সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার ঘোষক

মুক্তিযুদ্ধ,স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু নিয়ে ড. মোঃ ফজলুর রহমানের ধারাবাহিক মতামত।এটি লেখকের নিজস্ব মতামত।এর সাথে ইউরো বাংলা টাইমসের সম্পাদকীয় নীতিমালা সম্পর্ক নেই  

পর্ব-২ 

(১০) একথা আজ সবাই মানেন এবং বিশ্বাস করেন যে, বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ঘোষিত ছয় দফা এবং পরবর্তীকালে তাঁরই ৭ই মার্চের কালজয়ী ভাষণ প্রকৃত প্রস্তাবে বাঙালির মুক্তির সনদ। স্বীকৃত মতেই এই ভাষণ আমাদের স্বাধীনতার ম্যাগনা কার্টা। এই ভাষণ ছিল অত্যন্ত সাবলীল, সহজে বোধগম্য, ছেদহীন, নির্মেদ এবং অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী। এই ভাষণের বজ্রকণ্ঠ বিশাল জনসমুদ্রে কখনো উত্তাল ঢেউয়ের সৃষ্টি করেছে আবার কখনোবা উজ্জীবিত জনসমুদ্রকে অবিশ্বাস্যভাবে পিনপতন নিরবতায় নিমগ্ন করেছে। এই ভাষণের মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালি জাতি সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত হওয়ার দুরন্ত সাহস এবং অফুরন্ত অনুপ্রেরণা পেয়েছে। এরই পাশাপাশি এই ভাষণ বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে স্বাধীনতার অগ্নিমন্ত্রে উজ্জীবিত করে একই মোহনায় এনে দাঁড়া করিয়েছে। তাই এই ভাষণ পৃথিবীর ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত বিভিন্ন প্রথিতযশা রাষ্ট্র নায়কদের তেজস্বী ভাষণগুলির মধ্যে সর্ব শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে বিশ্ব সভায় বর্তমানে বিবেচিত হচ্ছে।

(১১)৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা না দেয়ায়, শুধুমাত্র তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করার অসৎ উদ্দেশ্যে অনেকেই বুঝে কিংবা না বুঝে তাঁকে দোষারোপ করেন। কিন্তু তারা একটি বারও বুঝতে চাননা যে, ঐদিন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ভঙ্গ করার অপরাধে তাঁকে একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা আখ্যায়িত করে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করা হতো। আর এহেন অপরাধে পাক বাহিনী ঐদিন থেকে প্রকাশ্য ভাবেই বিদ্রোহ দমন করার নামে বাঙালির উপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তো। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও তাদের পক্ষেই যেত। ন্যূনতম সাধারণ জ্ঞান সম্পন্ন কোন নেতা কিংবা নেত্রী অথবা রাষ্ট্রনায়ক এহেন অর্বাচীনের মতো কাজ করতে পারেন না। অত্যন্ত দূরদর্শী, বিদগ্ধ এবং পোড় খাওয়া রাজনীতিক বঙ্গবন্ধু ও তা করেননি। আর তা না করে বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।

(১২)বঙ্গবন্ধু কেন এবং কি কারণে ৭ই মার্চ সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি – এতদসংক্রান্ত ব্যাপারে বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট NW টিভির পক্ষে বিগত ১৯৭২ সনের ১৮ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন। উক্ত সাক্ষাতকারে বঙ্গবন্ধু বলেন – “বিশেষ করে ঐ দিনটিতে (৭ই মার্চ) আমি এটা করতে চাইনি। কেননা বিশ্বকে তাদের (পাকিস্তানীদের) আমি এটা বলার সুযোগ দিতে চাইনি যে, বঙ্গবন্ধু মুজিব দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। তাই তাদেরকে আঘাত হানা ছাড়া আমাদের আর কোন বিকল্প ছিল না। আমি চেয়েছিলাম, তারাই আগে আঘাত হানুক এবং আমার দেশের জনগণ তা প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তুত ছিল।” পরবর্তীকালের ঘটনাবলী সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে যে, ৭ই মার্চ সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা না করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সঠিক কাজটিই করেছেন।

(১৩)প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, বঙ্গবন্ধুর পূর্বে আরও অনেক বিখ্যাত এবং প্রাতঃস্মরণীয় মনীষী গণ তাঁদের নিজ নিজ দেশ ও জাতির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, গ্রেট বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এবং আমেরিকার বর্ণবাদ বিরোধী কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিং অন্যতম। তবে স্বীকৃত মতেই বঙ্গবন্ধুর সাথে তাদের পার্থক্য হলো উপরোক্ত কোন একজন নেতার সুবিখ্যাত কোন একটি ভাষণই অলিখিত কিংবা স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। বরং তা ছিল সুলিখিত, সুপরিকল্পিত এবং দীর্ঘদিনের গবেষণালব্ধ। পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল পুরোপুরিভাবে অলিখিত এবং স্বতঃস্ফূর্ত (Spontaneous)।

(১৪)প্রসঙ্গত আরও উল্লেখ্য যে, প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন কর্তৃক গেটিসবার্গে প্রদত্ত লিখিত ভাষণটির স্থায়িত্বকাল ছিল মাত্র ৩ (তিন) মিনিটের ও কম এবং এই ভাষণের শব্দ সংখ্যা ছিল ২৭২। উইনস্টন চার্চিলের গবেষণালব্ধ লিখিত ভাষণটির ও স্থায়িত্বকাল ছিল মাত্র ৭ (সাত) মিনিট। এছাড়া কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন বর্ণবাদ বিরোধী নেতা মার্টিন লুথার কিং এর ভাষণটির স্থায়িত্বকাল ছিল ১৭ (সতের) মিনিট। এবং শব্দ সংখ্যা ছিল ১৬৬৭। পক্ষান্তরে স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত সংগ্রাম মুখর ১০ (দশ) লক্ষাধিক বিশাল জনসমাবেশের সামনে দাঁড়িয়ে অকুতোভয় বঙ্গবন্ধুর অলিখিত এবং স্বতঃস্ফূর্ত ভাষণটির স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় ১৯ (ঊনিশ) মিনিট। এই ভাষণের শব্দ সংখ্যা ছিল ১৩০৮। স্বীকৃত মতেই এটি ছিল Ex tempo (পূর্ব প্রস্তুতি বিহীন) ভাষণ। তাই এই ভাষণ উপরোক্ত মহান নেতাদের তুলনায় যে কোন বিবেচনায়ই অনবদ্য এবং অনন্য উচ্চতায় অভিষিক্ত বটে।

(১৫)৭ই মার্চের ভাষণ সম্পর্কে লন্ডনের বিখ্যাত টাইমস্‌ ম্যাগাজিন উক্ত ভাষণের পর পরই মন্তব্য করেছে- শেখ মুজিব ৭ই মার্চের ভাষণের মাধ্যমে আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। এই ভাষণে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল ছিল বলেও উক্ত মন্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। উপরোক্ত একই ভাষণ সম্পর্কে রয়টার্স তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন- বিশ্বের ইতিহাসে এরকম আর একটি ও পরিকল্পিত এবং সুবিন্যস্ত ভাষণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। যেখানে একই সঙ্গে বিপ্লবের রূপরেখা দেয়া হয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে দেশ পরিচালনার দিক নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।

(১৬)দেশবাসী সবাই জানেন, মানেন এবং স্বীকার ও করেন যে, একাত্তরে বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালি জাতির অবিনশ্বর প্রতীক এবং একটি প্রদীপ্ত চেতনা। তাই ৭ই মার্চের তাঁর উপরোক্ত মহাকাব্যিক ভাষণটি বাঙালির মুক্তির দলিল হিসেবে পূর্বাপর বিবেচিত হয়ে থাকে। উপরন্তু এই কালজয়ী ভাষণ ছিল একাত্তরের রণাঙ্গনে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অফুরন্ত প্রেরণা এবং নিরন্তর সাহস ও উদ্দীপনা যোগানোর অনাবিল উৎস। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের পর সারা দেশের প্রতিটি এলাকা হয়ে যায় বারুদাগার। পাকিস্তানীদের সাথে যে আর থাকা সম্ভব নয় এই ভাষণের মধ্য দিয়ে তা দিবালোকের মত পরিষ্কার এবং অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে যায়। তদুপরি এই ভাষণের পর থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশে পাকিস্তানের শাসন এবং কর্তৃত্ব পুরোপুরিভাবে অচল হয়ে পড়ে। এরই পাশাপাশি ৭ই মার্চের উপরোক্ত তেজোদীপ্ত ভাষণের প্রতিটি শব্দ এবং বাক্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্নভাবে অত্যাচারিত, নিপীড়িত, নির্যাতিত এবং অধিকার বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত এবং প্রশংসিত হতে থাকে।

(১৭)গণ আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর ডাকে মার্চের প্রথম থেকেই সারা বাংলায় চলছিল অসহযোগ আন্দোলন। এহেন অবস্থায় ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের পর থেকে সে আন্দোলন আরও বেগবান এবং জোরদার হতে শুরু করল। ফলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সম্পূর্ণভাবে অচল এবং অকার্যকর হয়ে পড়ল। তদস্থলে বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনা অনুযায়ীই পূর্ব পাকিস্তান পরিচালিত হতে থাকল। এহেন অবস্থায় প্রমাদ গুণলেন পাকিস্তানী শাসক বর্গ। অতঃপর তারা বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনায় বসলেন। বেশ কয়েকদিন ধরে আলোচনা চলতে থাকল। কিন্তু ৬ দফার সমর্থনে দেশবাসীর ম্যান্ডেট পাওয়া বঙ্গবন্ধুকে উক্ত ৬ দফা থেকে এক চুলও সরানো গেল না। ফলে আলোচনা ভেঙ্গে গেল। এহেন অবস্থায় নিরস্ত্র দেশবাসীর উপর সশস্ত্র আক্রমণের নির্দেশ দিয়ে ২৫শে মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে গেলেন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান। তাঁর চলে যাওয়ার অব্যবহিত পর থেকেই বর্বর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী রাতের অন্ধকারে সর্বশক্তি নিয়ে ঘুমন্ত দেশবাসীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

(১৮)ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বিভিন্ন ধরনের উস্কানি এবং প্ররোচনা সত্ত্বেও পাকিস্তানী সামরিক জান্তার পাতানো ফাঁদে বঙ্গবন্ধু পা দেননি। বরং ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানী সামরিক জান্তাই মুজিবের ফাঁদে পা দিল। তারা তাদের পরিকল্পনা মোতাবেক অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় ঐ রাত থেকেই গণহত্যার পথ বেছে নিল। যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত অত্যাধুনিক বিভিন্ন ধরনের মারণাস্ত্র নিয়ে ঐ রাতে তারা ঘুমন্ত বাঙ্গালির উপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো। তদুপরি ঐ রাত থেকেই তারা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা শুরু করলো। এরই পাশাপাশি ঐ রাত ০১-২০ মিনিটের সময়ে তারা বঙ্গবন্ধুকে তাঁর ৩২ নং ধানমন্ডির বাসা থেকে গ্রেফতার করলো। আর এহেন গ্রেফতারের পূর্বে ২৫শে মার্চের মধ্য রাত শেষে তথা ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে রাত ০১-০১ মিনিটের সময়ে তৎকালীন E.P.R (East Pakistan Rifle) -এর ওয়ারলেস মেসেজের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু মুজিব নিজে স্বয়ং সর্বপ্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ঐ রাতে তিনি যে ঘোষণা দেন, তা ছিল Declaration of Independence- “This may be my last message. From today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistan occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved. Joy Bangla.” [সূত্রঃ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ড, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, পৃষ্ঠা- ১]

ড. মোঃ ফজলুর রহমান, সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ (অবঃ) , লেখক ও কলামিস্ট

(চলমান)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Time limit exceeded. Please complete the captcha once again.

Translate »