লুক্সেমবার্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এই চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে
ইউরোপ ডেস্কঃ বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) লুক্সেমবার্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা অনিয়মিত অবস্থায় থাকা অভিবাসীদের জোরপূর্বক বহিষ্কারসংক্রান্ত নতুন বিধিমালায় আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছেন।
তিন মাস আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বিধিমালাটি অনুমোদিত হয়েছিল। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বিদেশিদের যে সদস্য রাষ্ট্রে তারা অবস্থান করছেন, সেখান থেকে চলে যেতে হবে এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে। অন্যথায় তাদের বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা ও শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
এছাড়াও একই দিন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কাউন্সিল নতুন ‘রিটার্ন রেগুলেশন’ বা প্রত্যাবাসন বিধিমালায় চূড়ান্ত সম্মতি দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বিধিমালাটি ইইউর সরকারি জার্নালে প্রকাশ এবং কার্যকর হওয়ার আগে শেষ ধাপ সম্পন্ন হলো।

উল্লেখ্য যে,চলতি বছররে জুনের শুরুতে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও কাউন্সিলের মধ্যে এই বিধিমালা নিয়ে সমঝোতা হয়েছিল। এতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোতে ‘রিটার্ন হাব’ বা প্রত্যাবাসন
কেন্দ্র স্থাপনের সুযোগ রাখার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
অনিয়মিত অবস্থায় থাকা বিদেশিদের বহিষ্কারের আইনি কাঠামো নির্ধারণকারী এই বিধিমালা ইইউর অভিবাসন নীতির সবচেয়ে বিতর্কিত উদ্যোগগুলোর একটি।
এর সমর্থকদের মতে, যেসব অনিয়মিত অভিবাসীর নিজ দেশ তাদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে এটি একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। বর্তমানে ইইউতে দেশত্যাগের নির্দেশ পাওয়া বিদেশিদের বিরুদ্ধে জারি করা বহিষ্কার আদেশের মাত্র ২০ শতাংশ বাস্তবে কার্যকর হয়।
এদিকে ইইউ কাউন্সিলের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নতুন নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিদেশিদের সদস্য রাষ্ট্র ছেড়ে যেতে হবে এবং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে। অন্যথায় তাদের ভাতা কমানো, স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের জন্য সহায়তা প্রত্যাখ্যান, জরিমানা এমনকি জাতীয় আইনে বিধান থাকলে ফৌজদারি শাস্তিও দেওয়া হতে পারে।
ইইউ কাউন্সিল আরও জানিয়েছে, প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উল্লেখ করে একটি অভিন্ন ফরম তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইইউর একটি সদস্য রাষ্ট্র অন্য সদস্য রাষ্ট্রের নেওয়া প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত স্বীকৃতি দিতে পারবে। তবে এই পারস্পরিক স্বীকৃতি আপাতত স্বেচ্ছামূলক থাকবে। বিধিমালা কার্যকর হওয়ার তিন বছর পর বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। এরপর ইউরোপীয় কমিশন চাইলে এই স্বীকৃতি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিতে পারবে।

ইউরোপে প্রবেশে অনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞার সুযোগ নতুন বিধিমালার আওতায় সদস্য রাষ্ট্রগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য ইউরোপে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবে। একই সঙ্গে তৃতীয় দেশের নাগরিকদের ২৪ মাসের বেশি সময় প্রশাসনিক আটকেও রাখার সুযোগ থাকবে।
ইইউ কাউন্সিল জানিয়েছে, কোনো বিদেশির কারণে নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হলে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী তা যুক্তিসংগত ও আনুপাতিক বলে বিবেচিত হলে সদস্য রাষ্ট্রগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা দিতে পারবে। এছাড়া তৃতীয় দেশের নাগরিকদের ২৪ মাসের বেশি সময় আটক রাখার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত পাওয়া ব্যক্তিদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের কোনো দেশে পাঠানো যাবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে চুক্তি বা সমঝোতা থাকতে হবে। ওই দেশকে মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলতে হবে, যার মধ্যে জোরপূর্বক ফেরত না পাঠানোর নীতিও অন্তর্ভুক্ত। তবে অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের এই ব্যবস্থার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।
ইইউ কাউন্সিলের সভাপতিত্বকারী দেশ আয়ারল্যান্ডের বিচার, স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রী জিম ও’ক্যালাহান বলেন, ইইউ ছাড়ার নির্দেশ পাওয়া প্রতি তিনজনের মধ্যে প্রায় দুজনই বাস্তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করেন না।
বিধিমালাটি আজ শুক্রবার (২ অক্টোবর) ইইউর সরকারি জার্নালে প্রকাশিত হয়ে কার্যকর হবে। ‘রিটার্ন হাব’সংক্রান্ত বিধানগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। অন্য বিধানগুলো কার্যকর হতে এক বছর সময় লাগবে।

‘রিটার্ন হাব’ নিয়ে উদ্বেগ: নতুন বিধিমালার বিরোধীরা আশঙ্কা করছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশগুলোতে পাঠানো অভিবাসীদের মানবাধিকার যথাযথভাবে সুরক্ষিত থাকবে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের বিবৃতিতে বলেছে, ‘‘এ ধরনের চুক্তি কেবল সেই তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে করা যাবে, যারা মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং জোরপূর্বক ফেরত না পাঠানোর নীতি মেনে চলে।’’
বেলজিয়ামভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা পিকাম (পিআইসিইউএম)-এর অ্যাডভোকেসি কর্মকর্তা চিয়ারা কাতেল্লি নতুন বিধিমালার সমালোচনা করেছেন।
তিনি বলেন,এই বিধিমালা অভিবাসীদের আটক ও বহিষ্কারের পরিধি বাড়িয়েছে, কাগজপত্রহীন মানুষদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারে উৎসাহিত করছে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে এমন গন্তব্যে মানুষ পাঠানোর ক্ষেত্রে অবাধ সুযোগ দিচ্ছে, যেসব জায়গা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোনো ধারণাই নেই।
তিনি আরও বলেন, ‘‘এর ফলে আরও বেশি মানুষ সরকারি পরিষেবা নিতে বা সুরক্ষার আবেদন করতে ভয় পাবেন। কারণ, তাদের আশঙ্কা থাকবে যে এতে তাদের আটক করা হতে পারে অথবা বহিষ্কার করা হতে পারে। শেষ পর্যন্ত এই বিধিমালা অনিয়মিত অবস্থায় থাকা মানুষের সংখ্যা কমানোর পরিবর্তে আরও বাড়াবে।’’
বাস্তবে এসব ‘রিটার্ন হাব’ বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলের এমন দেশগুলোতে স্থাপন করা যেতে পারে, যেসব দেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশির কোনো সম্পর্ক নাও থাকতে পারে। অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের এসব কেন্দ্রে পাঠানো হবে না। তবে শিশু-সন্তানসহ পরিবারগুলো এই ব্যবস্থার আওতায় পড়তে পারে।
প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে একাধিক কঠোর ব্যবস্থা: নতুন বিধিমালায় বহিষ্কার ত্বরান্বিত করা এবং সুরক্ষার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আইনি প্রতিকারের সুযোগ সীমিত করার জন্য একাধিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে:
প্রশাসনিক আটকের সময়সীমা বৃদ্ধি: নতুন বিধিমালায় প্রশাসনিক আটকের সর্বোচ্চ সময়সীমা ১৮ মাস থেকে বাড়িয়ে ২৪ মাস করার বিধান রাখা হয়েছে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে, নতুন তথ্য পাওয়া গেলে অথবা সংশ্লিষ্ট তৃতীয় দেশের সঙ্গে সহযোগিতার উন্নতি হলে মোট ছয় মাস পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় আটকের মেয়াদ বাড়ানো সম্ভব হবে।
এছাড়া কোনো তৃতীয় দেশের নাগরিক ইইউর অন্য একটি সদস্য রাষ্ট্রে চলে গেলে তার ক্ষেত্রে নতুন করে আটকের সময়সীমা শুরু হতে পারে।
আটকের নিয়ম আরও কঠোর: নতুন বিধিমালায় অনিয়মিত অবস্থায় থাকা বিদেশিদের পৃথকভাবে মূল্যায়ন করে প্রশাসনিক আটকের ব্যবস্থা আরও কঠোর করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা না করা, পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকা অথবা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আটক রাখা যেতে পারে।
অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক ও শিশু-সন্তানসহ পরিবারকে আটক রাখার সুযোগ: নতুন নিয়মে অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং শিশু-সন্তানসহ পরিবারকে আটক কেন্দ্রে রাখার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।
তবে এটি কেবল ‘‘শেষ অবলম্বন’’ হিসেবে এবং যতটা সম্ভব কম সময়ের জন্য প্রয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় রাখার কথা বলা হয়েছে।
ইউরোপে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা সর্বোচ্চ ২০ বছর:
নতুন বিধিমালায় ইউরোপীয় ভূখণ্ডে পুনঃপ্রবেশের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ সাধারণভাবে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এই নিষেধাজ্ঞা আরও দীর্ঘ হতে পারে।
বিধিমালায় বলা হয়েছে, যথাযথভাবে প্রমাণিত কারণ থাকলে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ডে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রবেশ ঠেকানো প্রয়োজন বলে বিবেচিত হলে সর্বোচ্চ ২০ বছরের জন্য প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেতে পারে।
বহিষ্কারের বিরুদ্ধে আপিলে স্থগিতাদেশের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বাতিল: নতুন বিধিমালায় বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহিষ্কার স্থগিত থাকার ব্যবস্থাও বাতিল করা হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো বিদেশি বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করলেও তার বহিষ্কার কার্যকর হতে পারে।
ব্যক্তিগত সামগ্রী তল্লাশির ক্ষমতা: নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শরীর ও ব্যক্তিগত সামগ্রী তল্লাশি করতে পারবে। ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করার ক্ষমতাও রাখা হয়েছে।
তবে ইইউ কাউন্সিলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এসব ব্যবস্থা প্রয়োগের ক্ষেত্রে মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে হবে। একইসঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতীয় আইনে নির্ধারিত সুরক্ষা এবং আইনি প্রতিকারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
তথ্য সূত্র: ইনফোমাইগ্রেন্টস
কবির আহমেদ/ইবিটাইমস/এম আর





















