ভোলার চরফ্যাসনের কৃষিক্ষেত্রে সবজিবিপ্লব শুরু হয়েছে

শহিদুল ইসলাম জামাল, চরফ্যাসন ( ভোলা): কয়েক বছর ধানের বাজার মূল্য কম থাকায় কৃষকরা সবজি চাষে ঝুঁকেছে। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, বীজ ও সারের যোগান এবং কৃষি অফিসের নিবিড় পর্যবেক্ষণ জোরদার থাকায় এখানে সবজি চাষ যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি কৃষকরা ও উৎপাদিত সবজির কাঙ্খিত মূল্য পাচ্ছেন। সব কিছু অনুকূলে থাকায় অধিক বৃষ্টি ও জোয়ার প্রবণ চরফ্যাসনের কৃষিক্ষেত্রে সর্জান (কেইল/ আইল) পদ্ধতিতে সবজি বিপ্লবের যুগ শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় কৃষিবিদরা।

স্থানীয়রা জানান, চরফ্যাসন উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য উৎপাদন এলাকা। এখানে গত মৌসুমে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৮২০ মে.টন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছে। যা স্থানীয় চাহিদার অতিরিক্ত ১ লাখ ৮২ হাজার ৬০৭ মে.টন। কিন্তু গত কয়েক মৌসুম ধরে ধানের কাঙ্খিত বাজার মূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা সবজি চাষে ঝুঁকেছে।স্থানীয় কৃষি অফিস সবজি চাষে নতুন কৌশলের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও বীজ-সারের যোগান দিয়ে কৃষকদের এই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে চরফ্যাসনের কৃষিক্ষেত্রে নতুনমাত্রা সৃষ্টি করেছে। যা এখন সবজি বিপ্লব হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

চরফ্যাসনের চর মাদ্রাজ, আছলামপুর, হাজারীগঞ্জসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের গ্রামীন সড়ক ধরে চলতে চলতে সড়কের দু’পাশ জুড়ে সবুজ সবজির মাঠ চোখে পড়ছে। প্রতিদিন সকাল- বিকেলে কৃষকের খামার থেকে বোঝাঁই ছোট -বড় ট্রাকগুলো উপজেলা সদরের আড়তের পথে ছুটে যেতে দেখা যাচ্ছে। আড়ত থেকে আরো বড় বড় ট্রাক বোঝাঁই হয়ে সবজিগুলো ছুটছে ঢাকা,কুমিল্লা,ফেনী ও চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানাযায়, এ বছর চরফ্যাসনে সর্জান(কেইল/আইল) পদ্ধতিতে ৬ হাজার হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত সবজি বিভিন্ন শহরে যাচ্ছে। গ্রীষ্ম,বর্ষা ও শীত এই তিন মৌসুমে একই জমিতে ধারাবাহিক ভাবে মৌসুমি সবজি চাষ করছেন দক্ষ কৃষকরা। যা থেকে কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের বিষযুক্ত সবজির চাহিদার যোগান দিছেন।

মাদ্রাজ ইউনিয়নের মিয়াজানপুর গ্রামের কৃষক তরিকুল ইসলাম জানান, তার মিয়াজানপুর গ্রামে অন্তত ২ শ একর জমিতে সর্জান পদ্ধতিতে সবজি চাষ হচ্ছে। কয়েক বছর কৃষকরা ধানের চাষ কমিয়ে সবজি চাষে মনোযোগী হয়েছে।কৃষি অফিস থেকে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সার বীজ দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে। এই কৃষক জানান, সরকারি ভাবে সবজি চাষের উপর বিকল্প ঋণের ব্যবস্থা করা হলে সবজি চাষে কৃষকরা আরো সম্পৃক্ত হতে পারতো।

আছলামপুরের আবুগঞ্জ গ্রামের সবজিচাষী আবু তাহের ও হেলাল উদ্দিন জানান, এনজিও ঋণ এবং আড়ত থেকে নেয়া দাদনের টাকায় সবজি চাষ করছেন। উপজেলা কৃষি অফিস সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ এবং পরামর্শ দিলে ও বেশী পরিমানে সবজি চাষে আর্থিক কোন সার্পোট দিতে পারছেনা। উপজেলা কৃষি অফিসের উদ্ভিদ, সংরক্ষণ কর্মকর্তা ছানাউল্যাহ আজম জানান, ২০১৫ সন থেকে স্থানীয় সবজি চাষীদের সর্জান( কেইল/আইল) পদ্ধতিতে বিষমুক্ত সবজি চাষে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।মাঠ পর্যায়ে প্রদর্শনী খামার তৈরী করে নিয়মিত দেখভাল করা হচ্ছে। বিষমুক্ত সবজি চাষে অধিক উৎপাদন এবং কাঙ্খিত মূল্য পাওয়ায় কৃষকরা বিষমুক্ত সবজি চাষে উৎসাহি হয়ে উঠেছে। ফলে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে এখানে সবজির আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে।কেইল বা আইল পদ্ধতি কৃষকদের আবাদ করা সবজিকে অধিক বৃষ্টি কিংবা জোয়ারের থাবা থেকে সুরক্ষা দিচ্ছে।

উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ঠাকুর কৃষ্ণ বলেন, কয়েক বছর আগে ও শহর থেকে ট্রাক বোঝাই করে এখানে শাক- সবজি আনা হতো। স্থানীয় বাজারে তা চড়ামূল্যে বিক্রি হতো। এখন দূশ্যপট বদলে গেছে। এখন এখান থেকে সারি সারি পণ্যবাহী ট্রাক প্রতিদিন সবজি নিয়ে ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও ফেনীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে ছুটছে। স্থানীয় ভাবে অধিক সবজি উৎপাদনের কারণে স্থানীয়রা কমদামে বিষমুক্ত সবজি পাচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকরা অতিরিক্ত সবজি শহরে পাঠিয়ে ন্যায্য দাম পাচ্ছে। উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাওয়ায় কৃষকরা অধিক উৎসাহে সবজি চাষে মনোযোগী হয়েছে। যা এখানকার কৃষিক্ষেত্রে নবযুগের সূচনা করেছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষিবিদ আবু হাছনাইন জানান, অধিক বৃষ্টি ও জোয়ারের প্রবণ এই অঞ্চলে সর্জান (কেইল/আইল) পদ্ধতিতে সবজি চাষে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের দক্ষ করে গড়ে তোলা হয়েছে। সরকার এই পদ্ধতিতে সবজি চাষে কৃষকদের বীজ সারসহ কৃষি উপকরণ প্রদান এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অধিক সবজি উৎপাদনে সহায়তা নিশ্চিত করেছে। উৎপাদিত সবজি স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে শহরমূখী বাজারগুলোতে সরবরাহ সুগম করা হয়েছে। ফলে কাঙ্খিতমূল্য পাচ্ছেন কৃষক। যা কৃষকদের সর্জান (কেইল /আইল) পদ্ধতিতে বিষমুক্ত সবজি উৎপাদনে আগ্রহী করে তুলেছে।

ভোলা/ ইবিটাইমস/এম আর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »