মধ্য ইউরোপের দেশ অষ্ট্রিয়া

অস্ট্রিয়া একটি গনপ্রজাতান্ত্রিক দেশ এবং ইইউর সদস্য রাষ্ট্র

ইউরোপ ডেস্কঃ মধ্য ইউরোপের স্থলবেষ্টিত এই দেশের প্রতিবেশী দেশ মোট ৮ টি। উত্তরে জার্মানি ও চেক প্রজাতন্ত্র, পূর্বে স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি, দক্ষিণে স্লোভেনিয়া ও ইতালি, এবং পশ্চিমে সুইজারল্যান্ড ও আল্পস পর্বতমালার উপরের ছোট্ট দেশ লিকটেন্‌ষ্টাইন। অস্ট্রিয়া মূলত আল্পস পর্বতমালার উপরেই অবস্থিত একটি শীত প্রধান দেশ। দেশটির তিন-চতুর্থাংশ এলাকাই পর্বতময়।

অস্ট্রিয়ার মোট আয়তন ৮৩,৮৫৫ বর্গ কিলোমিটার (৩২,৩৭৭ বর্গ মাইল)।ভিয়েনা বর্তমানে অস্ট্রিয়ার বৃহত্তম শহর ও রাজধানী।

অস্ট্রিয়ার রাষ্ট্রীয় ভাষা জার্মান তবে এখানে মূল জার্মান ভাষার একটি পরিবর্তিত রূপ ব্যবহৃত হয়। এর নাম অস্ট্রীয় জার্মান। জার্মান ভাষায় এর নাম Schönbrunner Deutsch (শ্যোনব্রুনার ডয়েচ অর্থাৎ রাজকীয় প্রাসাদের জার্মান)। অস্ট্রীয় জার্মান বর্তমান আদর্শ জার্মান ভাষা থেকে বেশ কিছু দিকে থেকে আলাদা। কিছু কিছু ক্ষেত্রে যে সমস্ত স্বরধ্বনি আদর্শ জার্মান ভাষায় উচ্চারিত হয়, অস্ট্রীয় জার্মান ভাষায় সেগুলি উচ্চারিত হয় না; কিংবা সামান্য ভিন্নভাবে উচ্চারিত হয়। অস্ট্রীয় জার্মান ভাষায় নিজস্ব প্রত্যয়েরও (Suffix) ব্যবহার আছে। এছাড়া বলা হয়ে থাকে যে অস্ট্রীয় জার্মান খানিকটা নাসিক্য স্বরে (Nasalized) বলা হয়ে থাকে।

অস্ট্রীয় জার্মান ভাষার উপভাষাগুলিকে আলেমানীয় উপভাষা ও দক্ষিণ বাভারীয় উপভাষা – এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়। আলেমানীয় উপভাষা দেশটির পূর্ব এক-তৃতীয়াংশে প্রচলিত (ফোরার্লবের্গ প্রদেশে)। আর দক্ষিণ বাভারীয় উপভাষাগুলি দেশের বাকি অংশে ব্যবহৃত। আলেমানীয় উপভাষাগুলি সুইজারল্যান্ডের জার্মান ও দক্ষিণ-পূর্ব জার্মানির ভাষাগুলির সাথে তুলনীয়। আর দক্ষিণ বাভারীয় উপভাষাগুলি জার্মানির বাভারিয়ার বা বায়ার্নের ভাষাগুলির সাথে তুলনীয়।

এছাড়াও অস্ট্রিয়ায় অনেকগুলি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিজস্ব ভাষায় কথা বলে থাকে। এগুলির মধ্যে অন্যতম হল ক্রোয়েশীয়, স্লোভেনীয়, হাঙ্গেরীয়, চেক, স্লোভাক এবং জিপসি ভাষাসমূহ।

২০২১ সালের নতুন আদমশুমারী অনুযায়ী দেশটির বর্তমান জনসংখ্যা ৮৯ লাখ ৩২ হাজার ৬৬৪ জন। অস্ট্রিয়া একটি খ্রিস্টান প্রধান দেশ। তবে অন্যান্য ধর্ম পালনের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া আছে।

অস্ট্রিয়া একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখানে ৯টি ফেডারেল রাজ্য রয়েছে। এটি ইউরোপের ৬টি রাষ্ট্রের অন্যতম যারা স্থায়ীভাবে নিরপেক্ষতা ঘোষণা করেছে।

আর এই নিরপেক্ষতার ফলে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সদর দফতর প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম অস্ট্রিয়ায় জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি কমিশনের (IAEA) সদর দপ্তর অবস্থিত। তাছাড়াও বিশ্বের তেল উৎপাদনকারী দেশ সমূহের সংস্থা ওপেকের (OPEC) সদর দপ্তরও ভিয়েনায়  অবস্থিত। অস্ট্রিয়া ১৯৫৫ সাল থেকে জাতিসংঘের এবং ১৯৯৫ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য।

অস্ট্রিয়া অতীতে হাবসবুর্গ রাজাদের অধীনস্থ একটি বিস্তৃত শক্তিশালী সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল। ভিয়েনা ছিল সেই সাম্রাজ্যের রাজকীয় রাজধানী। ভিয়েনা এখনও বিশ্বের অন্যতম প্রধান শহর হিসেবে আদৃত। এর রাজকীয় রূপ, অসাধারণ বারোক স্থাপত্য, সঙ্গীত ও নাট্যকলা জগদ্বিখ্যাত।

অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সম্রাজ্য (অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি নামেও পরিচিত) বলতে একটি দ্বৈত রাজত্ব বা দ্বৈত রাষ্ট্রকে বোঝায়। ১৮৬৭ থেকে ১৯১৮ সাথ তথা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি পর্যন্ত মধ্য ইউরোপে একটি সম্মিলিত রাজত্ব হিসেবে এই দ্বৈত রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল। ১৮০৪ থেকে ১৮৬৭ পর্যন্ত কেবল অস্ট্রীয় সম্রাজ্য নামে একটি রাজত্ব ছিল। ১৮৬৭ সালে সেখানকার ক্ষমতাসীন হাসবুর্গ রাজবংশ এবং হাঙ্গেরীয় নেতৃত্বের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়। এই সমঝোতার ফলেই “অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সম্রাজ্যের” আবির্ভাব ঘটেছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) শেষে অস্ট্রিয়ার অধীনস্থ বহুজাতিক সাম্রাজ্যটি (অস্ট্রিয়া- হাঙ্গেরী) ভেঙে যায় এবং তার স্থানে একাধিক জাতিরাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। অস্ট্রিয়া নিজে একটি ক্ষুদ্র স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। নতুন রাষ্ট্রগুলি বাণিজ্য বাধার সৃষ্টি করলে অস্ট্রিয়া তার প্রাক্তন বৈদেশিক বাজার এবং জ্বালানির উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দেশটির অর্থনীতি বৈদেশিক সাহায্যের পর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অস্ট্রিয়াতে রক্ষণশীল শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ১৯৩০-এর দশকের অর্থনৈতিক মন্দা দেশটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দেয়। যে সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি ভিয়েনাকে সামাজিক গণতন্ত্রের মডেল হিসেবে গড়ে তুলেছিল, ১৯৩৪ সালে তাদের পতন ঘটে এবং ডানপন্থী স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানি অস্ট্রিয়াকে নিজেদের সাথে সংযুক্ত করে নেয়।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) সময় অস্ট্রিয়ার অধিকাংশ ইহুদী নাগরিককে হয় হত্যা করা হয় অথবা নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়। সিন্তি, জিপসি, সমকামী এবং অন্যান্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্ব্বীদেরও একই পরিণাম ঘটে। ১৯৩৮ সালের আগে অস্ট্রিয়াতে ২ লক্ষ ইহুদী বাস করত। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে এদের অর্ধেকের বেশি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। জার্মানরা ইহুদীদের ব্যবসা ও দোকানপাটে লুটতরাজ চালায়। প্রায় ৩৫ হাজার ইহুদীকে পূর্ব ইউরোপে গেটো বা বস্তিতে পাঠানো হয়। প্রায় ৬৭ হাজার ইহুদীকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়; যুদ্ধশেষে এদের মাত্র ২ হাজার বেঁচে ছিল।

১৯৪৫ সালে জার্মানির পরাজয়ের পর মিত্র শক্তিরা (যুক্তরাষ্ট্র,বৃটেন,ফ্রান্স ও সোভিয়েত রাশিয়া) অস্ট্রিয়াকে চারভাগে ভাগ করে নিয়ে দশ বছর দখল করে রাখে। ১৯৫৫ সালের ২৫শে অক্টোবর নাগাদ এরা সবাই অস্ট্রিয়া ত্যাগ করে এবং অস্ট্রিয়া পূর্ণ স্বাধীনতা পায়।

অস্ট্রিয়ার রাজনীতির ভিত্তি একটি কেন্দ্রীয় সংসদীয় প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রী প্রজাতন্ত্র ব্যবস্থা, যেখানে চ্যান্সেলর হলেন সরকারপ্রধান। এটি একটি বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা। সরকার নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী। আইন প্রণয়ন ক্ষমতা দ্বি-কাক্ষিক সংসদ (জাতীয় কাউন্সিল ও কেন্দ্রীয় কাউন্সিল) ও সরকার, উভয়ের হাতে ন্যস্ত। ১৯৪৯ সাল থেকে রক্ষণশীল দল Austrian People’s party(ÖVP) ও সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল Social Democratic Party of Austria (SPÖ) দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রাধান্য বিস্তার করে আসছে।

বাংলাদেশীরা ১৯৭০ এর দশক থেকে অস্ট্রিয়ায় আশা শুরু করেন। সবচেয়ে বেশী আসা শুরু হয় ৮০ দশকের শেষ এবং ৯০ এর দশকের শুরু থেকে। সে সময় অধিকাংশ বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতরা স্টুডেন্ট ভিসা এবং ট্যুরিস্ট ভিসায় আসেন। ১৯৯৩ সালের জুলাই মাসের পর অস্ট্রিয়ান সরকার ভিসা স্ট্যাটাস পরিবর্তন বন্ধ করে দেন। অর্থাৎ যে ব্যক্তি অস্ট্রিয়ায় যে ভিসায় আসবেন তাকে সে ভিসা এক্সটেনশন করেই থাকতে হবে। ১৯৯৩ সালের সেই নিয়মের পূর্বে যারা এসেছিলেন তারা তাদের ভিসা স্ট্যাটাস পরিবর্তন করে সহজেই কাজের ভিসায় প্রবেশ করেছিলেন।

অস্ট্রিয়ার নিয়ম অনুযায়ী যারা বৈধ ভিসা নিয়ে ১০ বৎসর অস্ট্রিয়ায় কোন বড় ধরনের অপরাধ ছাড়া বসবাস করে আসছেন এবং নিয়মিত আয়কর পরিশোধ করেছেন তারা আবেদনের পর অস্ট্রিয়ার নাগরিকত্ব পেয়েছেন। অস্ট্রিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়ার পর অনেক বাংলাদেশী পরিবার বৃটেনে চলে যান। অবশ্য বৃটেন ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর এখন সে দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশিরা অষ্ট্রিয়ার মূলধারার রাজনীতিতে নাই বললেই চলে । আশার কথা হল, ইতিমধ্যে নুতন প্রজন্মের একমাত্র বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মাহমুদুর  রহমান (নয়ন) অষ্ট্রিয়ার মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করে অস্ট্রিয়ান পিপলস পার্টীতে । ইতিমধ্যে উনি ভিয়েনা সিটি কর্পোরেশনের ২৩ নং ডিসট্রিক্ট এর কাউন্সিলর নির্বাচিত হয় । মাহমুদুর  রহমান (নয়ন) নির্বাচিত হয়ে অষ্ট্রিয়ায় নুতন ইতিহাস সৃষ্টি করলেন ।

বর্তমানে অস্ট্রিয়ায় প্রায় ৫,০০০ হাজার বাংলাদেশী বসবাস করছেন। অস্ট্রিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদারকরণের লক্ষ্যে স্থায়ী মিশন হিসেবে ২০১৪ সালে ভিয়েনায় নতুন দূতাবাস চালু করা হয়। অস্ট্রিয়ার পার্শ্ববর্তী তিন দেশ হাঙ্গেরি-স্লোভাকিয়া-স্লোভেনিয়ার সঙ্গেও কাজ করছে দূতাবাসটি।

জানা গেছে- অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া ও স্লোভেনিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা ৮ হাজারের কাছাকাছি। ভিয়েনার বাংলাদেশ দূতাবাস বর্তমানে এ অঞ্চলে বসবাস করা প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে আশা ও ভরসার জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

ভিয়েনায় বসবাসরত অল ইউরোপিয়ান বাংলা প্রেস ক্লাব AEBAPC এর উপদেষ্টা মাহবুবুর রহমান কে  দূতাবাস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ২০১৪ সালে আবু জাফর ভিয়েনার বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি ও স্লোভেনিয়াতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ সংক্ষরণে তিনি বিশেষভাবে কাজ করেছেন। বর্তমানে মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত ভিয়েনার বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিও প্রবাসীদের বিষয়ে যথেষ্ট আন্তরিক।

মাহবুবুর রহমান আরও বলেন , দূতাবাসের ডেপুটি চিফ অব মিশন রাহাত-বিন-জামান এবং প্রথম সচিব ও দূতালয় প্রধান তারাজুল ইসলামের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ না করলে অকৃতজ্ঞ হয়ে যাবো । আমি ব্যাক্তিগত বা অন্য প্রবাসীদের জন্য যে কোনো সমস্যা নিয়ে যখন ওনাদের কাছে গিয়েছি তারা আমাকে সম্ভাব্য সকল দিক থেকে আন্তরিভাবে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেছেন।

এছাড়াও বেশ কয়েকজন প্রবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দূতাবাসের পরিষেবার ওপর তারা সন্তুষ্ট এবং তারা মনে করেন যে কোনো প্রয়োজনে দূতাবাসকে যথার্থভাবে পাশে পেয়েছেন।

কবির আহমেদ /ইবি টাইমস

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »