত দেশটির অতীত ইতিহাসের জন্য। বিশেষ করে এ্যাক্রোপলিস দুর্গ তার মধ্যে অন্যতম। বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠেছে এই প্রাকৃতিক এ্যাক্রোপলিস দুর্গ। সুউচ্চ পাহাড়ের একটি স্তর পর্যন্ত গাড়িতে ওঠা যায়। তারপর আরও ওপরে উঠতে হলে টিকিট কাটতে হয়। বিশেষ করে এ্যাক্রোপলিসের সর্বোচ্চ চূড়ায় উঠতে হলে টিকিট কাটতে হয়।  সারা পৃথিবীর হাজার হাজার পর্যটক এই এ্যাক্রোপলিস দেখার জন্য ভিড় করে থাকে।

গ্রীস চমৎকার, অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এক দেশ। একের পর এক জলপাই ও ডুমুরের বাগান, নীল আকাশ ও নীল স্বচ্ছ সমুদ্রের জল আর সমুদ্রের জাহাজ ও পালতোলা নৌকা সৌন্দর্যকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। সেই সঙ্গে আছে প্রাচীন মন্দির, প্রাসাদ ও দুর্গের ধ্বংসাবশেষ । সর্বোপরি গ্রীসের সহৃদ সাধারণ মানুষ বিদেশী পর্যটকদের মুগ্ধ করে। গ্রীস যেমন সুন্দর, তেমনি গ্রিকরাও দেখতে খুব সুন্দর। কথাবার্তা, চালচলনে বেশ সপ্রতিভ। কথাবার্তায় যেমন স্বাধীনচেতা এবং অনেকটা দার্শনিক ভাব। অন্যদিকে তারা বেশ ফুর্তিবাজ। এ্যাক্রোপলিস এলাকা সব সময় যেন বেশ আনন্দ জোয়ারে ভাসছে।

কবির আহমেদ, লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »